- প্রচ্ছদ
- Topic
জাপান
জাপানে ইসলাম গ্রহণের পর দীর্ঘদিন আরবি ভাষা ও কুরআন অধ্যয়ন করে ৮০ বছর বয়সে পবিত্র কুরআনের জাপানি অনুবাদ প্রকাশ করেন উমর মিতা। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত তাঁর অনুবাদটি ছিল একজন জাপানি মুসলিমের করা প্রথম পূর্ণাঙ্গ কুরআন অনুবাদ। বৌদ্ধ পরিবারে জন্ম নেওয়া রিওইচি মিতা পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করে উমর মিতা নাম ধারণ করেন। জাপানে ইসলামের ইতিহাসে তাঁর এই কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। ১৮৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাপানের ইয়ামাগুচি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন রিওইচি মিতা। তাঁর পরিবার ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং সামুরাই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। শৈশব থেকেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। ১৯১৬ সালে ইয়ামাগুচি কমার্শিয়াল কলেজ থেকে শিক্ষা শেষ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে চীনে যান মিতা। সেখানে রেলওয়ে খাতে কাজ করার পাশাপাশি স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। চীনে অবস্থানকালেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, ধর্মীয় অনুশীলন ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এই আগ্রহ তাঁকে ইসলাম সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে উৎসাহিত করে। চীনে মুসলিমদের সঙ্গে মেলামেশার অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলে। তিনি ইসলামের ইতিহাস, ধর্মীয় শিক্ষা এবং মুসলিম সমাজ সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯২০ সালে জাপানের একটি সাময়িকীতে চীনের ইসলাম নিয়ে একটি প্রবন্ধও লেখেন। ইসলাম সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক অনুসন্ধানের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে এই লেখার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও বাড়ে জাপানি মুসলিম ওমর ইয়ামাওকার জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর। ইয়ামাওকা ১৯০৯ সালে হজ পালনকারী প্রথম দিকের জাপানি মুসলিমদের একজন হিসেবে পরিচিত। তাঁর অভিজ্ঞতা ও লেখালেখি জাপানে ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ইসলাম নিয়ে অধ্যয়ন ও অনুসন্ধানের পর ১৯৪১ সালে চীনের বেইজিংয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন রিওইচি মিতা। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪৮ বছর। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি উমর মিতা নাম ধারণ করেন। জীবনের এই পরিবর্তনের পর ইসলামের শিক্ষা ও ধর্মীয় সাহিত্য নিয়ে তাঁর কাজ আরও বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে ফিরে তিনি মুসলিম সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত জাপান মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এ সময় তাঁর সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন। কুরআনের মূল বক্তব্য যথাযথভাবে বোঝার জন্য তিনি বয়সের বাধা উপেক্ষা করে আরবি শেখার উদ্যোগ নেন। ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান সফর করেন এবং ১৯৫৮ সালে পবিত্র হজ পালন করেন। পাকিস্তান ও সৌদি আরবে অবস্থানকালে আরবি ভাষা এবং ইসলামি জ্ঞানচর্চার সুযোগ পান। জাপানে এর আগেও পবিত্র কুরআনের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২০, ১৯৩৭ ও ১৯৫০ সালে বিভিন্ন অনুবাদ প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৫৭ সালে জাপানি পণ্ডিত তোশিহিকো ইজুৎসু আরবি থেকে সরাসরি কুরআনের জাপানি অনুবাদ প্রকাশ করেন। তবে এসব অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মুসলিম ছিলেন না। ফলে একজন জাপানি মুসলিম হিসেবে উমর মিতার অনুবাদ উদ্যোগ বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব পায়। ১৯৬০ সালের দিকে তিনি কুরআন অনুবাদের কাজে নিবিড়ভাবে মনোযোগ দেন। অনুবাদের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল সাধারণ জাপানি পাঠকের কাছে কুরআনের বক্তব্য সহজবোধ্য করে তোলা। এজন্য শব্দ নির্বাচন, বাক্যগঠন এবং ধর্মীয় পরিভাষার ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। জাপানি ভাষায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবযুক্ত অনেক শব্দ প্রচলিত থাকলেও কুরআনের ধর্মীয় ধারণা প্রকাশের ক্ষেত্রে সেগুলোর ব্যবহার নিয়ে তিনি সতর্ক ছিলেন। প্রয়োজন অনুযায়ী সহজ ও পরিচিত জাপানি শব্দ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল অনুবাদের মাধ্যমে ইসলামের মূল বক্তব্য পাঠকের কাছে যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া। দীর্ঘ অধ্যবসায়ের পর ১৯৬৮ সালে অনুবাদের পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ করেন তিনি। তবে সেখানেই থেমে যাননি। অনুবাদের যথার্থতা নিশ্চিত করতে পরবর্তী সময়ে পাণ্ডুলিপি সংশোধন ও পর্যালোচনার উদ্যোগ নেন। ১৯৭০ সালে সংশোধিত পাণ্ডুলিপি মক্কাভিত্তিক মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের কাছে জমা দেওয়া হয়। সেখানে ইসলামি পণ্ডিতদের মাধ্যমে অনুবাদটি পর্যালোচনা করা হয় বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অবশেষে ১৯৭২ সালে তাঁর অনূদিত পবিত্র কুরআনের জাপানি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তখন তাঁর বয়স প্রায় ৮০ বছর। অনুবাদ শুরু থেকে প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় ১২ বছরের প্রচেষ্টায় তিনি এমন একটি কাজ সম্পন্ন করেন, যা জাপানি মুসলিমদের ধর্মীয় সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়। এই অনুবাদের মাধ্যমে জাপানি ভাষাভাষী মুসলিম পাঠকদের জন্য একজন স্বদেশি মুসলিম অনুবাদকের কাজ থেকে কুরআনের অর্থ বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে জাপানে ইসলামি সাহিত্য অনুবাদের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হয়। উমর মিতা শুধু কুরআন অনুবাদের মধ্যেই নিজের কাজ সীমাবদ্ধ রাখেননি। ইসলামি শিক্ষা, সাহাবিদের জীবন ও ইসলামের পরিচিতিমূলক বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করেন। মুসলিম পাঠকদের পাশাপাশি ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী জাপানি ভাষাভাষীদের জন্যও তাঁর সাহিত্যকর্ম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর অনুবাদ পরবর্তী সময়ে সংশোধিত আকারেও প্রকাশিত হয়। ১৯৮২ সালে সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়। কুরআন অনুবাদের পাশাপাশি জাপানে ইসলামি জ্ঞানচর্চা এবং মুসলিম সংগঠনের কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁকে দেশটির মুসলিম ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। ১৯৮৩ সালের ২৯ মে উমর মিতা মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। বৌদ্ধ পরিবারে জন্ম, চীনে ইসলাম সম্পর্কে অনুসন্ধান, মধ্যবয়সে ইসলাম গ্রহণ এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে কুরআন অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন একটি ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক যাত্রার সাক্ষ্য বহন করে। জাপানে কুরআনের অনুবাদের ইতিহাসে উমর মিতার বিশেষ পরিচয় আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তিনি প্রথম ব্যক্তি নন যিনি জাপানি ভাষায় কুরআন অনুবাদ করেছিলেন, তবে প্রথম জাপানি মুসলিম অনুবাদক হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্বীকৃত।
জাপানি সমাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপন এবং ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়ার লক্ষ্যে টোকিও মসজিদে সম্প্রতি এক বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাপানের ইসলামিক সেন্টারের সহযোগিতায় ‘মসজিদ ওপেন হাউস ডে’ শীর্ষক এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অমুসলিম দর্শনার্থী এবং মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে একটি উন্মুক্ত সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। এই আয়োজনে অংশ নিয়ে দর্শনার্থীরা ইসলাম সম্পর্কে জানার, বিভিন্ন প্রশ্ন করার এবং মুসলিমদের নিয়ে তাদের চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনার চমৎকার সুযোগ পান। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এই প্রোগ্রামে প্রায় ৯৫ জন অমুসলিম জাপানি নাগরিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের জাপানি ভাষার অধ্যাপক এবং জাপানের তাকুশোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুষদের প্রশিক্ষক রিম আহমেদ একটি তথ্যবহুল উপস্থাপনা পেশ করেন। জোহরের নামাজের পর দুপুরের খাবারের টেবিলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এক প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জাপানি ভাষায় পারদর্শী মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরা দর্শনার্থীদের বিভিন্ন কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দেন এবং ইসলামের নানা দিক সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে একটি বিশেষ মতবিনিময় পর্বের আয়োজন করা হয়, যেখানে দর্শনার্থীদের সরাসরি মতামত শোনা হয়। ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে প্রেজেন্টেশন এবং আলোচনার পর তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আয়োজক সংস্থা ইসলামিক সেন্টার অব জাপানের দাওয়াহ (প্রচার) ও শিক্ষা বিভাগের তথ্যমতে, অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারী জাপানি নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির অর্থনীতিবিদেরা। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পর সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্যের কর কমানো এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তিনি। এসব উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট করেনি সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বাজেটের মাধ্যমে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে, সরকার বেপরোয়া ব্যয়ের পরিবর্তে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখবে। জাপান টাইমসের ২২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিজুহো রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সাইসুকে সাকাই বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক নীতির প্রকৃত পরীক্ষা এখন শুরু হবে। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব বাজেটের মাধ্যমে বাজারের আস্থা অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়, রাজস্ব শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সানায়ে তাকাইচি। এরপর থেকে তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে জাপান সরকার পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করছে না। এ কারণে সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগ করতে চান তিনি। সরকারের অন্যতম পরিকল্পনা হলো আগামী এপ্রিল থেকে দুই বছরের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর ভোগ কর ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা। এতে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েনের আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের অর্থায়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি পার্লামেন্টে বলেছেন, ঘাটতি অর্থায়নের জন্য নতুন বন্ড ইস্যু না করেই প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করবে সরকার। তবে জাপান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ তোমোহিসা ইশিকাওয়া কর কমানোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, কর কমালেই পণ্যের দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দুই বছর পর সরকার আবার আগের করহার ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেট তৈরির কাজ চলছে। ডিসেম্বরে বাজেটের খসড়া প্রকাশ করা হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার বাজেট চাহিদা রেকর্ড ১৪৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এই চাহিদা ২০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইয়েন বেশি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত তাকাইচি অনেকের প্রত্যাশার তুলনায় কম সরকারি ব্যয় করেছেন। সম্পূরক বাজেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি। সরকারের পরিকল্পনা হলো পরবর্তী সময়ে আলাদা সম্পূরক বাজেটের পরিবর্তে প্রাথমিক বাজেটেই বেশি ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা। জাপানের অর্থনীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ সরকারি ঋণ। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দেশটির ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত সর্বোচ্চ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালে এই অনুপাত ছিল ২২০ শতাংশ। চলতি বছর তা কমে আনুমানিক ২০৪ শতাংশে নামতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারের কর আয় বাড়ায় ঋণের অনুপাত কমাতে কিছুটা সহায়তা হয়েছে। তবে এই প্রবণতা স্থায়ী নাও হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইশিকাওয়া। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়তে থাকায় জাপানের রাজস্ব পরিস্থিতি এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এদিকে তাকাইচির অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে আর্থিক বাজারেও উদ্বেগ রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্য ছিল ১৫০-এর নিচে। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা দুর্বল হয়ে প্রায় ১৬৪ ইয়েনে পৌঁছায়। একই সময়ে জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা ১৯৯৬ সালের পর সর্বোচ্চ। ইয়েনের দরপতন ঠেকাতে গত জুলাইয়ে জাপানকে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অনুসৃত শিথিল মুদ্রানীতিভিত্তিক অর্থনৈতিক কৌশল থেকে সরে আসারও পরামর্শ দেন। তবে তাকাইচি সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে অতিরিক্ত শিথিল রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমর্থক নন। তাঁদের মতে, জাপানের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আগের মতো নীতি অনুসরণ করা উপযুক্ত হবে না। আগামী বাজেটে কর কমানো, সরকারি বিনিয়োগ এবং ঋণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সরকার কীভাবে ভারসাম্য রাখবে, সেটিই এখন অর্থনীতিবিদদের প্রধান নজরে রয়েছে। সূত্র: জাপান টাইমস
জাপানের ভয়াবহ সুনামিতে স্ত্রীকে হারানোর ১৫ বছর পরও তাঁর দেহাবশেষের খোঁজে সাগরে নামছেন ইয়াসুও তাকামাৎসু। ২০১১ সালের ১১ মার্চ মিয়াগি প্রিফেকচারের উপকূলীয় শহর ওনাগাওয়া থেকে নিখোঁজ হন তাঁর স্ত্রী ইউকো তাকামাৎসু। দীর্ঘ অনুসন্ধানেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও ইয়াসুওর অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। দুর্যোগের সময় ইউকো ওনাগাওয়ার একটি ব্যাংকে কাজ করছিলেন। ভূমিকম্পের পর সুনামির ঢেউ শহরটিতে আঘাত হানে। নিখোঁজ হওয়ার আগে স্বামীকে পাঠানো শেষ বার্তায় তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ইয়াসুও ভালো আছেন কি না। একই সঙ্গে জানিয়েছিলেন, তিনি বাড়ি ফিরতে চান। পরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই বার্তার কথা তুলে ধরেন ইয়াসুও। স্ত্রীকে খুঁজতে প্রথমে স্থলভাগে অনুসন্ধান করেন তিনি। পরে সাগরের নিচে খোঁজার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য ২০১৩ সালে ডাইভিং শেখা শুরু করেন। প্রশিক্ষণের পর ওনাগাওয়ার উপকূলের পানিতে নিয়মিত নেমে স্ত্রীর কোনো চিহ্ন খুঁজতে থাকেন। অর্থাৎ স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে অনুসন্ধান চললেও সাগরে ডুব দিয়ে খোঁজা শুরু হয় প্রায় দুই বছর পরে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়াসুও তত দিনে ৭৬০ বারের বেশি ডুব দিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ‘ডাইভিং ফর ইউকো’ তথ্যচিত্রের জন্য তাঁর একটি অনুসন্ধানও ধারণ করা হয়েছে। এতবার সাগরে নামার পরও স্ত্রীর দেহাবশেষের সন্ধান পাননি তিনি। ইয়াসুওর এই অনুসন্ধানে সহযোগিতা করেছেন ডাইভিং প্রশিক্ষক মাসায়োশি তাকাহাশি। তাঁর নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবী ডুবুরিরা সুনামিতে নিখোঁজ মানুষদের খোঁজে সাগরের নিচে অনুসন্ধান চালান। স্ত্রীর খোঁজের পাশাপাশি ইয়াসুওও এই বৃহত্তর অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে সাগরে নামা এখন তাঁর কাছে স্ত্রীকে খোঁজার পাশাপাশি তাঁর কাছাকাছি থাকার একটি উপায়ও। ২০২৬ সালের মার্চে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা দেপেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইয়াসুওর অনুভূতি তুলে ধরে বলা হয়, পানির নিচে গেলে স্ত্রীর শেষ মুহূর্তের ভয় ও কষ্টের কথা মনে হয় তাঁর। তারপরও তিনি সেখানে ইউকোর উপস্থিতি অনুভব করেন।
ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য মোবাইল কেনার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। মা একটি ছাগল বিক্রি করে ফোন কিনে দিয়েছিলেন। সেই ফোন মডেম হিসেবে ব্যবহার করে প্রযুক্তি শেখা শুরু করা কুষ্টিয়ার মো. নাসিম আল আওয়াল এখন জাপানে মাইক্রোসফটের ডেটা সেন্টার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত। তাঁর পথচলায় রয়েছে কারখানায় কাজ, নিজের চেষ্টায় দক্ষতা অর্জন এবং চাকরির আবেদনে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতা। সময়ের আলো ও রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদনে তাঁর এই যাত্রা উঠে এসেছে। কুষ্টিয়ার আমলা-সদরপুরে বেড়ে ওঠা নাসিমের ডাকনাম কবি। ছোটবেলা থেকেই ইলেকট্রনিক যন্ত্র কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল। পরিচিতদের মোবাইল ফোন ও টেলিভিশন সারানোর চেষ্টা করতেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ডিনেটের কম্পিউটার লিটারেসি প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে হাতে-কলমে কম্পিউটার শেখার সুযোগ পান। পরে ভর্তি হন কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার প্রযুক্তি বিভাগে। পলিটেকনিকে পড়ার সময় মা মোছা. নাজমার কিনে দেওয়া মোবাইলটি তাঁর শেখার সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। ফোন দিয়ে ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে ভিডিও দেখতেন, অনলাইন ফোরামে প্রশ্ন করতেন এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান খুঁজতেন। পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে এভাবেই পড়াশোনার বাইরে নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন। ২০১২ সালে ডিনেটে প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন নাসিম। পরে প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট ও সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সময়ের আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় দেশের প্রায় ৩৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাজ এবং প্রায় তিন হাজার শিক্ষককে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয় তাঁর। ২০১৮ সালের শেষ দিকে জাপানে যান নাসিম। প্রথমে নাগোয়ার একটি গাড়ি কারখানার উৎপাদন লাইনে কাজ করেন। নতুন ভাষা ও পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি চালিয়ে যান। ২০২০ সালের মে মাসে এনটিটি কমিউনিকেশনসে নেটওয়ার্ক অপারেশনস সেন্টার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে সাবমেরিন কেবলের সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ ও আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের প্রযুক্তিগত সহায়তার কাজে যুক্ত ছিলেন। চাকরির পাশাপাশি অনলাইনে কোর্স করে প্রযুক্তিগত ও ভাষাগত দক্ষতা বাড়ান। তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে একাধিক আবেদন করেও সফল হননি। ২০২২ সালে মাইক্রোসফটে তাঁর আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর প্রস্তুতির ঘাটতি খুঁজে নতুন করে শেখা চালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে মাইক্রোসফট জাপানের ক্লাউড অপারেশনস অ্যান্ড ইনোভেশনস দলে কাজের সুযোগ পান। রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদনে নাসিমের বক্তব্য, ‘আমি কখনো অসাধারণ ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু হাল ছাড়িনি।’ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করতে চান তিনি, যাতে চাকরির আবেদনে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও তাঁরা শেখা ও প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে পারেন। সূত্র: পাবলিকিয়ান
জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ছুটির দিনেও মাত্র ১১ মিনিটের মধ্যে টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারে হাজির হয়ে প্রশংসিত হয়েছেন সংবাদ উপস্থাপিকা সায়াকা ইনাই। কোনো মেকআপ, চুলের সাজসজ্জা কিংবা প্রচলিত প্রস্তুতি ছাড়াই জরুরি সংবাদ নিয়ে দর্শকদের সামনে আসেন তিনি। দুর্যোগের মুহূর্তে নিজের সাজসজ্জার চেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন এই সাংবাদিক। ঘটনাটি গত ১৮ এপ্রিলের। ওই দিন স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ২০ মিনিটে জাপানের নাগানো প্রিফেকচারের উত্তরাঞ্চলে ৫ দশমিক শূন্য মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৮ কিলোমিটার গভীরে। নাগানোর ওমাচি শহরে জাপানের ভূমিকম্পের তীব্রতা পরিমাপের স্কেলে সর্বোচ্চ ৫ প্লাস মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের সময় জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের নাগানো কেন্দ্রের সংবাদ উপস্থাপিকা সায়াকা ইনাই ছুটিতে ছিলেন। কিন্তু ভূমিকম্পের খবর পাওয়ার পর দ্রুত কর্মস্থলে ফিরে আসেন তিনি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমিকম্পের মাত্র ১১ মিনিট পর দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে তাঁকে টেলিভিশনের পর্দায় ভূমিকম্পসংক্রান্ত তথ্য জানাতে দেখা যায়। এত অল্প সময়ের মধ্যে সম্প্রচারে অংশ নেওয়ায় স্বাভাবিক প্রস্তুতির সুযোগ পাননি সায়াকা। সাধারণত টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপনার আগে মেকআপ, চুলের সাজসজ্জা ও পোশাকের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু সেদিন তিনি এসবের অপেক্ষা করেননি। সাধারণ পোশাকের ওপর স্যুটের জ্যাকেট পরে, চুল বেঁধে এবং কালো ফ্রেমের চশমা পরেই সংবাদ উপস্থাপন করেন। তাঁর এই উপস্থিতি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। নিয়মিত সম্প্রচারে যে সাজসজ্জায় তাঁকে দেখা যায়, সেদিনের উপস্থিতি ছিল তার থেকে আলাদা। তবে দর্শকদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি। হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এইচকে০১-এর ২২ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ছুটির দিনে জরুরি সংবাদ সম্প্রচারে ফিরে আসার ঘটনায় সায়াকার পেশাদারত্বের প্রশংসা করেছেন অনেকেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর স্বাভাবিক উপস্থিতির পাশাপাশি দুর্যোগের সময় সংবাদ পরিবেশনের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টিও আলোচিত হয়। এদিকে ভূমিকম্পের পর জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে তাদের নিয়মিত অনুষ্ঠানের সূচিতে পরিবর্তন আনে। চলমান অনুষ্ঠান বন্ধ করে ভূমিকম্পের খবর, পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কবার্তা সম্প্রচার করা হয়। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছিল, ১৮ এপ্রিলের প্রথম ভূমিকম্পটির পর একই দিন দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটে নাগানোর উত্তরাঞ্চলে আরও একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ১। ওই ভূমিকম্পেও বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। প্রথম ভূমিকম্পের পর জাপানের আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে জানায়, কম্পন অনুভূত এলাকাগুলোতে ভূমিধস ও পাথরধসের ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী কয়েক দিন আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকায় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে প্রথম ভূমিকম্পের কারণে সুনামির কোনো আশঙ্কা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি সংবাদ সম্প্রচারের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে ভূমিকম্পপ্রবণ জাপানে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া দুর্যোগ মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোথায় কম্পন অনুভূত হয়েছে, নতুন কোনো সতর্কতা জারি হয়েছে কি না এবং বাসিন্দাদের কী ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, এসব তথ্য জানাতে সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সায়াকা ইনাইয়ের ঘটনাটি সেই দায়িত্ব পালনের একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ছুটির দিনে কর্মস্থলে ফিরে এসে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি ছাড়াই সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে একজন সাংবাদিকের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্পের কয়েক মাস পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সেই সম্প্রচারের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসছে। সাংবাদিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা ও জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদাহরণ হিসেবে অনেকেই তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করছেন।
চীনের অর্থনীতির গতি কমে যাওয়া, ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি এবং টোকিও–বেইজিংয়ের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে চীনে নিজেদের কার্যক্রম সংকুচিত করছে জাপানি কোম্পানিগুলো। জাপানের করপোরেট গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেইকোকু ডেটাব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে চীনে ব্যবসায়িক উপস্থিতি থাকা জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নেমেছে ১০ হাজার ১১৮টিতে। ২০১০ সালে এ তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বনিম্ন সংখ্যা। সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুনের আগের জরিপের তুলনায় চীনে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা কমেছে ২২ শতাংশ। আর ২০১২ সালের সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় তা প্রায় ৩০ শতাংশ কম। একসময় উৎপাদন ও বিক্রির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত চীনের বাজারে এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নতুন করে মূল্যায়ন করছে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো। রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক জেরেমি চ্যানের মতে, যেসব জাপানি কোম্পানি আগে থেকেই চীনে ব্যবসার পরিসর কমানোর পরিকল্পনা করছিল, দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পর তারা বাজার ছাড়ার বিষয়টি আরও জরুরিভাবে বিবেচনা করছে। তাঁর ভাষ্য, জাপানি প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মীদের মধ্যে চীনে স্বাগত না পাওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে। টেইকোকু ডেটাব্যাংকের মূল্যায়নে, এই প্রবণতা আরও জোরালো হতে পারে। শুল্কসংক্রান্ত ঝুঁকি, শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা জাপানি কোম্পানিগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধ যুক্ত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম ছোট করছে কিংবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তবে কিছু কোম্পানি পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন না করেও চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। গত দুই বছরে নতুন করে ১ হাজার ২২১টি জাপানি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সহযোগী কোম্পানি, কারখানা বা প্রতিনিধি কার্যালয়ের মাধ্যমে চীনে প্রবেশ করেছে। একই সময়ে ৪ হাজার ১৩৭টি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়েছে অথবা তাদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি বলে টেইকোকুর জরিপে উল্লেখ রয়েছে। নতুন প্রবেশের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় চীনে জাপানি ব্যবসার সামগ্রিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জাপান ও চীনের সম্পর্কের অবনতির পেছনে তাইওয়ান ইস্যুও রয়েছে। সিএনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পার্লামেন্টে বলেছিলেন, চীন তাইওয়ানে আক্রমণ করলে জাপান সামরিকভাবে জড়িত হতে পারে। এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে চাপ বেড়েছে। বেইজিং জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং নিজেদের নাগরিকদের জাপান ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। ফুজিৎসু রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান নীতি অর্থনীতিবিদ মার্টিন শুলজ বলেন, মার্কিন শুল্ক, চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে জনমত এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান বাজারও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করছে। তাঁর মতে, চীনে বিনিয়োগ একসঙ্গে একাধিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জাপানি কোম্পানিগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে বলে জানিয়েছেন মোনেক্স গ্রুপের বিশেষজ্ঞ পরিচালক জেসপার কল। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, টোপিক্স সূচকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফায় চীনের অবদান ২০২০ সালের ২৩ শতাংশ থেকে চলতি বছরে ১৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছে। কলের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের শিল্প উৎপাদন বাড়াতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয়ভাবে আকৃষ্ট করছে। অন্যদিকে চীন এমন একটি উৎপাদনব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে পণ্য চীনে তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও চীনা হবে। এই পরিবর্তন জাপানি কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার কৌশলকে প্রভাবিত করছে। চীনে কর্মী পাঠানোর বিষয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানি বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের অভিযোগে গত আগস্টে কয়েকজন জাপানি নাগরিককে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে বড় জাপানি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও ছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা ব্যবসায়িক ঝুঁকির পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এনেছে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের এপ্রিলের একটি প্রতিবেদনেও চীনে ব্যবসা সম্প্রসারণে জাপানি কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহ বাড়ার কথা উঠে এসেছে। তবে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেং বলেছেন, তাঁর দেশ জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা বিকাশ এবং বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে স্বাগত জানায়। জাপানি একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। সব ধরনের জাপানি প্রতিষ্ঠানের জন্য অবশ্য পরিস্থিতি এক নয়। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কেই কোগার মতে, গাড়ি নির্মাতা, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী এবং রপ্তানিনির্ভর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চীনে কার্যক্রম কমানোর সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম কোম্পানিগুলো সেখানে থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে চিকিৎসা ও সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন তিনি। সূত্র: সিএনবিসি ও টেইকোকু ডেটাব্যাংক।
মুম্বাই ও আহমেদাবাদের মধ্যে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্পের একটি অংশ ২০২৭ সালে চালুর লক্ষ্য থাকলেও জাপানের নতুন প্রজন্মের শিনকানসেন ট্রেন তখন পাওয়া যাবে না। এ কারণে শুরুতে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দ্রুতগতির ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশ এ ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছে। ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথের নির্মাণ, ট্রেন সরবরাহ ও সিগন্যাল ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে দুই দেশের মধ্যে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, জাপান ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে ই১০ সিরিজের ট্রেন সরবরাহ করবে। ট্রেনটি এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। তাই রেলপথের প্রথম অংশ প্রস্তুত হলে ভারতীয় ট্রেন দিয়ে যাত্রীসেবা শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে সরবরাহের সময় নিয়ে আরও দীর্ঘ অপেক্ষার কথা জানিয়েছেন ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, জাপান ২০৩৪ সালের আগে ই১০ ট্রেন দিতে পারবে না, এমন তথ্য স্পষ্ট হওয়ার পর নিজস্ব ট্রেন ও আন্তর্জাতিক মানের সিগন্যাল ব্যবস্থা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাপানি পক্ষ তখনো ট্রেন, সিগন্যাল এবং পরিচালনা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সরবরাহ প্রস্তাব দিতে পারেনি। প্রকল্পটির অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা। গত জুলাইয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ভারতীয় পক্ষের সিদ্ধান্ত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার সমস্যায় কাজ এগোয়নি। এটি মাকিহারার অভিযোগ; ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই দেশের আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে এবং দ্রুত রেলসেবা চালুর অভিন্ন লক্ষ্য অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রথম ভারতীয় বুলেট ট্রেন তৈরি করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিইএমএল। ‘বি২৮’ নামের এই ট্রেনের নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার, আর যাত্রীসেবায় পরিচালনার নির্ধারিত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। বাণিজ্যিক চলাচলের অনুমোদনের আগে ট্রেনটিকে পরীক্ষা ও পরীক্ষামূলক চলাচলের ধাপ পার হতে হবে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুজরাটের সুরাট থেকে ভাপি অংশে ২০২৭ সালের শেষ দিকে সেবা শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো প্রকল্প শেষ করার প্রত্যাশিত সময় ২০২৯ সাল। শুরুতে ভারতীয় ট্রেন ব্যবহারের পাশাপাশি নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আন্তর্জাতিক হাইস্পিড রেল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মাসাফুমি শুকুরি। প্রকল্পটি প্রথমে ২০২২ সালে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। তবে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও করোনাভাইরাস মহামারিতে কাজ ব্যাহত হয়। শুকুরির মতে, ভারতের প্রথম দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণের মতো বড় উদ্যোগ মূল্যায়নের সময় এসব বাধা বিবেচনা করা প্রয়োজন। মাকিহারার সমালোচনার বিপরীতে তিনি বলেছেন, এত দীর্ঘ নতুন রেলপথ অল্প কয়েক বছরে তৈরি করা সহজ নয়। মুম্বাই–আহমেদাবাদ প্রকল্পে জাপান শুধু প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নয়, ঋণও দিচ্ছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি বা জাইকার প্রকাশিত একটি ঋণচুক্তিতে বার্ষিক সুদ শূন্য দশমিক ১ শতাংশ, পরিশোধের মেয়াদ ৫০ বছর এবং প্রথম ১৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডের উল্লেখ রয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই রেলপথের উদ্দেশ্য দুই শহরের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি।
