বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এই অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ইরানের বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই পদক্ষেপে ইরান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তেহরানের সামনে পাল্টা কোনো বিকল্প পথ খোলা আছে কি? অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ইরান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নৌ-অবরোধের ফলে ইরান প্রতিদিন প্রায় ২৭৬ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের রপ্তানি আয় হারাতে পারে। এছাড়া আমদানি খাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে ইরানের প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের তেল নির্ভর অর্থনীতি এই ধাক্কা কতদিন সামলাতে পারবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। তেহরানের হাতে কি কোনো ‘এস্কেপ রুট’ আছে? আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এই অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিলেও তারা বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। ওমান উপসাগর এবং পাকিস্তানের সীমান্ত ব্যবহার করে স্থলপথে বাণিজ্য চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে তেহরান। এছাড়া চীন ও রাশিয়ার মতো মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতায় অবরোধ পাশ কাটিয়ে সীমিত আকারে তেল সরবরাহের চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালীর মতো বিশাল করিডোর বন্ধ হয়ে গেলে সেই ঘাটতি অন্য কোনো পথে পূরণ করা ইরানের জন্য প্রায় অসম্ভব। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বের অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের এই একক অবরোধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, অবরোধ চলাকালীন কোনো ইরানি জাহাজ মার্কিন নৌবহরের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে সেটিকে তাৎক্ষণিক ধ্বংস করা হবে। তবে তিনি এখনো আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন বলে দাবি করেছেন। নসব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীতে দুই শক্তির এই ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী শুক্রবার দেশ দুটির পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় (এলিসি প্যালেস) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন। মূলত হরমুজ প্রণালীতে একটি ‘বিশুদ্ধ রক্ষণাত্মক মিশন’ (Purely defensive mission) পরিচালনার লক্ষ্যেই এই আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই মিশনের মূল লক্ষ্য। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে একটি বিশেষ অপারেশন চালুর বিষয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে তেলবাহী ট্যাংকার ও কন্টেইনার জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পারাপার করা হবে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে অস্থিরতা ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সেই সংকট নিরসনেই ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইউরোপীয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে এই বিশেষ সুরক্ষা মিশন গঠন করতে যাচ্ছে।
শনিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী থেকে সমুদ্র মাইন অপসারণের কাজ শুরু করেছে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। যুদ্ধবিরতি ঘোষণা সত্ত্বেও প্রণালীটির কিছু অংশে জাহাজ চলাচল এখনো বিপজ্জনক থাকায় এই বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই. পিটারসন' এবং 'ইউএসএস মাইকেল মারফি' বর্তমানে আরব উপসাগরে অবস্থান করছে। সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) কর্তৃক পেতে রাখা মাইনগুলো পরিষ্কার করে জলপথটিকে সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, "আমরা আজ থেকে একটি নতুন এবং নিরাপদ জাহাজ চলাচলের পথ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছি। খুব শীঘ্রই এই নিরাপদ রুটের তথ্য আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক শিল্প সংস্থাগুলোর সাথে শেয়ার করা হবে, যাতে বিশ্ব বাণিজ্য পুনরায় স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে।" প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে এই পদক্ষেপকে বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি আমেরিকার একটি "উপহার" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের স্বার্থেই আমেরিকা এই ঝুঁকি গ্রহণ করেছে। উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সিএনএন-এর তথ্যমতে এ পর্যন্ত মাত্র ৩০টির মতো জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করতে পেরেছে। মাইনের পাশাপাশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি এখনো বিদ্যমান থাকায় পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ হরমুজ প্রণালীতে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিশেষ ফোনালাপ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। গতকাল রাতে অনুষ্ঠিত এই দীর্ঘ সংলাপে দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সামরিক কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আজ কাতার