যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের বহু স্কুলে শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ ধীরে ধীরে খালি হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কমছে নতুন শিক্ষার্থীর ভর্তি, কোথাও ছোট হয়ে আসছে স্নাতক ব্যাচ, আবার কোথাও শিক্ষার্থী সংকটের কারণে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে পুরো স্কুল। শিক্ষা গবেষকরা বলছেন, এটি সাময়িক কোনো সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন, যার প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যালিফোর্নিয়ার সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। অঙ্গরাজ্যের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি স্কুলে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষার্থী কম ভর্তি হয়েছে। গত এক দশকে সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে জন্মহার হ্রাস, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে পরিবারগুলোর অন্য এলাকায় স্থানান্তর এবং অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের প্রভাব। একসময় যেসব অঞ্চল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পরিচিত ছিল, সেখানেও এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা কমতে শুরু করেছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষা বোর্ড সভাপতি ও অধ্যাপক মাইকেল কার্স্ট বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার খুব কম স্কুল জেলা আছে যেখানে এই সংকট দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, এটি এখন প্রায় পুরো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি সাধারণ বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা জন্মহার হ্রাস। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম হয়েছিল প্রায় ৪৩ লাখ শিশুর, সেখানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩৬ লাখে। অর্থাৎ প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে জন্মহার।
গবেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় এর প্রভাব কয়েক বছর পর দৃশ্যমান হয়। কারণ আজ যারা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হচ্ছে, তাদের জন্ম হয়েছে পাঁচ বা ছয় বছর আগে। ফলে কম জন্মহার এখন সরাসরি স্কুলের ভর্তি সংখ্যায় প্রতিফলিত হচ্ছে।
করোনাভাইরাস মহামারি এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যদিও শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, অনেক পরিবার সাময়িকভাবে সন্তানদের বেসরকারি স্কুল বা ঘরে শিক্ষার দিকে নিয়ে যাওয়ায় ভর্তি কমেছে। কিন্তু পরবর্তী তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূল কারণ জনমিতিক পরিবর্তনই।
বিশেষ করে সান ফ্রান্সিসকো, ওকল্যান্ড, সান হোসে এবং উপকূলীয় ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী কমার হার সবচেয়ে বেশি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউট অব ক্যালিফোর্নিয়ার (পিপিআইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে বে এরিয়া অঞ্চলে সরকারি স্কুলে ভর্তি কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আরও প্রায় ১০ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধিও এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। সান ফ্রান্সিসকো ও সান হোসের মতো শহরে বসবাসের খরচ এতটাই বেড়েছে যে অনেক তরুণ পরিবার সেখান থেকে স্যাক্রামেন্টো বা সেন্ট্রাল ভ্যালির মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী এলাকায় চলে যাচ্ছে। ফলে বড় শহরগুলোর স্কুলে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
তবে বর্তমানে কিছু অঞ্চলে জনসংখ্যা ও শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে সেখানেও একই প্রবণতা দেখা যেতে পারে। আগামী এক দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার কোনো অঞ্চলেই ধারাবাহিক শিক্ষার্থী বৃদ্ধি বজায় থাকবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিবাসন নীতির পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বহু ভাষাভাষী ও অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার্থী হ্রাসের হার তুলনামূলক বেশি। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ায় বহু ভাষাভাষী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশে অভিবাসী পরিবারগুলো দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে অভিবাসন প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাবও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে স্কুলগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি স্কুলের অর্থায়নের একটি বড় অংশ শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও ভর্তি সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। ফলে শিক্ষার্থী কমলে কমে যায় বাজেটও।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালের পর থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ৬৩০টি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সান হোসে ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্ট পাঁচটি স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
