রাশিয়ার ভূখণ্ডের অনেক গভীরে ঢুকে সাইবেরিয়ার তিউমেন তেল শোধনাগারে এক ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। শনিবার দিনের বেলার এই হামলাটিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে কিয়েভের সবচেয়ে গভীর ও ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে ইউক্রেন যে কৌশল হাতে নিয়েছে, এই হামলা তারই একটি বড় অংশ। স্থানীয়দের মতে, শনিবার দুপুরে শোধনাগারটিতে অন্তত দুটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপরই সেখান থেকে কর্মীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয় এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে অন্তত দশটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ মাইল দূরে অবস্থিত পশ্চিম সাইবেরিয়ার এই বৃহত্তম তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থেকে কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শনিবার বিকেলে এক্সে দেওয়া এক বার্তায় একে একটি 'কার্যকরী হামলা' হিসেবে উল্লেখ করে জানান, কিয়েভের উন্নত ড্রোনগুলো এখন রাশিয়ার ১ হাজার ৮০০ মাইল ভেতর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এক উপদেষ্টাও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, রাশিয়ায় এখন আর কোনো নিরাপদ অঞ্চল অবশিষ্ট থাকবে না। তিউমেন মূলত রাশিয়ার অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল এবং এই শোধনাগারটি দেশের সবচেয়ে আধুনিক কেন্দ্রগুলোর একটি। এখান থেকে বছরে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল (দৈনিক সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল) এবং বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও গ্যাসোলিন উৎপাদিত হয়। এর মাত্র দুই দিন আগেই মস্কোর একটি তেল শোধনাগারে কিয়েভের ড্রোন হামলায় সেখানকার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ওই কেন্দ্রটি মস্কোর জ্বালানি বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করত। এছাড়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি 'দ্বীপে' পরিণত করার লক্ষ্যে সেখানেও রাতভর হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। অন্যদিকে, ইউক্রেনের এই আগ্রাসনের জবাবে নিজেদের পালটা হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া। শনিবার জাপোরিঝিয়ায় রাশিয়ার গ্লাইড-বোমা হামলায় অন্তত পাঁচজন ইউক্রেনীয় নিহত এবং আরও দশজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় খারকিভের একটি আবাসিক ভবনে হামলায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুসহ পুরো ইউক্রেন জুড়ে অন্তত আটজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৫৫ জন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ধ্বংসস্তূপ থেকে হতাহতদের উদ্ধারের মর্মান্তিক চিত্রগুলো যুদ্ধের ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন এই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, তখন দুই দেশের মধ্যকার শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া কার্যত থমকে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ এই সংঘাত অবসানে ইউরোপীয় নেতারা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার বিষয়ে এখনো দ্বিধাবিভক্ত। ইরানে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার উদ্যোগ বর্তমানে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জও ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইউরোপীয়রা এই সংঘাতে সরাসরি কোনো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে না।
ইউক্রেন রাশিয়ার রাজধানী মস্কোকে লক্ষ্য করে গত দুই বছরে সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা টাস। হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংসাবশেষ পড়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন বলেন, রাতভর অন্তত ১৯৪টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে, যেগুলো রাজধানীকে লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হওয়া হামলার তুলনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি, যেখানে সাধারণত ড্রোনের সংখ্যা কয়েক ডজনের মধ্যে সীমিত থাকত। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৫৫৫টি ড্রোন বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিহত করা হয়েছে, যার মধ্যে কিছু ড্রোন আজভ সাগরের ওপরেও ধ্বংস করা হয়। হামলার পর মস্কোর সব প্রধান বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয় বলে জানিয়েছে রুশ বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, ইউক্রেনের হামলার লক্ষ্য ছিল জ্বালানি অবকাঠামো। এর মধ্যে মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কাপোতনিয়া এলাকায় অবস্থিত একটি তেল শোধনাগারও রয়েছে, যেটি মঙ্গলবারও হামলার শিকার হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ভিডিওতে দেখা যায়, ড্রোন আসার সময় আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে এবং একটি বড় বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া মস্কোর সাদোভোদ ট্রেড সেন্টারের কাছে বড় ধরনের ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখা গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম। একটি আবাসিক ভবন ও একটি ফিটনেস সেন্টারেও ধ্বংসাবশেষ পড়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। রুশ ও ইউক্রেনীয় সূত্রের বরাত অনুযায়ী, ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলের একটি তেল ডিপোতেও হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া পাল্টা হামলায় সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৩৯টি ড্রোন ব্যবহার করেছে। এতে কিয়েভ ও পোলতাভা অঞ্চলের কয়েকটি স্থানে বাড়ি, জ্বালানি অবকাঠামো ও শিল্প স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার হামলার জবাবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি “সম্পূর্ণ ন্যায্য প্রতিক্রিয়া”। তিনি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলা রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে কার্যকর প্রভাব ফেলছে। ন্যাটো ও জি-৭ বৈঠকের সময় এই হামলা সংঘটিত হয়। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে জানান, ইউক্রেনকে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের এই ধরনের হামলা রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ, যা যুদ্ধের গতিপথে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