একবার স্থায়ী দাঁত পড়ে গেলে কিংবা তুলে ফেলতে হলে সেটি আর প্রাকৃতিকভাবে ফিরে আসে না। তখন বাধ্য হয়েই ভরসা করতে হয় ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট, ব্রিজ কিংবা কৃত্রিম দাঁতের ওপর। কিন্তু কেমন হতো, যদি আপনার শরীর নিজেই একটি নতুন দাঁত তৈরি করে নিতে পারতো? অসম্ভব মনে হওয়া এই কল্পনাবিলাসকেই এবার বাস্তবে পরিণত করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন জাপানের একদল চিকিৎসাবিজ্ঞানী। বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত পরীক্ষামূলক এই ওষুধটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘টিআরজি০৩৫’ (TRG035)। এর মূল লক্ষ্য হলো ‘ইউএসএজি-১’ (USAG-1) নামের একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, মূলত এই প্রোটিনটিই মানুষের শরীরে নতুন করে দাঁত গজানোর পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর আগে প্রাণীদেহে চালানো এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, এই প্রোটিনকে ব্লক করার মাধ্যমে সফলভাবে তাদের নতুন দাঁত গজানো সম্ভব। সেই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই মানুষের জন্য এই ওষুধ তৈরির পথে হাঁটেন গবেষকরা। এই যুগান্তকারী ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ে ২০২৪ সালে প্রথম 'হিউম্যান ট্রায়াল' শুরু হয়। সম্প্রতি ২০২৬ সালে সফলভাবে এর 'ফেজ ওয়ান' বা প্রথম ধাপের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রাথমিক ধাপে মানবদেহে ওষুধটির নিরাপত্তা এবং প্রভাব অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। মানুষের হারানো দাঁত সফলভাবে গজানোর চূড়ান্ত কার্যকারিতার ফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত না হলেও, গবেষণাটি অত্যন্ত সফলতার সাথে এখন পরবর্তী ধাপে এগোচ্ছে। গবেষকদের মূল লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যেই সাধারণ মানুষের জন্য দাঁত গজানোর এই অভাবনীয় চিকিৎসা পদ্ধতি সহজলভ্য করে তোলা। শেষ পর্যন্ত এই পদ্ধতিটি পুরোপুরি সফল হলে, ভবিষ্যতে ডেন্টাল চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। এর ফলে হারানো দাঁতের চিকিৎসায় মানুষকে আর কৃত্রিম উপায়ের ওপর নির্ভর করতে হবে না, বরং শরীর নিজেই তার হারানো দাঁত পুনরায় তৈরি করে নিতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশে রসায়ন নিয়ে উচ্চশিক্ষার শুরু। এরপর থাইল্যান্ড হয়ে জাপানে গবেষণার দীর্ঘ পথচলা। ন্যানোপ্রযুক্তি, শক্তি রূপান্তর, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও সেন্সিং প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে গবেষণা করে জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মোঃ জাহিদুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি জাপানের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওতে বিশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। এর আগে দেশটির নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক হিরোশি আমানোর গবেষণাগোষ্ঠীর একটি উপদলেও কাজ করেছেন তিনি। জাপানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংস্থা পরিচালিত গবেষক তথ্যভান্ডার জে গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওর ল্যাবরেটরি ফর বায়োম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যুক্ত রয়েছেন ড. জাহিদুল। সেখানে উন্নত উপাদান, ন্যানোপ্রযুক্তি ও জৈব উপাদানভিত্তিক গবেষণার সঙ্গে তাঁর কাজের সংযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে রসায়নে উচ্চশিক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁর একাডেমিক জীবনের সূচনা হয়। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান থাইল্যান্ডে। দেশটির রাজামঙ্গলা ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থান্যাবুরি থেকে ২০১৪ সালে রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরবর্তী গন্তব্য ছিল জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে ২০১৮ সালে রাসায়নিক ব্যবস্থা প্রকৌশলে ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। ডক্টরাল গবেষণায় তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দ্রবণ প্লাজমা প্রযুক্তির সাহায্যে ন্যানোকার্বন ও কার্বনভিত্তিক উন্নত উপাদান তৈরি। এসব উপাদান কীভাবে শক্তি রূপান্তর ও তড়িৎ অনুঘটন প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো যায়, তা নিয়েও গবেষণা করেন তিনি। বিশেষ করে জ্বালানি কোষ ও লিথিয়াম এয়ার ব্যাটারির মতো উন্নত শক্তি প্রযুক্তিতে এসব উপাদানের সম্ভাব্য ব্যবহার ছিল তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ডক্টরেট সম্পন্ন করার পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড সিস্টেমস ফর সাসটেইনেবিলিটিতে গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন জাহিদুল ইসলাম। প্রাপ্ত জীবনবৃত্তান্তের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক হিরোশি আমানোর গবেষণাগোষ্ঠীর একটি উপদলে পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগ পান তিনি। অধ্যাপক হিরোশি আমানো ২০১৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। নীল আলো নির্গমনকারী কার্যকর এলইডি উদ্ভাবনে অবদানের জন্য ইসামু আকাসাকি ও শুজি নাকামুরার সঙ্গে যৌথভাবে তাঁকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁদের উদ্ভাবন বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী আধুনিক এলইডি বাতি তৈরির পথ সুগম করে। জাপানের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা জাহিদুল ইসলামের গবেষণাজীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষণাপর্বে তিনি উন্নত উপাদানবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক উপাদান নিয়ে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের এপ্রিলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইলেকট্রনিক্স বিভাগে গবেষক হিসেবে যুক্ত হন। সেখানে ন্যানো উপাদান ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর গবেষণার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিভিন্ন উপাদানের গঠন ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের কার্যক্ষমতার সম্পর্ক বোঝা। ফলে রসায়নভিত্তিক উপাদান গবেষণার পাশাপাশি বাস্তব প্রযুক্তিতে সেসব উপাদানের ব্যবহার নিয়েও কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। ২০২১ সালের জুনে জাপান অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির স্কুল অব ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্সে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেখানে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত গবেষণা করেন। এই সময় তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল গ্রাফিনভিত্তিক ফিল্ড ইফেক্ট ট্রানজিস্টর, গ্যাস শনাক্তকরণ এবং উন্নত ইলেকট্রনিক সেন্সর। গ্রাফিন অত্যন্ত পাতলা কার্বনভিত্তিক একটি উপাদান, যার বিশেষ বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও সেন্সর তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে কাজ চলছে। জাহিদুল ইসলামের গবেষণাতেও গ্রাফিনভিত্তিক ডিভাইস ব্যবহার করে গ্যাস শনাক্তকরণ প্রযুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দীর্ঘ পোস্টডক্টরাল গবেষণার পর ২০২৩ সালের জুনে আবার নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন তিনি। এবার যোগ দেন গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। সেখানে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই পর্যায়ে উন্নত কার্যকরী ন্যানো উপাদান তৈরি, সেগুলোর গঠন ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ এবং তড়িৎ রাসায়নিক কার্যকারিতা পরীক্ষার মতো বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যান তিনি। শক্তি উৎপাদন, রূপান্তর ও সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তিতে নতুন উপাদানের সম্ভাব্য ব্যবহারও তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। এরপর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে টোকিও মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব বায়োম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত হন। একই বছরের অক্টোবরে টোকিও মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল ইউনিভার্সিটি ও টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একীভূত হওয়ার মাধ্যমে ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিও প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পদে তাঁর একাডেমিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওতে তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জৈব উপাদান, পলিমার এবং নরম পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়। এর ফলে রসায়ন, উপাদানবিজ্ঞান, শক্তি প্রকৌশল ও ইলেকট্রনিক্সে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত গবেষণাক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি। জাহিদুল ইসলামের গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, একটি উপাদান তৈরি থেকে শুরু করে তার গঠন, রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং বাস্তব প্রযুক্তিতে ব্যবহারের সম্ভাবনা পরীক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে কাজ করা। গবেষণার প্রয়োজনে তিনি ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ, স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ, অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ, রামান স্পেকট্রোস্কপি এবং এক্স রে ডিফ্র্যাকশনের মতো উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এসব প্রযুক্তির সাহায্যে ন্যানো উপাদানের গঠন ও বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যায়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। তড়িৎ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রোকেমিক্যাল ইম্পিড্যান্স স্পেকট্রোস্কপি ও সাইক্লিক ভোল্টামেট্রি। ব্যাটারি, জ্বালানি কোষ এবং তড়িৎ অনুঘটনভিত্তিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত উপাদানের কার্যকারিতা মূল্যায়নে এসব পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। জাপানের জে গ্লোবাল গবেষক তথ্যভান্ডারে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪১টি গবেষণা প্রকাশনার তথ্য তালিকাভুক্ত রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রকাশনাগুলোর মধ্যে ন্যানো উপাদানভিত্তিক তড়িৎ রাসায়নিক সেন্সর, সামুদ্রিক জৈব উপাদান থেকে তৈরি কার্বনের মাধ্যমে শক্তি সংরক্ষণ এবং বিশেষ ধরনের পলিমার ন্যানোফাইবারের বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা নিয়ে গবেষণা রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় তাঁর সহগবেষকেরা বিশেষ ধরনের জৈব পলিমার ন্যানোফাইবার দিয়ে তৈরি জেল ও পাতলা স্তরের বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা নিয়ে কাজ করেছেন। এই গবেষণার সঙ্গে টিস্যু পুনর্গঠনের মতো জৈব চিকিৎসা প্রযুক্তির সম্ভাব্য সম্পর্কও রয়েছে। বাংলাদেশে রসায়নে উচ্চশিক্ষা থেকে থাইল্যান্ডে স্নাতকোত্তর, এরপর জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট, একাধিক পোস্টডক্টরাল গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। ড. মোঃ জাহিদুল ইসলামের একাডেমিক পথচলায় রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর গবেষণাগোষ্ঠীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে শক্তি প্রযুক্তি, ন্যানো উপাদান, গ্রাফিনভিত্তিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও জৈব উপাদান নিয়ে গবেষণা, সব মিলিয়ে তাঁর কর্মজীবন বিস্তৃত হয়েছে বিজ্ঞানের একাধিক শাখায়। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন থেকে যাত্রা শুরু করে জাপানের আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিবেশে শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হওয়ার এই পথচলা বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষকদের অবদানের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সূত্র: পাবলিকিয়ান
জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপের একটি হোটেল থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে এক মার্কিন মেরিন সেনাকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। রোববার (৪ অক্টোবর) পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে, শনিবার (৩ অক্টোবর) ভোরে নাহা শহরের একটি হোটেলের কক্ষ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ওই নারীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ওই নারীর মরদেহের অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই ধারণা করা হচ্ছে। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মাথা কামানো বিদেশি চেহারার এক ব্যক্তি ওই নারীর সঙ্গে হোটেল কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তীতে ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তি একাই ওই নারীর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে যান। শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে মরদেহ উদ্ধারের পর দ্রুত অভিযানে নামে পুলিশ এবং ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে রোববার রাত ১টার দিকে শহরের রাস্তায় ঘোরাফেরা করার সময় ওই সেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০ বছর বয়সী ওই তরুণ মার্কিন সেনা ওকিনাওয়ার ফুতেনমা এয়ার স্টেশনে কর্মরত ছিলেন। এই ঘটনার পর টোকিওতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানানো হয়েছে, ওকিনাওয়ায় জাপানি নাগরিকের মৃত্যু ও মার্কিন মেরিন সেনাকে হেফাজতে নেওয়ার বিষয়ে তারা অবগত রয়েছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে জাপানের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ জানতে স্থানীয় পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়ায় গাড়ি কেনার সময় সাশ্রয়ী মডেলকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ক্রেতারা। এতে হাইব্রিড গাড়ির চাহিদা বাড়ছে এবং সুবিধা পাচ্ছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতারা। ২ অক্টোবর প্রকাশিত সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর গ্যাসোলিনের মূল্যবৃদ্ধি ক্রেতাদের পছন্দে এই পরিবর্তন এনেছে। হাইব্রিড গাড়িতে গ্যাসোলিনচালিত ইঞ্জিনের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করা হয়। এই সমন্বয় জ্বালানি খরচ কমাতে সাহায্য করে। সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানিসাশ্রয়ী গাড়ি খুঁজতে গিয়ে ক্রেতারা এশীয় ব্র্যান্ডগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বড় মার্কিন নির্মাতাদের হাইব্রিড মডেলের বিকল্প সীমিত। নির্মাতাদের প্রকাশিত বিক্রির হিসাবেও হাইব্রিডের প্রতি আগ্রহের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। হুন্দাই জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। ওই মাসে প্রতিষ্ঠানটির মোট বিক্রির ২৮ শতাংশ ছিল হাইব্রিড। কিয়াও সেপ্টেম্বর ও তৃতীয় প্রান্তিকে হাইব্রিড বিক্রিতে নিজেদের সর্বোচ্চ রেকর্ডের কথা জানিয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে টয়োটার হাইব্রিড বিক্রি ২৯ শতাংশ এবং হোন্ডার ২১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে হুন্দাই ও কিয়ার সম্মিলিত গাড়ি বিক্রি ফোর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে মার্কিন নির্মাতাদের হাইব্রিড গাড়ি নেই, এমন নয়। ফোর্ডের ২০২৬ সালের এফ-১৫০ পিকআপে পাওয়ারবুস্ট ফুল হাইব্রিড ইঞ্জিনের বিকল্প রয়েছে। ফলে বাজারের পার্থক্যটি মূলত ক্রেতাদের সামনে কত ধরনের হাইব্রিড মডেল রয়েছে, তা নিয়ে। সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বড় মার্কিন নির্মাতারা দীর্ঘদিন বেশি লাভের বড় এসইউভি ও ট্রাককে গুরুত্ব দিয়েছে। এখন জ্বালানি খরচ কমানোর আগ্রহ বাড়ায় তাদের সীমিত হাইব্রিড বিকল্প প্রতিযোগিতায় চাপ তৈরি করছে। ক্রেতাদের এই চাহিদা ধরে রাখতে জ্বালানিসাশ্রয়ী মডেলের পরিসর বাড়ানো প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১৯৬৮ সালের ১০ ডিসেম্বর। জাপানের টোকিওতে পুলিশের পোশাক পরা এক ব্যক্তি চার ব্যাংককর্মীকে থামিয়ে এমন এক নাটক সাজিয়েছিলেন, যার পরিণতিতে প্রায় ৩০ কোটি ইয়েন নিয়ে উধাও হয়ে যান তিনি। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও সেই অর্থ উদ্ধার হয়নি, ধরা পড়েনি ঘটনার মূল হোতাও। সেদিন চার ব্যাংককর্মী একটি গাড়িতে করে টশিবার ফুচু কারখানার কর্মীদের বোনাসের টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে ছিল ২৯ কোটি ৪৩ লাখ ৭ হাজার ৫০০ ইয়েন। ১৯৬৮ সালের বিনিময় হারে যার মূল্য ছিল প্রায় ৮ লাখ ১৮ হাজার মার্কিন ডলার। গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছালে পুলিশের মোটরসাইকেল নিয়ে এক ব্যক্তি তাদের গাড়ি থামান। পুলিশের পোশাক পরা ওই ব্যক্তি দাবি করেন, ব্যাংক শাখা ব্যবস্থাপকের বাড়িতে বি স্ফো রণ ঘটেছে। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, তাদের গাড়িতেও বো ম থাকতে পারে। ভয় পেয়ে চার ব্যাংককর্মী গাড়ি থেকে নেমে আসেন। এরপর ওই ব্যক্তি গাড়ির নিচে ঢুকে পরীক্ষা করার ভান করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি চিৎকার করে জানান, গাড়ির নিচে ডা য় না মাই ট পাওয়া গেছে এবং যেকোনো মুহূর্তে গাড়িটি বি স্ফো রিত হতে পারে। পরিস্থিতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে গাড়ির নিচে ধোঁয়া ও আগুনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। পরে জানা যায়, ওই ধোঁয়া ও আগুন আসলে একটি ফ্লেয়ার থেকে তৈরি করা হয়েছিল। আতঙ্কিত ব্যাংককর্মীরা গাড়ি থেকে দূরে সরে গেলে ভুয়া পুলিশ সদস্যটি গাড়িতে উঠে সেটি চালিয়ে পালিয়ে যান। ঘটনাটি জাপানে ‘৩০ কোটি ইয়েন ডাকাতি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পুলিশ ব্যাপক তদন্ত শুরু করে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য তদন্তে যুক্ত হন এবং অসংখ্য সম্ভাব্য সন্দেহভাজনের তথ্য যাচাই করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১২০টি আলামতও উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, এর কিছু ছিল তদন্তকে বিভ্রান্ত করার জন্য সাজানো। তদন্তে একজন সম্ভাব্য সন্দেহভাজনের নাম সামনে এসেছিল। তবে তাকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। চুরি যাওয়া অর্থও আর কখনো উদ্ধার হয়নি। দীর্ঘ তদন্তের পরও প্রকৃত অপরাধীর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৮ সালের সেই ঘটনার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু জাপানের আলোচিত এই ডাকাতির রহস্য এখনো অমীমাংসিত। পুলিশের পোশাক, সাজানো বি স্ফো রণের ভয় এবং কয়েক মিনিটের অভিনয় ব্যবহার করে বিপুল অর্থ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি আজও জাপানের অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত অপরাধ হিসেবে পরিচিত।
অতিথিদের ফেলে যাওয়া স্যুটকেস এবার আর আবর্জনা হিসেবে ফেলে দিচ্ছে না টোকিওর একটি হোটেল। সেগুলোকে রূপান্তর করা হচ্ছে সবজি ও ভেষজ চাষের পাত্রে। টোকিওর চিয়োদা ওয়ার্ডে অবস্থিত হোটেল নিওয়া টোকিওর ছাদে এভাবেই গড়ে উঠেছে একটি ব্যতিক্রমী বাগান, যেখানে উৎপাদিত কিছু সবজি ও ভেষজ আবার হোটেলের রেস্তোরাঁয় অতিথিদের খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। হোটেলটি ২০২২ সালে ‘ইকো-নিওয়া’ নামে পরিবেশবান্ধব একটি উদ্যোগ শুরু করে। এর লক্ষ্য ছিল হোটেলের বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা এবং ছাদে বাগান গড়ে তোলা। শুরুতে কফি বিন বহনে ব্যবহৃত শণজাতীয় বস্তা গাছ লাগানোর পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এসব বস্তা যথেষ্ট টেকসই না হওয়ায় মাটি বেরিয়ে যেত এবং পানি ধরে রাখার ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছিল। পরে অতিথিদের ফেলে যাওয়া স্যুটকেস ব্যবহার করার ধারণা আসে। হোটেলের মহাব্যবস্থাপক কাজুয়া ওকাওয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে প্রায় ১০টি স্যুটকেস অতিথিরা হোটেলে রেখে যান। হোটেলের প্রায় ৯০ শতাংশ অতিথিই বিদেশি। করোনাভাইরাস মহামারির পর জাপানে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে ফেলে যাওয়া স্যুটকেসের সংখ্যাও বেড়েছে। মালিককে ফেরত দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এসব স্যুটকেস সংরক্ষণ করা হয়। সেই সময়ের মধ্যে কেউ নিতে না এলে উপযোগী স্যুটকেসগুলোর কিছু বাগানের কাজে ব্যবহার করা হয়। ছাদবাগান প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ইয়োকো তাকাতা জানান, বিশেষ করে প্লাস্টিকের তৈরি এমন স্যুটকেস, যেগুলোর চাকা অক্ষত রয়েছে, গাছ লাগানোর জন্য বেশ কার্যকর। স্যুটকেসের কাঠামো মাটি ও পানি ধরে রাখতে পারে। পাশাপাশি চাকা ও হাতল থাকায় প্রয়োজন হলে সেগুলো সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো যায়। ফলে সাধারণ আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়ার বদলে পুরোনো স্যুটকেসগুলোকে ব্যবহার করে শহরের মধ্যেই নতুন করে সবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে হোটেলটির ছাদবাগানে প্রায় ৪০ ধরনের সবজি ও ভেষজ উৎপাদন করা হচ্ছে। হোটেলের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, অতিথিদের ফেলে যাওয়া স্যুটকেসসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত উপকরণ ব্যবহার করে এসব ফসল চাষ করা হয়। বাগান থেকে পাওয়া কিছু সবজি ও ভেষজ হোটেলের দুটি রেস্তোরাঁয় পরিবেশন করা হয়। তবে ফসলের মৌসুমের ওপর নির্ভর করে রেস্তোরাঁয় ছাদবাগানের উৎপাদিত খাবারের প্রাপ্যতা পরিবর্তিত হতে পারে। ছাদবাগানের উৎপাদিত খাবার অতিথিদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করছে। তাকাতা বলেন, অতিথিরা যখন জানতে পারেন যে তাদের খাবারে ব্যবহৃত উপকরণ কিছুক্ষণ আগেই হোটেলের ছাদ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, তখন তারা আনন্দিত হন। আবার অনেক অতিথি প্রথমবার হোটেলে এসে জানতে পারেন যে ভবনের ছাদেই একটি সবজির বাগান রয়েছে। শহরের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যে এমন একটি উদ্যোগ হোটেলের অতিথিদের জন্যও আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। হোটেলের পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম অবশ্য শুধু স্যুটকেস পুনর্ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হোটেলের চারটি বাগান থেকে সংগ্রহ করা শুকনো পাতা প্রক্রিয়াজাত করে মাটির উর্বরতা বাড়ানোর উপাদান তৈরি করা হয়। রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য ও খাবারের ডিমের খোসাও বাগানের কাজে ব্যবহার করা হয়। ২০২৪ সাল থেকে হোটেলের ছাদে মৌমাছি পালনের উদ্যোগও রয়েছে এবং সেখান থেকে উৎপাদিত মধু হোটেলের খাবার ও পানীয়তে ব্যবহার করা হয়। পরিত্যক্ত স্যুটকেসকে গাছ লাগানোর পাত্র হিসেবে ব্যবহারের ধারণাটি এর আগে থেকেই হোটেলটির পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের অংশ ছিল। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, হোটেলের ছাদে স্যুটকেস ব্যবহার করে বেগুন, টমেটো, মরিচ, তরমুজ, শিসো ও তুলসিসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হচ্ছিল। তখন ছাদবাগানে প্রায় ২০ ধরনের ফসল চাষের কথা জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্যোগটি আরও বিস্তৃত হয়ে বর্তমানে প্রায় ৪০ ধরনের সবজি ও ভেষজ উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন হোটেল কর্তৃপক্ষ এই ধারণাকে স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কাছাকাছি স্কুলগুলোতে কর্মশালার আয়োজন করে পুরোনো স্যুটকেস কীভাবে গাছ লাগানোর পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তা শেখানোর কথা ভাবছে তারা। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ইয়োকো তাকাতা জানিয়েছেন, অতিথিদের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করাও তাদের লক্ষ্য। হোটেল নিওয়া টোকিওর ‘ইকো-নিওয়া’ প্রকল্পটি মূলত একটি সাধারণ বর্জ্যকে নতুন কাজে ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ। পরিত্যক্ত স্যুটকেসের মতো সহজে ফেলে দেওয়া একটি উপকরণকে ব্যবহার করে শহরের ছাদে খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সচেতনতা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করছে হোটেলটি। জাপানের হোটেলটির নিজস্ব তথ্যেও স্যুটকেস পুনর্ব্যবহার করে সবজি ও ভেষজ চাষ এবং সেগুলো রেস্তোরাঁয় ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সূত্র: দ্য জাপান টাইমস, হোটেল নিওয়া টোকিও
জাপানে বৃষ্টির মধ্যে কাজে যাওয়ার পথে সাইকেল থেকে পড়ে আহত হয়েছিলেন ভারতীয় নারী সোনম মিধা। কাঁধে আঘাতের পাশাপাশি বেঁকে যায় সাইকেলের হ্যান্ডেল, ভেঙে যায় আইফোনের স্ক্রিনও। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার পর এক অপরিচিত জাপানি দোকানির কাছ থেকে পাওয়া মানবিক আচরণই শেষ পর্যন্ত তার কাছে দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে ওঠে। সোনম জানান, বৃষ্টির মধ্যে সাইকেল চালিয়ে অফিসে যাওয়ার সময় সেটি পিছলে যায়। পড়ে গিয়ে কাঁধে আঘাত পান তিনি। কোনোভাবে অফিসে পৌঁছানোর পর সহকর্মী তাকে প্রাথমিক চিকিৎসায় সহায়তা করেন। দুপুরের বিরতিতে ক্ষতিগ্রস্ত সাইকেলটি নিয়ে কাছের একটি মেরামতের দোকানে যান সোনম। তার ধারণা ছিল, সাইকেল ঠিক করতে ভালো অঙ্কের অর্থ খরচ হবে। কারণ এর আগে শুধু সাইকেলের সিটের অবস্থান ঠিক করতেই তাকে ৫০০ ইয়েন দিতে হয়েছিল বলে জানান তিনি। কিন্তু দোকানে পৌঁছানোর পর ঘটে অন্য ঘটনা।সাইকেল দেখার আগে দোকানি সোনমের আঘাতের দিকে নজর দেন। প্রথমেই জানতে চান, তিনি ঠিক আছেন কি না। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত হ্যান্ডেল ঠিক করে দেন। কাজ শেষে সোনম জাপানি ভাষায় জানতে চান, ‘ইকুরা দেশু কা?’ অর্থাৎ কত টাকা দিতে হবে? দোকানির উত্তর ছিল মাত্র দুটি শব্দ - ‘নো প্রাইস।’ অর্থাৎ কোনো টাকা লাগবে না। বিনা পয়সাতেই সাইকেলটি ঠিক করে দেন তিনি। শুধু তাই নয়, বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে আরও নিরাপদে সাইকেল চালাতে হবে, সে বিষয়েও সোনমকে পরামর্শ দেন ওই দোকানি। অপরিচিত একজন মানুষের এমন আচরণে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সোনম। তবে শুধু ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যেতে চাননি তিনি। কাছের একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁয় গিয়ে দোকানির জন্য খাবার প্যাকেট করেন। এরপর আবার বৃষ্টির মধ্যেই সাইকেল চালিয়ে ফিরে যান সেই দোকানে। সোনমকে আবার দোকানে ঢুকতে দেখে প্রথমে চিন্তিত হয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি। সোনমের ধারণা, দোকানি হয়তো ভেবেছিলেন তিনি আবার পড়ে গেছেন কিংবা সাইকেলে নতুন কোনো সমস্যা হয়েছে। কিন্তু সোনম যখন জানান, তার জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন, তখন দোকানির প্রতিক্রিয়াও বদলে যায়। সোনমের ভাষ্য অনুযায়ী, খাবার পেয়ে আবেগাপ্লুত ও দৃশ্যত আনন্দিত হয়ে ওঠেন তিনি। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দুই অপরিচিত মানুষের পারস্পরিক এই আচরণ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। একজন বিনা পয়সায় সাইকেল ঠিক করে দিয়েছিলেন, অন্যজন সেই আন্তরিকতার জবাব দিয়েছেন নিজের দেশের খাবার দিয়ে। সোনম জানিয়েছেন, দিনটি তার মনে থাকবে সাইকেল দুর্ঘটনা, আহত কাঁধ কিংবা ভাঙা ফোনের জন্য নয় - বরং অপরিচিত একজন মানুষের কাছ থেকে পাওয়া মানবিকতার জন্য। মজার বিষয় হলো, জাপানে সোনমের এমন অভিজ্ঞতা এটিই প্রথম নয়। গত আগস্টে তিনি একটি ব্যাগ হারিয়েছিলেন, যেখানে নগদ অর্থ, বাড়ির চাবি ও দামি মাইক্রোফোনসহ প্রায় এক লাখ রুপির জিনিস ছিল। পরে থানায় গিয়ে জানতে পারেন, অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ব্যাগটি খুঁজে পেয়ে সবকিছু অক্ষত অবস্থায় পুলিশের কাছে জমা দিয়ে গেছেন। সূত্র: সোনম মিধার ইনস্টাগ্রাম পোস্টের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস
আগামী দুই মাসে তিন দেশ সফরের প্রস্তুতি চলছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। অক্টোবর ও নভেম্বরে জাপান, তুরস্ক ও সৌদি আরব সফরের সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ঢাকা। তবে এখন পর্যন্ত এই তিন দেশ সফরের সম্ভাব্য সূচিতে প্রতিবেশী ভারতের নাম নেই। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রথমে জাপান সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সম্ভাব্য এই দ্বিপক্ষীয় সফর তিন থেকে চার দিনের হতে পারে। সফরটি সামনে রেখে ঢাকা ও টোকিওর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। জাপান সফরে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, জনশক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। জাপানও বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ জানিয়েছে। এরপর নভেম্বরে তুরস্ক সফরের কথা রয়েছে তারেক রহমানের। দেশটির আনতালিয়ায় আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩১তম সম্মেলন - কপ৩১। প্রধানমন্ত্রীকে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও এর আগে তারেক রহমানের কপ৩১-এ অংশ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তুরস্কের পর নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরব সফরের সম্ভাবনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে সম্ভাব্য এই দ্বিপক্ষীয় সফর আয়োজন নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। সৌদি সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, জ্বালানি, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাংলাদেশি জনশক্তির সুযোগ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে সফরের চূড়ান্ত তারিখ ও পূর্ণ কর্মসূচি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এদিকে সম্ভাব্য এই তিন দেশ সফরের তালিকায় ভারত না থাকলেও দিল্লি সফরের আলোচনা শেষ হয়ে যায়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও তাকে আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যদিও তিনি সেখানে যাননি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৫ সেপ্টেম্বর জানায়, দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের বিষয়ে তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কাছ থেকে কোনো চূড়ান্ত জবাব তারা পায়নি। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২১ সেপ্টেম্বর কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, দুই পক্ষ নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে সম্ভাব্য ভারত সফরের তারিখ নিয়েও আলোচনা করছে। ফলে বর্তমানে ভারত সফর বাতিল হয়েছে বা হচ্ছে না - এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগও নেই। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী কূটনৈতিক সফরের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে এখন সামনে রয়েছে জাপান, তুরস্ক ও সৌদি আরব। তিন সফরের প্রস্তুতি এগোলেও তারিখগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
জাপানের সমাজে বিয়ের পর সাধারণত নারীরা স্বামীর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হলেও দেশটিতে এর সম্পূর্ণ বিপরীত এক অদ্ভুত পারিবারিক ব্যবস্থাও বেশ প্রচলিত। ঐতিহ্যবাহী এই প্রথায় বিয়ের পর মেয়ের স্বামীকেই দত্তক নিয়ে পরিবারের ছেলে ও উত্তরাধিকারী বানানো হয়। ‘মুকোয়োশি’ বা ‘দত্তক ঘরজামাই’ নামের দীর্ঘদিনের এই সামাজিক ও আইনি রীতির মাধ্যমে জামাইরা শুধু পরিবারের সদস্যই হন না, বরং শ্বশুরবাড়ির পদবি, ব্যবসা, সম্পদ এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা উত্তরাধিকারেরও মূল কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশে শিশুদের দত্তক নেওয়ার ধারণা প্রচলিত থাকলেও জাপানের মোট দত্তকের ৯০ শতাংশের বেশিই হলো ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। মূলত পারিবারিক আবেগ এবং ভবিষ্যতের হিসাব-নিকাশ থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাপানে বহু পুরোনো ব্যবসা আজও পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত হয়। কোনো পরিবারে পুত্রসন্তান না থাকলে কিংবা নিজের ছেলেকে ব্যবসার উত্তরসূরি হিসেবে উপযুক্ত মনে না হলে তারা একজন যোগ্য পুরুষকে দত্তক নিতে পারে। সেই ব্যক্তি যদি নিজের মেয়ের স্বামী হন, তাহলে বিষয়টি আরও সহজ হয়ে যায়। দত্তক সম্পন্ন হওয়ার পর ওই ব্যক্তি জাপানের সরকারি পারিবারিক নথি ‘কোসেকি’-তে নিবন্ধিত হন এবং জন্মসন্তানের মতোই পরিবারের বয়স্কদের দেখাশোনাসহ সব দায়িত্ব ও অধিকার লাভ করেন। ‘মুকোয়োশি’ প্রথার মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবারের পদবি হারিয়ে যেতে না দেওয়া এবং শত বছরের পুরোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পরিবারের ভেতরেই রাখা। জাপানে এ নিয়ে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে যে, পুত্রসন্তান বেছে নেওয়া যায় না, কিন্তু জামাই বেছে নেওয়া যায়। এমনকি উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে দেওয়ার জন্য সেখানে বিশেষ ম্যাচমেকিং সেবারও অস্তিত্ব রয়েছে। জাপানের বিশ্বখ্যাত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাসেও ‘মুকোয়োশি’ প্রথার গভীর প্রভাব রয়েছে। সুজুকি মোটর করপোরেশনের দীর্ঘদিনের প্রধান ওসামু সুজুকি নিজেও ছিলেন এই প্রথায় পরিবারে আসা একজন দত্তক ঘরজামাই। এছাড়া নিনটেনডো, কিক্কোমান ও টয়োটার মতো জাপানি প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের দত্তকের সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে আধুনিক জাপানে জন্মহার কমে যাওয়ায় প্রথাটি এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই ব্যবস্থায় বিদেশিদেরও সুযোগ রয়েছে। দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি থাকা বিদেশিরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দত্তক হতে পারেন। অর্থাৎ, শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কোনো বাংলাদেশি ব্যক্তিও চাইলে জাপানি পরিবারের দত্তক সন্তান হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে দত্তক হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাপানের নাগরিকত্ব বা ভিসা পাওয়া যায় না, এর জন্য সম্পূর্ণ আলাদা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সব মিলিয়ে জাপানের এই ‘মুকোয়োশি’ প্রথা নিছক কোনো দত্তক নেওয়ার গল্প নয়, বরং এটি বদলে যাওয়া সমাজের সঙ্গে ব্যবসা ও উত্তরাধিকার টিকিয়ে রাখার এক বিস্ময়কর কৌশল।
জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা স্থায়ী আবাসিক মর্যাদা পাওয়ার নিয়ম আরও কঠোর করছে দেশটির সরকার। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদের গৃহস্থালি আয়, ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা ও জাপানি ভাষাজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এতে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বিদেশিদের একটি অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় আট বছর আগে কাজের জন্য জাপানে যাওয়া আবদুল নামে এক বাংলাদেশি নাগরিকও তাদের মধ্যে রয়েছেন। উত্তর টোকিওতে বাংলাদেশি স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করা এই প্রযুক্তি প্রকৌশলী স্থায়ী বসবাসের পাশাপাশি জাপানের নাগরিকত্বের জন্যও আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে নতুন নিয়মের কারণে দুই আবেদনই প্রত্যাখ্যাত হলে জাপান ছাড়ার বিকল্পও তাকে ভাবতে হচ্ছে। নিজের প্রকৃত নাম প্রকাশ না করার শর্তে আবদুল আল জাজিরাকে বলেন, ভবিষ্যতে জাপান সরকার নিয়ম আরও কঠোর করবে কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। দুই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে কী করবেন, সে প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে তাকে। এরই মধ্যে তিনি জাপানের বাইরে কাজের সুযোগ খুঁজতে শুরু করেছেন। নতুন ব্যবস্থার আওতায় স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের বার্ষিক গৃহস্থালি আয় জাপানি পরিবারের গড় আয়ের চেয়ে বেশি হতে হবে। এ শর্তটি এপ্রিল থেকে জমা দেওয়া কিছু আবেদনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। পাশাপাশি আবেদনকারীর জাপানি ভাষায় দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধার বিষয়ও বিবেচনা করা হবে। পেনশনের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ডে আবেদনকারীর ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা এমন পর্যায়ে থাকতে হবে, যা নির্দিষ্ট আয়স্তরে কর্মচারীদের পেনশন ব্যবস্থায় ৩০ বছর অবদান রাখলে পাওয়া যেতে পারে। তবে আগের খসড়া নির্দেশনায় পেনশন সুবিধা নির্ধারিত মানের নিচে থাকলে সঞ্চয় বা অন্যান্য আর্থিক সম্পদের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছিল। জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নতুন নীতির মূল যুক্তি হলো, স্থায়ী বাসিন্দাদের নিজেদের জীবনযাপন স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার সক্ষমতা থাকতে হবে এবং তারা যেন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ওপর আর্থিক বোঝা হয়ে না দাঁড়ান। জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক নথিতে বিদেশিদের বসবাস ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোরতা আনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্নদের মধ্যে রয়েছেন ১৪ বছর ধরে জাপানে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিক সারাহ নেলকিনও। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাপানে আসা নেলকিন দেশটির বিনোদন শিল্পে কাজ করছেন। নতুন নিয়ম ঘোষণার কিছু আগে তিনি স্থায়ী বসবাসের আবেদন করেছিলেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাপানের নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। তবে জাপান সাধারণভাবে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি না দেওয়ায় সে ক্ষেত্রে তাকে মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে হতে পারে। নেলকিনের ভাষ্য, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরো সময়টাই তিনি জাপানে কাটিয়েছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরিবারের কাছে যাতায়াতসহ বিভিন্ন কারণে মার্কিন নাগরিকত্ব ধরে রাখতে চান তিনি। তারপরও বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিকত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি তাকে বিবেচনা করতে হচ্ছে। জাপানের মেইকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিসা হাগিওয়ারা মনে করেন, নতুন পরিবর্তনগুলো দেশটির অভিবাসন নীতিকে আরও বাছাইভিত্তিক ও শর্তনির্ভর করে তুলছে। তার মতে, জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং শ্রমিক সংকটের কারণে জাপানের বিদেশি কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে বসবাসের সুযোগ কঠিন হয়ে গেলে বিদেশি কর্মীদের কাছে জাপান কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৫ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি এবং প্রথমবারের মতো ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, জাপানের নিজস্ব জনসংখ্যা কমছে। দেশটির দীর্ঘদিনের কম জন্মহারের মধ্যে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বিদেশিদের নিয়ে নীতিতে একদিকে শ্রমবাজারের প্রয়োজন, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস ও সামাজিক সংহতি নিয়ে উদ্বেগ, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চাপ তৈরি হয়েছে। বিদেশিদের নিয়ে জাপানি সমাজের মনোভাবেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের একটি প্যানেল জরিপে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা জাপানে আরও বিদেশি বাসিন্দা গ্রহণের বিরোধী। ২০২৪ সালের একই জরিপে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মানুষের উত্তর নিয়ে পরিচালিত ওই গবেষণায় তরুণদের মধ্যে বিরোধিতার বৃদ্ধিও তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। এ পরিবর্তন জাপানের রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং জাপান ইনোভেশন পার্টি বর্তমানে ক্ষমতাসীন জোটে রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নিম্নকক্ষ নির্বাচনে এলডিপি ৩১৫টি আসন এবং জাপান ইনোভেশন পার্টি ৩৬টি আসন পায়। একই নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত সানসেইতো দল ১৫টি আসন পেয়ে নিম্নকক্ষে তাদের উপস্থিতি বাড়ায়। তবে জাপানের অর্থনীতির জন্য বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট। জনসংখ্যা কমে যাওয়া ও শ্রমিক সংকটের মধ্যে দেশটি বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশিদের শুধু কতজন প্রয়োজন তা নয়, তারা দীর্ঘমেয়াদে জাপানে বসবাস করলে কেমন সমাজ তৈরি হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠছে। নতুন নিয়মের প্রভাব তাই শুধু স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। জাপানে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা বিদেশিদের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক যারা দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাস করছেন, তাদের জন্যও নতুন শর্তগুলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। সূত্র: আল জাজিরা
জাপানে কোনো পরিবারে উপযুক্ত পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে মেয়ের স্বামীকে আনুষ্ঠানিকভাবে দত্তক নিয়ে পরিবারের পদবি ও ব্যবসার দায়িত্ব দেওয়ার দীর্ঘদিনের একটি রীতি রয়েছে। ‘মুকোয়োশি’ নামে পরিচিত এই প্রথায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বিয়ের পর শুধু জামাই হিসেবে নয়, আইনগতভাবে শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্য ও উত্তরাধিকারী হিসেবেও যুক্ত হতে পারেন। বিশেষ করে পারিবারিক ব্যবসা ও পরিবারের নাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাখাই এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য। জাপানি সমাজে এই প্রথার শিকড় বহু পুরোনো। ঐতিহাসিকভাবে পরিবারের নেতৃত্ব ও সম্পদের উত্তরাধিকার অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ উত্তরসূরির মাধ্যমে চলত। কোনো পরিবারে ছেলে না থাকলে, কিংবা থাকা ছেলে পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনার জন্য উপযুক্ত না হলে, মেয়ের স্বামীকে দত্তক নেওয়া একটি কার্যকর উত্তরাধিকার ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। দত্তক নেওয়ার পর ওই ব্যক্তি পরিবারের পদবি গ্রহণ করেন এবং পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে মুকোয়োশি শুধু মেয়ের স্বামীকে দত্তক নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো পারিবারিক ব্যবসার জন্য উপযুক্ত উত্তরসূরি না থাকলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের দক্ষ কর্মীকেও দত্তক নিয়ে পরিবারের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে। অর্থাৎ রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতাকেও উত্তরসূরি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে এই প্রথা। জাপানের পরিচিত কয়েকটি ব্যবসায়িক পরিবারের ইতিহাসেও দত্তক উত্তরসূরির নজির পাওয়া যায়। সুজুকির সাবেক চেয়ারম্যান ও দীর্ঘদিনের শীর্ষ নির্বাহী ওসামু সুজুকি জন্মসূত্রে সুজুকি পরিবারের সদস্য ছিলেন না; তিনি বিয়ের মাধ্যমে পরিবারে যুক্ত হয়ে দত্তক নেওয়া হয় এবং পরে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন। কিক্কোমানের দীর্ঘ ব্যবসায়িক ইতিহাসেও উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় পরিবার ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষার বিভিন্ন কৌশলের নজির রয়েছে। সময়ের সঙ্গে এই প্রথাকে ঘিরে ম্যাচমেকিং বা মধ্যস্থতাকারী সেবারও বিকাশ ঘটেছে। ব্যবসার উত্তরসূরি প্রয়োজন এমন পরিবার এবং মুকোয়োশি হতে আগ্রহী পুরুষদের মধ্যে বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্ক তৈরিতে কিছু বিশেষায়িত সেবা কাজ করেছে। তবে এটি কোনো সাধারণ ‘ঘরজামাই আবেদন’ ব্যবস্থা নয়। পরিবার, বিয়ে, দত্তক এবং ব্যবসার উত্তরাধিকার সবকিছুই আলাদা সামাজিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। জাপানে প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক আইনগতভাবেও স্বীকৃত একটি ব্যবস্থা। দত্তক সম্পন্ন হলে ব্যক্তি দত্তক পরিবারের সঙ্গে আইনগত পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন এবং পরিবারের পদবি গ্রহণ করতে পারেন। মুকোয়োশির ক্ষেত্রে মেয়ের স্বামীকে তার বাবা-মা দত্তক নিলে তিনি পরিবারের আইনগত ছেলে হিসেবে যুক্ত হন। ফলে পারিবারিক সম্পদ ও ব্যবসার উত্তরাধিকার পরিকল্পনায় তার ভূমিকা তৈরি হতে পারে। তবে মুকোয়োশি হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাপানি নাগরিকত্ব বা ইমিগ্রেশন সুবিধা পাওয়া নয়। বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে দত্তক, বিয়ে, বসবাসের স্ট্যাটাস ও নাগরিকত্ব আলাদা আইন ও প্রক্রিয়ার বিষয়। তাই জাপানি পরিবারে দত্তক নেওয়া এবং জাপানে বৈধভাবে বসবাস বা নাগরিকত্ব পাওয়াকে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কম জন্মহার ও পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার সংকটের মতো পরিবর্তনগুলো জাপানে এই ঐতিহ্যের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। রক্তের সম্পর্কের পরিবর্তে যোগ্য উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় মুকোয়োশি ব্যবস্থা শুধু একটি পারিবারিক রীতিই নয়, বহু ব্যবসায়িক পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি বিশেষ মডেল হিসেবেও আলোচিত হয়ে আসছে।
জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন অংশগ্রহণকারী কয়েকটি দেশের অ্যাথলিট ও কর্মকর্তারা। ভারতীয় দলের কয়েকজন অ্যাথলিটও নাগোয়ায় পৌঁছে নির্ধারিত কক্ষ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোয়িং ও শুটিং দলের সদস্যদের কেউ কেউ দীর্ঘ অপেক্ষার পর গেমস সেন্টারের লবি ও অন্যান্য অস্থায়ী জায়গায় সময় কাটিয়েছেন। এশিয়ান গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে ১৯ সেপ্টেম্বর। তবে ফুটবল, বাস্কেটবলসহ কয়েকটি ডিসিপ্লিনের প্রতিযোগিতা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এবারের আসরে প্রায় ১৭ হাজার অ্যাথলিট ও কর্মকর্তা অংশ নিচ্ছেন। আগের পরিকল্পনার তুলনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আবাসন ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আয়োজকরা এবার আলাদা করে কোনো বড় অ্যাথলিট ভিলেজ তৈরি করেনি। খরচ কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অ্যাথলিট ও কর্মকর্তাদের জন্য হোটেল, অস্থায়ী কক্ষ এবং নাগোয়া বন্দরে নোঙর করা ইতালীয় ক্রুজ জাহাজ ‘কোস্টা সেরেনা’ ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্রুজ জাহাজটিতে প্রায় ৪ হাজার মানুষ থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া বন্দরের এলাকায় তৈরি করা অস্থায়ী কনটেইনার ধরনের কক্ষেও প্রায় ২ হাজার অ্যাথলিট ও কর্মকর্তাকে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভারতীয় দলের ক্ষেত্রে সমস্যা বেশি দেখা দেয় নাগোয়ায় পৌঁছানোর পর কক্ষ বরাদ্দের সময়। নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ভারত থেকে যাত্রা করা দলের একটি অংশ বুধবার সকালে নাগোয়ায় পৌঁছায়। দীর্ঘ যাত্রার পর তারা ক্রুজ জাহাজে পৌঁছালেও নির্ধারিত আবাসন পেতে তাদের অপেক্ষা করতে হয়। রোয়িং দলের এক সদস্য সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে তারা আবাসনকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্ষ বরাদ্দ হয়নি। ভারতের রোয়িং দল এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভোগা দলগুলোর একটি বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। কয়েকজন অ্যাথলিটকে কক্ষ বরাদ্দের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে কক্ষ পাওয়া গেলেও একাধিক ব্যক্তিকে একই কক্ষে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুটিং দলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিলম্বের খবর এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার নাগোয়ায় পৌঁছানো শুটারদের একটি অংশ নির্ধারিত কক্ষ না পেয়ে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তির মধ্যে কয়েকজনকে গেমস সেন্টারের লবিতে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। পরে ভোরের দিকে তাদের কক্ষ বরাদ্দ করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একজন ভারতীয় কোচের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা এক দিন আগে নাগোয়ায় পৌঁছেছিলেন, তাঁদের ভোগান্তি তুলনামূলক বেশি ছিল। পরদিন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তাঁর দলের সদস্যদেরও কয়েক ঘণ্টা কক্ষের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। কোচ জানান, স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টার দিকে তাঁরা পৌঁছালেও রাত প্রায় ১০টার দিকে কক্ষ পান। পরে গেমস সেন্টার থেকে বাসে করে তাদের হোটেলে যেতে হয়। আবাসন নিয়ে শুধু ভারতীয় দলই সমস্যায় পড়েনি। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারাও অস্থায়ী কক্ষের মান নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন। কোরিয়ার বাস্কেটবল কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কনটেইনার ধরনের কক্ষের কিছু বিছানা দুই মিটারের বেশি উচ্চতার খেলোয়াড়দের জন্য যথেষ্ট বড় নয়। ফিলিপাইনের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, তাদের কিছু কোচ ও কর্মকর্তাকে বিভিন্ন হোটেল ও ভাড়া করা বাসস্থানে রাখা হয়েছে। আয়োজকরা অবশ্য জানিয়েছে, আবাসন নিয়ে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলো সমাধানে কাজ চলছে। আয়োজক কমিটি ও অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়ার যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে নিবন্ধন বন্ধ হওয়ার সময় তালিকাভুক্ত ১৭ হাজারের বেশি অ্যাথলিট ও কর্মকর্তার জন্য গেমস উপযোগী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আয়োজকদের মতে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আগের অনুমানের চেয়ে বেড়ে যাওয়াই আবাসন ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরির অন্যতম কারণ। এবারের এশিয়ান গেমসে নতুন কয়েকটি ডিসিপ্লিন যুক্ত হওয়ায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও বেড়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে জাপান অতিরিক্ত হোটেল কক্ষও প্রস্তুত রেখেছে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, আবাসন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যাতায়াত ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াতেও কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। ক্রুজ জাহাজে প্রবেশের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র সক্রিয়করণে বিলম্ব হওয়ায় অনেক অ্যাথলিটকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। জাপানের দলসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের ক্ষেত্রেও কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে সমন্বয় করতে হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। সব মিলিয়ে উদ্বোধনের আগেই আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজকদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে আয়োজকরা বলছে, সব নিবন্ধিত অ্যাথলিট ও কর্মকর্তার থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং যেসব বাস্তব সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হচ্ছে। সূত্র: নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, রয়টার্স, অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়া
ঘুমিয়ে সময় কাটানো নয়, এবার ভালো ঘুমই হতে পারে পুরস্কার জেতার উপায়। জাপানের টোকিওতে এমনই এক ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে যাচ্ছে কোরালা জেপি। ‘ম্যাটরেস বাই কোরালা’ নামের এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের ৯০ মিনিট ঘুমের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। সবচেয়ে ভালো ঘুমের জন্য বিজয়ী পাবেন ২২২ লাখ ইয়েনের পুরস্কার। প্রতিযোগিতাটি আগামী ৫ অক্টোবর টোকিওর মিনামি আওয়ামার শেয়ার গ্রিন মিনামি আওয়ামা এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিযোগীদের কোরালা ম্যাট্রেসে শুয়ে ঘুমাতে হবে এবং বিশেষ ঘুম পরিমাপক যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের ঘুমের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। শুধু কতক্ষণ ঘুমানো হলো, সেটিই এখানে মূল বিষয় নয়। ঘুম কতটা গভীর ও মানসম্মত ছিল, কত দ্রুত ঘুম এসেছে এবং ঘুম কতটা স্থিতিশীল ছিল, এসব বিষয় বিবেচনা করে প্রতিযোগীদের জন্য একটি বিশেষ ‘স্লিপ স্কোর’ তৈরি করা হবে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এই স্কোর নির্ধারণ করা হবে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছে। সর্বোচ্চ স্কোর পাওয়া প্রতিযোগী হবেন বিজয়ী। তবে প্রতিযোগিতায় জিততে হলে আগে থেকেই সারারাত জেগে থাকা বা অতিরিক্ত ঘুমের ঘাটতি তৈরি করে আসার সুযোগ নেই। ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুম বঞ্চিত থাকা, ঘুমের ওষুধ বা ঘুম আনতে সহায়তা করে এমন ওষুধ ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতায় দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার সুবিধা নিতে কেউ আগের রাতের ঘুম নষ্ট করতে পারবেন না। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে অংশগ্রহণকারীদের জন্য থাকবে বিশেষ ধরনের ‘ঘুমের ব্যায়াম’। এরপর প্রত্যেককে এলোমেলোভাবে একটি করে ঘুম-সংক্রান্ত সামগ্রী দেওয়া হবে। এসব সামগ্রী ঘুমের পরিবেশে কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারে এবং প্রতিযোগিতাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। এরপর শুরু হবে মূল ৯০ মিনিটের ঘুমের পর্ব। প্রতিযোগীরা যখন ঘুমানোর চেষ্টা করবেন, তখন আয়োজকেরা পরিকল্পিতভাবে কিছু বিঘ্ন ঘটাবেন। এর মাধ্যমে হঠাৎ কোনো বাধা তৈরি হলেও কে কতটা স্থিরভাবে ঘুমিয়ে থাকতে পারেন, সেটিও যাচাই করা হবে। ফলে শুধু দ্রুত ঘুমিয়ে পড়াই নয়, পুরো সময়জুড়ে ঘুমের মান ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মূল পুরস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থাও থাকছে। সবচেয়ে গভীর ঘুমের জন্য ‘ডিপ স্লিপ ডাইভ অ্যাওয়ার্ড’ এবং অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী ভঙ্গিতে ঘুমানোর জন্য ‘স্লিপ-টার্নিং অ্যাক্রোব্যাট অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো প্রতিযোগিতায় তিনটি পর্ব থাকবে। প্রতিটি পর্বে প্রায় ২০ জন করে অংশ নেবেন এবং প্রতিটি ঘুমের পর্বের সময় ৯০ মিনিট। পুরো আয়োজনটি দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। অংশগ্রহণের জন্য কোনো ফি নেই। আবেদনকারীর সংখ্যা নির্ধারিত আসনের চেয়ে বেশি হলে লটারির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী নির্বাচন করা হবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০ বছর বা তার বেশি বয়সীরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে ৪ সেপ্টেম্বর এবং ১৬ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। জাপানে ঘুমের ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। আয়োজকদের দাবি, এই ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুমের গুরুত্ব তুলে ধরাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে ঘুমকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে এমন একটি আয়োজন, যেখানে শারীরিক শক্তি বা দ্রুততার বদলে প্রতিযোগিতার মূল মাপকাঠি হবে বিশ্রামের মান। কোরালা জেপি জানিয়েছে, ‘ম্যাটরেস বাই কোরালা’ তাদের কোরালা ম্যাট্রেসকে ঘিরে আয়োজিত একটি নতুন ধরনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক অনুষ্ঠান। আয়োজনটির পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ইভেন্ট নির্মাতা আফ্রোম্যান্স। সূত্র: কোরালা জেপি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।