শিক্ষকরা বলছেন, এর প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, শিক্ষকদের কর্মসংস্থানের ওপরও পড়ছে। ভর্তি কমে যাওয়ার কারণে অনেক জেলায় নিয়োগ স্থগিত, কর্মী ছাঁটাই এবং শিক্ষক সংখ্যা কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি শিক্ষা খাতে অর্থায়ন স্থিতিশীল থাকে, তাহলে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে বেশি সম্পদ ব্যয় করা সম্ভব হবে। ছোট শ্রেণিকক্ষ, ব্যক্তিগত সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে এটি কাজে লাগানো যেতে পারে।
এদিকে গবেষকরা সতর্ক করছেন, এই প্রবণতা শুধু স্কুল পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কমে যাওয়া শিক্ষার্থী এবং বাজেট সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনিক কার্যক্রম একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থী সংকট মোকাবিলায় শুধু ব্যয় কমানো যথেষ্ট হবে না। বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন, সাশ্রয়ী আবাসন বৃদ্ধি এবং পরিবারবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে।
তাদের ভাষায়, এটি কেবল স্কুলের ভর্তি কমার গল্প নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ছয় বছরের এক শিশুকন্যা ও তার বাবার মৃত্যুকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, পারামাট্টা নদীতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৪৭ বছর বয়সী মওলিক ধান্ধুকিয়া এবং তার ছয় বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সিডনির কনকর্ড এলাকার কাছে একটি নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। তার সঙ্গে ছিলেন ছয় বছর বয়সী কন্যা। কিছু সময় পর নদীতে জরুরি পরিস্থিতির খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। আরও পড়ুন...টেক্সাসে স্বামীর গুলিতে স্ত্রী নিহত, পরে পুলিশের গুলিতে স্বামী নিহত; দুই শিশুকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুপুরের কিছু আগে মওলিক ধান্ধুকিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে শিশুটির সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিশুকন্যার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করেন। ঘটনার তদন্তে সহায়তার জন্য আশপাশের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় একটি স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় জানানো হয়েছে, আগামী শুক্রবার রাউস হিলের ক্যাসেলব্রুক ক্রেমেটোরিয়ামে বাবা ও মেয়ের যৌথ শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। শোকবার্তায় লেখা হয়েছে, “দুই কোমল ও সদয় আত্মা, যারা চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।” তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগে কয়েক দফা নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। একবার তার স্ত্রী প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়াও তার সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে। আরও পড়ুন...টেক্সাসে বিস্ফোরণের আগুনে পুড়েও বাড়ি ও নাতি-নাতনিদের বাঁচালেন এক সাহসী দাদা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ একটি পোস্ট করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। সেখানে তিনি ২০০৫ সালে জিমে ব্যায়াম করার সময় ঘাড়ে পাওয়া আঘাতের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগা শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ঘাড়ের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তার জীবনের অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমআরআই পরীক্ষায় তার মেরুদণ্ডের ঘাড়ের অংশে স্নায়ুর ওপর চাপের বিষয়টি ধরা পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মওলিক ধান্ধুকিয়া পেশাগত জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করতেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি সাউথ ইস্টার্ন সিডনি লোকাল হেলথ ডিস্ট্রিক্টে অ্যাপ্লিকেশন সাপোর্ট বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এই ঘটনার পর পরিবারটির জন্য সহায়তা তহবিলও গঠন করেছেন স্বজন ও পারিবারিক বন্ধুরা। তহবিল সংগ্রহের আহ্বানে বলা হয়েছে, প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়া একসঙ্গে তার স্বামী ও একমাত্র কন্যাকে হারিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে তাকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। ▶️ ট্রাম্পের লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি অবৈধ ঘোষণা মার্কিন আদালতের তহবিলের অর্থ শেষকৃত্যের ব্যয়, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং নিকট আত্মীয়দের যাতায়াত ও আবাসন খাতে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস্টিন ম্যাকডোনাল্ড ঘটনাটিকে “পরিবার ও সমাজের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। আমরা সব দিক থেকে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি এবং কোনো সম্ভাবনাই উপেক্ষা করা হবে না।” পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে পারিবারিক সহিংসতার কোনো উপাদান ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। বাবা ও মেয়ের একসঙ্গে শেষকৃত্যের খবর আরও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেছে। স্বজন ও পরিচিতজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের বহু স্কুলে শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ ধীরে ধীরে খালি হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কমছে নতুন শিক্ষার্থীর ভর্তি, কোথাও ছোট হয়ে আসছে স্নাতক ব্যাচ, আবার কোথাও শিক্ষার্থী সংকটের কারণে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে পুরো স্কুল। শিক্ষা গবেষকরা বলছেন, এটি সাময়িক কোনো সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন, যার প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যালিফোর্নিয়ার সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। অঙ্গরাজ্যের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি স্কুলে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষার্থী কম ভর্তি হয়েছে। গত এক দশকে সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার। শিক্ষাবিদদের মতে, এই প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে জন্মহার হ্রাস, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে পরিবারগুলোর অন্য এলাকায় স্থানান্তর এবং অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের প্রভাব। একসময় যেসব অঞ্চল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পরিচিত ছিল, সেখানেও এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষা বোর্ড সভাপতি ও অধ্যাপক মাইকেল কার্স্ট বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার খুব কম স্কুল জেলা আছে যেখানে এই সংকট দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, এটি এখন প্রায় পুরো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি সাধারণ বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা জন্মহার হ্রাস। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম হয়েছিল প্রায় ৪৩ লাখ শিশুর, সেখানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩৬ লাখে। অর্থাৎ প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে জন্মহার। গবেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় এর প্রভাব কয়েক বছর পর দৃশ্যমান হয়। কারণ আজ যারা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হচ্ছে, তাদের জন্ম হয়েছে পাঁচ বা ছয় বছর আগে। ফলে কম জন্মহার এখন সরাসরি স্কুলের ভর্তি সংখ্যায় প্রতিফলিত হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারি এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যদিও শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, অনেক পরিবার সাময়িকভাবে সন্তানদের বেসরকারি স্কুল বা ঘরে শিক্ষার দিকে নিয়ে যাওয়ায় ভর্তি কমেছে। কিন্তু পরবর্তী তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূল কারণ জনমিতিক পরিবর্তনই। বিশেষ করে সান ফ্রান্সিসকো, ওকল্যান্ড, সান হোসে এবং উপকূলীয় ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী কমার হার সবচেয়ে বেশি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউট অব ক্যালিফোর্নিয়ার (পিপিআইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে বে এরিয়া অঞ্চলে সরকারি স্কুলে ভর্তি কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আরও প্রায় ১০ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধিও এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। সান ফ্রান্সিসকো ও সান হোসের মতো শহরে বসবাসের খরচ এতটাই বেড়েছে যে অনেক তরুণ পরিবার সেখান থেকে স্যাক্রামেন্টো বা সেন্ট্রাল ভ্যালির মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী এলাকায় চলে যাচ্ছে। ফলে বড় শহরগুলোর স্কুলে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তবে বর্তমানে কিছু অঞ্চলে জনসংখ্যা ও শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে সেখানেও একই প্রবণতা দেখা যেতে পারে। আগামী এক দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার কোনো অঞ্চলেই ধারাবাহিক শিক্ষার্থী বৃদ্ধি বজায় থাকবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিবাসন নীতির পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বহু ভাষাভাষী ও অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার্থী হ্রাসের হার তুলনামূলক বেশি। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ায় বহু ভাষাভাষী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশে অভিবাসী পরিবারগুলো দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে অভিবাসন প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাবও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে স্কুলগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি স্কুলের অর্থায়নের একটি বড় অংশ শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও ভর্তি সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। ফলে শিক্ষার্থী কমলে কমে যায় বাজেটও। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালের পর থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ৬৩০টি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সান হোসে ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্ট পাঁচটি স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, এর প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, শিক্ষকদের কর্মসংস্থানের ওপরও পড়ছে। ভর্তি কমে যাওয়ার কারণে অনেক জেলায় নিয়োগ স্থগিত, কর্মী ছাঁটাই এবং শিক্ষক সংখ্যা কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি শিক্ষা খাতে অর্থায়ন স্থিতিশীল থাকে, তাহলে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে বেশি সম্পদ ব্যয় করা সম্ভব হবে। ছোট শ্রেণিকক্ষ, ব্যক্তিগত সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে এটি কাজে লাগানো যেতে পারে। এদিকে গবেষকরা সতর্ক করছেন, এই প্রবণতা শুধু স্কুল পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কমে যাওয়া শিক্ষার্থী এবং বাজেট সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনিক কার্যক্রম একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থী সংকট মোকাবিলায় শুধু ব্যয় কমানো যথেষ্ট হবে না। বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন, সাশ্রয়ী আবাসন বৃদ্ধি এবং পরিবারবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে। তাদের ভাষায়, এটি কেবল স্কুলের ভর্তি কমার গল্প নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির চেষ্টা করেন। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, গবেষণার সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থানের কারণে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ হয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়নকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং, টাইমস হায়ার এডুকেশন এবং ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্টের বিভিন্ন তালিকায় নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সেরাদের মধ্যে স্থান পেয়ে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের নেতৃত্ব, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক ক্যারিয়ারের দরজা খুলে দেয়। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি। প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম বিশ্বজুড়ে। অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর কাছেই এমআইটি উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্বপ্নের নাম। একইভাবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। ব্যবসা, আইন, চিকিৎসা, জননীতি এবং মানবিক বিষয়ে হার্ভার্ডের খ্যাতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বিশ্বের বহু রাষ্ট্রনায়ক, নোবেল বিজয়ী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সিলিকন ভ্যালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গুগল, নেটফ্লিক্স, ইয়াহু এবং আরও অনেক সফল প্রযুক্তি উদ্যোগের পেছনে স্ট্যানফোর্ডের শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, ছোট ক্লাস সাইজ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগের জন্য এটি বিশেষভাবে পরিচিত। পাশাপাশি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় মানবিক বিজ্ঞান, আইন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহীদের জন্য ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা ক্যালটেক একটি বিশেষ আকর্ষণের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে বিশ্বজুড়ে উচ্চ মর্যাদা অর্জন করেছে। কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, অর্থনীতি এবং পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে বার্কলে আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ও বিশ্বের সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নিয়মিতভাবে স্থান পেয়ে থাকে। বিশেষ করে জনস হপকিন্স চিকিৎসা বিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য এবং গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য শুধু ভালো ফলাফলই যথেষ্ট নয়। নেতৃত্বের গুণাবলি, গবেষণায় অংশগ্রহণ, সামাজিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ততাও ভর্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী পূর্ণ বা আংশিক বৃত্তি নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বাংলাদেশি পরিবার তাদের সন্তানদের মিডিল স্কুল থেকেই পরিকল্পিত প্রস্তুতি শুরু করেন জাতে এসব আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এসব প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি শুধু উচ্চশিক্ষার সনদ নয়; এটি বিশ্বমানের গবেষণা, পেশাগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করে। আর সেই পথের অন্যতম বড় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের এই শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যেগুলো এখনও হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