সাড়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এবার দৃশ্যপট পরিবর্তনের জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের টানা ও গভীর হামলায় রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ এস-৩০০ মিসাইলের মজুতে চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকটের সুযোগ নিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন আরও সহজে রাশিয়ার অভ্যন্তরে সফল আক্রমণ চালাতে সক্ষম হচ্ছে বলে দাবি করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। ইউক্রেনের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে তৈরি সোভিয়েত আমলের এস-৩০০ মিসাইল রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। যুদ্ধক্ষেত্রে বর্তমানে রাশিয়া এস-৩৫০, এস-৪০০ এবং প্যান্টসির-এস১-এর মতো অত্যাধুনিক ব্যবস্থা ব্যবহার করলেও এস-৩০০ মিসাইলের ওপর তাদের নির্ভরতা একেবারেই কমেনি। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের ২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই সময়ে রাশিয়ার হাতে অন্তত ৪০০টির বেশি এস-৩০০ ও এস-৪০০ ইন্টারসেপ্টর ছিল। তবে বর্তমানে এই মজুত উদ্বেগজনক হারে কমে আসছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, রাশিয়া সম্প্রতি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহৃত এস-৩০০ মিসাইলগুলোকে ইউক্রেনে আক্রমণ চালানোর জন্য ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। পাশাপাশি, ইউক্রেনের জেট ইঞ্জিনযুক্ত অত্যাধুনিক ও দ্রুতগতির ড্রোনগুলোকে ঠেকাতেও রাশিয়াকে তাদের এই মূল্যবান মিসাইলগুলোর বিশাল একটি অংশ খরচ করতে হচ্ছে। রাশিয়ার এই আকাশ প্রতিরক্ষা সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে ইউক্রেন এখন সরাসরি তাদের মিসাইল সাইটগুলোতে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করছে। ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ রব লি জানান, গত কয়েক মাসে ক্রিমিয়া, লুহানস্কসহ বিভিন্ন অধিকৃত অঞ্চলে রাশিয়ার বিপুল সংখ্যক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে কিয়েভ। পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া এই মিসাইলগুলোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, বিশেষ করে গাইডেন্স সিকার এবং কন্ট্রোল মডিউলের তীব্র সংকটে পড়েছে। চীন বা পশ্চিমা বাজার থেকে এসব যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে না পারায় মস্কোর পক্ষে দ্রুত এই বিপুল ঘাটতি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (জিইউআর) ভারপ্রাপ্ত প্রধান ওলেহ চোরনি সতর্ক করে বলেছেন যে, ড্রোন হামলা মোকাবিলার জন্য রাশিয়ার হাতে এখনও বেশ কিছু অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রয়েছে। অন্যদিকে, এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইউক্রেনও নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে রুশ ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিহত করতে সক্ষম মার্কিন প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টরের তীব্র অভাব কিয়েভকে বেশ চিন্তায় ফেলেছে। নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাশিয়া যেখানে বছরে ৬০০ থেকে ৮০০ ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে, সেখানে বিশ্বব্যাপী প্যাক-৩ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন গত বছর মাত্র ৬২০টি ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ করেছে। তারপরও রাশিয়ার এই মিসাইল ঘাটতির খবর যুদ্ধক্ষেত্রে কিয়েভের অবস্থানকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করেছে। সম্প্রতি ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে এই ধরনের জোরালো হামলাই মূলত যুদ্ধ বন্ধে মস্কোকে বাধ্য করার অন্যতম প্রধান উপায়।
রাতের আঁধারে ইউক্রেনের ভয়াবহ ড্রোন হামলায় রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর একটি বড় তেল শোধনাগার এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদার অঞ্চলের একটি জ্বালানি তেলের ডিপোতে আগুন ধরে গেছে। এই হামলার ফলে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, মধ্য মস্কো থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত গ্যাজপ্রম নেফ্ট পরিচালিত একটি তেল শোধনাগারে অন্তত একটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। তাঁর মতে, ইউক্রেন রাতারাতি রুশ রাজধানীর দিকে প্রায় ৬০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন, যেখানে দেখা যায় ড্রোনটি ওই শোধনাগারে আঘাত হানার সাথে সাথেই সেটি বিশাল অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হচ্ছে। তিনি এই হামলাকে ইউক্রেনে রাশিয়ার অব্যাহত আক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী আগ্রাসনের একটি 'ন্যায্য জবাব' হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি লেখেন, "মস্কো অঞ্চল আজ ইউক্রেনের দূরপাল্লার সক্ষমতার আঁচ টের পেয়েছে।" মেয়র সোবিয়ানিন জানান, এই ড্রোন হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। তবে এই ঘটনার ফলে ওই তেল শোধনাগারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। উল্লেখ্য, পুরো মস্কোর প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সরবরাহ করে এই শোধনাগারটি। পরবর্তীতে জরুরি সেবার কর্মকর্তারা জানান, গ্যাজপ্রম নেফ্ট স্থাপনার আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে হামলার পর ওই এলাকায় যান চলাচল সীমিত করে দেন পরিবহন কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, ক্রাসনোদার অঞ্চলের স্থানীয় ক্রাইসিস রেসপন্স সেন্টার জানিয়েছে যে, একটি ড্রোনের আছড়ে পড়ার ফলে পোলতাভস্কায়া তেল ডিপোতে আগুন ধরে যায়। এই ডিপোটি মূলত ওই অঞ্চলের বিভিন্ন গ্যাস স্টেশনে জ্বালানি সরবরাহ করে থাকে। প্রায় সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর সেখানকার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকালের মধ্যে ১৪টি অঞ্চল এবং সংযুক্ত ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের নিক্ষেপ করা অন্তত ১৭২টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। চলতি বসন্তকাল থেকেই ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার এবং সরবরাহ লাইনগুলোর ওপর তাদের আক্রমণ ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের ক্রমবর্ধমান দাম থেকে ক্রেমলিন যেন কোনো অতিরিক্ত মুনাফা বা সুবিধা নিতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই এই কৌশল বেছে নিয়েছে কিয়েভ। অব্যাহত এই ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার পেট্রোলিয়াম উৎপাদনের বড় অংশের জন্য দায়ী স্থাপনাগুলোতে উৎপাদন হয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, নয়তো উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। রাশিয়ান শোধনাগারগুলোতে হামলার পাশাপাশি ইউক্রেন সংযুক্ত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্রাকগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যার ফলে ওই অঞ্চলে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ময়দানে এবার দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করেছে। সীমান্ত থেকে ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। রবিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের বিশেষ বাহিনী রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভল অঞ্চলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেলের মজুত বা রিজার্ভ স্থাপনা এবং তুলা অঞ্চলের 'আজোট' রাসায়নিক কারখানায় সফল ও সুনির্দিষ্ট আঘাত