- প্রচ্ছদ
- Topic
ফ্রান্স
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বাড়ি কিনতে আগ্রহী আমেরিকানদের সংখ্যা বাড়ছে। একসময় ধনী মার্কিন নাগরিকদের জন্য প্যারিসে বাড়ি কেনা মূলত ছুটির সময় ব্যবহারের জন্য একটি অতিরিক্ত ঠিকানা বা বিনিয়োগের বিষয় ছিল। এখন সেই প্রবণতা বদলে অনেকেই স্থায়ীভাবে প্যারিসে বসবাসের জন্য বাড়ি কিনছেন। রাজনৈতিক পরিবেশ, জীবনযাত্রার মান, তুলনামূলকভাবে কম জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইউরোপের কেন্দ্র থেকে জীবন শুরু করার সুযোগ আমেরিকানদের আকৃষ্ট করছে। একই সঙ্গে তাদের তুলনামূলক বেশি ব্যয়ের কারণে প্যারিসের বিলাসবহুল আবাসন বাজারেও তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ। বিজনেস ইনসাইডারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ১৫ হাজার ৩৮৮ জন আমেরিকান ফ্রান্সে বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করেন। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। আবাসন বাজারে আমেরিকানদের উপস্থিতিও বেশ চোখে পড়ার মতো। প্যারিসে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে আমেরিকানদের অংশ উল্লেখযোগ্য এবং তাদের গড় ক্রয় বাজেট অন্যান্য অনেক বিদেশি ও স্থানীয় ক্রেতার তুলনায় বেশি। নোটারি দ্য গ্রঁ প্যারির তথ্যেও প্যারিসের আবাসন বাজারে আমেরিকানদের শক্ত অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে ফ্রান্সের বাইরে বসবাসকারী বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে আমেরিকানরা প্যারিসে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন। তারা ২২০টি বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন, যা বিদেশি অনাবাসী ক্রেতাদের মোট কেনাকাটার ২৬ শতাংশ। তাদের মধ্যম ক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৮ লাখ ৬৪ হাজার ইউরো এবং গড় আয়তন ৬৫ বর্গমিটার। এই প্রবণতার পেছনে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণও কাজ করছে। প্রতিবেদনে এমন কয়েকজন আমেরিকানের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশে হতাশ হয়ে প্যারিসে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মার্টি ইয়াব্রো ও তার স্ত্রী অ্যাঞ্জির গল্পটি তার একটি উদাহরণ। ২০২৪ সালে ইউরোপের তিনটি শহর ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করছিলেন তারা। কিন্তু ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তাদের মনে হয়, কয়েক সপ্তাহের সফরের বদলে ইউরোপেই যদি নতুন জীবন শুরু করা যায়। শেষ পর্যন্ত আটলান্টার বাড়ি বিক্রি করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তারা প্যারিসে চলে যান। অবসরপ্রাপ্ত এই দম্পতির কাছে শুধু রাজনীতি নয়, জীবনযাত্রার হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্সে স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধার কাঠামো তাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। প্যারিসের হাঁটাচলার উপযোগী পরিবেশের কারণে গাড়ির প্রয়োজনও কম, যা দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার খরচ কমাতে পারে। প্যারিসে আগ্রহী আমেরিকানদের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিক ও অভিজাত এলাকাগুলোর প্রতি আকৃষ্ট। সাঁ-জার্মাঁ-দে-প্রে, ওদেয়োঁ, ল্য মারেঁ এবং ত্রিয়ঁগল দ'অর এলাকার মতো জায়গাগুলো তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে। তবে এখন তারা শহরের আরও কিছু এলাকায়ও যেতে শুরু করেছেন, যেখানে তুলনামূলকভাবে স্থানীয় প্যারিসবাসীদের বসবাস বেশি। নুভেল আথেন ও মনপারনাসের মতো এলাকাও আমেরিকান ক্রেতাদের নজরে এসেছে। এসব এলাকার কাছাকাছি দ্বিভাষিক স্কুল, বড় পার্ক ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা রয়েছে। কেউ কেউ প্যারিসের বাইরে অভিজাত শহরতলিতেও বাড়ি খুঁজছেন। এই পরিবর্তন প্যারিসের আবাসন বাজারে শুধু ক্রেতার সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, বাড়ির ধরন ও সংস্কারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনছে। আমেরিকান ক্রেতারা সাধারণত সংস্কার করা রান্নাঘর, সংযুক্ত বাথরুম, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও লিফটের মতো সুবিধা চান। ফলে পুরোনো অ্যাপার্টমেন্ট কিনে সেগুলো আধুনিক করে বিক্রি করার ব্যবসাও বাড়ছে। ফরাসি আবাসন বাজারে এই প্রবণতার আরেকটি দিক হলো আমেরিকান ক্রেতাদের তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা। ব্যবসা-বাণিজ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিসে আমেরিকান ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দাম পাওয়া সম্ভব বলে বাজারে একটি ধারণা রয়েছে। এর পেছনে ফরাসি আবাসন বাজারের কাঠামোগত পার্থক্যও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ফ্রান্সে বাড়ি বিক্রির জন্য একটি একক বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নেই। বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও স্থানীয় সংস্থার মাধ্যমে সম্পত্তির তথ্য ছড়িয়ে থাকে। ফলে নতুন বিদেশি ক্রেতাদের জন্য একই এলাকার বিভিন্ন বাড়ির দাম তুলনা করা কঠিন হতে পারে। ফরাসি ক্রেতারা সাধারণত নিজের জন্য আলাদা ক্রেতা প্রতিনিধি নিয়োগ করেন না। তারা অনেক সময় সরাসরি বিক্রেতার প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিপরীতে আমেরিকান ক্রেতারা নিজেদের স্বার্থ দেখার জন্য আলাদা আবাসন প্রতিনিধি নিয়োগে বেশি আগ্রহী। এই পার্থক্য থেকে দুই দেশের ক্রয়প্রক্রিয়ার মধ্যেও বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। ফরাসি বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগুলোর একটি হলো প্রতি বর্গমিটারের দাম। আমেরিকান ক্রেতারা অনেক সময় মোট বাজেট এবং বাড়িতে কী কী সুবিধা চান, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে একই দামে কতটুকু