সফররত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি যদি দীর্ঘমেয়াদী করতে হয়, তবে এই প্রক্রিয়ায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। স্টারমার বলেন, “উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সরাসরি প্রতিবেশী। যুদ্ধবিরতি টেকসই করতে হলে তাদের মতামতের গুরুত্ব দিতেই হবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে এই দেশগুলোর অত্যন্ত জোরালো অবস্থান রয়েছে।” ফোনালাপের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ ও বাধাহীন নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নৌ-চলাচল এখন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে মার্কিন ও ব্রিটিশ মিত্রদের সঙ্গে ন্যাটো সদস্যদের কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অনীহার কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোটের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এমন এক নাজুক সময়ে ট্রাম্প ও স্টারমারের এই ফোনালাপ কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এই দেশগুলোর পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “সংকটের এই মুহূর্তে বন্ধু এবং মিত্র হিসেবে আমরা তাদের পাশে আছি। এই সংঘাত হয়তো আগামী এক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে। তাই আমাদের অত্যন্ত শক্তি ও সাহসের সাথে এর মোকাবিলা করতে হবে।” তিন দিনের মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষে স্টারমার স্পষ্ট করেন যে, ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই এখন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একযোগে কাজ করতে বদ্ধপরিকর।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এবং চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান এই আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করছে। অন্যদিকে, ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রণালিটির ব্যবস্থাপনায় ‘নতুন পর্যায়’ শুরুর ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তুলেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে কড়া ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে ইরান অত্যন্ত "অসম্মানজনক" কাজ করছে এবং বিভিন্ন ট্যাংকার থেকে বেআইনিভাবে 'ফি' আদায় করছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানের এই কর্মকাণ্ড বর্তমান চুক্তির পরিপন্থী এবং এটি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বার্তায় দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানই "বিজয়ী জাতি" হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান প্রতিটি ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করবে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে তার রহস্যময় বার্তা—"ব্যবস্থাপনাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া"—আন্তর্জাতিক মহলে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে না আসলেও তার এই বার্তা তেহরানের কঠোর অবস্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্য দিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প টেলিফোনে আলাপকালে হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, এই নৌপথ পুনরুদ্ধারে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী ধাপে কাজ করতে একমত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি এখনো থমথমে। লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় ৩০৩ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে, যা চুক্তির ভবিষ্যৎকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটিয়ে পুনরায় সচল হতে যাচ্ছে। ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রস্তাবিত বৈঠকের আগেই আগামী বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবার এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি উন্মুক্ত করে দিতে পারে তেহরান। তবে এই সিদ্ধান্তটি মূলত একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। চলমান সংঘাতের শুরু থেকেই ইরান এই কৌশলগত প্রণালীটি বন্ধ রাখায় বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, যা বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে তেহরান এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে সম্মত হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি ইরানি সামরিক বাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ও সমন্বয়ে সম্পন্ন হবে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় মাইলফলক হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন সচল রাখে যে সমুদ্রপথগুলো, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেগুলো এখন চরম ঝুঁকির মুখে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় টালমাটাল বিশ্ববাজার। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক অস্থিরতার ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। তবে কেবল হরমুজ নয়, বিশ্বের মোট বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র পাঁচটি সরু জলপথ বা 'বটলনেক', যার একটি বন্ধ হওয়া মানেই বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট। ১. হরমুজ প্রণালি: বিশ্বের জ্বালানি নাভি পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরকে সংযুক্তকারী এই পথটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ। সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ৩৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৯ শতাংশ এখান দিয়েই যায়। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনায় বর্তমানে এই পথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আইইএ-র মতে, এটি তেলের বাজারে ইতিহাসের বড় সরবরাহ বিপর্যয় ঘটাতে পারে। ২. সুয়েজ খাল ও বাবে আল মানদাব: ইউরোপ-এশিয়ার সেতুবন্ধন বিশ্ব বাণিজ্যের ১০ শতাংশ এবং কন্টেইনার পরিবহনের ২২ শতাংশ হয় সুয়েজ খাল দিয়ে। কিন্তু লোহিত সাগরের প্রবেশপথে হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত ড্রোন ও মিসাইল হামলা এই রুটকে অনিরাপদ করে তুলেছে। ফলে ২০২৪ সালে এই পথে জাহাজ চলাচল অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা বৈশ্বিক পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ৩. মালাক্কা প্রণালি: চীনের 'মালাক্কা ডিলেমা' সিঙ্গাপুরের পাশ দিয়ে যাওয়া এই রুটটি বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ। চীনের ৮০ শতাংশ তেল আমদানি হয় এই পথ দিয়ে। পাইরেসি বা জলদস্যুতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রে রয়েছে এই সরু জলপথটি। ৪. পানামা খাল: খরা ও আধিপত্যের লড়াই প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করা এই খালটি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার। তীব্র খরার কারণে পানির স্তর কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল সীমিত করতে হয়েছে। পাশাপাশি এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনপন্থী কোম্পানিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ৫. তার্কিশ প্রণালি: বিশ্বের শস্য ভাণ্ডার বসফোরাস ও দার্দেনেলিস প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ গম রপ্তানি হয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে এই পথটি এখন সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই পথে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে আটা ও ময়দার দামে আগুন লাগতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব বাণিজ্য এই অল্প কয়েকটি বিন্দুর ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, যেকোনো একটি পথে দুর্ঘটনা বা যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত হিসেবে তেহরান দুটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, তেহরান এখন থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর 'টোল' বা মাশুল আরোপ করতে চায়। একই সাথে, অঞ্চলটি থেকে সমস্ত মার্কিন যুদ্ধকালীন বাহিনী প্রত্যাহারের দাবিও জোরালো করেছে তারা। এই পরিস্থিতিতে সবচাইতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই টোল কি মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ওপরও প্রযোজ্য হবে? বাহরাইনে সদর দপ্তর অবস্থিত মার্কিন ৫ম নৌবহরের (5th Fleet) জন্য এটি একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কারণ, এই নৌবহরটি পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর, লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরের বিশাল জলসীমার নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। হরমুজ প্রণালী ছাড়াও সুয়েজ খাল এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক কলিন কোহ-এর মতে, যদি ইরান সফলভাবে টোল আদায় শুরু করে, তবে পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক প্রবেশাধিকার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তার মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেন্টকমের (CENTCOM) পুরো অবস্থান পরিবর্তন না করেন, তবে এই টোল ব্যবস্থা মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ মোকাবিলায় নতুন রণকৌশল নিয়েছে ইরান ও চীন। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ ব্যবহার করে এবার ডলারের পরিবর্তে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এর প্রচলন শুরু করেছে দেশ দুটি। আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধাবস্থার মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন টালমাটাল, ঠিক তখনই তেহরান ও বেইজিং এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ট্রানজিট ফি হিসেবে ডলারের পরিবর্তে ইউয়ান গ্রহণ করছে ইরান। অন্তত দুটি বড় জাহাজ ইতোমধ্যে ইউয়ানে তাদের ফি পরিশোধ করেছে বলে লয়েড’স লিস্ট (Lloyd’s List) নিশ্চিত করেছে। কেন এই পদক্ষেপ? বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও চীন উভয়েই দীর্ঘকাল ধরে ওয়াশিংটনের ‘ডলার ডিপ্লোমেসি’ বা ডলারের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার রাজনীতির শিকার। বিশ্ব তেলের বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন ডলারে হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই যেকোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই আধিপত্য খর্ব করতেই তেহরান ও বেইজিং এখন ‘পেট্রো-ইউয়ান’ (Petroyuan) ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ আল-জাজিরাকে বলেন, "ইরান একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে আঙুল দিয়ে নিজেদের শক্তি দেখাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইউয়ানকে বেছে নিয়েছে। চীনও চাইছে তাদের মুদ্রাকে বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সিতে রূপান্তর করতে।" সুবিধা ভোগ করছে দুই পক্ষই চীনের জন্য এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশটি ইরানের তেলের ৮০ শতাংশেরই ক্রেতা। ইউয়ানে লেনদেন করলে উভয় দেশই মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সহজে ও কম খরচে বাণিজ্য করতে পারছে। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বের আওতায় এই সহযোগিতা আরও জোরালো হয়েছে। ডলারের ভবিষ্যৎ কী? যদিও ইউয়ান দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছে, তবে মার্কিন ডলারের জায়গা দখল করা এখনো বেশ কঠিন। বর্তমানে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫৭ শতাংশই ডলারে রাখা হয়, যেখানে ইউয়ানের অবস্থান মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া চীনের কঠোর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ইউয়ান এখনো ডলারের মতো অবাধে বিনিময়যোগ্য নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি একদিনে সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে ডলারের ভিত দুর্বল করে দিচ্ছে। কিলে ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বুলেন্ট গোকায় বলেন, বেইজিং একটি 'মাল্টিপোলার' বা বহুমুখী আর্থিক বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে, যেখানে একক কোনো মুদ্রার খবরদারি থাকবে না। ইরান বুধবার ঘোষণা করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় তারা হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ যাতায়াতের গ্যারান্টি দেবে। তবে এই সময়ের মধ্যেও ইউয়ানে লেনদেন অব্যাহত থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ডলারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে আনা একটি প্রস্তাব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নাকচ হয়ে গেছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন ও রাশিয়া তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে বাহরাইন সমর্থিত এই প্রস্তাবটি আটকে দেয়। নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত এই খসড়া প্রস্তাবে সদস্য দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসকর্ট প্রদানসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা মূলক পদক্ষেপে সমন্বয় করার জন্য "জোরালো উৎসাহ" দেওয়া হয়েছিল। কূটনৈতিক সূত্রমতে, প্রস্তাবটি ছিল মূল খসড়ার একটি নমনীয় সংস্করণ। উল্লেখ্য যে, মূল খসড়াটিতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিধান রাখা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে চীন ও রাশিয়ার আপত্তি এড়াতে বাদ দেওয়া হয়। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। বিপরীতে চীন ও রাশিয়া বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় প্রস্তাবটি গৃহীত হতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া দুটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। প্রস্তাবটি পণ্ড হওয়ার পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওয়াল্টজ চীন ও রাশিয়ার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দেশ দুটি এমন একটি শাসনের পক্ষ নিচ্ছে যারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে ভয় দেখিয়ে বশ করতে চায়। অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া যুক্তি দেন যে, এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে একটি "বিপজ্জনক নজির" তৈরি করতে পারে। ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেন, প্রস্তাবটি পাস না হলেও ১১টি দেশের সমর্থন প্রমাণ করে যে বিশ্ব সম্প্রদায়ের বড় অংশ নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থার কারণে এবার বিশ্বজুড়ে তীব্র হিলিয়াম সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেল বা এলএনজি নিয়ে আলোচনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া এই ‘হিলিয়াম সংকট’ এখন আধুনিক সভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসা, সেমিকন্ডাক্টর এবং মহাকাশ গবেষণা খাতে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। বিশ্বের মোট হিলিয়াম চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। বর্তমানে ইরানের নিষেধাজ্ঞায় এই রুটটি বন্ধ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এছাড়া কাতারে জ্বালানি গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে ইরানি হামলায় এলএনজির পাশাপাশি হিলিয়াম উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, কাতার একাই বিশ্বের ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ হিলিয়াম সরবরাহ করে। আমেরিকা ও রাশিয়ার সামান্য উৎপাদন থাকলেও তা বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে একেবারেই অপর্যাপ্ত। হিলিয়াম গ্যাসের এই সংকটে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে চিকিৎসা খাত। এমআরআই (MRI) মেশিন সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ হিলিয়াম প্রয়োজন হয়। এই গ্যাসের অভাব দেখা দিলে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। পাশাপাশি সংকটে পড়েছে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নির্মাণ শিল্প। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) এই যুগে চিপ তৈরিতে হিলিয়াম অপরিহার্য, যা চিপ উৎপাদন প্রক্রিয়াকে শীতল রাখতে ব্যবহৃত হয়। সরবরাহ বন্ধ থাকলে ডেটা সেন্টার এবং এআই প্রযুক্তির বিকাশ থমকে যেতে পারে। মহাকাশ গবেষণাতেও হিলিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম। রকেট উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে ফাইবার অপটিক্স এবং ওয়েল্ডিং শিল্পেও এই গ্যাসের বিকল্প নেই। এদিকে ভারতের মতো দেশগুলো যারা তাদের চাহিদার শতভাগ হিলিয়াম আমদানি করে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বর্তমানে হরমুজে আটকে থাকা ২০০টিরও বেশি জাহাজে আটকা পড়ে আছে জরুরি হিলিয়াম গ্যাস। হাতে থাকা মজুদ ফুরিয়ে আসছে দ্রুত, আর সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে পৃথিবী এক চরম সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা নিরসনে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে বিশ্বজুড়ে কূটনীতিকদের একটি বড় জোট। সামরিক অভিযানের পরিবর্তে তারা এখন সংকট মোকাবিলায় কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস্পেন বার্থ এইড এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন। সম্প্রতি ৪০টিরও বেশি দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধস নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এইড বলেন, "যুদ্ধ চলাকালীন সামরিকভাবে আসলে কতটুকু অর্জন করা সম্ভব, সে বিষয়ে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। এই জোট ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক পন্থায় অগ্রসর হবে।" নরওয়ের এই অবস্থানের সাথে একমত পোষণ করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। তিনি ইরানের সাথে আলোচনার পক্ষ নিয়ে বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথটি পুনরায় সচল করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের চিন্তা করা "অবাস্তব"। উল্লেখ্য যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার জন্য সমালোচনা করেছিলেন এবং তাদের হরমুজ প্রণালী "দখল" করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমনকি তিনি ন্যাটো (NATO) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দেন। ট্রাম্পের এই বিতর্কিত অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যাটো জোটের কৌশলগত পার্থক্যের কথা মনে করিয়ে দেন। এস্পেন বার্থ এইড স্পষ্ট করে বলেন, "যখন কোনো সদস্য রাষ্ট্র নিজেদের পছন্দে অন্য কোথাও যুদ্ধ শুরু করে, তখন ন্যাটো সেই যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য নয়। তবে ৯/১১ হামলার সময় আমাদের এক সদস্য আক্রান্ত হওয়ায় আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।" বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব নেতারা যুদ্ধের দাবানল আরও ছড়িয়ে না দিয়ে আলোচনার টেবিলেই সংকটের সমাধান খুঁজছেন।
ইরানের সাথে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ সচল করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক শক্তি প্রয়োগের আহ্বানকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। ট্রাম্পের এই প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফরে থাকা ম্যাখোঁ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে জোরপূর্বক হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার ধারণাটি বাস্তবসম্মত নয়। তিনি মনে করেন, এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে পরমাণু সংকটের কোনো সমাধান আনতে পারবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি অভিযোগ করেছিলেন যে, মিত্র দেশগুলো তাকে ইরানের বিরুদ্ধে যথাযথ সমর্থন দিচ্ছে না। তিনি প্রকাশ্যেই আহ্বান জানিয়েছিলেন, অন্য দেশগুলোর উচিত হরমুজ প্রণালীতে গিয়ে সেটি দখল করে নেওয়া। এর জবাবে ম্যাখোঁ বলেন, "গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে কথা বলার সময় প্রতিদিন নিজের অবস্থানের পরিবর্তন করা মোটেও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।" ম্যাখোঁ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান বিরোধী চলমান এই অভিযান মূলত মার্কিন-ইসরায়েল জোটের একটি নিজস্ব পরিকল্পনা এবং ফ্রান্স এতে কোনোভাবেই অংশ নেবে না। তার মতে, একটি সফল সমাধানের জন্য প্রয়োজন: অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা। ইরানের সাথে পুনরায় কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে একটি 'রিঅ্যাসুরেন্স মিশন' বা নিরাপত্তা দল গঠন করা। ম্যাখোঁ আরও উল্লেখ করেন যে, বাইরের প্রতিনিধিদের দিয়ে যথাযথ পরিদর্শন ছাড়া চলমান এই সামরিক পদক্ষেপ মোটেও ফলপ্রসূ হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানে দক্ষ জনবল এবং গোপন পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যেভাবে রয়ে গেছে, তাতে কয়েক সপ্তাহের টার্গেটেড হামলা এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান দিতে অক্ষম।