হেনেছে। উল্লেখ্য, এই রাসায়নিক কারখানাটি রুশ সামরিক বাহিনীর জন্য গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই আকস্মিক ও দূরপাল্লার জোরালো হামলায় রীতিমতো কেঁপে উঠেছে রাশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই নজিরবিহীন হামলার জেরে রাশিয়ার অন্তত ২৮টি অঞ্চলে জরুরি বিমান হামলার সতর্কতা (এয়ার রেইড অ্যালার্ট) জারি করতে বাধ্য হয় পুতিন প্রশাসন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ছয়টি বিমানবন্দরে উড়ান চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। মূল ভূখণ্ডের পাশাপাশি, ইউক্রেনের ভেতরে রুশ বাহিনীর দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে থাকা সামরিক লজিস্টিকস ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতেও সফল আঘাত হেনেছে কিয়েভ। ইয়ারোস্লাভল ও তুলা অঞ্চলের স্থানীয় রুশ গভর্নররা হামলার বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন, ড্রোনের আঘাতে শিল্পাঞ্চলে আগুন ধরে যায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি পরিষেবা দল কাজ করছে। এই পরিকল্পিত সামরিক অভিযানকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের কার্যকর 'দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞা' বা 'লং-রেঞ্জ স্যাংশনস'-এর অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, যুদ্ধ বন্ধের জন্য কিয়েভের পক্ষ থেকে বারবার আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও মস্কো তা বারবার প্রত্যাখ্যান করে উল্টো আগ্রাসন বাড়ানোর পথই বেছে নিয়েছে। তারই সমুচিত জবাব হিসেবে এই দূরপাল্লার আঘাত হানা হচ্ছে। জেলেনস্কি তার বার্তায় দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "যুদ্ধ এখন সেখানেই ফিরে যাচ্ছে, যেখান থেকে এর শুরু হয়েছিল।" যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দেওয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনের শান্তির প্রতি অবিচল অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। শুক্রবার ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের এক বৈঠকে আগামী সপ্তাহে ইউক্রেন এবং মলদোভার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। মলদোভাকেও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বলয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছিল। বিশ্বের বৃহত্তম এই ট্রেডিং ব্লকে যুক্ত হওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই আলোচনাটি আগামী সোমবার লুক্সেমবার্গে শুরু হবে। ইউক্রেন মনে করে, রাশিয়ার সাথে চলমান সংঘাতের অবসানের পর একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য ইইউ সদস্যপদ তাদের জন্য একটি বড় 'নিরাপত্তা গ্যারান্টি' হিসেবে কাজ করবে। ন্যাটো সদস্যপদ ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় হতে পারলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আপাতত তা সম্ভব নয়। তাছাড়া, যুদ্ধ চলমান অবস্থায় ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে অন্যান্য মিত্রদেরও ঘোর আপত্তি রয়েছে। রাশিয়া এর তীব্র বিরোধী এবং ২০২২ সালে তাদের পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন চালানোর পেছনে ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের চেষ্টাকেই অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিল মস্কো। তবে, কিয়েভের ইইউ সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে রাশিয়া সরাসরি কোনো আপত্তি জানায়নি। ইইউ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এবং কমিশন প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এক যৌথ বিবৃতিতে এই পদক্ষেপকে ইউরোপজুড়ে "শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি" জোরদার করার একটি কৌশলগত পছন্দ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা উভয় দেশের দৃঢ়তা, সাহস ও পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের মুখেও সংস্কারমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার ভূয়সী প্রশংসা করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্ত হতে ইচ্ছুক দেশগুলোকে কৃষি থেকে শুরু করে বাণিজ্য পর্যন্ত মোট ৩৫টি নীতিগত ক্ষেত্রে (যাকে 'চ্যাপ্টার' বলা হয়) দীর্ঘ আলোচনা সম্পন্ন করতে হয়, যা অনেক সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। সোমবারের আন্তঃসরকারি সম্মেলনে এই ব্লকের প্রতিষ্ঠা ও মূল নীতি-সম্পর্কিত প্রধান চ্যাপ্টার বা 'ক্লাস্টার'গুলোর দ্বার উন্মোচন করা হবে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার আগ্রাসনের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউতে যোগদানের আবেদন করেছিল। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ইউক্রেন বেশ কিছু সংস্কার কাজ এগিয়ে নিতে সক্ষম হওয়ায় ইইউ কমিশন দেশটির প্রশংসা করেছে, তবে দুর্নীতি ও বিচার ব্যবস্থার মান নিয়ে এখনো কিছু গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। এদিকে, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ সম্প্রতি তার ইইউ মিত্রদের প্রতি ইউক্রেনকে 'অ্যাসোসিয়েট মেম্বারশিপ' বা সহযোগী সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে করে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের অবসানে একটি নতুন গতি আনা যায়। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসও পূর্ণ সদস্যপদের বদলে দ্রুত ইউক্রেনকে ব্লকের আওতায় আনার বিকল্প পথের প্রস্তাব দিয়েছে। মার্জের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ইউক্রেন ভোটাধিকার ছাড়াই ইইউর বিভিন্ন বৈঠক, ইউরোপীয় কমিশন এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ করতে পারবে। বর্তমানে আমেরিকার মনোযোগ ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের দিকে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সরাসরি নিজস্ব আলোচনা শুরুর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। ইইউর নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো নতুন নীতিগত চ্যাপ্টার খোলা ও বন্ধ করার ক্ষেত্রে ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সর্বসম্মত সম্মতি প্রয়োজন। উল্লেখযোগ্যভাবে, হাঙ্গেরি দীর্ঘদিন ধরে এই আলোচনার পথ আটকে রেখেছিল, তবে বুদাপেস্টে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তাদের সেই কঠোর অবস্থানে নমনীয়তা এসেছে, যা ইউক্রেন ও মলদোভার জন্য এই ঐতিহাসিক আলোচনার পথ সুগম করেছে।
রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেন থেকে নিরাপত্তার কারণে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেওয়া শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। কিয়েভ সরকার বলছে, আদালতের সিদ্ধান্ত ও দত্তক প্রক্রিয়ার কারণে এসব শিশুদের দেশে ফেরানোর প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে থাকা শিশু এবং এতিমসহ প্রায় ৪ হাজার ৮০০ শিশুকে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ইতালি ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে অন্তত কয়েক ডজন শিশুর ইউক্রেনে প্রত্যাবর্তন ইতালির আদালতের রায়ের কারণে আটকে আছে বলে দাবি কিয়েভের। এর মধ্যে কিছু শিশু ইতালিতে দত্তক প্রক্রিয়ার আওতায় চলে গেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে এপ্রিল মাসে, যখন ইউক্রেন জানায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর ‘সাশা’কে ইতালির একটি পরিবার আইনগতভাবে দত্তক নিয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, ওই কিশোরের মা এখনও তাকে দেশে ফিরিয়ে নিতে চান। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ধীরে ধীরে কিছু এলাকায় নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে এবং শিশুদের দেশে ফেরানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, বিদেশে থাকা শিশুদের স্থায়ীভাবে অন্য দেশে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কিয়েভ। ইউক্রেনের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিনিধি দিমিত্রো লুবিনেতস অভিযোগ করেছেন, ইতালীয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সহযোগিতা করছে না এবং শিশুদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ইউক্রেনকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, এটি শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি স্থানান্তরের মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে। অন্যদিকে ইতালি বলছে, দেশটির বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং আদালতের সিদ্ধান্তে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। ইতালির আইন অনুযায়ী, অভিভাবকহীন নাবালকদের সুরক্ষায় কঠোর বিধান রয়েছে, যার ফলে আদালতের অনুমতি ছাড়া তাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। ইতালিতে আশ্রয় পাওয়া শিশুদের অনেককে শুরুতে যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে সুরক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য নতুন আইনি অভিভাবক নিয়োগ করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় তত্ত্বাবধানের পরিবর্তে ইতালীয় তত্ত্বাবধান কার্যকর হয়। কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, কিছু শিশু ধীরে ধীরে জন্মভূমির ভাষা ও পরিচয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ ইতালিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করলে শিশুদের স্থায়ীভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য জনমিতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে কিছু ইতালীয় অভিভাবক পরিবার বলছে, তারা শিশুদের নিরাপদ জীবন ও শিক্ষা নিশ্চিত করছে এবং যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফেরত না নেওয়াই যুক্তিযুক্ত। বর্তমানে ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা ইউক্রেনীয় শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আদালতভিত্তিক একাধিক মামলা চলমান রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে মানবাধিকার ও অভিভাবকত্ব ইস্যুতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের গুপ্তহত্যা করতে রাশিয়া অভিনব ও ভয়ংকর এক 'হানিপট' বা প্রলোভনের ফাঁদ তৈরি করেছে। ইউক্রেনের জাতীয় পুলিশ প্রধান ইভান ভিহিভস্কি চাঞ্চল্যকর এক অভিযোগে জানিয়েছেন, রাশিয়ান গোয়েন্দারা এই জঘন্য কাজে ইউক্রেনের তরুণী এবং উঠতি বয়সি কিশোরীদের নিয়োগ করছে। মূলত টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থের লোভ দেখিয়ে এসব নারীদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে এবং দূর থেকে পুরো হত্যা মিশনটি সুকৌশলে পরিচালনা করা হচ্ছে। ইউক্রেন পুলিশের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত টেলিগ্রামের মাধ্যমে কমপক্ষে ছয়টি চুক্তিবদ্ধ হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে, যার মধ্যে মাত্র একটি প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। পুলিশ প্রধান ভিহিভস্কি জানান, রাশিয়ান এজেন্টরা এই নারীদের প্রাপ্তবয়স্কদের ডেটিং সাইটগুলোতে গিয়ে ইউক্রেনীয় সামরিক সদস্যদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেয়। এরপর সেনাদের সাথে একান্তে দেখা করার জন্য বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার টাকাও সরাসরি সরবরাহ করে তারা। সাক্ষাতের আগে মেয়েদের কাছে পার্সেলের মাধ্যমে মেথাডোন নামের উচ্চমাত্রার সিন্থেটিক ওপিওড বা ব্যথানাশক ওষুধ পাঠানো হয়, যা অতিরিক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করলে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে ডেটিংয়ে আসা ওই সেনাদের পানীয়ের সাথে সেই বিষাক্ত ওষুধ মিশিয়ে দেওয়ার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় তাদের। সম্প্রতি ইউক্রেনের জাইতোমির অঞ্চলে এমনই এক মর্মান্তিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে সেখানকার একটি বাড়ি থেকে ২৭ বছর বয়সী এক ইউক্রেনীয় সেনার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, যার ব্যবহৃত পাত্রে পাউডার জাতীয় পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এই ঘটনার তদন্তে নেমে গত ৪ জুন বারদিচিভ শহরের ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই কিশোরী পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে যে, সে টেলিগ্রামে এক সন্দেহভাজন রাশিয়ান এজেন্টের নির্দেশে ওই সেনার অ্যালকোহলের সাথে মেথাডোন মিশিয়েছিল। সেনা সদস্যটি অচেতন হয়ে পড়ার পরপরই সে ওই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পালিয়ে যায়। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার একশরও বেশি ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে নিজ দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং রাশিয়ার হয়ে অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাসবাদ বা নাশকতামূলক কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার ভয়াবহ ড্রোন হামলায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে মস্কোর ওপর আরও চাপ প্রয়োগের বিষয়ে আলোচনার জন্য বিশ্বনেতারা যখন লন্ডনে জড়ো হয়েছেন, ঠিক তখনই রোববার এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটল। এদিকে, রুশ বাহিনীর সাম্প্রতিক সামরিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে এদিন ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝিয়া এলাকায় একটি বাস স্টপেজে রুশ বোমা হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। এর কাছাকাছি এলাকায় আরেকটি ড্রোন হামলায় ৫৬ বছর বয়সী এক মিনিবাস চালক প্রাণ হারান। অন্যদিকে, মধ্যাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার পৃথক হামলায় আরও দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে টেলিগ্রামে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় গভর্নর ওলেক্সান্ডার গাঞ্জা। হামলার তীব্রতা থেকে বাদ যায়নি চেরনোবিলও। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা এনার্গোঅ্যাটম জানিয়েছে, চেরনোবিলের এক্সক্লুশন জোনে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি সংরক্ষণের একটি স্থাপনা রুশ হামলায় 'আংশিকভাবে ধ্বংস' হয়েছে। তবে ভবনটি খালি থাকায় বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিগা এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, রুশ বাহিনী এর আগেও পারমাণবিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকিতে ফেলেছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্যমতে, রাতভর দেশটিতে ২৩৬টি ড্রোন ছুড়েছে রাশিয়া, যার মধ্যে ২১৫টিই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে কিয়েভ। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার-এর তথ্যের ভিত্তিতে এএফপি জানিয়েছে, মে মাসে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো হারানোর চেয়ে বেশি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করেছে ইউক্রেন। অন্যদিকে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বাত্মক হামলার পর এই মুহূর্তে সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে রাশিয়া। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর বৃদ্ধি, দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণের সুদ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও চরম শ্রমিক সংকটে ভুগছে মস্কো। এমন পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে লেখা এক খোলা চিঠিতে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন জেলেনস্কি। তিনি জানিয়েছেন যে, একটি 'পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি'র জন্যও তিনি প্রস্তুত রয়েছেন। যদিও শুক্রবার রাশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নিয়ে পুতিন রুশ অর্থনীতি ভেঙে পড়ার দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রাশিয়ার বার্ষিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের সমাপনী দিনে সেন্ট পিটার্সবার্গ ও এর আশপাশের এলাকায় এক নজিরবিহীন ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রথমবারের মতো সেন্ট পিটার্সবার্গের গভর্নর আলেকজান্ডার বেগলোভ স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার জরুরি নির্দেশ দিয়েছেন। রাশিয়ার লেলিনগ্রাদ অঞ্চলের গভর্নর আলেকসান্দর দ্রোজদেন্দো জানিয়েছেন, ওই অঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৪০টিরও বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এই ব্যাপক হামলার কারণে একটি সামরিক স্থাপনায় আগুন ধরে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ড্রোন ও বিস্ফোরণের ভিডিও প্রকাশ করে এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার (৬২০ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ অঞ্চলের ক্রনশটাদে অবস্থিত রুশ নৌবাহিনীর বাল্টিক ফ্লিটের প্রধান ঘাঁটি এবং অস্ত্রাগারে নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। রুশ আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতেই দূরপাল্লার বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া ক্রাসনোদার অঞ্চলের একটি তেল ডিপোতেও সফলভাবে আঘাত করা হয়েছে বলে ইউক্রেন দাবি করেছে। ইউক্রেনের চালকবিহীন বিমান বাহিনীর ৪১৩তম রেজিমেন্টের কমান্ডার ইয়েভহেন কারাস জানান, রুশ আকাশসীমায় তারা এখন প্রায় কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই অনায়াসে প্রবেশ করতে পারছেন। রাশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ফোরাম চলাকালীনই ভলোদিমির জেলেনস্কি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে সরাসরি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে মার্কিন মনোযোগ এখন সেদিকে থাকায়, কেবল ওয়াশিংটনের ওপর ভরসা না করে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন জেলেনস্কি। তবে ফোরামের বক্তব্যে পুতিন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি দিলে ইউক্রেন নিজেদের সামরিকভাবে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। রুশ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ থামবে না বলে পুতিন তার আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছেন। মস্কোর দাবি, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের প্রক্রিয়া ত্যাগ করতে হবে, যা মানতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানিয়েছে কিয়েভ। সেন্ট পিটার্সবার্গের পাশাপাশি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশ নিয়ন্ত্রিত লুহানস্কেও ইউক্রেনীয় ড্রোন বাহিনী ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। রাশিয়ার সামরিক রসদ সরবরাহের পথগুলো লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চলায় নিরাপত্তার স্বার্থে লুহানস্কের দুটি প্রধান মহাসড়কে বাস চলাচল এবং যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবা স্থগিত করেছে মস্কো-মনোনীত স্থানীয় প্রশাসন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গত মে মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় হামলায় রাশিয়ার ২০০টিরও বেশি লরি এবং ৩০টির বেশি তেলের ট্যাংকার ধ্বংস হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর গত চার বছরে ইউক্রেন নিজস্ব প্রতিরক্ষা খাতকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করেছে। ফলে তারা এখন নিয়মিতভাবেই রাশিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি অবকাঠামো ও সামরিক লজিস্টিকস লক্ষ্য করে সফলভাবে দূরপাল্লার হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে।
ইসরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনা যখন চরম শিখরে, তখন একটি প্রশ্ন বিশ্বজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে—গাজা বা ইউক্রেন যুদ্ধের সময় পশ্চিমা বিশ্বের রাজপথ যেভাবে প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রে কেন তা অনুপস্থিত? আল জাজিরার এক বিশেষ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই 'নীরবতার' নেপথ্য কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে গাজা এবং ইউক্রেন ইস্যুতে ক্রমাগত আন্দোলন করতে করতে পশ্চিমা অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে এক ধরনের 'ক্লান্তি' (Protest Fatigue) চলে এসেছে। এছাড়া, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা এবং দেশটির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে পশ্চিমা সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা নেতিবাচক ধারণা বা ভীতি অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর চলমান সামরিক চাপ এবং অবরোধের ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়লেও, পশ্চিমা জনমতে ইরানের প্রতি সহমর্মিতার অভাব স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমা সরকারগুলোর কঠোর অবস্থান এবং গণমাধ্যমের একপাক্ষিক প্রচারণা সাধারণ মানুষকে দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলেছে। ফলে গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে যে বিশাল গণজোয়ার দেখা গিয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজলেও রাজপথে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এই নীরবতাকে 'হতাশা' এবং 'ভয়ের' সংমিশ্রণ হিসেবে দেখছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, একদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে আতঙ্ক, অন্যদিকে নিজ দেশের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে ইরানের পক্ষে দাঁড়ানোর ঝুঁকি—সব মিলিয়ে স্তিমিত হয়ে পড়েছে পশ্চিমা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন।