জায়গা পাওয়া যাচ্ছে, সেটি তুলনায় কম গুরুত্ব পেতে পারে। নোটারি দ্য গ্রঁ প্যারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফ্রান্সের বাইরে বসবাসকারী বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে আমেরিকানদের মধ্যম বাজেট ছিল ৮ লাখ ৬৪ হাজার ইউরো। একই সময়ে ফ্রান্সে বসবাসকারী ক্রেতাদের মধ্যম বাজেট ছিল ২ লাখ ৮৫ হাজার ইউরোর কাছাকাছি। এতে বোঝা যায়, অনাবাসী আমেরিকান ক্রেতারা প্যারিসের তুলনামূলক উচ্চমূল্যের বাজারে বেশি সক্রিয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিদেশি ক্রেতারাই পুরো প্যারিসের আবাসন বাজারের দাম নির্ধারণ করছেন। নোটারিদের আগের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, বিদেশি অনাবাসী ক্রেতাদের মোট অংশ সামগ্রিক বাজারে তুলনামূলকভাবে ছোট। তবে শহরের নির্দিষ্ট অভিজাত এলাকা ও উচ্চমূল্যের বাজারে তাদের প্রভাব বেশি হতে পারে। প্যারিসের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই প্রবণতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একদিকে বিদেশি ক্রেতাদের অর্থ বাজারে নতুন লেনদেন ও বিনিয়োগ তৈরি করছে। পুরোনো বাড়ি সংস্কার, বিক্রি এবং মালিকদের বাড়ি বদলের ক্ষেত্রেও এটি সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে স্থানীয়দের আশঙ্কা, বেশি অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত বিদেশি ক্রেতাদের সংখ্যা বাড়লে বিশেষ করে অভিজাত এলাকাগুলোতে বাড়ির দাম আরও বাড়তে পারে। এতে স্থানীয় ক্রেতাদের জন্য বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ২০২৬ সালের নোটারি বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, প্যারিসের উচ্চমূল্যের আবাসন বাজারে বিদেশি ক্রেতাদের ভূমিকা বাড়ছে। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত পুরো ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে পুরোনো বাড়ির বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ শতাংশ কমলেও প্যারিসের উচ্চমূল্যের বাজারে বিদেশি ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক শক্তিশালী। আমেরিকানদের জন্য প্যারিসের বাড়ি শুধু বসবাসের জায়গা নয়, সম্পদ বৈচিত্র্য করার মাধ্যমও হয়ে উঠছে। ইউরোর মাধ্যমে সম্পদ রাখা তাদের জন্য মার্কিন ডলারের বাইরে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। প্যারিসের সীমিত ভৌগোলিক পরিসর, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণের নীতি এবং ইউরোপের অন্যান্য শহরে সহজ যোগাযোগও দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। তবে বাড়ি কেনার খরচও কম নয়। সম্পত্তি কেনার সময় কর, নোটারি ফি এবং অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে মোট লেনদেন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হতে পারে। নোটারি দ্য গ্রঁ প্যারির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেটার প্যারিস এলাকায় ২০২৫ সালের পরিবর্তনের পর এসব কর ও ফি মিলিয়ে ক্রয়মূল্যের প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তারপরও আমেরিকানদের আগ্রহ কমছে না। বরং প্যারিসের বিলাসবহুল আবাসন বাজারে তাদের উপস্থিতি নতুন ধরনের ব্যবসার জন্ম দিচ্ছে। ক্রেতাদের হয়ে সম্পত্তি খোঁজা, দাম নিয়ে দরকষাকষি এবং স্থানীয় বাজার বোঝাতে বিশেষায়িত প্রতিনিধি বা ক্রেতা-পরামর্শকের সংখ্যা বাড়ছে। প্যারিসের আবাসন বাজারে আমেরিকানদের এই প্রবেশ তাই কেবল বিদেশিদের বাড়ি কেনার গল্প নয়। এটি শহরের অভিজাত আবাসন বাজারের চাহিদা, সম্পত্তির সংস্কারের ধরন, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের সম্পর্কেও পরিবর্তন আনছে।, তবে প্যারিসের সামনে বড় প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্থনৈতিক সুবিধা ধরে রেখেও কীভাবে শহরটিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সাশ্রয়ী ও বাসযোগ্য রাখা যায়। বাজারে আমেরিকানদের আগ্রহ আপাতত কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার
প্যারিসে আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনে আসা একটি হিন্দু ধর্মীয় দলের সফরকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই প্রতিনিধি দলের সফরের সময় নারী কর্মীদের কর্মস্থল থেকে সরে গিয়ে আড়ালে থাকতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ কর্মীরা প্রতিবাদে নামার পর প্যারিস কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ সেপ্টেম্বর প্রায় ১০০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল আইফেল টাওয়ারে ব্যক্তিগত সফরে যায়। দলটি ভারতের হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন বোচাসানওয়াসি অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামিনারায়ণ সংস্থা, সংক্ষেপে বিএপিএসের সঙ্গে যুক্ত। ফ্রান্সের উপকণ্ঠে সংগঠনটির একটি নতুন হিন্দু মন্দির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তাদের প্রতিনিধিরা সেখানে ছিলেন। আইফেল টাওয়ারের কর্মীদের ইউনিয়ন প্রতিনিধি দিয়ান দাভোয়েন রয়টার্সকে জানান, প্রতিনিধি দলটি যাওয়ার সময় নারী কর্মীদের নিজ নিজ কর্মস্থল ছেড়ে দিতে বলা হয়। তাদের জায়গায় পুরুষ কর্মীদের দাঁড় করানো হয়েছিল বলেও তিনি জানান। ফরাসি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকজন নারী কর্মীকে তাদের পদ ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যেতে বলা হয়েছিল। কিছু কর্মস্থলে তাদের পরিবর্তে পুরুষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিনিধি দলটি সেখানে অবস্থান করার সময় নারী কর্মীদের কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকা দিয়ে চলাচল না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে কর্মীরা অভিযোগ করেছেন। ঘটনার পর আইফেল টাওয়ারের কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ৭ সেপ্টেম্বর কর্মীরা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো নারী কর্মীকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে না পড়তে দেওয়ার নিশ্চয়তা চেয়ে বৈঠকে বসেন। এর ফলে সেদিন আইফেল টাওয়ারের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং দর্শনার্থীদের জন্য টাওয়ার খোলার সময় পিছিয়ে যায়। কর্মীদের ইউনিয়ন প্রতিনিধি দাভোয়েন জানান, ঘটনাটি নিয়ে ব্যবস্থাপনা কর্মীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। কর্মীদের প্রতিবাদের পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও সমালোচনা শুরু হয়। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার দ্রুত তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, কর্মীদের ক্ষোভ সম্পর্কে তিনি অবগত এবং তাদের অসন্তোষকে যৌক্তিক বলে মনে করেন। কী ঘটেছিল, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য দ্রুত সামনে আনা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট ইয়ায়েল ব্রাউন-পিভে ঘটনাটির সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, অন্যদের স্বাগত জানানো মানে নিজেদের মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া নয়। ফ্রান্সে নারীরা জনজীবনের সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে উপস্থিত এবং তাদের অদৃশ্য হয়ে যেতে বলা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বিএপিএস ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে জানায়, প্রতিনিধি দলের আকার বড় হওয়ায় অন্য দর্শনার্থীদের অসুবিধা এড়াতে আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দিনের শুরুর দিকে সফরের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাদের জানা অনুযায়ী, কাউকে আইফেল টাওয়ারে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়নি। তবে এ ঘটনায় কারও কষ্ট বা অসুবিধা হয়ে থাকলে তারা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসইটিই জানিয়েছে, প্রতিনিধি দলটির পক্ষ থেকে নারী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল। পরবর্তী এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করে, এমন শর্ত মেনে নেওয়া উচিত ছিল না এবং তা তাদের মূল্যবোধ ও নারী-পুরুষের সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন বিএপিএসের প্রতিনিধিরা প্যারিসের উপকণ্ঠে বুসি-সাঁ-জর্জ এলাকায় সংগঠনটির নতুন হিন্দু মন্দিরের উদ্বোধন উপলক্ষে ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন। ৬ সেপ্টেম্বর সেখানে মন্দিরটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। আইফেল টাওয়ারে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি এখন শুধু কর্মীদের প্রতিবাদের বিষয় নয়, ফ্রান্সের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নারী-পুরুষের সমতা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। প্যারিস কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষ হলে সফরের সময় ঠিক কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কে সেই নির্দেশ দিয়েছিল এবং তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য সামনে আসতে পারে। সূত্র: রয়টার্স
ফ্রান্সে জনসমক্ষে হিজাব নিষিদ্ধ করার ডানপন্থী প্রস্তাবের প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রচারণা শুরু করেছেন দেশটির একদল নারী। মুসলিম নারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা নিজেদের হিজাব পরা ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করছেন। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ন্যাশনাল র্যালি বা আরএন-এর প্রস্তাব ঘিরে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হচ্ছে, তখনই এই অনলাইন উদ্যোগ সামনে এসেছে। প্রচারণায় অংশ নেওয়া নারীদের কেউ লিখেছেন, “হিজাব পরা আমাদের সব সহনাগরিকের সমর্থনে।” আবার কেউ জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত আইন পাস হলে সংহতি জানাতে তিনি নিজেও সঙ্গে সঙ্গে হিজাব পরবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই প্রচারণার পেছনে রয়েছে ফ্রান্সের ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির হিজাব নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা। দলটির এমপি জ্যঁ-ফিলিপ তাঙ্গি গত ৩০ আগস্ট এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বলেন, দলটি ক্ষমতায় গেলে জনসমক্ষে হিজাব পরার ক্ষেত্রে জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি জানান, এ বিষয়ে দলের অবস্থান চূড়ান্ত হয়েছে। তবে ন্যাশনাল র্যালির প্রস্তাবটি সরাসরি নির্বাচনের পরদিন কার্যকর করার কথা নয়। দলটির নেতা জর্ডান বারদেলা জানিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে এ বিষয়ে গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি এটিকে বৃহত্তরভাবে ইসলামপন্থী মতাদর্শ নিয়ে একটি গণভোটের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রস্তাবটি নিয়ে ফ্রান্সে সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্নও উঠেছে। ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে এর সাংবিধানিক বৈধতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরাও জনসমক্ষে হিজাব নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মত দিয়েছেন। ফ্রান্সে বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা দায়িত্ব পালনের সময় দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করতে পারেন না। ২০০৪ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থীদের বড় বা স্পষ্ট ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যার আওতায় মুসলিম হিজাবও পড়ে। তবে জনসমক্ষে হিজাব পরার ওপর দেশজুড়ে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা বর্তমানে নেই। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে হিজাব ইস্যুটি ফ্রান্সের রাজনীতিতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হয়েছে। ন্যাশনাল র্যালি এটিকে তাদের নির্বাচনী কর্মসূচির অংশ করছে, আর বিরোধীরা বলছেন, প্রস্তাবটি বিশেষভাবে মুসলিম নারীদের লক্ষ্যবস্তু করছে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফ্রান্সে জনপরিসরে হিজাব নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের নতুন ঢেউ দেখা দিয়েছে। মুসলিম নারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এমন অনেক ফরাসি নারী, যারা সাধারণত হিজাব পরেন না, তারাও মাথায় স্কার্ফ বা হিজাব পরা ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করছেন। এই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালি বা আরএনের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর। দলটির পক্ষ থেকে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে জনপরিসরে হিজাব পরিধানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং তা কার্যকর করতে জরিমানার বিধান আনার কথা বলা হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরএনের এমপি জঁ-ফিলিপ তাগি বলেন, দলটি ক্ষমতায় এলে জনপরিসরে হিজাব পরিধানের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি সম্ভাব্য জরিমানাকে সিটবেল্ট না বাঁধার জন্য গাড়িচালকদের যে ধরনের জরিমানা করা হয়, তার সঙ্গে তুলনা করেন। তবে জরিমানার নির্দিষ্ট পরিমাণ এখনো ঠিক করা হয়নি। এর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। হিজাব না পরা বেশ কয়েকজন নারী নিজেদের মাথা স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে ভিডিও প্রকাশ করেন। এসব ভিডিওতে তারা হিজাব পরা মুসলিম নারীদের প্রতি সংহতি জানান এবং পোশাক বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান প্রকাশ করেন। তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এমন একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আরব নিউজভিত্তিক আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন প্রচারণায় অংশ নেওয়া নারীদের কেউ কেউ নিজেদের প্রকাশনায় মুসলিম নারীদের সঙ্গে সংহতির কথা জানিয়েছেন। কেউ কেউ আবার বলেছেন, হিজাব নিষিদ্ধ করার মতো আইন কার্যকর হলে তারাও প্রতিবাদ হিসেবে হিজাব পরবেন। জনপরিসরে হিজাব নিষিদ্ধের প্রস্তাবটি অবশ্য নতুন নয়। ন্যাশনাল র্যালির নেত্রী মারিন ল পেন দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। ২০১২ সাল থেকে তিনি জনপরিসরে হিজাব নিষিদ্ধের কথা বলে আসছেন এবং ২০১৭ ও ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাতেও বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে বিষয়টি আবারও ফ্রান্সের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ল পেন বর্তমানে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি অনিশ্চয়তা থাকলেও ন্যাশনাল র্যালি হিজাব, অভিবাসন ও ইসলামকে ঘিরে কঠোর অবস্থানকে নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। ফ্রান্সে ধর্মীয় পোশাক নিয়ে এরই মধ্যে বেশ কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্য ধর্মীয় প্রতীক পরিধান ২০০৪ সাল থেকে নিষিদ্ধ। সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের সময়ও দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে ন্যাশনাল র্যালির প্রস্তাবটি এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত, কারণ এর লক্ষ্য জনপরিসরে হিজাব পরিধানকে নিয়ন্ত্রণ করা। প্রস্তাবটির সমালোচকেরা মনে করছেন, এটি ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবটির সমালোচকেরা এর সাংবিধানিক বৈধতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি ন্যাশনাল র্যালির ভেতর থেকেও কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে দলটির নেতৃত্ব বলছে, হিজাবকে তারা ফ্রান্সের প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখে। ফ্রান্সের এই বিতর্কের সঙ্গে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট হবে ১৮ এপ্রিল ২০২৭ এবং দ্বিতীয় দফার ভোট হবে ২ মে। ফ্রান্সের সংবিধান অনুযায়ী কোনো প্রেসিডেন্ট টানা দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। ফলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ২০২৭ সালের নির্বাচনে তৃতীয় টানা মেয়াদের জন্য প্রার্থী হতে পারবেন না। এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। ন্যাশনাল র্যালির জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। দলটির নেতারা অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, ইসলাম ও নিরাপত্তার মতো বিষয়কে নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন। হিজাব নিষেধের প্রস্তাব সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানেরই একটি অংশ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে হিজাবকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাল্টা প্রচারণা দেখাচ্ছে, বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। মুসলিম নারীদের পোশাকের স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের পাশে দাঁড়াতে অমুসলিম নারীদের একাংশও প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে ২০২৭ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ফ্রান্সে ধর্মনিরপেক্ষতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গণেশ চতুর্থীর শোভাযাত্রায় রাস্তায় নারকেল ভাঙার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। ধর্মীয় এই ঐতিহ্য নিয়ে কেউ পরিচ্ছন্নতা ও জনপরিসর ব্যবহারের প্রশ্ন তুলেছেন, আবার কেউ এটিকে হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে সমর্থন করেছেন। রোববার, ৩০ আগস্ট প্যারিসের লা শাপেল এলাকায় শ্রী মানিকা বিনায়ক