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তজনা নিরসনে একজোট হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। টোকিও’র আকাসাকা প্রাসাদে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই বিশ্বনেতা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাপান সফররত ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জানান, ফ্রান্স ও জাপান উভয় রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তিনি বলেন, আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য হলো শান্তি ফিরিয়ে আনা। আমরা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পক্ষে জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির নাজুকতা তুলে ধরে বলেন, সংঘাতের দ্রুত প্রশমন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুই দেশ একমত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের এই কঠিন আন্তর্জাতিক পরিবেশে ফ্রান্স ও জাপানের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা গভীর হওয়া অত্যন্ত অর্থবহ। দুই নেতাই মনে করেন, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা বজায় রাখা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ কোনো একক দেশের সিদ্ধান্তে নয়, বরং এই অঞ্চলের সকল দেশের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজ এক সংবাদ সম্মেলনে এই আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা বজায় রাখা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। কাতার মনে করে, এই জলপথের নিরাপত্তা এবং এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি রক্ষায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে দোহা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা এক নতুন মোড় নিয়েছে। ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাতটি দ্বীপ—আবু মুসা, বৃহত্তর তুনব, ক্ষুদ্রতর তুনব, হেঙ্গাম, কেশম, লারাক এবং হরমুজ—এখন পেন্টাগনের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার 'হরমুজ প্রণালী'র নিয়ন্ত্রণ নিতে এই দ্বীপগুলো দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার সময়সীমা আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ালেও, রণপ্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র "বোমার মাধ্যমেই আলোচনা" চালিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৪,০০০ মেরিন সেনা এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ১,০০০ সদস্যকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চীনা ও ইরানি গবেষকদের মতে, এই দ্বীপগুলো একত্রে ইরানের একটি "আর্চ ডিফেন্স" বা ধনুকাকৃতি প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করে। বিশেষ করে আবু মুসা ও দুই তুনব দ্বীপের অবস্থান এমন জায়গায়, যেখানে পানির গভীরতা কম হওয়ায় বড় যুদ্ধজাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কারগুলো এই দ্বীপগুলোর খুব কাছ দিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এখান থেকেই ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ড্রোন বা দ্রুতগামী বোটের সাহায্যে যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। আইআরজিসি কমান্ডাররা এই দ্বীপগুলোকে "অজেয় বিমানবাহী রণতরী" হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্লেষক কার্ল শুস্টার সিএনএন-কে জানিয়েছেন, এই দ্বীপগুলো দখল করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশ ও জলপথ—উভয় দিক থেকেই আক্রমণ চালাতে হতে পারে। তবে এটি মোটেও সহজ হবে না। লারাক দ্বীপ থেকে ইরানের মিসাইল হামলা মার্কিন নৌবহরের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া, দ্বীপগুলো দখল করার পর সেখানে প্রায় ২,০০০ সৈন্যের স্থায়ী অবস্থান প্রয়োজন হবে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। এই সামরিক উত্তেজনার মাঝে যুক্ত হয়েছে মালিকানা বিতর্ক। ১৯৭১ সাল থেকে ইরান এই দ্বীপগুলো নিয়ন্ত্রণ করলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এগুলোকে নিজেদের দাবি করে আসছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপগুলো দখল করে আমিরাতকে দিয়ে দেয়, তবে ইরানের ভবিষ্যৎ সরকারের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক চিরতরে বিষিয়ে উঠতে পারে। আর যদি ইরানের কাছেই রাখা হয়, তবে দীর্ঘদিনের মিত্র আমিরাত ক্ষুব্ধ হবে। সব মিলিয়ে, পারস্য উপসাগরের এই ক্ষুদ্র দ্বীপগুলোই এখন বিশ্ব রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের আগামীর স্থিতিশীলতা।
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে হামলার কবলে পড়া থাই মালবাহী জাহাজ ‘ময়ূরী নারি’ এবার ইরানি উপকূলে আটকা পড়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে আক্রান্ত হওয়া এই জাহাজটি দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে কিশম দ্বীপের রামচাহ গ্রামের কাছে বালুচরে আটকে যায়। পরবর্তীতে জাহাজটির অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি শুক্রবার জানিয়েছে, জাহাজটি কিশম দ্বীপ থেকে সরে গিয়ে পার্শ্ববর্তী লারাক দ্বীপে পৌঁছেছে। তবে জাহাজটি ঠিক কীভাবে সেখানে পৌঁছাল বা বর্তমানে এর যান্ত্রিক অবস্থা কেমন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি তেহরান। উল্লেখ্য, গত ১১ মার্চ ২৩ জন ক্রু