ছিদ্দিকুর রহমান বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে নিজের অবস্থান শক্ত করছে। নীল সমুদ্র, সবুজ পাহাড়, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী ভ্রমণ ব্যয়ের কারণে বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশের এই পর্যটন নগরীকে ঘিরে। তবে কক্সবাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়লেও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ এখনও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নীতিগত সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক প্রচারণার ঘাটতি এবং পর্যটকবান্ধব সেবার অভাব বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। কক্সবাজার কেন বিদেশিদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে এর ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত। বিশ্বের অন্যান্য জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকতগুলোর তুলনায় এর বিস্তৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একে অনন্য করেছে। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ বর্তমানে বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। একদিকে উত্তাল বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে পাহাড়ি বনাঞ্চল—এই সড়ককে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মনোরম উপকূলীয় পথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, ছেঁড়াদ্বীপ, ইনানী সৈকত, হিমছড়ি, মহেশখালী এবং টেকনাফের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ সৃষ্টি করছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ, আধুনিক রেল যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের হোটেল প্রতিষ্ঠার ফলে বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যটন বিকাশে বাংলাদেশের প্রধান বাধা ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশে প্রবেশের প্রথম বাধা হচ্ছে ভিসা ব্যবস্থা। অনেক দেশের নাগরিককে আগাম ভিসা সংগ্রহ করতে হয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা মনে করেন, পূর্ণাঙ্গ ই-ভিসা ব্যবস্থা চালু এবং ভিসা অন অ্যারাইভালের সুযোগ সম্প্রসারণ করলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক প্রচারণার ঘাটতি বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদ নিয়ে বিশ্বব্যাপী কার্যকর প্রচারণা প্রায় নেই বললেই চলে। মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড কিংবা ভারতের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করলেও বাংলাদেশের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বিশ্বের অনেক পর্যটক এখনও বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বড় একটি অংশ নগদ অর্থ বহনের পরিবর্তে কার্ড বা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। কিন্তু দেশের অধিকাংশ পর্যটন এলাকায় আন্তর্জাতিক কার্ড গ্রহণের সুবিধা এখনও সীমিত। হোটেল ছাড়া অনেক রেস্টুরেন্ট, পরিবহন সেবা ও স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ না থাকায় বিদেশি পর্যটকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। পেশাদার গাইড ও সেবার অভাব বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বহুভাষিক ট্যুর গাইডের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল। ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, জাপানি, চীনা বা স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ গাইডের অভাব বিদেশি পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে সীমিত করে। এছাড়া পর্যটনসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, মূল্য নিয়ে বিভ্রান্তি এবং অপ্রফেশনাল আচরণের অভিযোগও রয়েছে। যাতায়াত ও ট্রাফিক সমস্যা বিদেশি পর্যটকদের একটি বড় অংশ ঢাকা হয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। রাজধানীর দীর্ঘ যানজট, বিমানবন্দরের চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য নেতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ বিদেশি পর্যটক, বিশেষ করে নারী পর্যটকদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অতিরিক্ত কৌতূহলী দৃষ্টি, অনাকাঙ্ক্ষিত ছবি তোলা কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাবের অভিযোগ পাওয়া যায়। পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় জনগণের মধ্যে পর্যটন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পর্যটকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৈশকালীন বিনোদনের সীমাবদ্ধতা বিশ্বের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোতে সন্ধ্যার পরও পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের সুযোগ সীমিত। ফলে দীর্ঘ সময় অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটনের নতুন গন্তব্য হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রাখে। এ জন্য প্রয়োজন, সহজ ও দ্রুত ই-ভিসা ব্যবস্থা চালু করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণা বৃদ্ধি। পর্যটন এলাকাগুলোতে আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট নিশ্চিত করা। বহুভাষিক প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড তৈরি করা। পর্যটক নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়ন। বিশেষ পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা। পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর আরও উন্নয়ন। বিশ্ব পর্যটন শিল্পে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্র, পাহাড়, বনভূমি, সংস্কৃতি এবং আতিথেয়তার সমন্বয়ে বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী পর্যটন গন্তব্য হওয়ার সব উপাদান ধারণ করে। কক্সবাজার ইতোমধ্যে সেই সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে নয়, বরং আধুনিক নীতি, আন্তর্জাতিক মানের সেবা, সহজ ভিসা ব্যবস্থা এবং কার্যকর বৈশ্বিক প্রচারণার মাধ্যমেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।