সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এবার এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ, ২০২৬) বাহরাইনে এক নিয়মিত মিশনে থাকা অবস্থায় ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর সাথে কর্মরত এক বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন।
এই নজিরবিহীন হামলায় আমিরাতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরও ৫ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই হতাহতের খবর নিশ্চিত করেছে। নিহত ব্যক্তি মরক্কোর নাগরিক ছিলেন বলে জানা গেছে।
আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি ইরান ও আমিরাতের মধ্যকার ইতিমধ্যে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি নতুন এবং অত্যন্ত স্পর্শকাতর মাত্রা যোগ করল।
প্রথমবারের মতো এই ধরনের সরাসরি হামলায় সামরিক ঠিকাদার নিহত ও সার্ভিসম্যানদের আহত হওয়ার ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে এই উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
ইরান থেকে ছোড়া সস্তা ড্রোন মোকাবিলায় অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে—যা সামরিকভাবে কার্যকর হলেও অর্থনৈতিকভাবে হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ। চলমান সংঘাতে ড্রোন প্রতিরোধে ব্যয়বহুল এই কৌশল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্লেষকদের মধ্যে। পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, নিচু দিয়ে ধীরগতিতে উড়ে আসা ইরানি ড্রোন ধ্বংস করতে যুদ্ধবিমান এখন প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক Center for Security and Emerging Technology-এর গবেষক লরেন কান এ প্রসঙ্গে বলেন, এই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের ব্যবহৃত Shahed-136 ড্রোনের প্রতিটির দাম মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। বিপরীতে একটি F-16 Fighting Falcon যুদ্ধবিমান আকাশে এক ঘণ্টা ওড়াতেই খরচ হয় ২৫ হাজার ডলারের বেশি। শুধু তাই নয়, এসব ড্রোন ভূপাতিত করতে যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, তার খরচ আরও বেশি। যেমন, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য AIM-9X Sidewinder ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটির দাম প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার ডলার। আর AIM-120 AMRAAM ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১০ লাখ ডলারেরও বেশি। ফলে তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ঠেকাতে ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহারের এই সমীকরণকে অনেকেই ‘মশা মারতে কামান দাগানো’র সঙ্গে তুলনা করছেন। Center for Strategic and International Studies-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের ব্যয়বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। একই মত দিয়েছেন Center for Naval Analyses-এর গবেষক স্যামুয়েল বেন্ডেট। তার মতে, সস্তা হুমকি মোকাবিলায় তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প ব্যবস্থাই বেশি কার্যকর। বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধবিমান থেকে ভারী গুলি ব্যবহার করে ড্রোন ভূপাতিত করার চেষ্টা করছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় সস্তা। তবে এতে ঝুঁকিও রয়েছে—কারণ লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি যেতে হয় এবং জনবহুল এলাকায় ব্যবহারে বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা থাকে। এদিকে, ইসরায়েল তাদের Iron Dome প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি লেজারভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে, যেখানে প্রতি ড্রোন ধ্বংসে খরচ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সংযুক্ত আরব আমিরাতও এ ধরনের প্রযুক্তি কেনার কথা ভাবছে। পরিস্থিতির জটিলতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইরানের ব্যাপক ড্রোন হামলা। গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে দেশটি তিন হাজারের বেশি ড্রোন ছুড়েছে বলে জানা গেছে। যদিও অধিকাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে, তবুও কিছু ড্রোন সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ব্যয় নয়—এই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিমানবাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপও তৈরি করছে। Stimson Center-এর গবেষক কেলি গ্রিকো মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধবিমান সর্বোচ্চ সক্ষমতায় ব্যবহার করলে রক্ষণাবেক্ষণের চাপ বাড়বে এবং কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইন্টারসেপ্টর ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইউক্রেনের তৈরি প্রায় ১০ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে বলেও জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু ড্রোন ঠেকানোর ওপর নয়, বরং ইরানের ড্রোন উৎক্ষেপণ সক্ষমতা কত দ্রুত কমানো যায়, তার ওপর। দীর্ঘমেয়াদে শুধু প্রতিরোধ নয়—হুমকির উৎস নিয়ন্ত্রণই হবে মূল কৌশল।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ফিলিপাইন সরকার। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দেশটির প্রেসিডেন্ট Ferdinand Marcos Jr. এক নির্বাহী আদেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। সরকার বলছে, বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন এবং দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। ফিলিপাইনের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে এই সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহে দেশটিতে জ্বালানির দাম একাধিকবার বেড়েছে এবং বর্তমানে ডিজেল ও পেট্রোলের মূল্য আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদ্যমান জ্বালানি মজুত দিয়ে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব। এই সীমিত মজুতকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি হিসেবেই জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এই ঘোষণার ফলে সরকার জ্বালানি খাতে বিশেষ ক্ষমতা পেয়েছে। এখন থেকে সরাসরি জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য ক্রয় ও মজুত করা যাবে। পাশাপাশি খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকানো এবং সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া। প্রাথমিকভাবে এই জরুরি অবস্থা এক বছরের জন্য বলবৎ থাকবে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুযায়ী এর সময়সীমা বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ফিলিপাইন সরকার আশা করছে, এই বিশেষ ব্যবস্থা দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জেরে মঙ্গলবার ইসরায়েলে একাধিক দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এর আগেই তেহরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই দাবির পরদিনই হামলার ঘটনা পরিস্থিতির ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ইসরায়েলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী হলেও ইরান মার্কিন শর্ত মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। এর আগে ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করেন। পরে সাংবাদিকদের কাছেও একই বক্তব্য দেন তিনি। যদিও তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এখনো কোনো ধরনের আলোচনা শুরু হয়নি। এদিকে ট্রাম্পের একটি মন্তব্য ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি তিনিও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেন। এর জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরান দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ব্যঙ্গাত্মক ছবি পোস্ট করে। ছবিতে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে একটি খেলনা স্টিয়ারিং হুইল দেখানো হয়, যা ট্রাম্পের মন্তব্যকে পরোক্ষভাবে উপহাস করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি এবং চলমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলতি সপ্তাহেই ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি-এর প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি এই বাহিনীর সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের জোলকাদরকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি-এর কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে ব্যর্থ আলোচনার অভিযোগ তুলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটির ওপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান শুধু ইসরায়েলই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এছাড়া, উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার পাশাপাশি ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত করেছে। বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়, ফলে এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।