নিয়ে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় জাহাজটিকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলিবর্ষণ করা হয়। ওই ভয়াবহ হামলার পর ৩ জন ক্রু নিখোঁজ হন। বাকি ২০ জনকে উদ্ধার করে নিরাপদে ব্যাংককে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও জাহাজটির ভাগ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছেই না। আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশসহ নির্দিষ্ট ৬টি বন্ধুপ্রতিম দেশের জাহাজে কোনো প্রকার হামলা করা হবে না। বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই স্বস্তির খবর নিশ্চিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান এবং ইরাকের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এই নিরাপত্তা সুবিধার আওতায় থাকবে। আরাগচি বলেন, “ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এই ছয়টি দেশের জাহাজে কোনো হামলা চালানো হবে না। যুদ্ধের এই কঠিন সময়েও দেশগুলো সেখানে ‘নিরাপদ প্যাসেজ’ বা চলাচলের বিশেষ সুবিধা পাবে।” উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান এই কৌশলগত জলপথে অবরোধ জারি করে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং দাম বৃদ্ধিতে অনেক দেশ সংকটে পড়ে। তবে ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে, এই কঠোরতা শুধু ‘শত্রুভাবাপন্ন’ দেশগুলোর জন্য। এদিকে, মিত্র দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরান কিছু নিয়ম জারি করেছে। প্রধান শর্ত হলো— হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগে অবশ্যই ইরানের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিতে হবে। পাশাপাশি ইরানি সংবাদমাধ্যম ফার্স জানিয়েছে, এই জলপথ ব্যবহারের জন্য সব বিদেশি জাহাজকে নির্দিষ্ট হারে ‘টোল’ প্রদানের একটি আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে দেশটির পার্লামেন্ট।
ওয়াশিংটন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী সংকট নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী নিরাপদ রাখতে ন্যাটো মিত্ররা সহযোগিতা না করলে ভবিষ্যতে “খুব খারাপ পরিস্থিতি” তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প বলেন, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই এটি বন্ধ বা অচল হয়ে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। তিনি ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, এই সংকট সমাধানে সহযোগিতা না পেলে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট এর সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক পিছিয়ে দিতে পারেন। তার মতে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় শক্তিগুলোর সমন্বয় জরুরি। এদিকে ইরান ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ছাড়া অন্য সব দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক জোটে বিভক্তি তৈরি করার কৌশল হতে পারে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ Kharg Island ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে সংঘাত বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে।
ইরান যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (AAA) এর তথ্য অনুযায়ী, আজ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম ৩.৭০ ডলারে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে। গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার ২.৬৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৩.১৪ ডলারে বন্ধ হয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ৩.১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৮.৭১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যুদ্ধের শুরু থেকেই এই কৌশলগত জলপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে এই অঞ্চল থেকে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ডিসেম্বরে যেখানে গ্যাসের দাম ২০২১ সালের পর প্রথমবারের মতো ৩ ডলারের নিচে নেমেছিল, এখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কেবল জ্বালানি নয়, জাহাজ ভাড়া এবং সারের দাম বাড়ার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমনকি জ্বালানি তেলের এই ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে বিমান ভাড়াতেও বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে।
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। আজ সকালে মাল্টার পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, 'প্রিমা' নামক ওই তেল ট্যাঙ্কারটি তাদের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল। হরমুজ প্রণালীতে যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ওই অঞ্চলের বর্তমান অনিরাপদ পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করার পরেও জাহাজটি তা অমান্য করায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করছে ইরান। মেরিন ট্রাফিক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার 'প্রিমা' একটি তেল ও রাসায়নিক পণ্য পরিবহনকারী জাহাজ, যা মাল্টার নিবন্ধিত পতাকাতলে চলাচল করছিল। আজকের এই ঘটনা ওই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক নৌপথে নতুন করে অস্থিরতা ও তেলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews