- প্রচ্ছদ
- Topic
ইউক্রেন
ইউক্রেনের মারিউপোল যুদ্ধে রুশ বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার প্রায় তিন বছর পর দেশে ফিরেছিলেন ইউক্রেনীয় নৌসেনা ওলেক্সান্দর কিরিয়েঙ্কো। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়ার পর তার আগের ও পরের দুটি ছবি সামনে আসে। ছবিতে বন্দিদশার সময় তার শারীরিক পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিরিয়েঙ্কো ইউক্রেনের ৩৬তম মেরিন ব্রিগেডের প্রধান সার্জেন্ট এবং স্নাইপার প্লাটুনের প্রধান সার্জেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পূর্ণমাত্রার রুশ আগ্রাসন শুরু হলে তিনি মারিউপোলের প্রতিরক্ষায় অংশ নেন। ২০২২ সালের ১২ এপ্রিল ইলিচ কারখানা থেকে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে বের হওয়ার সময় তিনি রুশ বাহিনীর হাতে বন্দি হন। এরপর প্রায় তিন বছর রাশিয়ার বন্দিদশায় কাটে তার। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার বর্ণনা অনুযায়ী, বন্দিদশায় তাকে নির্যাতন ও মারধরের শিকার হতে হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের বন্দিত্ব, কঠিন পরিস্থিতি এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবের কারণে তার ওজন প্রায় ৪০ কেজি কমে যায় বলে তিনি জানিয়েছেন। বন্দিদশার সময় তাকে রাশিয়ার মর্দোভিয়ার একটি কারাগারে রাখা হয়েছিল বলে ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। কিরিয়েঙ্কো পরে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, বন্দিদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো এবং তাদের খাবার ও চিকিৎসা নিয়েও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব বক্তব্য তার নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে অবশেষে ইউক্রেনে ফেরেন কিরিয়েঙ্কো। দেশে ফেরার পর তিনি শারীরিক পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রায় তিন বছরের ব্যবধানের দুটি ছবিতে তার আগের শক্তসমর্থ চেহারার সঙ্গে মুক্তির পরের শারীরিক অবস্থার বড় পার্থক্য দেখা যায়। কিরিয়েঙ্কোর বন্দিদশার অভিজ্ঞতা পরে আরও আলোচনায় আসে ২০২৫ সালের আগস্টে। যুক্তরাষ্ট্রের র্যাপার আজেলিয়া ব্যাংকস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিরিয়েঙ্কোর বন্দিত্বের আগে ও পরে তোলা ছবি নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এর জবাবে কিরিয়েঙ্কো বলেন, নির্যাতন একটি অপরাধ এবং বন্দিত্বের এমন অভিজ্ঞতা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। মারিউপোলের যুদ্ধ, দীর্ঘ বন্দিত্ব এবং শেষ পর্যন্ত বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে দেশে ফেরার কিরিয়েঙ্কোর ঘটনা ইউক্রেনীয় যুদ্ধবন্দিদের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় তিন বছরের ব্যবধানের দুটি ছবি সেই দীর্ঘ সময়ের শারীরিক পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। দেশে ফিরলেও বন্দিদশার অভিজ্ঞতা থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে তার দীর্ঘ পুনর্বাসনের প্রয়োজন হচ্ছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের ডুনবেগে নিজের গলফ কোর্সে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ডিজেলের আকাশছোঁয়া দামবৃদ্ধির জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলার কারণেই জ্বালানির এই সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে রাশিয়ার ডিজেল স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, এই সংকটের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ভূমিকা নেই, বরং রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান সংঘাতই এর মূল কারণ। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ৬.০৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২২ সালের জুনে, অর্থাৎ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে এই দাম ছিল ৫.৮২ ডলার। অথচ চলতি বছরের মার্চ মাসেও প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ৪ ডলারের নিচে ছিল। মূলত যাত্রীবাহী গাড়ি পেট্রোলে চললেও বৈশ্বিক অর্থনীতি অনেকটাই ডিজেলনির্ভর। বড় ট্রাক, কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি, ট্রেন ও বিশাল পণ্যবাহী জাহাজগুলো এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, ডিজেলের দামবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের মূল্যের ওপর গিয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাশিয়ার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎসটি ধ্বংস করতে গত কয়েক মাস ধরে দেশটির তেল ও গ্যাস শোধনাগারগুলোতে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেন। এসব হামলার কারণে মস্কো বাধ্য হয়ে ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও তাদের মিত্রদের হামলার কারণেও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সিএনবিসি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর ফলে বিশ্বজুড়ে ডিজেলের সরবরাহ প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো ইতিমধ্যেই তাদের সক্ষমতার ৯৮ শতাংশ ব্যবহার করে কাজ করছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলেছেন এবং তাকে ডিজেল স্থাপনা বাদে অন্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে কিয়েভের দাবি, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস থেকে আসা অর্থ সরাসরি মস্কোর সামরিক আগ্রাসনে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাই তারা এই দূরপাল্লার হামলা অব্যাহত রেখেছে।
নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে সদস্য দেশগুলোর নেতারা বৈঠকে বসেছেন। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সম্মেলনটি ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জোটটি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কণ্ঠ আরও শক্তিশালী করা এবং বিশ্বব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী বা মাল্টিপোলার করার লক্ষ্য সামনে রাখছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজনে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন। সম্প্রসারিত ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা এখন ১১ এবং জোটটি বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককে প্রতিনিধিত্ব করে। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধই সম্মেলনের অন্যতম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ইরান ২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ জোটটির ভেতরের মতপার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িত থাকায় এবং চীন, ভারত ও অন্যান্য সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকায় আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলোতে ব্রিকসের জন্য অভিন্ন অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে এবারের শীর্ষ সম্মেলনে একটি যৌথ অবস্থান তৈরি করা জোটটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে মতপার্থক্যের মধ্যেও ব্রিকস নিজেদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। জোটটির অন্যতম লক্ষ্য হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বাড়ানো এবং পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে আরও বিকল্প তৈরি করা। সম্মেলনে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহযোগিতার মতো বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও ব্রিকসের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের জন্য এবারের সম্মেলন বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। একদিকে নয়াদিল্লির চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। ফলে ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হিসেবে না দেখে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। ব্রিকসের সম্প্রসারণ জোটটির বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ালেও একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও বাড়িয়েছে। ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলো একই প্ল্যাটফর্মে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তারপরও ব্রিকস নেতারা গ্লোবাল সাউথের জন্য আরও শক্তিশালী ভূমিকা এবং একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। সম্মেলনের শেষ দিনে তাই মূল প্রশ্ন হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামলে ব্রিকস কতটা কার্যকরভাবে ঐক্যের বার্তা দিতে পারে এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও কতটা বাড়াতে পারে। সূত্র: আল জাজিরা
রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে বাড়তি রাজস্বের উৎস তৈরি করতে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট শিল্পকে বৈধ ও করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে ইউক্রেন। দেশটির পার্লামেন্টে উত্থাপিত একটি বিল প্রথম দফার অনুমোদন পেয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে এই খাত থেকে বছরে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার কর আদায় হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক। প্রস্তাবটির লক্ষ্য শুধু কর আদায় নয়, বর্তমানে আইনি জটিলতার মধ্যে থাকা অনলাইন প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট শিল্পকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনা। ইউক্রেনে পর্নোগ্রাফি তৈরি ও বিতরণ এখনো অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় কনটেন্ট নির্মাতাদের আয় ঘোষণা এবং কর দেওয়ার ক্ষেত্রেও এক ধরনের আইনি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। আইনপ্রণেতাদের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইউক্রেনের প্রায় ৭ হাজার ৯০০ জন নাগরিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ওনলিফ্যানসের মাধ্যমে ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করেন। এই বিপুল আয়ের ওপর কর আদায়ের সুযোগ থাকলেও বর্তমান আইনের কারণে সংশ্লিষ্টরা একই সঙ্গে কর দেওয়ার এবং ফৌজদারি আইনের আওতায় পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। ঝেলেজনিয়াকের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বছরে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার অতিরিক্ত কর রাজস্ব পাওয়া যেতে পারে। তার দাবি, এই অর্থ দিয়ে প্রায় ৩০ হাজার ড্রোনের অর্থায়ন করা সম্ভব। তবে এটি আইনপ্রণেতার হিসাব, কোনো নিশ্চিত সরকারি বরাদ্দ বা ড্রোন কেনার সিদ্ধান্ত নয়। প্রস্তাবটি এমন সময়ে এসেছে, যখন যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের সরকারি অর্থের ওপর ব্যাপক চাপ রয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রয়োজন বছরে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই তুলনায় প্রস্তাবিত ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার খুব বড় অঙ্ক না হলেও সরকার অতিরিক্ত রাজস্বের প্রতিটি সম্ভাব্য উৎস খুঁজছে। এদিকে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতাদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান ও আইনি হয়রানির অভিযোগও সামনে এসেছে। কিছু নির্মাতা দাবি করেছেন, তারা আয়কর দেওয়ার পরও এমন কর্মকাণ্ডের জন্য আইনি ঝুঁকিতে পড়ছেন, যা বর্তমান আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এই পরিস্থিতিতে কয়েকজন নির্মাতা ইউক্রেনের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিতর্কটি প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কাছেও পৌঁছেছে। একটি গণস্বাক্ষরিত আবেদনের পর জেলেনস্কি বিষয়টি পার্লামেন্টে বিবেচনার কথা জানিয়েছেন। তবে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট বৈধ করার প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত আইন নয় এবং এটি পার্লামেন্টের পরবর্তী ধাপের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রস্তাবটি পাস হলে ইউক্রেনের জন্য এটি একই সঙ্গে করনীতি, অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধকালীন অর্থনীতির একটি বিতর্কিত পরিবর্তন হবে। সংশ্লিষ্ট আইনপ্রণেতারা বলছেন, বৈধ কাঠামো তৈরি হলে কর আদায় বাড়বে এবং বর্তমানে চলমান আইনি অস্পষ্টতাও কমবে।
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার। শনিবার মস্কোর ক্রেমলিনে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠকটি হয়। তবে আলোচনার পর কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা বা বড় ধরনের অগ্রগতির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, উইটকফ ও কুশনার পুতিনের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ‘সাবস্ট্যানশিয়াল প্ল্যান’ বা গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এসব পরিকল্পনার বিস্তারিত আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ করা হতে পারে। বৈঠকের পর দুই মার্কিন দূত ইউক্রেনে গিয়ে একই বিষয়ে আরও আলোচনা করবেন বলে জানানো হয়েছে। শনিবার ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন উইটকফ ও কুশনার। রুশ প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বৈঠকটিকে ‘গঠনমূলক, অত্যন্ত খোলামেলা ও কার্যকর’ বলে বর্ণনা করেছেন। উশাকভ জানান, মার্কিন দূতরা ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাধানের বিভিন্ন পথ নিয়ে কয়েকটি ধারণা তুলে ধরেছেন। তবে তিনি সেসব প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। পুতিনও রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের অগ্রগতি এবং যুদ্ধের ‘মূল কারণ’ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। আলোচনায় শুধু যুদ্ধ নয়, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়েও বিস্তারিত কথা হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন ঘণ্টার বেশি আলোচনার পরও কোনো বড় ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ইউক্রেনের ভূখণ্ড নিয়ে রাশিয়ার দাবি এবং ন্যাটোতে ইউক্রেনের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে মস্কোর অবস্থান এখনও গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে কিয়েভ নিজেদের ভূখণ্ড নিয়ে ছাড় দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছে। এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তাঁর দূতরা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে একটি ‘কংক্রিট প্রস্তাব’ নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনে যাচ্ছেন। তবে সেই প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। মস্কো সফরের পর আজ রোববার উইটকফ ও কুশনারের কিয়েভ যাওয়ার কথা। এটি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কিয়েভে তাদের প্রথম সফর হতে যাচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও তাদের সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মার্কিন দূতদের সঙ্গে আলোচনার সময় যুদ্ধের পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে কথা হবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, ৫ সেপ্টেম্বর জেলেনস্কি উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আলোচনার সময় দুই দেশের রাজধানীতে বিমান হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়ে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন। মার্কিন দূতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই মস্কো ও কিয়েভে হামলা না চালানোর বিষয়ে সাময়িক সম্মতি জানিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, কিয়েভে তিন দিন হামলা না চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলেনস্কিও বলেছেন, ইউক্রেন একই সময়ে মস্কোতে হামলা থেকে বিরত থাকবে। তবে এই সাময়িক বিরতি কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া ও ইউক্রেনের হামলা এখনও অব্যাহত রয়েছে। বৈঠকে পুতিন জানিয়েছেন, রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি করছে এবং নিজেদের সামরিক লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে মস্কো আত্মবিশ্বাসী। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের ‘মূল কারণগুলো’ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ঘটাতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। কয়েক মাস ধরে শান্তি আলোচনা স্থবির থাকার পর উইটকফ ও কুশনারের নতুন সফরকে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে - মার্কিন দূতদের প্রস্তাবের সুনির্দিষ্ট বিষয় কী এবং রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই সেটিতে কতটা সম্মত হবে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। শনিবার মস্কোয় পৌঁছে তারা রুশ পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার দুই দূত যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রস্তাব নিয়ে গেছেন। একই সময়ে উইটকফ ও কুশনারের সফরকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইউক্রেনের আকাশ হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, উইটকফ ও কুশনার ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ করার একটি প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি প্রস্তাবটির বিস্তারিত জানাননি। মস্কো এই পরিকল্পনায় কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত কি না, সে বিষয়েও তিনি কোনো ইঙ্গিত দেননি। রাশিয়ায় এটি উইটকফ ও কুশনারের তৃতীয় পরিচিত সফর। এর আগে তারা আরও দুইবার মস্কো সফর করেছেন। সর্বশেষ সফরটি হয়েছিল জানুয়ারিতে। তবে আগের দুই সফর থেকে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বারবার বলেছেন, মস্কো সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার যুক্তি, এমন যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তি আনবে না এবং ইউক্রেনকে নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহের সুযোগ দেবে। চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তকে একটি অর্থনৈতিক ফোরামে পুতিন বলেন, সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ রয়েছে। তবে পরে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, এর জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট পূর্বশর্ত তৈরি হয়নি। মস্কো সফরের পর উইটকফ ও কুশনার রোববার ইউক্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন বলে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনে এটিই তাদের প্রথম পরিচিত সফর হতে যাচ্ছে। কিয়েভে এই সফর নিয়ে প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। ইউক্রেনীয় প্রশাসন মনে করছে, মার্কিন দূতদের দেশটির পরিস্থিতি সরাসরি দেখার সুযোগ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে আগ্রহ দেখাচ্ছে না এবং আগামী কয়েক মাসে হামলা আরও বাড়াতে পারে বলে কিয়েভের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মার্কিন দূতদের সফর চলাকালে ইউক্রেন একতরফাভাবে রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে আকাশ হামলা চালাবে না। তিনি বলেছেন, ইউক্রেনের পক্ষ থেকে কোনো আকাশ হামলা হবে না এবং রাশিয়াকেও একই কাজ করতে হবে। তিনি আরও জানিয়েছেন, উইটকফ ও কুশনার ইতোমধ্যে রুশ পক্ষের সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন। ইউক্রেনের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিরিলো বুদানভ শনিবার বলেন, ইউক্রেন সামনের যুদ্ধক্ষেত্রেও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু মস্কোর কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এর আগে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, উইটকফ ও কুশনারের রাশিয়া ও ইউক্রেন সফরের পুরো সময় পারস্পরিক ও ব্যাপক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল কিয়েভ। এই প্রস্তাব আলোচনার বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে রুশ পক্ষের কাছে পাঠানোর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছেও দেওয়া হয়েছিল। তবে ক্রেমলিন ও রুশ আলোচকদের কাছ থেকে এর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এদিকে, জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, কুশনার ও উইটকফ যাতে সরাসরি বিমানে কিয়েভে পৌঁছাতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যে রুশ বাহিনী রাতের বেলায় কিয়েভের দুটি প্রধান বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন দূতদের সরাসরি বিমানে কিয়েভে পৌঁছানো হলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর সেটিই হতো কোনো বিদেশি সরকারি প্রতিনিধিদলের প্রথম এমন সফর। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার এই পদক্ষেপের বিষয়টি তারা বিবেচনায় নিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে রুশ আকাশসীমা নিয়ে নিজেদের কার্যক্রম পরিবর্তন করবেন। বিমান চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, উইটকফ ও কুশনারকে বহনকারী বিমানটি মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করে প্রথমে হেলসিঙ্কিতে থামে। এরপর সেটি রাশিয়ার দিকে রওনা হয় এবং স্থানীয় সময় শনিবার দুপুরের দিকে মস্কোর ভনুকোভো বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্টের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ তাদের স্বাগত জানান। পরে মার্কিন দূতদের গাড়িবহর নিরাপত্তা যানসহ মস্কোর কেন্দ্রের দিকে যেতে দেখা যায়। এর আগে ইউক্রেন বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা ও রাশিয়ার আকাশসীমা ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে বলেছিল, সামরিক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় রুশ আকাশসীমা অনিরাপদ হয়ে উঠছে। পুতিন এই পদক্ষেপকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, শান্তি আলোচনার জন্য ভবিষ্যতে কিয়েভের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে বলে রাশিয়া ইউক্রেনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে। তবে শুক্রবার রাশিয়ার একটি ড্রোন কিয়েভে ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার সদর দপ্তরে আঘাত হানে। ভবনটি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর একটি এবং রাশিয়ার ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্থার কার্যালয়ও সেখানে রয়েছে। মস্কো ওই হামলার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। উইটকফ ও কুশনারের মস্কো সফরের পর কিয়েভ সফর এবং দুই পক্ষের সঙ্গে তাদের আলোচনার ফলাফলের দিকে এখন নজর রয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন দূতদের এই সফর শুরু হলেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংঘাত এবং পারস্পরিক হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে নতুন এই কূটনৈতিক উদ্যোগ থেকে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কতটা অগ্রগতি হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস
ইউক্রেনে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও খারকিভ শহরের শিশুদের জন্য এবারের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষতে শহরের উপরিভাগের অনেক অংশ জর্জরিত থাকলেও, রুশ বোমাবর্ষণের সার্বক্ষণিক হুমকির মাঝেই শিশুদের নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা নিশ্চিতে মাটির নিচে তৈরি করা হয়েছে এক অভিনব স্কুল। ‘খারকিভ লাইসিয়াম নম্বর ২৪’ নামের এই নবনির্মিত ভূগর্ভস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ পরিবেশে পাঠদানের সব ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের এই শহরটিতে প্রতিনিয়তই রাশিয়ান বাহিনীর হামলার আতঙ্ক বিরাজ করে। ভূপৃষ্ঠের ওপরে স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা যখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই মাটির নিচের এই স্কুলটি শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনার কারণে যুদ্ধকালীন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই নিরাপদে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো এই স্কুলটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের শিশুদের জন্য এক নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ইউক্রেনে চলমান সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার ঘোষণার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাতে তেহরানকে পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ১০ দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক জোট সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলন শেষে তিনি এ কথা জানান। পশ্চিমাদের 'ক্ষুধার্ত হাঙর' আখ্যা দিয়ে পুতিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, কেউ যদি তাদের গিলে খেতে বা গ্রাস করতে চায়, তবে রাশিয়া তার দাঁতভাঙা জবাব দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। ইউক্রেন সংকট সমাধানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন পুতিন। সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের বিরল মস্কো সফরের পরপরই রুশ প্রেসিডেন্ট জানান, ট্রাম্পের আস্থাভাজন এই দুই দূতের সঙ্গে কাজ করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা নিয়ে ভলোদিমির জেলেনস্কির বক্তব্যকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়ে পুতিন স্পষ্ট করেছেন যে, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না। উল্টো ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে আরও ব্যাপক হামলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, যা দেশটির অর্থনীতি ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া রাশিয়ায় নতুন করে সেনা নিয়োগের গুঞ্জনকে তিনি ‘আজেবাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে হওয়া এক বৈঠকে তেহরানের প্রতি মস্কোর জোরালো সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন পুতিন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই রাশিয়া দেশটিকে সমর্থন দিয়ে আসছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তেহরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশও পাঠিয়েছে মস্কো। ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশটির জনগণের সাহস ও দৃঢ়তার প্রশংসা করে পুতিন আশ্বাস দেন যে, এই কঠিন সময়ে তেহরানের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করতে রাশিয়া কাজ করে যাবে।
ইউক্রেনকে ঘিরে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। জার্মানির সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন স্থাপনায় সরাসরি হামলার হুমকি দিয়েছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের সামরিক স্থাপনায় রাশিয়া হামলা চালাতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, বিষয়টি ‘সামরিক গোপনীয়তা’। জার্মানি গত মঙ্গলবার অভিযোগ করেছে, গত মাসে লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন হামলার চেষ্টার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশি তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য এবং হামলার ধরন বিশ্লেষণ করে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। এর পরই মেদভেদেভ জার্মানির বিরুদ্ধে কঠোর হুমকি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, জার্মানির সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী স্থাপনাগুলো সরাসরি হামলার লক্ষ্য হতে পারে। বার্লিনের আরও কিছু স্থাপনাকেও সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। গত ৪ আগস্ট লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা এলাকায় একটি বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন পাওয়া যায়। জার্মান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি ইউক্রেনের একটি কার্গো বিমানের কাছে ছিল এবং এতে বিস্ফোরক ও ডেটোনেটর ছিল। পরে ড্রোনটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। জার্মান সরকার ঘটনাটিকে রাশিয়ার বৃহত্তর ‘হাইব্রিড অপারেশন’-এর অংশ হিসেবে দেখছে। অভিযোগের পর রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে জার্মানি। পাশাপাশি বন শহরে রাশিয়ার কনস্যুলেট বন্ধ এবং বার্লিনে রাশিয়ান হাউসের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রুশ নাগরিকদের প্রবেশে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তবে মস্কো জার্মানির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। রুশ কর্মকর্তারা বলেছেন, বার্লিনের অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। পুতিনও জার্মানির পদক্ষেপকে গুরুতর ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এদিকে যুক্তরাজ্যকে নিয়েও রাশিয়ার হুঁশিয়ারি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইউক্রেনকে ব্রিটিশ তৈরি দীর্ঘপাল্লার স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে আরও সক্ষম করে তুলতে ব্রিটেনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর মস্কো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছে। কিরগিজস্তানে এক সংবাদ সম্মেলনে পুতিনকে প্রশ্ন করা হয়, রাশিয়া ব্রিটিশ ভূখণ্ডে যুক্তরাজ্যের সামরিক স্থাপনায় হামলার কথা বিবেচনা করছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, এটি ‘সামরিক গোপনীয়তা’। এর আগে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সতর্ক করে জানিয়েছিল, ইউক্রেনকে ব্রিটিশ অস্ত্র সরবরাহের কারণে যুক্তরাজ্য রাশিয়ার হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়ছে। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জার্মানির পাশে থাকার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে ইউরোপে রাশিয়ার কথিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও নিষেধাজ্ঞা জোরদারের আলোচনা চলছে।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ অন্তত নয়টি শহরে রাতভর একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে রুশ সামরিক বাহিনী। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত চলা এই নির্বিচার হামলায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা কিয়েভ। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এই ব্যাপক হামলায় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে এক বৃদ্ধা এবং খারকিভ অঞ্চলে আরেকজনসহ অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৪ জন বেসামরিক নাগরিক। আবাসিক ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশটির বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই হামলাকে ‘ব্যাপক আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করেছে, তারা ইউক্রেনের শিল্প স্থাপনা, তেল শোধনাগার, সামরিক লজিস্টিক হাব এবং বন্দর অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে ইউক্রেনের দাবি, শীতের আগে দেশটির জ্বালানি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবসা খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলে চারটি শক্তিশালী গ্লাইড বোমার আঘাতে একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া হামলায় ধ্বংস হয়েছে একটি খেলনা ব্র্যান্ড ও কনফেকশনারি কোম্পানির ডিপো এবং একটি ইলেকট্রনিক্স রিটেলারের গুদাম। গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বন্দর ওদেসাতেও টানা সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে হামলা চলে, যার ফলে ব্যাহত হয় শস্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৬ তলা একটি আবাসিক ভবন। এদিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মারাত্মক সংকটে ভুগছে ইউক্রেন। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশ্চিমা মিত্রদের প্রতি দ্রুত আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স প্যাকেজ সরবরাহের জোর আহ্বান জানিয়েছেন। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী সাতটি রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস বা প্রতিহত করার দাবি করেছে। এই হামলার রেশ ছড়িয়েছে প্রতিবেশী দেশ মলদোভাতেও; দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতের আঁধারে পাঁচটি ড্রোন তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। পাল্টা জবাবে ইউক্রেনও রাশিয়ার ভেতরে ব্যাপক ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দোনেৎস্কের কাছে রাশিয়ার প্রধান ও বিকল্প কমান্ড পোস্টে সফল আঘাত হানার দাবি করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা ১৪টি অঞ্চল এবং কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরের ওপর থেকে ২৬৭টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে এসব ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘ওজন’-এর উফা শহরের লজিস্টিক কেন্দ্রে আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের আকস্মিক মস্কো সফর নিয়ে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়ায় র্যাটক্লিফের এই সফরকে ‘আধা-রুটিন’ বলে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছেন, এই সফর থেকে ‘কিছু একটা হতে পারে’। মঙ্গলবার র্যাটক্লিফ গোপনে মস্কো সফর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগে এই সফরের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। পরে রাশিয়ার ক্রেমলিন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, সিআইএ প্রধান রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার কোনো বৈঠক হয়নি। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে এবং বৈঠকের ফলাফল পুতিনকে দ্রুত জানানো হয়েছে। তবে আলোচনায় কী বিষয় উঠে এসেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। পেসকভ বলেন, এমন যোগাযোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়, যদিও এর মাধ্যমে দুই দেশের গভীর সংকট কতটা কমবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। র্যাটক্লিফের সফরটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ ২০২১ সালের পর এই প্রথম কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত সিআইএ পরিচালক মস্কো সফর করলেন। ২০২১ সালে তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস মস্কো সফর করে পুতিনকে ইউক্রেনে সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। কয়েক মাস পরই রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ হামলা শুরু করে। র্যাটক্লিফের এবারের সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু থেকেই নানা জল্পনা তৈরি হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া যেন কোনো ন্যাটো সদস্য দেশের ওপর হামলা না চালায়, সে বিষয়ে সতর্ক করতেই র্যাটক্লিফ মস্কো গিয়েছিলেন। সিবিএস নিউজও একাধিক সূত্রের বরাতে একই ধরনের তথ্য জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প এই ব্যাখ্যা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। গ্লেন বেকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, র্যাটক্লিফ ‘অসাধারণ একজন ব্যক্তি’ এবং তিনি মস্কো গিয়েছেন এমন কোনো কারণে নয়, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। ট্রাম্পের দাবি, সফরটি আধা-রুটিন ধরনের হলেও এর মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় অগ্রগতি হতে পারে। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে ‘খুব কঠোরভাবে কাজ করছে’। তার ভাষ্য, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই এখন যুদ্ধের অবসান চায়। তবে ওয়াশিংটন, মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে শান্তি আলোচনা এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছায়নি। এদিকে র্যাটক্লিফের সফরের আগে ইউক্রেনকে মস্কোয় একটি উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফরের বিষয়ে জানানো হয়েছিল এবং সফর চলাকালে রাশিয়ার ওপর দূরপাল্লার হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল বলে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে। র্যাটক্লিফের সফর এমন এক সময়ে হলো, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রচেষ্টা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত। একই সময়ে ন্যাটোকে ঘিরে রাশিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মহলেও উদ্বেগ রয়েছে। সিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ন্যাটোর ঐক্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে সাইবার হামলা বা সীমিত ধরনের সামরিক ও অন্যান্য ‘হাইব্রিড’ পদক্ষেপ নিতে পারে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন। তবে র্যাটক্লিফ ও রুশ কর্মকর্তাদের বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটো, ইরান কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ট্রাম্পের কথায় ‘কিছু একটা’ হওয়ার ইঙ্গিত থাকলেও সফরটির প্রকৃত ফলাফল এখনো স্পষ্ট নয়।
রাশিয়ার তামবভ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পর দেশটির অন্যতম বড় অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম ওয়াইল্ডবেরিজের একটি বিশাল লজিস্টিকস সেন্টারে আগুন ধরে পুরো স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে গেছে। বুধবার ২৬ আগস্ট রাতে ওই হামলায় একজন কর্মী আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তামবভের গভর্নর ইয়েভগেনি পারভিশভ জানান, কতোভস্ক শহরের লজিস্টিকস সেন্টারটিতে ড্রোন হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আগুন প্রায় ১ লাখ বর্গমিটার এলাকায় ছড়িয়ে যায়, যা প্রায় ১৪টি ফুটবল মাঠের সমান। পরে তিনি জানান, আগুনে লজিস্টিকস সেন্টারটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। হামলার সময় গুদামে থাকা কর্মীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। বিস্ফোরণের ধাক্কায় একজন কর্মী আহত হয়ে কনকাশনে আক্রান্ত হয়েছেন বলে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ওয়াইল্ডবেরিজও হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, ওই স্থাপনায় নতুন পণ্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে। তামবভ কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলার সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৬টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে ড্রোন হামলার দায় ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। ওয়াইল্ডবেরিজের এই গুদামটি এর আগেও ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়েছিল। গত ১৮ জুলাই একই কতোভস্ক স্থাপনায় হামলায় সাতজন নিহত ও ২৫ জন আহত হন। এরপর জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়াইল্ডবেরিজের একাধিক গুদাম ও লজিস্টিকস স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার আরেক বড় অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওজনের লজিস্টিকস সেন্টারগুলোকেও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে। রাশিয়ার অনলাইন খুচরা বাজারে ওয়াইল্ডবেরিজ ও ওজন দুই প্রতিষ্ঠানই বড় অংশ দখল করে আছে। যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি যখন ধীরগতির প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে, তখন বাণিজ্যিক ও লজিস্টিকস অবকাঠামোয় এ ধরনের হামলা অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকদের মতে। এদিকে তামবভের পাশের লিপেতস্ক অঞ্চলে ড্রোন হামলার পর একটি বাড়িতে আগুন লেগে এক ব্যক্তি ও ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বেলগোরোদ অঞ্চলেও ড্রোন হামলায় একজন নারী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই বারবার দাবি করে আসছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইউক্রেনকে ব্রিটিশ তৈরি ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলার অভিযোগের পর যুক্তরাজ্যকে আবারও ‘পরিণতি’ ভোগ করার হুমকি দিয়েছে মস্কো। এ নিয়ে রাশিয়া–ব্রিটেন উত্তেজনার মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, চাপের মুখে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন। সম্প্রতি ইউক্রেন রাশিয়ার গভীরে চালানো হামলায় ব্রিটিশ তৈরি ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। এর পরই লন্ডনে রুশ দূতাবাস অভিযোগ করে, যুক্তরাজ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। তাদের হুঁশিয়ারি—সংঘাতে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা যত বাড়বে, দেশটির জন্য ‘মূল্য’ও তত বেশি হবে। ব্রিটিশ তৈরি ড্রোনের মাধ্যমে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ যুক্তরাজ্য ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র ও ড্রোনসহ সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ইউক্রেনও রাশিয়ার সামরিক শিল্প, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম রাশিয়ার হুমকির জবাবে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের পাশে ‘১০০ শতাংশ’ রয়েছে এবং রাশিয়ার হুমকির কারণে কিয়েভকে সমর্থন থেকে সরে আসবে না। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। রাশিয়ার হুমকি অবশ্য নতুন নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ব্রিটেনের সামরিক সহায়তার প্রতিটি বড় ধাপের পর মস্কো বিভিন্ন ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন—রাশিয়া যদি নিজেকে আরও কোণঠাসা ও মরিয়া মনে করে, তাহলে বেপরোয়া পদক্ষেপের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ব্রিটেন সরাসরি সামরিক হামলার পাশাপাশি সাইবার হামলা, নাশকতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আঘাতের মতো হাইব্রিড হুমকির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটির বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি অংশ সমুদ্রের নিচের কেবলের ওপর নির্ভরশীল, যা নাশকতার লক্ষ্য হতে পারে। এদিকে রাশিয়া ও ব্রিটেনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কও আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিনও দায়িত্ব শেষে দেশ ছেড়েছেন এবং এখনো তার স্থলাভিষিক্ত কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, পুতিনের হুমকির অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে পশ্চিমা দেশগুলোকে ইউক্রেনের প্রতি সামরিক সহায়তা কমাতে চাপ দেওয়া। সরাসরি ব্রিটেনের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, রাশিয়ার সাইবার হামলা, নাশকতা ও অন্যান্য গোপন তৎপরতার ঝুঁকি যে বাস্তব—এ বিষয়ে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে ইউক্রেনকে ব্রিটিশ সামরিক সহায়তা এবং রাশিয়ার পাল্টা হুমকিকে ঘিরে লন্ডন-মস্কো উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সরাসরি সংঘাতে না গিয়েও এই পরিস্থিতি ইউরোপের নিরাপত্তা ও রাশিয়া-ন্যাটো সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না পেয়ে এবার সেনাদের হারানো মনোবল চাঙা করতে মধ্যযুগীয় ইতিহাস ও ধর্মীয় আবেগের দ্বারস্থ হয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। চতুর্দশ শতকের বিখ্যাত রুশ সামরিক নেতা গ্র্যান্ড প্রিন্স দিমিত্রি দনস্কয়ের সদ্য আবিষ্কৃত দেহাবশেষ বা হাড়গোড় ইউক্রেনে যুদ্ধরত রুশ সেনাদের কাছে পাঠানোর এক ব্যতিক্রমী পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি বিস্টের এক প্রতিবেদনে পুতিনের এই অভিনব যুদ্ধ-কৌশলের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি মস্কোর ঐতিহাসিক আর্কেঞ্জেল ক্যাথেড্রালের সংস্কারকাজ চলার সময় দিমিত্রি দনস্কয়ের এই দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয় বলে জানায় রুশ অর্থোডক্স চার্চ। তাদের দাবি, ১৩৮৯ সালে মারা যাওয়া এই বীরের দেহাবশেষ প্রায় সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে; কেবল বাম পায়ের গোড়ালির একটি হাড় ছাড়া। এই আবিষ্কারের পরপরই গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ক্যাথেড্রালটি পরিদর্শনে যান ৭৩ বছর বয়সী পুতিন। ক্রেমলিনের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি মোমবাতি হাতে প্রার্থনাসভায় অংশ নিচ্ছেন এবং রুশ সেনাবাহিনীর বিজয় ও জাতির জন্য আশীর্বাদ কামনা করছেন। প্রার্থনা শেষে তিনি কাপড়ে ঢাকা ওই দেহাবশেষ রাখা দুটি খোলা সমাধিও ঘুরে দেখেন। রুশ ইতিহাসে দিমিত্রি দনস্কয় এক কিংবদন্তি সামরিক বীর, যিনি ১৩৮০ সালের কুলিকোভোর যুদ্ধে দুর্ধর্ষ মঙ্গোল বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন। রুশ অর্থোডক্স চার্চের প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল এই বীরের দেহাবশেষের কিছু অংশ ইউক্রেন ফ্রন্টে লড়াইরত সেনাদের কাছে পাঠানোর প্রস্তাব দিলে পুতিন তাতে সম্মতি দেন। যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে এমন এক কিংবদন্তি বীরের দেহাবশেষ আবিষ্কারের ঘটনাকে ‘বিস্ময়কর’ ও ‘অলৌকিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে রাশিয়াকে বিপুল সামরিক সরঞ্জাম হারাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিতে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। দেশ ও দেশের বাইরে যখন পুতিনের ওপর চাপ বাড়ছে, ঠিক তখনই মধ্যযুগীয় এক বীরের স্মৃতি ও ধর্মীয় প্রতীককে সামনে এনে রুশ বাহিনীর মনোবল পুনরুদ্ধারের এই আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে ক্রেমলিন।
ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ এবার আরও গভীরে পৌঁছেছে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয়। রাতভর মস্কো ও আশপাশের অঞ্চল লক্ষ্য করে ৬২০টি ড্রোন পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা। একই সময়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ব্রিটিশ তৈরি ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগ তুলে যুক্তরাজ্যকে ‘পরিণতি ভোগ করতে হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে মস্কো। মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত চলা হামলা নিয়ে মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানান, রাজধানী ও আশপাশের এলাকা লক্ষ্য করে আসা ড্রোনগুলোর মধ্যে অন্তত ১৮০টি ধ্বংস করেছে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। তবে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ৬২০ ড্রোন পাঠানোর এই সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। কয়েকটি ভবন ও স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া গেছে। রাশিয়ার রাজধানীর দিকে এত বিপুলসংখ্যক ড্রোন পাঠানোর ঘটনা ইউক্রেন যুদ্ধের পরিবর্তিত চিত্র সামনে আনছে। সম্মুখযুদ্ধের পাশাপাশি দুই দেশই এখন দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত বাড়াচ্ছে। ইউক্রেন বিশেষভাবে রাশিয়ার সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং যুদ্ধের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে। তবে এবারের ঘটনাপ্রবাহ শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নতুন করে উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাজ্যও। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের দুটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ড্রোন ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে হামলার জন্য ব্যবহার করছে। এসব হামলায় রাশিয়ার সামরিক ও শিল্প স্থাপনাসহ তেল শোধনাগার এবং বিভিন্ন লজিস্টিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এরপরই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে লন্ডনে রুশ দূতাবাস। রাশিয়ার অভিযোগ, ইউক্রেনকে এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য শুধু কিয়েভকে সহায়তা করছে না - বরং রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলার সহযোগীতে পরিণত হচ্ছে। মস্কোর হুঁশিয়ারি, সংঘাতে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা যত বাড়বে, দেশটিকে তার জন্য তত বড় মূল্য দিতে হতে পারে। তবে রাশিয়ার এসব অভিযোগ ও হুঁশিয়ারির পরও অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি ব্রিটেন। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ মস্কোর সতর্কবার্তার পরও কিয়েভকে সামরিক সহায়তা থেকে সরে আসার কোনো ঘোষণা দেয়নি লন্ডন। ফলে ব্রিটিশ তৈরি ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে রাশিয়ার অভিযোগ এখন ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে মস্কো ও লন্ডনের পুরোনো উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেন যখন রাশিয়ার গভীরে হামলার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তখন ইউক্রেনের জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোর ওপরও আক্রমণ জোরদার করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান নাফটোগাজ জানিয়েছে, মাত্র এক সপ্তাহে তাদের স্থাপনাগুলোতে ১৩টি রুশ হামলা হয়েছে। ইউক্রেনের অভিযোগ, শীতের আগে দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থা দুর্বল করে দিতেই পরিকল্পিতভাবে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক রুশ হামলায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নিজ শহর ক্রিভি রিহের একটি বড় ইস্পাত কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে দুইজন নিহত এবং অন্তত ১৪ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাল্টাপাল্টি এসব হামলা দেখাচ্ছে, যুদ্ধ এখন আর শুধু সম্মুখসারিতে সীমাবদ্ধ নেই - উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত হানার চেষ্টা করছে। আর ব্রিটিশ তৈরি ড্রোন রাশিয়ার অভ্যন্তরে ব্যবহারের অভিযোগ সেই উত্তেজনাকে আরও বড় আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু ইউক্রেন রাশিয়ার কতটা গভীরে আঘাত করতে পারছে, সেটি নয় - পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ করা অস্ত্র রাশিয়ার অভ্যন্তরে কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর জবাবে মস্কো কতদূর যেতে প্রস্তুত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ৬২০ ড্রোনের বিশাল হামলার পর তাই নজর এখন মস্কোর পরবর্তী পদক্ষেপে। বিশেষ করে ব্রিটেনকে দেওয়া ‘পরিণতি ভোগের’ হুঁশিয়ারি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি রাশিয়া সেটিকে বাস্তব কোনো পদক্ষেপে রূপ দেয় - সেটিই এখন লন্ডন-মস্কোর ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পরবর্তী বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে ইউক্রেন। তবে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় এই সরবরাহ যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়মিত সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলাবারুদ ও ইন্টারসেপ্টর ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, প্রতি মাসে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সমঝোতা রয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি এবং রাশিয়ার হামলার মাত্রা বিবেচনায় ইউক্রেনের আরও বেশি সরঞ্জাম প্রয়োজন। রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলার কারণে কিয়েভ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর চেয়ে আসছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতার কারণে কিয়েভ বারবার আরও প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ও এর ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে। জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়মিত সরবরাহের সমঝোতা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় কিছুটা নিশ্চয়তা তৈরি করলেও বর্তমান চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট নয়। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিয়েভ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি খেরসন শহরের একটি বাজার এলাকায় ঘটে। পরে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ ভিডিওটি প্রকাশ করলে সেটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যাচাই করে। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ৫২ বছর বয়সী এক সবজি বিক্রেতা নিজের গাড়ি থেকে সবজি নামানোর সময় একটি রুশ চালকবিহীন উড়োজাহাজ তাকে অনুসরণ করতে থাকে। প্রাণ বাঁচাতে তিনি গাড়ির চারপাশে দৌড়ানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে উড়োজাহাজটি তার খুব কাছে বিস্ফোরিত হলে তিনি আহত হন।বিস্ফোরণের ধাতব খণ্ড তার পা ও পিঠে বিদ্ধ হয়। পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে থাকা তার স্ত্রী অক্ষত ছিলেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ ঘটনাকে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ইউক্রেনের জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে। দেশটির প্রসিকিউটরদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী সাধারণ নাগরিককে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই হামলার সব তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রাশিয়া এ ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মস্কো বারবার দাবি করে আসছে, তারা সাধারণ নাগরিককে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। অন্যদিকে ইউক্রেন বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে খেরসনসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় সাধারণ মানুষের ওপর চালকবিহীন উড়োজাহাজের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ইউক্রেনে সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এসব হতাহতের বড় একটি অংশ ঘটেছে চালকবিহীন উড়োজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়।
ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর সামরিক সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে এবার রাশিয়ায় একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েন করছে উত্তর কোরিয়া। কিয়েভের দেওয়া তথ্যমতে, রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলে অবস্থিত ১১২তম মিসাইল ব্রিগেডের অধীনে প্রায় ৯০ জন উত্তর কোরিয়ান কর্মীকে নিয়ে এই বিশেষ ইউনিটটি গঠন করা হচ্ছে। আগামী মাসে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সামরিক মোতায়েনের চূড়ান্ত রূপরেখা এবং মোট ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা নির্ধারিত হবে বলে জানা গেছে। তবে প্রাথমিকভাবে কিয়েভ ধারণা করছে, এই ইউনিটে অন্তত ১২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি লঞ্চার যুক্ত থাকতে পারে। উত্তর কোরিয়ার এই পদক্ষেপ ইউক্রেনের জন্য নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে কিয়েভ উচ্চমানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সংকট আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, কারণ এ ধরনের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ভূপাতিত করা অত্যন্ত কঠিন। বিদেশি থিঙ্ক ট্যাংকের সামরিক বিশ্লেষক রব লি উল্লেখ করেছেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই অভাবই বর্তমানে ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা। বিশেষ করে আসন্ন শীতকালে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনের পাওয়ার গ্রিড বা জ্বালানি অবকাঠামোতে ভারী হামলার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা কিয়েভের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এর আগে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকেই রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার তৈরি প্রায় ১৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের রাদুশনে গ্রামে উত্তর কোরীয় একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পিয়ংইয়ং রাশিয়াকে কোটি কোটি আর্টিলারি শেল বা গোলা সরবরাহ করেছে। পাশাপাশি রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে হাজার হাজার উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের খবরও সামনে এসেছে। তবে নতুন করে এই ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট গঠনের বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘে অবস্থিত উত্তর কোরিয়ার দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও আশপাশের অঞ্চলে রাশিয়ার ব্যাপক রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত এবং অন্তত ৪৪ জন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, হামলায় ব্যবহৃত কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি, কারণ দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকট রয়েছে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ২৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, চারটি উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১১৫টি ড্রোন নিক্ষেপ করে। ড্রোনগুলোর বেশিরভাগই ভূপাতিত করা গেলেও কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আটকানো যায়নি। হামলায় কিয়েভ, ব্রোভারি, বুচা ও ফাস্টিভ এলাকায় গুদামঘর, রেলওয়ে স্থাপনা, শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, দ্রুত পর্যাপ্ত ব্যালিস্টিক প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করা হলে অনেক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো। তিনি পশ্চিমা মিত্রদের প্রতি দ্রুত সহায়তা পাঠানোর আহ্বান জানান এবং বিলম্বের কারণে বেসামরিক মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে বলে সতর্ক করেন। কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানান, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলার পর বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে এবং উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। কিছু এলাকায় রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও তদন্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা। তবে ইউক্রেনের সরকার বলছে, হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল বেসামরিক অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহর আগের তুলনায় আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
রাশিয়ার ই-কমার্স জায়ান্ট 'ওয়াইল্ডবেরিজ'-এর গুদামসহ একাধিক বাণিজ্যিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইউক্রেনের ভয়াবহ ড্রোন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার দিবাগত রাতভর চালানো এই হামলায় ওয়াইল্ডবেরিজ ছাড়াও রুশ খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান 'লেন্তা'-এর একটি গুদামে আগুন ধরে যায়। বিগত দুই সপ্তাহ ধরে ওয়াইল্ডবেরিজের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রায় প্রতিদিনই ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে কিয়েভ। মস্কোর আঞ্চলিক গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ নিশ্চিত করেছেন যে, মস্কো অঞ্চলের চেখভ শহরে একটি গুদামে ড্রোনের আঘাতে ওই পাঁচজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও অন্তত দশজন আহত হয়েছেন। এছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় লেনিনগ্রাদ এবং মস্কোর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত তেভের অঞ্চলেও ওয়াইল্ডবেরিজের দুটি গুদামে ড্রোনের আঘাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, তবে সেখানে কেউ হতাহত হননি। অপরদিকে লেনিনগ্রাদে লেন্টা-এর একটি লজিস্টিক সেন্টারে হামলায় একজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত রাশিয়া ও ক্রিমিয়া অঞ্চল মিলিয়ে মোট ৩২০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন তারা প্রতিহত করেছে। গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউক্রেন ওয়াইল্ডবেরিজের প্রায় দুই ডজন লজিস্টিক সেন্টারে হামলা চালিয়েছে। কিয়েভের অভিযোগ, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি রুশ সামরিক বাহিনীকে ড্রোনের যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে। ফোর্বস রাশিয়ার তথ্যমতে, টানা এই হামলার কারণে প্রতিষ্ঠানটির গুদাম সক্ষমতার একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং থার্ড-পার্টি বিক্রেতারা শত শত বিলিয়ন রুবলের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ক্রমাগত হামলার মুখে পড়ে ওয়াইল্ডবেরিজ এখন কাজাখস্তানে ২ লাখ ৬০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের বিশাল গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, যা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সম্পন্ন হতে পারে। এদিকে, রাশিয়ার অভ্যন্তরে যখন ইউক্রেনের এই জোরালো আক্রমণ চলছে, তখন ইউক্রেনেও রুশ আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার ইউক্রেনের আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার রাতে উত্তরাঞ্চলীয় সুমি শহরে রাশিয়ার গাইডেড বোমা হামলায় দুই শিশু ও এক বৃদ্ধা মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।
কৃষ্ণসাগরে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার পর নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তুরস্ক। আঙ্কারা বলেছে, বেসামরিক জাহাজ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা বজায় রাখতে উভয় দেশকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলায় একটি তুর্কি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে তিনজন নাবিক গুরুতর আহত হন। আহতদের চিকিৎসার বিষয়টি তুরস্ক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানানো হয়েছে। আঙ্কারা আরও বলেছে, কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই এমন ঘটনা এড়াতে এবং নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এটি প্রথমবার নয়। চলতি বছর কৃষ্ণসাগরে তুর্কি মালিকানাধীন একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার পর তুরস্ক বারবার মস্কো ও কিয়েভের কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়ে বেসামরিক জাহাজে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কৃষ্ণসাগর আন্তর্জাতিক শিপিং ও শস্য রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।