যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও বাড়ছে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ। নিউইয়র্ক, মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া, মিশিগান, টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বর্তমানে বহু বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। ভালো বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, সম্মানজনক পেশা এবং কমিউনিটির সেবার সুযোগ থাকায় অনেকের এ পেশার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ অফিসার হতে হলে কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। অধিকাংশ পুলিশ বিভাগে আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অথবা কিছু ক্ষেত্রে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা (গ্রিন কার্ডধারী) হওয়ার শর্ত থাকে। আবেদনকারীর হাই স্কুল ডিপ্লোমা বা GED থাকতে হয় এবং অনেক বিভাগ কলেজ শিক্ষাকে অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করে।
পুলিশ বিভাগে যোগ দিতে হলে প্রথমে লিখিত পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষা, মেডিকেল পরীক্ষা এবং বিস্তারিত ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন ও সাক্ষাৎকারও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক বিভাগে পলিগ্রাফ বা লাই ডিটেক্টর পরীক্ষাও নেওয়া হয়ে থাকে।
নির্বাচিত প্রার্থীদের পরে পাঠানো হয় পুলিশ একাডেমিতে। সেখানে কয়েক মাসব্যাপী প্রশিক্ষণে আইন, অস্ত্র পরিচালনা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, আত্মরক্ষামূলক কৌশল এবং কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। একাডেমি শেষে নতুন কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে অভিজ্ঞ অফিসারের সঙ্গে কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলা ভাষা জানা এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা থাকায় কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বিরোধ বা কমিউনিটি সচেতনতা কার্যক্রমে বাংলাদেশি অফিসারদের উপস্থিতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বেতন ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকেও পেশাটি আকর্ষণীয়। অঙ্গরাজ্য ও বিভাগের ভিত্তিতে একজন পুলিশ অফিসারের বার্ষিক আয় সাধারণত ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ডলারের বেশি হতে পারে। এছাড়া স্বাস্থ্যবীমা, পেনশন, ওভারটাইম এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধাও পাওয়া যায়।
তবে পুলিশ বিভাগে যোগ দিতে আগ্রহীদের জন্য পরিষ্কার ব্যক্তিগত রেকর্ড, শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন এবং শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ছয় বছরের এক শিশুকন্যা ও তার বাবার মৃত্যুকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, পারামাট্টা নদীতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৪৭ বছর বয়সী মওলিক ধান্ধুকিয়া এবং তার ছয় বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সিডনির কনকর্ড এলাকার কাছে একটি নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। তার সঙ্গে ছিলেন ছয় বছর বয়সী কন্যা। কিছু সময় পর নদীতে জরুরি পরিস্থিতির খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। আরও পড়ুন...টেক্সাসে স্বামীর গুলিতে স্ত্রী নিহত, পরে পুলিশের গুলিতে স্বামী নিহত; দুই শিশুকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুপুরের কিছু আগে মওলিক ধান্ধুকিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে শিশুটির সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিশুকন্যার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করেন। ঘটনার তদন্তে সহায়তার জন্য আশপাশের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় একটি স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় জানানো হয়েছে, আগামী শুক্রবার রাউস হিলের ক্যাসেলব্রুক ক্রেমেটোরিয়ামে বাবা ও মেয়ের যৌথ শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। শোকবার্তায় লেখা হয়েছে, “দুই কোমল ও সদয় আত্মা, যারা চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।” তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগে কয়েক দফা নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। একবার তার স্ত্রী প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়াও তার সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে। আরও পড়ুন...