যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে ‘বর্ধিত পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ (এক্সটেন্ডেড নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স) জোরদার করার সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন। বেইজিং কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও টোকিওর এই নীতি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার এবং বিশ্বজুড়ে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বেইজিংয়ে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এই বিষয়ে মুখ খোলেন। তিনি সাফ জানান, ‘বর্ধিত প্রতিরোধ’ মূলত শীতল যুদ্ধের সময়কার একটি পুরোনো ও বিপজ্জনক ধারণা। কিছু দেশ নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এই পারমাণবিক সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে চরম অস্থিরতা তৈরি করছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও টোকিওর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের ‘বর্ধিত প্রতিরোধ’ সংলাপ এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্ত করে নিউক্লিয়ার কনসালটেশন গ্রুপের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানায়, জাপানকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে তারা নিজেদের সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা, এমনকি প্রয়োজন হলে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। মূলত আমেরিকার এই প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতির পরই কড়া প্রতিক্রিয়া দেখালো চীন। মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, "পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) পর্যালোচনা সম্মেলনগুলোতে বিশ্বের বহু দেশ এই ধরনের ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেছে। অথচ কিছু দেশ পারমাণবিক বলয় তৈরি করে বিশ্বে নতুন করে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা শুরু করতে চাইছে।" এ সময় জাপানের দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করে চীনা মুখপাত্র বলেন, টোকিও একদিকে মুখে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত শান্তিময় বিশ্বের কথা বলে, অন্যদিকে গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। জাপানকে এনপিটি-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "জাপানের উচিত ‘তিনটি অ-পারমাণবিক নীতি’ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করা এবং কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা না করা।" উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র হিসেবে কাজ করছে। তবে টোকিওর যেকোনো ধরনের পারমাণবিক বা সামরিক অগ্রগতিকে বেইজিং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি বড় হুমকি হিসেবে দেখে থাকে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় মুদ্রা ইয়েনের ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদের হার বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করেছে। মঙ্গলবার ব্যাংক অব জাপান এই সিদ্ধান্ত নেয়, যা ১৯৯৫ সালের পর দেশটির সবচেয়ে উচ্চ সুদের হার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া আর্থিক নীতি স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হলো। এর আগে গত ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়িয়ে ০.৭৫ শতাংশ করা হয়েছিল। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানো হয়, যা পরিচালনা পর্ষদের ৭–১ ভোটে অনুমোদিত হয়। একমাত্র ভিন্নমত দেন বোর্ড সদস্য তোইচিরো আসাদা, যিনি বর্তমান হার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দেন। সুদের হার বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং ইয়েনের দুর্বলতা উল্লেখ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জাপানের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল ইয়েন আমদানিকৃত পণ্যের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ০.৪৬ শতাংশ বেড়ে যায়। পাশাপাশি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েন সামান্য শক্তিশালী হয়ে ১৬০.২২ পর্যায়ে পৌঁছায়। দেশটির ১০ বছরের সরকারি বন্ডের ইল্ডও ৩ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ২.৬১৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ব্যাংক অব জাপান জানিয়েছে, তারা প্রতি প্রান্তিকে ২০০ বিলিয়ন ইয়েন করে সরকারি বন্ড কেনা কমাবে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে ২ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বন্ড কেনা বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সরকার ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে ভোক্তা মুদ্রাস্ফীতি এখনো ২ শতাংশের নিচে রয়েছে। তবে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব দ্রুতই উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে পণ্য ও সেবার দামে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। মে মাসে জাপানের উৎপাদক মূল্য সূচক ৬.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান বাজার কৌশলবিদ তাই হুই বলেন, সুদের হার বৃদ্ধি বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও নীতি প্রণয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে ইয়েনের ধারাবাহিক দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণে বারবার বাজারে হস্তক্ষেপ করেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি বলে মনে করছেন টোকিওভিত্তিক বিশ্লেষকরা। মনেক্স গ্রুপের বিশেষজ্ঞ জেসপার কোল বলেন, নীতিগত পরিবর্তন ছাড়া কেবল বাজারে হস্তক্ষেপ কার্যকর নয়। মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামাল দিতে জাপান সরকার ইতোমধ্যে ৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্পূরক বাজেট অনুমোদন করেছে। যদিও কর সংস্কার ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমে ১.