যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ফেয়ারফিল্ড শহরের মেয়র ক্যাথরিন ময় হঠাৎ করেই পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগের সময়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ শহর কর্তৃপক্ষ তার আবাসন-সংক্রান্ত যোগ্যতা নিয়ে চলা একটি বিতর্কিত তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করতে বৈঠকে বসার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে ফেয়ারফিল্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল মেয়র ক্যাথরিন ময়ের বাসস্থান নিয়ে বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি আইন অনুযায়ী ফেয়ারফিল্ড শহরের বাসিন্দা হিসেবে মেয়রের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেছিলেন কি না। এই অভিযোগের তদন্তের জন্য শহর কর্তৃপক্ষ একজন স্বাধীন আইনজীবী নিয়োগ দেয়।
মঙ্গলবার একটি বিশেষ সিটি কাউন্সিল বৈঠকে তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই পদত্যাগপত্র জমা দেন ক্যাথরিন ময়। ফলে তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আর তৈরি হয়নি।
মেয়রের আসন শূন্য থাকায় বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন উপমেয়র প্যাম বার্তানি। বৈঠকে তিনি স্বীকার করেন, এমন পদত্যাগের ঘটনা তিনি একেবারেই প্রত্যাশা করেননি।
তদন্তে নিয়োজিত স্বাধীন আইনজীবী তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ক্যাথরিন ময় ফেয়ারফিল্ড শহরের বাইরে বসবাস করতেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন কি না, সেই সিদ্ধান্ত সিটি কাউন্সিলের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পদত্যাগের ফলে কার্যত তদন্ত প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটে। শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি আর দায়িত্বে না থাকায় এ বিষয়ে পরবর্তী কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
তবে তদন্ত বন্ধ হয়ে গেলেও বিতর্ক থামেনি। সিটি কাউন্সিল বৈঠকে জনমত প্রকাশের সময় বিষয়টি নিয়ে শহরবাসীর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা যায়।
কিছু বাসিন্দা তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, এটি ছিল একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা। এক বক্তা বলেন, এই ঘটনার কারণে শহরের প্রশাসনিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরেকজন অভিযোগ করেন, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিকল্পিত আক্রমণ।
ময়ের সমর্থকদের একজন বলেন, ক্যাথরিন ময়ের পরিবারের শিকড় বহুদিন ধরে ফেয়ারফিল্ডে। তিনি এই শহরেই বড় হয়েছেন, পরিবার গড়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই তাকে শহরের বাইরের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশের মত ভিন্ন। তাদের দাবি, এই পরিস্থিতির জন্য মেয়র নিজেই দায়ী। একজন বক্তা মন্তব্য করেন, বাইরের কোনো গোষ্ঠী নয়, বরং নিজের কর্মকাণ্ডের কারণেই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সংকটে পড়েছে।
একই বৈঠকে ক্যাথরিন ময়ের আইনগত ব্যয় বহনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। আবাসন-সংক্রান্ত বিতর্ক মোকাবিলায় তিনি যে আইনজীবীদের সহায়তা নিয়েছিলেন, সেই ব্যয় শহর কর্তৃপক্ষ বহন করবে কি না, তা নিয়ে ভোটাভুটি হয়।
তবে কাউন্সিল সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ৫-১ ভোটে তার আইনি ব্যয় পরিশোধের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। কাউন্সিল সদস্য কে. প্যাট্রিস উইলিয়ামস বলেন, যে পরিস্থিতির কারণে এসব আইনগত ব্যয় তৈরি হয়েছে, তার জন্য সাবেক মেয়র নিজেই দায়ী। তাই করদাতাদের অর্থ দিয়ে সেই ব্যয় বহনের যৌক্তিকতা তিনি দেখেন না।
ফেয়ারফিল্ড শহরে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ে পুলিশের একটি গ্রেপ্তার অভিযান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পাশাপাশি একটি স্নাতক সমাপনী অনুষ্ঠানের বাইরে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনাও শহরটিকে জাতীয় সংবাদে নিয়ে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে উপমেয়র প্যাম বার্তানি শহরবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ফেয়ারফিল্ড বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনার কারণে সংবাদ শিরোনামে এসেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক বিভাজন দূরে রেখে শহরের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করা।
বর্তমানে বার্তানি ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সিটি কাউন্সিল আগামী সপ্তাহে মেয়াদের অবশিষ্ট সময়ের জন্য নতুন মেয়র নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে ফেয়ারফিল্ডের পরবর্তী নির্বাচিত মেয়র কে হবেন, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররা। আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে শহরবাসী নতুন মেয়র বেছে নেবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের অভিবাসী আদালতগুলোতে কড়াকড়ি বাড়ায় বড় ধরনের আইনি ঝুঁকিতে পড়েছে শিশুরা। ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে দ্রুত বিচারকাজ পরিচালনার নীতি গ্রহণ করায় নিউআর্ক ফেডারেল আদালতে শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের নির্বাসনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় অভিবাসী আইনজীবী ও প্রবক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে নিউআর্কের আদালতে একসঙ্গে অনেক মানুষের উপস্থিতি ও অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত শুনানির প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের বিশাল মামলার তালিকার সঙ্গেই শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিচারকাজে যুক্ত করা হচ্ছে, যা শিশুদের সুরক্ষার আইনগত বিধানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। আইনি সহায়তার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা এবং বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার তীব্র তাগিদে বহু শিশু আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই পাচ্ছে না। ফলে তারা প্রতিনিয়ত গুরুতর আইনি জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে এবং কোনো ধরনের আইনি প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই তাদের আদালতে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ভেরা ইনস্টিটিউট অব জাস্টিসের তথ্য মতে, বিগত ছয় মাসে আদালতে যাওয়া শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৮১ শতাংশকেই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাইডেন প্রশাসনের শেষ ছয় মাসের তুলনায় এই নির্বাসনের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আইনজীবীরা আরও বলছেন, বিশেষ অভিবাসী শিশু মর্যাদা পাওয়ার পরও বর্তমান আইনি ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে অনেক শিশু এখন নির্বাসন থেকে কোনো ধরনের সুরক্ষা পাচ্ছে না। ফলে এসব অসহায় শিশু ও তরুণদের ভবিষ্যৎ জীবন চরম অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার মুখে পতিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং অভিবাসন বিষয়ক নির্বাহী পর্যালোচনা কার্যালয় অবশ্য জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও যথাসময়ে সম্পন্ন করতেই মূলত মামলার জট কমানোর ওপর এই বাড়তি জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, তাড়াহুড়ো করে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে অভিবাসী শিশুরা চরম অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে এবং তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করতে সরকার নতুন অভিবাসন বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শদাতা ও আইনজীবীর তীব্র সংকটের কারণে অভিবাসী পরিবার ও শিশুরা চরম আইনি সহায়তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি স্থগিত ও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন প্রস্তাবিত আইনে আগামী তিন বছরের জন্য নতুন এইচ-১বি ভিসা দেওয়া বন্ধ এবং কর্মসূচির নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর টিম শিহি এই প্রস্তাবিত বিলটি সিনেটে উত্থাপন করেছেন। বিলটি পাস হলে বিদেশি কর্মী নিয়োগ, গ্রিন কার্ডের পথ এবং ভিসাধারীদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার সুযোগে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, তিন বছর নতুন এইচ-১বি ভিসা ইস্যু না করে এই কর্মসূচির পুরো কাঠামো পর্যালোচনা করা হবে। এরপর আরও কঠোর শর্তে কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করা হতে পারে। সমর্থকদের দাবি, এইচ-১বি ভিসা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণের জন্য তৈরি হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান কম খরচে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে স্থানীয় কর্মীদের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সিনেটর টিম শিহি বলেছেন, নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য হলো কর্মসূচির অপব্যবহার বন্ধ করা এবং মার্কিন কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রস্তাবিত বিলে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা করা এইচ-১বি ভিসা আবেদনের জন্য ১ লাখ ডলার ফি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান লটারি পদ্ধতি বাতিল করে বেতনভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তৃতীয় পক্ষের স্টাফিং কোম্পানির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ, একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ এবং এইচ-১বি ভিসাধারীদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার সুযোগ সীমিত বা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। শুধু কর্মী ভিসাই নয়, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব রয়েছে। বিলটিতে অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং (ওপিটি) কর্মসূচি বাতিল এবং নির্দিষ্ট কিছু এক্সচেঞ্জ ভিসাধারীদের কাজের অনুমতি প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ফেডারেল সরকারি সংস্থাগুলোতে অ-অভিবাসী ভিসাধারীদের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন এখনো চূড়ান্ত নয়। বিলটি কার্যকর হতে হলে প্রথমে সিনেটে পাস হতে হবে। এরপর প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর প্রায় ৬৫ হাজার সাধারণ এইচ-১বি ভিসা দেয়। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চতর ডিগ্রিধারী আবেদনকারীদের জন্য আরও ২০ হাজার ভিসার কোটা রয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে ভারত, বাংলাদেশ, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগে এই কর্মসূচি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে সফটওয়্যার, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও গবেষণা খাতে কর্মরত হাজারো বিদেশি পেশাজীবীর জন্য এইচ-১বি ভিসা যুক্তরাষ্ট্রে ক্যারিয়ার গড়ার অন্যতম প্রধান পথ। ফলে নতুন প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক দক্ষ কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস ও কাজ করে আসা ১০ লাখের বেশি অভিবাসীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) কর্মসূচি বাতিলের উদ্যোগের ফলে এল সালভাদর, হাইতি ও আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকরা কাজের অনুমতি হারানো এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। ওয়াশিংটন ডিসি ও আশপাশের এলাকায় এল সালভাদরের বংশোদ্ভূত অনেক কর্মী মার্কিন ক্যাপিটল হিল, পেন্টাগন এবং আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সংস্কার ও নির্মাণকাজে অবদান রেখেছেন। একইভাবে ফ্লোরিডা, ম্যাসাচুসেটস ও নিউইয়র্কের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে হাইতিয়ান সেবাকর্মীরা বহু বছর ধরে প্রবীণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন সহায়তা দিয়ে আসছেন। টিপিএস কর্মসূচির আওতায় থাকা এসব মানুষ এখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। আদালতের সিদ্ধান্তের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন মানবিক সুরক্ষা হিসেবে চালু থাকা এই কর্মসূচি বন্ধের পথে এগোতে পারছে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টিপিএস সুবিধাভোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে সক্রিয়। তাদের বড় একটি অংশ নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করছেন। প্রথম ধাপে হাইতি ও কয়েকটি দেশের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টিপিএস সুবিধাভোগী তাদের কাজের অনুমতি হারাতে পারেন। এরপর এল সালভাদরের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষও সেপ্টেম্বরের পর তাদের আইনি সুরক্ষা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর প্রভাব শুধু অভিবাসীদের জীবনেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প খাতেও পড়তে পারে। পেন ওয়ার্টন বাজেট মডেলের নীতি বিশ্লেষক আলেকজান্ডার আরনন বলেন, নির্দিষ্ট শিল্প ও অঞ্চলে আইনিভাবে কাজ করার অনুমতি হারানো হাজার হাজার কর্মীর অভাব বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। টিপিএস সুবিধাভোগীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ঘটতে পারে। কেউ কেউ অ্যাসাইলাম বা অন্য আইনি সুরক্ষার চেষ্টা করবেন, আবার কেউ কেউ বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। টিপিএস বহাল রাখার দাবিতে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও সক্রিয় হয়েছে। ইউএস চেম্বার অব কমার্সের নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কংগ্রেসের প্রতি কর্মসূচিটি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। চেম্বার সতর্ক করেছে, টিপিএস বাতিল হলে শ্রমবাজারে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং একটি অপ্রয়োজনীয় মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতাও এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ওহাইওর রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইন হাইতিয়ানদের জন্য টিপিএস শেষ করার সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মন্তব্য করেছেন এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা জানিয়েছেন। দক্ষিণ ফ্লোরিডায়, যেখানে বড় হাইতিয়ান জনগোষ্ঠী বসবাস করে, মিয়ামি-ডেড কাউন্টির নেতারাও ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে রিপাবলিকানদের একটি অংশ টিপিএসের সমালোচনা করছে। মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর এরিক শ্মিট বলেন, এই কর্মসূচি জরুরি পরিস্থিতির জন্য তৈরি হলেও পরে এটি দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯০ সালে কংগ্রেস অনুমোদিত এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ, সংঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরতে না পারা বিদেশি নাগরিকদের সাময়িক সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু কিছু দেশে দীর্ঘস্থায়ী সংকট চলতে থাকায় অনেক অভিবাসী বছরের পর বছর এই সুবিধার আওতায় থেকেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই টিপিএস কর্মসূচির বিরোধিতা করে আসছেন। তার প্রশাসন এটিকে বাতিল করার উদ্যোগ নেয় এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্বাহী শাখা এই পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পায়। বিভিন্ন কোম্পানি ও শিল্প প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে টিপিএস কর্মীদের দক্ষতা ও অবদানের প্রশংসা করে এসেছে। তবে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পর অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি মন্তব্য না করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তাদের উদ্বেগ জানাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, টিপিএস বাতিলের মাধ্যমে অভিবাসন আইনের নিয়মিত কাঠামোয় ফিরে যাওয়া হচ্ছে। ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার বলেন, সরকার আইনের শাসন বজায় রাখছে। এখন টিপিএস সুবিধাভোগীদের সামনে বড় সিদ্ধান্ত—তারা যুক্তরাষ্ট্রে থাকার জন্য অন্য কোনো আইনি পথ খুঁজবেন, নাকি নিজ দেশে ফিরে যাবেন। অনেকেরই যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, চাকরি এবং পরিবার রয়েছে। এল সালভাদর থেকে আসা কনসেপসিয়ন মোরালেস টিপিএসের মাধ্যমে নেভাল একাডেমি ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ২২ বছর কাজ করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সরকারি ভবনেই কোনো না কোনো টিপিএস কর্মীর অবদান রয়েছে। কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষক প্যাট্রিসিয়া ক্যাম্পোস-মেদিনা বলেন, অনেক টিপিএস সুবিধাভোগী তাদের জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। তাদের সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে, তারা বাড়ি ও ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। অন্যদিকে, সমালোচকরা বলছেন, টিপিএস একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হলেও এটি দীর্ঘদিন ধরে চলায় অভিবাসন ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। হাইতির মতো দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০২১ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট হত্যার পর থেকে সেখানে ব্যাপক সহিংসতা চলছে। রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্সের বড় অংশ সশস্ত্র গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফ্লোরিডায় কর্মরত এক হাইতিয়ান নার্স, যিনি দীর্ঘদিন টিপিএস সুবিধার আওতায় ছিলেন, বলেন দেশে ফিরে যাওয়ার চিন্তা তাকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানের মা এই নারী আশঙ্কা করছেন, অভিবাসন কর্মকর্তাদের নজরে পড়তে পারেন তিনি। টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্ত এখন শুধু একটি অভিবাসন নীতির পরিবর্তন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ খাত এবং লাখো অভিবাসী পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বড় রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।