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশকে ইরানের তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন ভূপাতিত করতে কারিগরি ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে ইউক্রেন—এমন দাবি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞরা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে স্থানীয় বাহিনীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে ইরানি ড্রোন প্রতিহত করতে হয়, তা দেখানো হয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন মোকাবিলায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যা এখন অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় তিনি এসব দেশের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি চূড়ান্ত করেন। সে সময় উপসাগরীয় অঞ্চল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে ছিল। জেলেনস্কি আরও দাবি করেন, ইউক্রেন শুধু একটি দেশে নয়, বরং একাধিক দেশে এই সহায়তা দিয়েছে এবং ইতোমধ্যে সফলভাবে ইরানি ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ইউক্রেনের সামরিক দক্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও বাড়াবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার কাছে দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব থেকে তারা সরে আসছেন না। এই প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে মস্কোর কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সোমবার (৬ এপ্রিল) রাতে এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, কিয়েভ এমন একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে, যা কার্যকর হতে পারে যদি রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সব ধরনের হামলা বন্ধ করে। তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যা তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করে, তবে ইউক্রেনও একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত থাকবে। তিনি বলেন, এই প্রস্তাব ইতোমধ্যে মার্কিন পক্ষের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহেও ইস্টার উপলক্ষে একই ধরনের শর্তে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন জেলেনস্কি। উল্লেখ্য, রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশেই অর্থডক্স খ্রিস্টানদের মধ্যে আসন্ন রোববার ইস্টার উদযাপিত হওয়ার কথা। তবে সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাশিয়া এই প্রস্তাবের জবাবে ইরানে তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন ব্যবহার করেছে। গত সপ্তাহে কিয়েভের প্রস্তাবে মস্কোর প্রতিক্রিয়া খুব ইতিবাচক ছিল না। তারা জানায়, পৃথক যুদ্ধবিরতির বদলে একটি সামগ্রিক শান্তি চুক্তির দিকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এদিকে সোমবার কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী ওডেসা শহরে রাতভর হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া ইস্টারকে কেন্দ্র করে যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী নয় বলেই মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশেষ এই সময়কে ঘিরে বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলেও রাশিয়ার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে—তাদের কাছে কোনো কিছুই যেন পবিত্র নয়।
ইউক্রেনের টেনিস সেনসেশন মার্তা কস্ত্যুক আবারও আলোচনায়। তবে এবার কেবল তার র্যাকেট বা ফোরহ্যান্ড শটের জন্য নয়, বরং নিজ দেশ ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সংকল্প নিয়ে তিনি শুরু করতে যাচ্ছেন বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ 'ক্লে-কোর্ট' মৌসুম। সম্প্রতি সিএনএন-এর সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ২৩ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় তার ক্যারিয়ার, বর্তমান ফর্ম এবং যুদ্ধের ময়দানে থাকা নিজ দেশের পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। টেনিসের লাল মাটির কোর্ট বা ক্লে-কোর্ট সবসময়ই খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক ধৈর্য পরীক্ষা করে। কস্ত্যুক জানান, এবারের মৌসুমে তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী। গত কয়েক মাসে তার খেলায় ব্যাপক উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ব্রিসবেন ইন্টারন্যাশনালের ফাইনালে পৌঁছানো এবং অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালের পারফরম্যান্স তাকে র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে প্রবেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সাক্ষাৎকারে কস্ত্যুক আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন যখন তিনি তার দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলেন। কস্ত্যুক জানান, টেনিস কোর্টে যখন তিনি প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করেন, তখন তার মনের এক কোণায় সবসময় ইউক্রেনের মানুষের কষ্টের কথা ঘুরপাক খায়। তিনি বলেন, "আমি প্রতিদিন হৃদয়ে এক ধরণের ব্যথা নিয়ে খেলি। যখন ভাবি আমার দেশে হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎ ও পানি ছাড়াই দিন কাটাচ্ছে, তখন কোর্টের লড়াইকে অনেক ছোট মনে হয়।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমার খেলা এখন আর কেবল আমার একার নয়। আমি চাই আমার প্রতিটি জয় যেন ইউক্রেনবাসীর মুখে হাসি ফোটায় এবং বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে আমরা এখনও লড়ে যাচ্ছি।" রাশিয়ান ও বেলারুশিয়ান খেলোয়াড়দের সাথে করমর্দন না করার যে সিদ্ধান্ত কস্ত্যুক এবং অন্যান্য ইউক্রেনীয় খেলোয়াড়রা নিয়েছেন, সে বিষয়েও তিনি কথা বলেন। তিনি একে তার "সচেতন পছন্দ" হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইউক্রেনে আগ্রাসন বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করা সম্ভব নয়। যদিও টেনিস বিশ্বে এই নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে, তবে কস্ত্যুক তার অবস্থানে অনড়। বর্তমানে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ১৬ নম্বরের আশেপাশে থাকা এই তরুণী এখন তার ক্যারিয়ার সেরা ফর্মে আছেন। ক্লে-কোর্ট মৌসুমে ভালো ফলাফল করতে পারলে প্রথমবারের মতো শীর্ষ ১০-এ জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে তার সামনে। টেনিস বিশ্লেষকদের মতে, কস্ত্যুক যদি তার বর্তমান মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারেন, তবে আসন্ন ফ্রেঞ্চ ওপেনে তিনি বড় কোনো চমক দেখাতে পারেন। দেশের সংকটময় মুহূর্তে একজন ক্রীড়াবিদ কীভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারেন, মার্তা কস্ত্যুক আজ তার জীবন্ত উদাহরণ। সূত্র: সিএনএন।
ইউক্রেন–এর বিভিন্ন অঞ্চলে রাশিয়া–র বোমা হামলায় অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১৪ জন। অন্যদিকে, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ এলাকায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একজন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে মস্কো। রোববার (২৯ মার্চ) স্থানীয় সময় দোনেৎস্ক অঞ্চলের ক্রামাতোরস্ক শহরে রুশ বাহিনী গ্লাইড বোমা হামলা চালায়। এতে হতাহতের পাশাপাশি কয়েকটি বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিয়েভের আঞ্চলিক প্রশাসনের অভিযোগ, বেসামরিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে। একই দিনে ওডেসা শহরে মাতৃসদন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটে, যেখানে বেশ কয়েকজন হতাহত হন। এর জবাবে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে হামলার তৎপরতা বাড়িয়েছে। বাল্টিক সাগরের উস্ত-লুগা বন্দর এলাকায় ড্রোন হামলার পর আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার দাবি, এসব হামলা রাশিয়ার জ্বালানি ও রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল করার কৌশলের অংশ। এদিকে বেলগোরোদ অঞ্চলেও ইউক্রেনের ড্রোন হামলার দাবি করেছে রাশিয়া। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় রুশ বাহিনী ইউক্রেনের দিকে শত শত ড্রোন ও একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কিয়েভের দাবি, এর মধ্যে অধিকাংশ ড্রোন প্রতিহত বা ভূপাতিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ এখন দুই পক্ষের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের আবহে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সমর্থন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আদায়ে এবার জর্ডানে পৌঁছেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের পর এটিই তার এই ঝটিকা সফরের সর্বশেষ গন্তব্য। জর্ডান বিমানবন্দরে অবতরণের পর জর্ডানি কর্মকর্তাদের সাথে কুশল বিনিময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন জেলেনস্কি। সেখানে তিনি স্পষ্ট জানান, এবারের সফরে তার মূল লক্ষ্য হলো ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’। ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তি বিনিময়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ইতিমধ্যে সৌদি আরব ও কাতারের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করেছেন তিনি। জর্ডানের সাথেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসার কথা রয়েছে তার, যেখানে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই–এ ইউক্রেনের একটি ড্রোন-বিধ্বংসী অস্ত্রের ডিপোতে হামলার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সেনাবাহিনীর বরাতে তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার (২৮ মার্চ) চালানো ওই হামলায় ডিপোটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ড–এর এক মুখপাত্র দাবি করেন, হামলার সময় সেখানে ২১ জন ইউক্রেনীয় ড্রোন বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন। হামলার পর ডিপোর ভেতরের অবস্থা স্পষ্ট না হওয়ায় তাদের সবাই নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সামরিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর গোপন স্থাপনা লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে রাখা ইউক্রেনের ড্রোন-বিধ্বংসী ব্যবস্থার ডিপোও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তবে এই দাবি সরাসরি নাকচ করেছে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংস্থাটির মুখপাত্র জর্জি তিখি বলেন, “এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করছি।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইরান প্রায়ই এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে। এর আগে শনিবারই এক অনানুষ্ঠানিক সফরে আমিরাতে যান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সফরকালে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা জোরদারের কথা জানান। তার এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ড্রোন ডিপোতে হামলার দাবি সামনে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও এটি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন ও মিসাইল হামলার হুমকির মধ্যে কাতার ও ইউক্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের সঙ্গে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং যুদ্ধ অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলতি সপ্তাহে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এক ঝটিকা সফরে বের হন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর কাতারের সঙ্গে এই চুক্তি তার সফরের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। ইউক্রেনের পক্ষে চুক্তিতে সই করেছেন দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আন্দ্রি নাটোভ এবং কাতারের পক্ষে সই করেছেন কাতার সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জসিম বিন মোহাম্মদ আল-মান্নাই। চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ কেবল প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নয়, বরং প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক বিনিয়োগের পথও প্রসারিত করবে। বিশেষ করে, গত এক মাসে ইরানের সঙ্গে সংঘটিত যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব ড্রোন ও মিসাইল প্রতিরক্ষা অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায্য করতে আগ্রহী ইউক্রেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য এমন মিত্র প্রয়োজন, যাদের আর্থিক সক্ষমতা এবং সামরিক রসদ সরবরাহের সামর্থ্য বেশি। বর্তমান সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যে বেশি, তখন কাতার ও সৌদি আরবের সমর্থন কিয়েভের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরক্ষা খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে এক ঐতিহাসিক সফরে তিনি আগামী এক দশকের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে যৌথভাবে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, "আমরা ১০ বছরের এক সুদূরপ্রসারী সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছি। ইতিমধ্যে সৌদি আরবের সাথে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং কাতারের সাথেও সমজাতীয় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। খুব শীঘ্রই সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথেও একই ধরনের চুক্তি হতে যাচ্ছে।" এই চুক্তির বিশেষত্ব হলো কেবল অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয় নয়, বরং দুই অঞ্চলেই যৌথভাবে অত্যাধুনিক অস্ত্রের কারখানা ও প্রোডাকশন লাইন স্থাপন করা। এর ফলে ইউক্রেনের মাটিতে যেমন নতুন কারখানা তৈরি হবে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও ইউক্রেনীয় প্রযুক্তিতে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদিত হবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে কৌশলগত সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে।