৪ শতাংশে নেমেছে, তা মূলত সাময়িক প্রভাব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার বৃদ্ধি জাপানের অর্থনীতিতে মূল্য স্থিতিশীলতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও ইয়েনের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক পরিবারের ন্যায়বিচারের সংগ্রাম নতুন মোড় নিয়েছে জাপানে। হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করা হিরোমু সাকাহারার মৃত্যুর ১৫ বছর পর তার মামলার পুনর্বিচারের অনুমতি দিয়েছে দেশটির আদালত। এই সিদ্ধান্তকে যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় মরণোত্তর পুনর্বিচারের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আদালতের এই রায় আসার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন সাকাহারা। ২০১১ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। ফলে নিজের নির্দোষ প্রমাণের সম্ভাবনা সামনে এসেও তা দেখে যেতে পারেননি তিনি। জাপানের গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৪ সালে জাপানের শিগা প্রিফেকচারের হিনো শহরের একটি মদের দোকানের ব্যবস্থাপককে হত্যা ও ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় হিরোমু সাকাহারাকে। তদন্তের সময় পুলিশ তাকে শারীরিক নির্যাতন এবং পরিবারের ক্ষতির হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে তার পরিবার। সাকাহারার ছেলে কোজি সাকাহারা, বর্তমানে যার বয়স ৬৪ বছর, জানান, তার বাবা শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এরপর জীবনের শেষ ২৪ বছর কারাগারেই কাটাতে হয় তাকে। মামলার রায় ঘোষণার বহু বছর পরও সাকাহারার পরিবার সামাজিকভাবে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের অনেকেই ‘খুনির পরিবার’ পরিচয়ে অপমানের শিকার হন। কোজি সাকাহারার ভাষ্য অনুযায়ী, তার মাকেও দীর্ঘদিন ফোন করে কটূক্তি করা হতো। সমাজের চোখে অপরাধীর পরিবারের তকমা বহন করতে হয়েছে তাদের। তবে বাবার মৃত্যুর পরও হাল ছাড়েননি কোজি। আইনজীবীদের সহায়তায় তিনি মামলাটি পুনরায় খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে পুলিশের সংরক্ষিত একটি পুরোনো নেগেটিভ ফিল্ম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে আসে। আইনজীবীরা দাবি করেন, ওই আলোকচিত্রের প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তদন্তের সময় পুলিশই সাকাহারাকে মৃতদেহের অবস্থান সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছিল। অর্থাৎ তদন্তে ব্যবহৃত কিছু তথ্যকে স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকারোক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে সেগুলো পুলিশি প্রভাবের ফল ছিল বলে সন্দেহের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। এই নতুন প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত মামলাটির পুনর্বিচারের নির্দেশ দিয়েছে। যদিও পুনর্বিচারের চূড়ান্ত ফলাফল এখনো আসেনি, তবুও আদালতের এই সিদ্ধান্তকে সাকাহারা পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি আবারও জাপানের বিচারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশটিতে ৯৯ শতাংশেরও বেশি ফৌজদারি মামলায় আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, জাপানে সন্দেহভাজনদের অনেক সময় আইনজীবীর উপস্থিতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সমালোচকেরা এই পদ্ধতিকে ‘জিম্মি বিচার’ বা ‘হোস্টেজ জাস্টিস’ বলে আখ্যায়িত করেন। সাকাহারার মামলাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন জাপানে ভুল রায় সংশোধনের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। দেশটির পার্লামেন্টে বর্তমানে একটি সংস্কার বিল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যার মাধ্যমে পুনর্বিচারের অনুমতি পাওয়ার পর প্রসিকিউটরদের ধারাবাহিক আপিল করে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ সীমিত করা হতে পারে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই সংস্কার উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভুল রায়ের কারণে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে বিচার মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, আপিলের সুযোগ সীমিত করা হলে কিছু ক্ষেত্রে প্রমাণ যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। টোকিওর মেইজি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে ভুল রায় সংশোধনের জন্য প্রায়ই কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়। এতে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি নন, তার পুরো পরিবার সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের মতে, বিচার ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্য উদ্ঘাটন, শুধুমাত্র মামলায় জয়লাভ নয়। আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কোজি সাকাহারা। তিনি বলেন, “এই রায় যদি বাবা জীবিত অবস্থায় পেতেন, তাহলে হয়তো তার জীবনের শেষ সময়টা অন্যরকম হতো। আমি চাই না ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো এত দীর্ঘ সময় ধরে ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হোক।” চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াই এখন শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি জাপানের বিচারব্যবস্থার জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং ভুল রায় সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