টেক্সাসে বিস্ফোরণের আগুনে পুড়েও বাড়ি ও নাতি-নাতনিদের বাঁচালেন এক সাহসী দাদা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ একটি পোস্ট করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। সেখানে তিনি ২০০৫ সালে জিমে ব্যায়াম করার সময় ঘাড়ে পাওয়া আঘাতের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগা শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ঘাড়ের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তার জীবনের অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমআরআই পরীক্ষায় তার মেরুদণ্ডের ঘাড়ের অংশে স্নায়ুর ওপর চাপের বিষয়টি ধরা পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মওলিক ধান্ধুকিয়া পেশাগত জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করতেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি সাউথ ইস্টার্ন সিডনি লোকাল হেলথ ডিস্ট্রিক্টে অ্যাপ্লিকেশন সাপোর্ট বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এই ঘটনার পর পরিবারটির জন্য সহায়তা তহবিলও গঠন করেছেন স্বজন ও পারিবারিক বন্ধুরা। তহবিল সংগ্রহের আহ্বানে বলা হয়েছে, প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়া একসঙ্গে তার স্বামী ও একমাত্র কন্যাকে হারিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে তাকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। ▶️ ট্রাম্পের লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি অবৈধ ঘোষণা মার্কিন আদালতের তহবিলের অর্থ শেষকৃত্যের ব্যয়, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং নিকট আত্মীয়দের যাতায়াত ও আবাসন খাতে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস্টিন ম্যাকডোনাল্ড ঘটনাটিকে “পরিবার ও সমাজের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। আমরা সব দিক থেকে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি এবং কোনো সম্ভাবনাই উপেক্ষা করা হবে না।” পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে পারিবারিক সহিংসতার কোনো উপাদান ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। বাবা ও মেয়ের একসঙ্গে শেষকৃত্যের খবর আরও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেছে। স্বজন ও পরিচিতজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া শিগগিরই আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। দেশটির স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) নাগরিকত্ব আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট আপিল প্রক্রিয়ার ফি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের আবেদনকারীদের জন্য বিদ্যমান ফি ছাড় ও ফি মওকুফের সুবিধা বাতিলেরও পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে মার্কিন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে আগ্রহীদের অতিরিক্ত কয়েকশ ডলার ব্যয় করতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের অভিবাসীদের জন্য এটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অভিবাসন অধিকারকর্মীরা। বর্তমানে নাগরিকত্বের আবেদনপত্র বা ফরম এন-৪০০ জমা দিতে কাগজে আবেদন করলে ৭৬০ ডলার এবং অনলাইনে আবেদন করলে ৭১০ ডলার ফি দিতে হয়। তবে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এই ফি বাড়িয়ে যথাক্রমে ১,৩৩০ ডলার ও ১,২৮০ ডলার করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে পুনর্বিবেচনার জন্য ব্যবহৃত ফরম এন-৩৩৬-এর ফিও বাড়ানো হতে পারে। বর্তমানে কাগজে আবেদন করলে এর ফি ৮৩০ ডলার এবং অনলাইনে ৭৮০ ডলার। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী তা বেড়ে কাগজে ১,৪৭৫ ডলার এবং অনলাইনে ১,৪২৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর অর্থ হলো, কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের ব্যয় বর্তমানের তুলনায় ৮০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। ডিএইচএস আরও জানিয়েছে, বর্তমানে যেসব আবেদনকারীর পারিবারিক আয় ফেডারেল দারিদ্র্যসীমার ৪০০ শতাংশ বা তার কম, তারা নাগরিকত্ব আবেদনে কম ফি দেওয়ার সুযোগ পান। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে সেই সুবিধা পুরোপুরি তুলে দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, নাগরিকত্ব আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট আপিল প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ফি মওকুফের সুযোগও বাতিল করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আবেদনকারীরা ভবিষ্যতে বিশেষ ছাড় পাবেন না। তবে বর্তমান ও সাবেক মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ফি ছাড় বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে ডিএইচএস। নতুন ফি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভাগটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা (ইউএসসিআইএস) আবেদন প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে যে ব্যয় বহন করে, নতুন ফি সেই ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। পাশাপাশি সংস্থাটির আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও এই পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএসসিআইএস মূলত আবেদনকারীদের দেওয়া ফি থেকেই পরিচালিত হয়। ফলে কার্যক্রমের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে সংস্থাটি প্রায়ই ফি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়। তবে নাগরিকত্ব আবেদন ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে অনেক অভিবাসী আবেদন করতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অভিবাসীদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ নাগরিকত্ব অর্জনের পাশাপাশি আবেদন, নথিপত্র সংগ্রহ, ভাষা ও নাগরিকত্ব পরীক্ষার প্রস্তুতিসহ অন্যান্য খরচও বহন করতে হয়। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই নতুন ফি কাঠামো কার্যকর হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে প্রস্তাবটি ইতোমধ্যেই অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, নাগরিকত্ব অর্জনের পথ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বহু অভিবাসীর জন্য নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা খাতে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ৪৫৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রায় ৯০ জন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী। মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড কর্মসূচির নামে ভুয়া বিল, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ঘুষভিত্তিক রোগী রেফারেল এবং জাল চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ ব্যয় করা হয়েছে বিলাসবহুল গাড়ি, দামি গয়না, প্রাসাদোপম বাড়ি, শিল্পকর্ম, ব্যক্তিগত নৌযান ও বিদেশি সম্পত্তি কেনায়। মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এই অভিযানের ঘোষণা দিয়ে একে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যৌথ ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের অভিযান বলে উল্লেখ করেন। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের আওতায় ৪৫টি অঙ্গরাজ্য ও বিভিন্ন অঞ্চলে একযোগে তদন্ত চালানো হয়। তদন্তে উঠে আসে, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তার জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থের বড় অংশ প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলোর একটিতে টেক্সাসের এক নার্সের বিরুদ্ধে প্রায় ৯০৬ মিলিয়ন ডলার বা ৯০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ভুয়া দাবি উত্থাপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রোগীদের অপ্রয়োজনীয় টিস্যু গ্রাফট প্রয়োগ করে মেডিকেয়ারের কাছে প্রতি রোগীর জন্য বিপুল অঙ্কের বিল জমা দেন। অভিযুক্ত মারিজেল ইউকি নামে ওই নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ২৯৭ মিলিয়ন ডলার আদায় করতে সক্ষম হন এবং সেই অর্থ দিয়ে বিলাসবহুল গাড়ি, গয়না ও স্থাবর সম্পত্তি কেনেন। এমনকি ফিলিপাইনে প্রায় ৪৬ লাখ ডলার ব্যয়ে একটি সমুদ্রসৈকত রিসোর্টও নির্মাণ করেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের সময় কর্তৃপক্ষ তার ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ৩ কোটি ডলার, কয়েক লাখ ডলার নগদ অর্থ, একটি বিলাসবহুল ফেরারি, আরও কয়েকটি দামি গাড়ি এবং উচ্চমূল্যের গয়না জব্দ করেছে। অন্য এক মামলায় চিকিৎসা পণ্যের একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ কমিশন ও ঘুষভিত্তিক বিপণনের মাধ্যমে শত শত মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, রোগীদের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ব্যয়বহুল ক্ষত চিকিৎসা সামগ্রী ব্যবহারে চিকিৎসকদের উৎসাহিত করা হতো। এর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের মাধ্যমে প্রায় ১২০ কোটি ডলারের ভুয়া বা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিল জমা দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত ৬১৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ। ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে আরেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি প্রতিদিন শত শত ঘণ্টার কাউন্সেলিং ও থেরাপি সেবার বিল জমা দিয়েছেন, যা বাস্তবে প্রদান করা সম্ভব ছিল না। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীসংখ্যা এত কম ছিল যে তারা ২৪ ঘণ্টা কাজ করলেও ওই পরিমাণ সেবা দেওয়া সম্ভব হতো না। তবুও প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের দাবি উত্থাপন করা হয় এবং এর মধ্যে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার আদায় করা হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে, ওই অর্থের বড় অংশ বিনিয়োগ, বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবসা, সম্পত্তি ক্রয় এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপনে ব্যয় করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে শিক্ষার্থী ক্রীড়াবিদদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে। টেক্সাসের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ক্রীড়াবিদদের হৃদরোগ পরীক্ষা করে প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বিল জমা দেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই স্বাভাবিক বলে অনুমোদন দেন। মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এক শিক্ষার্থীর পরীক্ষার রিপোর্টে সম্ভাব্য হৃদরোগের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও সেটিকে স্বাভাবিক বলে ঘোষণা করা হয়। মাত্র ২৪ দিন পর বাস্কেটবল অনুশীলনের সময় ওই শিক্ষার্থী হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তদন্তকারীদের দাবি, ওই ঘটনার পরও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক একই ধরনের অনুমোদন দেওয়া অব্যাহত রাখেন। ফ্লোরিডার আরেক বাসিন্দার বিরুদ্ধে প্রায় ৩৭৬ কোটি ডলারের ভুয়া চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের বিল জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁর দুটি প্রতিষ্ঠান এমন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ক্ষত পরিচর্যা সামগ্রীর বিল করেছে, যা বাস্তবে কখনো সরবরাহই করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রায় ৫৭ লাখ ডলার পেয়েছিলেন এবং পরে সেই অর্থের একটি অংশ বিদেশে স্থানান্তর করেন। তদন্ত শুরুর পর তিনি দেশ ছাড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সাইপ্রাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা খাতে জালিয়াতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড কর্মসূচিতে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার অপচয় ও প্রতারণার অভিযোগ উঠে আসে। তবে এবারের অভিযান আকার ও অর্থের পরিমাণের দিক থেকে সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় বলে বিবেচিত হচ্ছে। মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে সবাই আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার চিকো শহরের একটি লাইব্রেরিতে গত সোমবার এক কিশোর বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে দুজন নিহত হয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত ৪৬ বছর বয়সী জ্যাকব হালের ভাই বেঞ্জামিন হেনেবেরি কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের কাছে সেদিনের ভয়ংকর ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, জ্যাকব সেদিন তার সাবেক প্রেমিকার মেয়েকে দেখাশোনা করছিলেন এবং তাকে নিয়ে লাইব্রেরিতে গিয়েছিলেন। বেঞ্জামিনের আক্ষেপ, তার ভাই সম্পূর্ণ ভুল সময়ে ভুল একটি জায়গায় উপস্থিত ছিলেন, যার খেসারত তাকে নিজের জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের বরাত দিয়ে জানা যায়, ব্র্যাডলি স্কট সায়ার নামের ১৮ বছর বয়সী ওই হামলাকারী হঠাৎ করেই লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। বেঞ্জামিন জানান, প্রবেশপথের কাছে থাকায় তার ভাই জ্যাকব সবার আগেই এই নির্মম বুলেটের শিকার হন। জ্যাকবকে হত্যার পর হামলাকারী ডেস্কে বসে থাকা ৭৪ বছর বয়সী এক বৃদ্ধকেও গুলি করে হত্যা করে। এ সময় একটি শিশুও আহত হয়, যাকে পরবর্তীতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং বর্তমানে সে আশঙ্কামুক্ত। সৌভাগ্যক্রমে জ্যাকবের সাথে থাকা তার সাবেক প্রেমিকার মেয়েটি এই ভয়াবহ হামলা থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় রক্ষা পায়। তবে এই প্রাণহানির সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারত, যদি না লাইব্রেরির কর্মীরা অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিতেন। বুট কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মাইক র্যামসি জানিয়েছেন, গুলির শব্দ শোনা মাত্রই কর্মীরা লাইব্রেরিতে উপস্থিত সাধারণ পাঠক ও শিশুদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন এবং দরজাগুলো ভেতর থেকে আটকে দেন। তাদের এই বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কারণেই সেদিন বড় ধরনের কোনো হত্যাযজ্ঞ ঘটেনি। অন্যদিকে, হামলাকারী সায়ার লাইব্রেরির পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। সম্প্রতি চিকো হাইস্কুল থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এই তরুণের বিরুদ্ধে বর্তমানে হত্যার দুটি অভিযোগ দায়ের করে তাকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। নিহত ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বেঞ্জামিন বলেন, জ্যাকব অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং প্রচুর বই পড়তেন। গত ২৪ ঘণ্টা ধরে নির্ঘুম এই ভাই বলেন, "আমি একবার কাঁদছি, আবার পরক্ষণেই শোকে পাথর হয়ে যাচ্ছি।" কেন তার ভাইকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলো, তা তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না। তার ধারণা, এটি সম্পূর্ণ এলোপাতাড়ি একটি হামলা ছিল এবং হামলাকারী জ্যাকবকে আগে থেকে চিনত না। হামলাকারী সায়ারের প্রতি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ না করে একরাশ হতাশা নিয়ে বেঞ্জামিন শুধু বলেন, "ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আমার ভেতরে কোনো অনুভূতিই কাজ করেনি। সে অযথাই নিজের জীবনটা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিল। কী এক অর্থহীন অপচয়!"