প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা জোরদারে ইউক্রেন ও সৌদি আরব একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানায়, শুক্রবার (২৭ মার্চ) জেদ্দায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং ইউক্রেন পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন তারা। পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পর্যালোচনা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতেও মতবিনিময় হয়। জেলেনস্কি তার এক্স পোস্টে উল্লেখ করেন, সৌদি আরব সফরের অংশ হিসেবে জেদ্দায় বৈঠকের আগে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তিনি বলেন, ইউক্রেন তার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সৌদি আরবের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত। সূত্র জানায়, শনিবার (২৮ মার্চ) জেদ্দা ত্যাগ করার কথা রয়েছে জেলেনস্কির। কিং আবদুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানানোর জন্য মক্কা অঞ্চলের উপ-গভর্নর প্রিন্স সৌদ বিন মিশআলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। উল্লেখ্য, ইরান-সংক্রান্ত সামরিক উত্তেজনা শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন জেলেনস্কি। বিশেষ করে ড্রোন প্রতিরোধে ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে, এবং বর্তমানে এসব দেশে ইউক্রেনের দুই শতাধিক সামরিক প্রযুক্তিবিদ কাজ করছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফরে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার লক্ষ্যেই এই সফর। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে রয়েছেন ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান রুস্তম উমেরভ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় জেলেনস্কি জানান, "সৌদি আরবে পৌঁছেছি। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। যারা আমাদের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করতে আগ্রহী এবং আমাদের সমর্থন করছেন, তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।" সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইউক্রেন তাদের নিজস্ব 'এয়ার ডিফেন্স' বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কিয়েভ ইতিমধ্যে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জেলেনস্কি এই সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৌদি আরবের আর্থিক সমর্থন এবং উন্নত প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন। মূলত 'প্রযুক্তি ও অর্থ'-এর বিনিময়ে নিরাপত্তা সহযোগিতার এই নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে ইউক্রেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ছয় বছরের এক শিশুকন্যা ও তার বাবার মৃত্যুকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, পারামাট্টা নদীতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৪৭ বছর বয়সী মওলিক ধান্ধুকিয়া এবং তার ছয় বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সিডনির কনকর্ড এলাকার কাছে একটি নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। তার সঙ্গে ছিলেন ছয় বছর বয়সী কন্যা। কিছু সময় পর নদীতে জরুরি পরিস্থিতির খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। আরও পড়ুন...টেক্সাসে স্বামীর গুলিতে স্ত্রী নিহত, পরে পুলিশের গুলিতে স্বামী নিহত; দুই শিশুকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুপুরের কিছু আগে মওলিক ধান্ধুকিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে শিশুটির সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিশুকন্যার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করেন। ঘটনার তদন্তে সহায়তার জন্য আশপাশের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় একটি স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় জানানো হয়েছে, আগামী শুক্রবার রাউস হিলের ক্যাসেলব্রুক ক্রেমেটোরিয়ামে বাবা ও মেয়ের যৌথ শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। শোকবার্তায় লেখা হয়েছে, “দুই কোমল ও সদয় আত্মা, যারা চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।” তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগে কয়েক দফা নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। একবার তার স্ত্রী প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়াও তার সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে। আরও পড়ুন...টেক্সাসে বিস্ফোরণের আগুনে পুড়েও বাড়ি ও নাতি-নাতনিদের বাঁচালেন এক সাহসী দাদা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ একটি পোস্ট করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। সেখানে তিনি ২০০৫ সালে জিমে ব্যায়াম করার সময় ঘাড়ে পাওয়া আঘাতের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগা শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ঘাড়ের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তার জীবনের অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমআরআই পরীক্ষায় তার মেরুদণ্ডের ঘাড়ের অংশে স্নায়ুর ওপর চাপের বিষয়টি ধরা পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মওলিক ধান্ধুকিয়া পেশাগত জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করতেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি সাউথ ইস্টার্ন সিডনি লোকাল হেলথ ডিস্ট্রিক্টে অ্যাপ্লিকেশন সাপোর্ট বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এই ঘটনার পর পরিবারটির জন্য সহায়তা তহবিলও গঠন করেছেন স্বজন ও পারিবারিক বন্ধুরা। তহবিল সংগ্রহের আহ্বানে বলা হয়েছে, প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়া একসঙ্গে তার স্বামী ও একমাত্র কন্যাকে হারিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে তাকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। ▶️ ট্রাম্পের লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি অবৈধ ঘোষণা মার্কিন আদালতের তহবিলের অর্থ শেষকৃত্যের ব্যয়, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং নিকট আত্মীয়দের যাতায়াত ও আবাসন খাতে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস্টিন ম্যাকডোনাল্ড ঘটনাটিকে “পরিবার ও সমাজের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। আমরা সব দিক থেকে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি এবং কোনো সম্ভাবনাই উপেক্ষা করা হবে না।” পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে পারিবারিক সহিংসতার কোনো উপাদান ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। বাবা ও মেয়ের একসঙ্গে শেষকৃত্যের খবর আরও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেছে। স্বজন ও পরিচিতজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।