জাপানের কিয়োটো প্রিফেকচারের ইয়াওয়াটা সিটির ৩৫ বছর বয়সী মেয়র শোকো কাওয়াতা সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৩ সালে নির্বাচিত এই মেয়রের সিদ্ধান্ত দেশটির স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাওয়াতা জানিয়েছেন, তিনি আনুমানিক সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তার প্রথম সন্তানের জন্ম দেবেন। এ উপলক্ষে সন্তান জন্মের আগে ও পরে মোট ১৬ সপ্তাহ, অর্থাৎ ৮ সপ্তাহ করে ছুটিতে থাকবেন। নির্বাচিত কোনো মেয়রের ক্ষেত্রে এ ধরনের দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার ঘটনা জাপানে এটিই প্রথম বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাপানের বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান থাকলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নিয়ম নেই। ফলে বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ধূসর পরিসরে অবস্থান করছে। কাওয়াতা জানিয়েছেন, তার অনুপস্থিতিতে সিটি প্রশাসনের দায়িত্ব সামলাতে একজন ডেপুটি নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি আংশিকভাবে ই-মেইল ব্যবহারের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখবেন বলেও উল্লেখ করেছেন। তার এই সিদ্ধান্ত জাপানে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য, লিঙ্গসমতা এবং জন্মহার সংকট নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাপানের কর্মসংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কাঠামো এখনো অনেকাংশে পুরুষকেন্দ্রিক। পরিবর্তনের গতি ধীর হওয়ায় নারীদের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন ও মাতৃত্বকালীন সহায়তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। জাপানে দীর্ঘদিন ধরে কম জন্মহার, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং নারীদের ক্যারিয়ার ও পারিবারিক দায়িত্বের দ্বৈত চাপে জনসংখ্যা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আট দশক ধরে জাপানের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে তার শান্তিবাদী সংবিধান। বিশেষ করে সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ, যা দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধক্ষমতা সম্পন্ন সামরিক বাহিনী গঠন থেকে বিরত রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ডানপন্থী শক্তির উত্থানের ফলে সেই ঐতিহাসিক অবস্থান এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন শিবির সংবিধান সংশোধনের পক্ষে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর তার সমর্থকরা এখন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষেও দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে বহুদিন ধরে আলোচিত সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এবার বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের রক্ষণশীল রাজনীতিকরা দীর্ঘদিন ধরেই সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন, জনমত এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে তারা সফল হতে পারেননি। এবার সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। রেইতাকু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক এবং রক্ষণশীল চিন্তাকেন্দ্র জাপান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ফান্ডামেন্টালসের জ্যেষ্ঠ সদস্য সুতোমু নিশিওকা বলেন, “সংবিধান সংশোধনের পক্ষে আবারও গতি তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা।” জাপানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন জোটে থাকা শান্তিবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত কোমেইতো পার্টির প্রভাব কমেছে। তাদের জায়গায় উঠে এসেছে জাপান ইনোভেশন পার্টি, যারা জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানের সমর্থক। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও জাপানের রাজনৈতিক আলোচনাকে নতুন দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়গুলো জাপানি জনগণের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। টোকিওর ব্যবসায়ী কেন কাতো, যিনি সংবিধান সংশোধনের সমর্থক, বলেন, “আগে মানুষ মনে করত সামরিক বাহিনী থাকলে সংঘাত বাড়বে। এখন অনেকে মনে করেন, আত্মরক্ষার যথেষ্ট সক্ষমতা না থাকলে অন্যরা সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। তাই প্রতিরোধক্ষমতা জরুরি।” যদিও বাস্তবে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী বা সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও সুসজ্জিত বাহিনীর একটি। কয়েক দশক ধরেই তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে সংবিধানের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই বাহিনীর অস্তিত্ব বৈধ করা হয়েছে। রক্ষণশীলদের দাবি, বাস্তবতা ও আইনি অবস্থানের মধ্যে এই বৈপরীত্য দূর করতে হবে। নিশিওকার মতে, বর্তমান সংবিধান আজকের বাস্তবতা কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই সংশোধনের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। সংসদের নিম্নকক্ষে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এবং ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) আইনপ্রণেতা কেইজি ফুরুয়া মনে করেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখন তাদের হাতে রয়েছে। সম্প্রতি জাপান ফরওয়ার্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন নিয়ে গণভোট আয়োজনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তার হিসাব অনুযায়ী, এলডিপি, জোটসঙ্গী দল, ছোট ডানপন্থী দল এবং কয়েকজন স্বতন্ত্র সদস্যের সমর্থন মিলিয়ে সংসদে সংশোধনী উত্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটসংখ্যা অর্জন করা সম্ভব। ফুরুয়ার মতে, এতদিন ধরে এই প্রশ্নে জনগণের মতামত নেওয়া না হওয়াটা সংসদের ব্যর্থতা। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ সাধারণ নাগরিকদের প্রাপ্য। তবে সংশোধনের পথ যে পুরোপুরি মসৃণ, তা নয়। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দীর্ঘ সময় ধরে সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করেও সফল হননি। তার উত্তরসূরি ফুমিও কিশিদাও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেননি। টোকিওর সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক তাদাশি আন্নো মনে করেন, বর্তমান উদ্দীপনার মধ্যে কিছুটা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কাজ করছে। তার ভাষায়, “তাকাইচি এখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু ইরান সংকট, জাপানে মূল্যস্ফীতি, ইয়েনের অবমূল্যায়ন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপ ভবিষ্যতে সেই সমর্থন কমিয়ে দিতে পারে।” আন্নো নিজেও সংবিধান সংশোধনের পক্ষে, তবে এলডিপির প্রস্তাবিত পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তিনি সংবিধানের ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে বিবাহকে একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তার মতে, এই ধরনের পুরোনো ভাষা আধুনিক সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। তবে ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ নিয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ২০১২ সালে এলডিপি যে খসড়া সংবিধান প্রস্তাব করেছিল, তা অত্যন্ত রক্ষণশীল ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, জাপানি জনগণের বড় অংশ হয়তো এমন পরিবর্তন সমর্থন করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর ১৯৪৭ সালে মিত্রবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রণীত জাপানের সংবিধান দেশটির শান্তিবাদী রাষ্ট্রপরিচয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। সেই সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ যুদ্ধকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ফলে সেই ঐতিহাসিক অনুচ্ছেদ এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। ফলে জাপান কি সত্যিই তার যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী অবস্থান থেকে সরে আসতে যাচ্ছে, নাকি সীমিত কিছু পরিবর্তনের মধ্যেই নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে এশিয়ার দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে জাপান। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি সহায়তায় ১০ বিলিয়ন ডলার তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি। বুধবার এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এশিয়ার দেশগুলো পারস্পরিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একটি অঞ্চলের সংকট অন্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। জাপান সরকারের এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সংগ্রহে সহায়তা করা, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তুলতে সহায়তা করা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও অবরোধের কারণে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অর্থায়ন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্যদের প্রায় এক বছরের অপরিশোধিত তেল আমদানির সমপরিমাণ ব্যয় মেটাতে সক্ষম। এ তহবিল বিভিন্ন উৎস থেকে আসবে, যার মধ্যে রয়েছে জাপানের রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। বাংলাদেশসহ ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়া এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নেতারা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে জাপান সরকার আশ্বস্ত করেছে, এই সহায়তা কর্মসূচির ফলে তাদের নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। দেশটির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহারের প্রস্তুতিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এশিয়ার জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিগুলো বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে জাপানের এই সহায়তা উদ্যোগ আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তজনা নিরসনে একজোট হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। টোকিও’র আকাসাকা প্রাসাদে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই বিশ্বনেতা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাপান সফররত ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জানান, ফ্রান্স ও জাপান উভয় রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তিনি বলেন, আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য হলো শান্তি ফিরিয়ে আনা। আমরা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পক্ষে জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির নাজুকতা তুলে ধরে বলেন, সংঘাতের দ্রুত প্রশমন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুই দেশ একমত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের এই কঠিন আন্তর্জাতিক পরিবেশে ফ্রান্স ও জাপানের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা গভীর হওয়া অত্যন্ত অর্থবহ। দুই নেতাই মনে করেন, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা বজায় রাখা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
জাপানের বৃহত্তম দ্বীপ হনশু-এর পূর্ব উপকূলে ৬ দশমিক ২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে এই কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্প সংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করেছে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস। সংস্থাটির বিবৃতিতে জানানো হয়, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর আগের দিন বুধবার রাতেও একই অঞ্চলে ৪ দশমিক ২ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। সেই কম্পনের কেন্দ্র ছিল প্রায় ২০ কিলোমিটার গভীরে। একদিনের ব্যবধানে দুই দফা ভূমিকম্পে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সূত্র: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, জাপানের জাহাজসহ অন্যান্য নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ চলাচলে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তেহরান। জাপানের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা প্রণালিটি বন্ধ করিনি, এটি উন্মুক্ত রয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়; বরং সংঘাতের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী অবসান চায়। আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না করলেও যেসব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় জড়িত, তাদের জাহাজের ওপর নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে অন্যান্য দেশের জাহাজ চলাচলে সহায়তার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে তেহরান। তিনি আরও জানান, জাপানের মতো দেশগুলো যদি ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে, তাহলে তাদের জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব। উল্লেখ্য, জাপানের অপরিশোধিত তেল আমদানির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং এর অধিকাংশ পরিবহন হয় এই প্রণালি দিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের এ অবস্থান আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে, যদিও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অস্থির। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুন্দর পিচাইয়ের বক্তব্য চলাকালীন ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ ও অনুষ্ঠান বর্জনের (ওয়াকআউট) ঘটনা ঘটেছে। রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৫তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সুন্দর পিচাই প্রধান বক্তা হিসেবে মঞ্চে ওঠার পরপরই এই ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, সুন্দর পিচাই বক্তব্য শুরু করার মুহূর্তেই সমাবর্তনস্থলে উপস্থিত ১০০ জনেরও বেশি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী তাদের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। এ সময় তারা "ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন" (ফিলিস্তিনের মুক্তি চাই) বলে উচ্চকণ্ঠে স্লোগান দিতে দিতে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। কট্টর বামপন্থী ছাত্র সংগঠন 'স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন' এবং 'নো টেক ফর অ্যাপার্থাইড'-এর যৌথ আহ্বানে এই প্রতিবাদের আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে ইসরায়েল সরকারের সাথে গুগলের ১.২ বিলিয়ন ডলারের ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি 'প্রজেক্ট নিম্বাস'-কে দায়ী করা হচ্ছে। আমাজনের সাথে যৌথভাবে পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে গুগল ইসরায়েল সরকারকে ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, গুগলের এই প্রযুক্তি ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি এবং ইসরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও গুগল বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, এটি কেবল সরকারি বেসামরিক কাজের জন্য একটি ক্লাউড সেবা। উল্লেখ্য, সুন্দর পিচাই নিজে ১৯৯৫ সালে এই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই মেটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসে তাকে এমন নজিরবিহীন প্রতিবাদের মুখে পড়তে হলো। এর আগে ২০২৪ সালেও এই প্রজেক্ট নিম্বাসের বিরুদ্ধে গুগলের ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্ক অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবস্থান ধর্মঘট করলে গুগল কয়েক ডজন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছিল। চলতি বছর আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের লক্ষ্য করে শিক্ষার্থীদের এমন ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনা নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগেই অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গুগলের সাবেক সিইও এরিক শ্মিড বক্তব্য দিতে গেলে এআই প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে শিক্ষার্থীরা তাকে ধুয়ে দেয়। তবে স্ট্যানফোর্ডের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এই তুমুল হট্টগোল ও কক্ষ ত্যাগের মাঝেও সুন্দর পিচাই তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যান, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ভূ-রাজনীতির চেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষার্থীদের আশাবাদী থাকার পরামর্শই বেশি প্রাধান্য পায়।