আলায়াম মন্দিরের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বার্ষিক গণেশ উৎসব। প্যারিস ট্যুরিজম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৮তম অ্যারোঁদিসমঁর এই মন্দিরটি ফ্রান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু উপাসনালয় এবং লা শাপেল এলাকার দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির সঙ্গে এর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মন্দির থেকে শোভাযাত্রা বের হয়। ফুল ও নানা উপকরণে সাজানো রথে ছিল গণেশের প্রতিমা। সঙ্গে ছিলেন নৃত্যশিল্পী, গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা। শোভাযাত্রার পথে ভক্তদের মধ্যে মিষ্টি ও আশীর্বাদপুষ্ট প্রসাদও বিতরণ করা হয়। এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় রীতি হলো গণেশের রথের সামনে নারকেল ভাঙা। প্যারিস ট্যুরিজম অফিসের তথ্যেও শোভাযাত্রার অংশ হিসেবে পথে নারকেল ভাঙার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় প্রথায় নারকেল ভাঙাকে দেবতার উদ্দেশে নিবেদনের একটি প্রতীকী রীতি হিসেবে দেখা হয়। উৎসবের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অবশ্য ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। নারকেল ভাঙার কারণে রাস্তায় আবর্জনা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। কেউ কেউ আবার এমন প্রকাশ্য ধর্মীয় আয়োজন ইউরোপে ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী কমিউনিটির ভাবমূর্তিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও মন্তব্য করেন। তবে সমালোচনার পাশাপাশি উৎসবের পক্ষে অবস্থান নেন অনেকে। কয়েকজন অংশগ্রহণকারী দাবি করেন, এটি প্যারিসে দীর্ঘদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা নিয়মিত আয়োজন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেই শোভাযাত্রা পরিচালনা করা হয়। তাদের ভাষ্য, আয়োজন শেষে রাস্তাগুলো পরিষ্কার করার ব্যবস্থাও থাকে। প্যারিসের লা শাপেল এলাকায় গণেশ উৎসবটি কয়েক দশক ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারও শোভাযাত্রাটি মার্কস দোরমোয়া এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ধর্মীয় আয়োজন হলেও এটি এখন প্যারিসের দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে।
ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব ও ফ্রান্স। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দুই দেশ। সোমবার প্যারিসে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিস্তৃত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হতে হবে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান এবং সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকটের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা। ইরান ইস্যুতে দুই দেশ আরও উত্তেজনা এড়াতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সৌদি আরব ও ফ্রান্স ইরানের পরমাণু কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ প্রকৃতি নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে তেহরানকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে তারা। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং নৌপথের নিরাপত্তার জন্য হুমকিরও নিন্দা জানিয়েছে দুই দেশ। বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালিতে আগের স্বাভাবিক নৌচলাচল ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব ও ফ্রান্স আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা, নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিবহন এবং কোনো ধরনের সরাসরি বা পরোক্ষ কর কিংবা চলাচলে বাধা না থাকার আহ্বান জানিয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতেও দুই দেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। সৌদি আরব ও ফ্রান্স হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে চুক্তির ঘোষণা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় টেকসই যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরি এবং বেসামরিক মানুষের কাছে দ্রুত, নিরাপদ ও বাধাহীন মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে তারা। দুই দেশ ফিলিস্তিনি জনগণের ১৯৬৭ সালের সীমারেখার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার ক্ষুণ্ন করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন কার্যক্রম ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব ও ফ্রান্স। বিবৃতিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার কর্মসূচির প্রতিও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে আইনসভা ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা স্বাগত জানিয়েছে দুই দেশ। তাদের মতে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ সুগম করাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লেবানন, ইয়েমেন, সুদান ও সিরিয়ার পরিস্থিতিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। লেবাননের ক্ষেত্রে দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং সব অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছে দুই দেশ। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন এবং লেবাননের সব ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইয়েমেনে প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে সৌদি আরব ও ফ্রান্স। সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হুথিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির ভূখণ্ডে হামলার বিরুদ্ধে সৌদি আরবের প্রতি সংহতি ও পূর্ণ সমর্থনের কথাও জানিয়েছে প্যারিস। সুদানের ক্ষেত্রে সংকট দ্রুত সমাধান, বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে। সিরিয়ার ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে দুই দেশ। পাশাপাশি সৌদি-সিরীয়-ফরাসি ব্যবসায়ী পরিষদ গঠনের বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি সৌদি আরব ও ফ্রান্স অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের পরিকল্পনাও করেছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ছিল। এবার দুই দেশ পারস্পরিক বিনিয়োগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতেও নতুন সহযোগিতার ঘোষণা এসেছে। দুই দেশ অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণসহ ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিভিন্ন বিষয়ে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও উদীয়মান প্রযুক্তিতেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সৌদি আরবের আলউলা অঞ্চলের প্রত্নতত্ত্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে যৌথ সহযোগিতা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া ফ্রান্স রিয়াদ এক্সপো ২০৩০-এ অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দুই দেশের নেতারা মনে করছেন, এই আয়োজন সৌদি আরব ও ফ্রান্সের সম্পর্ক আরও গভীর করার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। বৈঠকের সময় প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদীয়মান প্রযুক্তি ও বিনোদন খাতে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি-ফরাসি বিনিয়োগ গোলটেবিল বৈঠক থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ২২টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের ঘোষণা এসেছে। সব মিলিয়ে, সৌদি আরব ও ফ্রান্সের নতুন যৌথ উদ্যোগ শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইরান, হরমুজ প্রণালি, ফিলিস্তিন, লেবানন, ইয়েমেন, সুদান ও সিরিয়ার মতো মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ইস্যুতেও দুই দেশ নিজেদের সমন্বয় আরও জোরদার করতে চাইছে।
ফ্রান্সের প্যারিসে শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরের টার্মিনালকে ১৮ বছর নিজের বাড়ি বানিয়ে ফেলেছিলেন ইরানি নাগরিক মেহরান কারিমি নাসেরি। ১৯৮৮ সালে বিমানবন্দরে আটকে পড়ার পর দীর্ঘদিন সেখানেই বসবাস করেন তিনি। তার অদ্ভুত জীবনকাহিনি পরে হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’-এর অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। নাসেরি ১৯৮৮ সালের আগস্টে শার্ল দ্য গল মানবন্দরে পৌঁছান। এর আগে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আইনি জটিলতার মধ্য দিয়ে বেশ কয়েক বছর কাটিয়েছিলেন। প্যারিসে এসে তিনি দাবি করেন, তার পরিচয়পত্র ও শরণার্থী সনদ হারিয়ে গেছে বা চুরি হয়েছে। ফলে ফ্রান্সে প্রবেশের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার হাতে ছিল না। একই সঙ্গে অন্য কোনো দেশও তাকে গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছিল না। এই জটিল অবস্থায় বিমানবন্দরের টার্মিনাল ১-ই হয়ে ওঠে তার আশ্রয়। দিন গড়াতে গড়াতে সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে বছর চলে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছর সেখানেই থেকে যান নাসেরি। টার্মিনালের একটি লাল প্লাস্টিকের বেঞ্চ ছিল তার দীর্ঘদিনের বিছানা। বিমানবন্দরের কর্মীদের ব্যবহৃত গোসলের সুবিধা তিনি ব্যবহার করতেন। সময় কাটত বই পড়া, লেখালেখি ও নিজের ডায়েরি লিখে। বিমানবন্দরের কর্মীরাও ধীরে ধীরে তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তারা তাকে ‘স্যার আলফ্রেড’ নামে ডাকতে শুরু করেন। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো যাত্রী ওই টার্মিনাল দিয়ে যাতায়াত করতেন। তাদের অনেকের কাছেই নাসেরি হয়ে উঠেছিলেন এক পরিচিত মুখ। কেউ কৌতূহলবশত তার সঙ্গে কথা বলতেন, কেউ আবার বিমানবন্দরে বসবাসকারী এই অদ্ভুত মানুষটির গল্প শুনতে থামতেন। তবে নাসেরির জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল, পরবর্তী সময়ে তার বিমানবন্দর ছাড়ার আইনগত সুযোগ তৈরি হলেও তিনি আর বের হননি। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বেলজিয়ামে বৈধভাবে বসবাসের অনুমতি পান। পরে ফ্রান্সেও তার জন্য আইনি বসবাসের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন বিমানবন্দরে থাকার পর সেটিই যেন তার পরিচিত পৃথিবী হয়ে উঠেছিল। তার জীবনের এই অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা ১৯৯৩ সালের ফরাসি সিনেমা ‘লস্ট ইন ট্রানজিট’-এর অনুপ্রেরণা দেয়। পরে আরও বেশি পরিচিতি পায় স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ২০০৪ সালের সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’। টম হ্যাঙ্কস অভিনীত সিনেমাটিতে একজন মানুষকে বিমানবন্দরে আটকে গিয়ে সেখানেই বসবাস করতে দেখা যায়। নাসেরির জীবনের সঙ্গে সিনেমাটির গল্পের মিল থাকলেও এটি তার জীবনের সরাসরি পুনর্নির্মাণ ছিল না। ২০০৪ সালেই নাসেরি নিজের স্মৃতিকথা ‘দ্য টার্মিনাল ম্যান’ প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন বিমানবন্দরে বসবাসের কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার গল্প ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি একসময় বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ২০০৬ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেষ পর্যন্ত শার্ল দ্য গল বিমানবন্দর ছাড়েন নাসেরি। এরপর প্যারিসের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১৬ বছর কাটান তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়েও বিমানবন্দরটি যেন তাকে আবার টেনে নেয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে, বয়স সত্তরের শেষ দিকে, তিনি আবার শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরে ফিরে আসেন। এর মাত্র দুই মাস পর, ১২ নভেম্বর ২০২২ সালে টার্মিনাল ২এফ-এ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মেহরান কারিমি নাসেরি। জীবনের প্রায় দুই দশক যে বিমানবন্দরকে নিজের বাড়ি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেখানেই থেমে যায় তার দীর্ঘ ও অস্বাভাবিক জীবনের গল্প।
জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টাকালে প্রায় ১৪০ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে ফ্রান্সের মেরিটাইম রেসকিউ টিম। শনিবার ভোরে একাধিক উদ্ধারকারী নৌকার সমন্বয়ে পরিচালিত এক জটিল ও দীর্ঘ অভিযানে তাদের নিরাপদে তীরে ফিরিয়ে আনা হয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানায়, শুক্রবার সকালে নরম্যান্ডি উপকূলের ডিয়েপ বন্দরের দিকে একটি অভিবাসীবাহী নৌকা যেতে দেখে সেন্ট-ওবিন-সুর-মেরে অবস্থিত নজরদারি স্টেশন। এরপর দুটি টহল নৌকার সাহায্যে সেটির গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। শুক্রবার গভীর রাতে বার্ক-সুর-মার উপকূলের কাছে 'ট্যাক্সি-বোটের' অপেক্ষায় থাকা প্রায় ৪০ জন অভিবাসী জোয়ারের পানিতে আটকা পড়েন। বিপদ বুঝতে পেরে উদ্ধারকারী দল দ্রুত তাদের সৈকতে নিয়ে আসে এবং ফায়ার ও রেসকিউ সার্ভিসের কাছে হস্তান্তর করে। রাত আনুমানিক ১টার দিকে ওই নৌকাটি আবারও উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে এবং অন্য একটি সৈকতে পৌঁছায়। সেখানে লাইফ জ্যাকেট পরা আরও ৮২ জন নৌকায় ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন, যদিও ছোট ওই নৌকায় আগে থেকেই প্রায় ২০ জন উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অপেক্ষমাণ অভিবাসীরা শেষ পর্যন্ত নৌকায় না ওঠার সিদ্ধান্ত নেন এবং ফরাসি উদ্ধারকর্মীরা তাদের ডাঙায় প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করেন। অবশেষে রাত সাড়ে ৩টার দিকে নৌকায় থাকা যাত্রীরাও চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা বাতিল করেন। এই উদ্ধার অভিযানের পর হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত এক শিশুকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। ফরাসি মেরিটাইম প্রিফেকচার শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে পৌঁছাতে মরিয়া এই অভিবাসীরা চরম জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সাধারণত ফরাসি উদ্ধারকারীদের সহায়তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই এসব ভঙ্গুর নৌকায় জোর করে উদ্ধার অভিযান চালালে নৌকাডুবির প্রবল ঝুঁকি থাকে, তাই সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হয়। সম্প্রতি চ্যানেল পাড়ি দিতে ব্যবহৃত এই ছোট নৌকাগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত সোমবারেই একটি ১৫ মিটার লম্বা নৌকায় রেকর্ড ২৩০ জন যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন, যা মাঝপথে ভেঙে গিয়ে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ট্র্যাজেডির জন্ম দিতে পারত বলে সতর্ক করেছেন ফরাসি উদ্ধারকর্মীরা।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় সামরিক বিমানটিকে এবার ফ্রান্সের ভয়াবহ দাবানল নেভানোর কাজে নামানো হয়েছে। এয়ারবাসের তৈরি 'এ৪০০এম অ্যাটলাস' (A400M Atlas) নামের এই বিমানটি সাধারণত সেনা ও সামরিক যান বহনে ব্যবহৃত হলেও, প্রকৌশলীদের জরুরি পরিবর্তনের পর এটি এখন ২২ টন ধারণক্ষমতার বিশালাকার 'ওয়াটার বোমারু' হিসেবে কাজ করছে। কার্গো হোল্ডে বসানো এই বিশেষ পানির ট্যাংক ব্যবহার করে বিমানটি মাটি থেকে মাত্র ১০০ ফুট ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে উন্মুক্ত র্যাম্পে বসানো পাইপের মাধ্যমে পানি বা রাসায়নিক ফায়ার রিটার্ডেন্ট (অগ্নিনির্বাপক পদার্থ) ফেলতে সক্ষম। ২০২২ সাল থেকে এই অগ্নিনির্বাপণ প্রযুক্তির উন্নয়ন কাজ চলছিল। তবে ফ্রান্সে দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করায় ফরাসি কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে গত সপ্তাহে এর চূড়ান্ত পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। কাজ শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রথম এয়ারবাস বিমানটি বোর্দোর কাছাকাছি অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ এই দাবানলকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের 'সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যার কারণে দেশটিতে ইতোমধ্যে তিন লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এয়ারবাসের প্রধান নির্বাহী গিয়ম ফোরি জানিয়েছেন, অগ্নিনির্বাপণের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা না হলেও, সামরিক বাহিনীতে সহজলভ্য হওয়ায় এই বিমানগুলোকে বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত কাজে লাগানো হচ্ছে। সচরাচর ব্যবহৃত হলুদ রঙের ক্যানাডায়ার (Canadair) ওয়াটার বোমারুর চেয়ে এটি তিনগুণ বেশি তরল বহন করতে পারে। মাত্র এক আঘাতেই এটি ৪,৪০০ গ্যালন তরল ফেলতে পারে, যা ১,৩০০ ফুটেরও বেশি দীর্ঘ এলাকা ভিজিয়ে দিতে সক্ষম। ক্যানাডায়ারের মতো এটি হ্রদ বা সমুদ্র থেকে সরাসরি পানি তুলতে না পারলেও, মাটি থেকে ফায়ার রিটার্ডেন্ট লোড করার ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি কার্যকর। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজে লাগিয়ে কার্গো বিমানের পেছনের র্যাম্প দিয়ে সহজেই এই পানির ট্যাংক প্রবেশ করানো যায় এবং মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই একটি সাধারণ সামরিক বিমানকে অগ্নিনির্বাপক বিমানে রূপান্তর করা সম্ভব। ঘণ্টায় ৫৫০ মাইল বেগে উড়তে সক্ষম এই বিমানটি সাধারণ ক্যানাডায়ার বিমানের চেয়ে অনেক দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তৈরি হওয়ায় দুর্গম বা অস্থায়ী রানওয়েতেও এটি সহজেই ওঠানামা করতে পারে। এয়ারবাস জানিয়েছে, দাবানলের কারণে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে কীভাবে বিমান নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সে বিষয়ে তারা আরও পাইলটকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। চলতি বছরেই এই ফায়ারফাইটিং কিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে স্পেনও তাদের সামরিক বহরে থাকা এ৪০০এম বিমানগুলোকে একইভাবে রূপান্তর করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের মেয়াদ বাড়ানোকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়েছে। ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের সঙ্গে তুলনা করার পর প্রতিবাদ জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক থেকে বের হয়ে যায় মার্কিন প্রতিনিধিদল। ঘটনার সূত্রপাত হয় গত সপ্তাহে ভলকার টুর্কের দ্বিতীয় মেয়াদের নিয়োগ নিয়ে ভোটাভুটিকে ঘিরে। ওই ভোটে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মিলে টুর্কের মেয়াদ বাড়ানোর বিপক্ষে ভোট দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত ১৪৪টি দেশের সমর্থনে তার পুনর্নিয়োগ অনুমোদিত হয়। বিপক্ষে ভোট দেয় ১০টি দেশ এবং ১৩টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। ভোটের পর জাতিসংঘে ফ্রান্সের স্থায়ী মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে। ফ্রান্সের পক্ষ থেকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র একসময় মানবাধিকারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এখন আর সেই অবস্থানে নেই। এ মন্তব্যে ওয়াশিংটন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ পাল্টা অভিযোগ করেন, ফ্রান্স এমন একজন কর্মকর্তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যিনি গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে সমালোচনা করেন, অথচ দমনমূলক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছেন। তবে নিজের বক্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি। ভলকার টুর্ক এর আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান এবং গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। তার সমর্থকরা বলছেন, তিনি মানবাধিকার রক্ষায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন। জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান নেগ্রিয়া জানিয়েছেন, ফ্রান্স তাদের "অসম্মানজনক বক্তব্য" প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ও অর্থায়নের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা হতে পারে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় অর্থায়ন কমিয়েছে এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এই বিরোধ ওয়াশিংটন ও জাতিসংঘের সম্পর্কের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করেছে। অন্যদিকে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জেরোম বোনাফন্ট ভলকার টুর্ককে "বিবেকের কণ্ঠস্বর" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, টুর্ক প্রথম মেয়াদে দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘের উপ-মুখপাত্র ফারহান হক এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি শুধু বলেছেন, জাতিসংঘ আশা করে সব সদস্য রাষ্ট্র সংস্থাটির সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় অরেঞ্জ শহরের একটি বাড়িতে রাখা কাগজের বাক্স থেকে পাঁচ নবজাতকের দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যা মামলার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার ৩২ বছর বয়সী এক নারী ওই বাড়িতে সন্তান জন্ম দেন। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তার সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি বাড়িতে থাকা কিছু সন্দেহজনক বিষয় সম্পর্কে চিকিৎসকদের জানান। ওই ব্যক্তি পুলিশকে জানান, নারীর গর্ভধারণের বিষয়টি তিনি অনেক দেরিতে জানতে পারেন। পরে বিষয়টি জানার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করার সময় তিনি মানুষের দেহাবশেষের মতো কিছু দেখতে পান। তথ্য পাওয়ার পর সোমবার রাতে বাড়িটিতে অভিযান চালায় পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হাড় পরীক্ষা করে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, সেগুলো পাঁচ নবজাতকের দেহাবশেষ হতে পারে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই নারীর বর্তমান শারীরিক অবস্থার কারণে এখনো তার সঙ্গে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি। ওই নারীর পরিবারে ৮ ও ৯ বছর বয়সী আরও দুই সন্তান রয়েছে। মঙ্গলবারও ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি ছিল। দুইতলা বাড়িটির প্রবেশপথ নিরাপত্তা টেপ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে এবং দেহাবশেষের পরিচয়, মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার পুরো পরিস্থিতি জানতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ফ্রান্সে নবজাতকের দেহ লুকিয়ে রাখার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। চলতি বছরের মার্চে একটি বাড়ির ফ্রিজ থেকে দুই নবজাতকের দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনায় ৪৪ বছর বয়সী এক নারীকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেয় দেশটির আদালত। পুলিশ জানিয়েছে, অরেঞ্জের ঘটনার ক্ষেত্রে ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে দেহাবশেষের পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে। তদন্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ফ্রান্সের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জের বিরুদ্ধে এক ব্যতিক্রমী মামলা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কর্মী লরেন্স ভ্যান ওয়াসেনহোভ। তার অভিযোগ, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোম্পানি নিয়মিত বেতন ও অন্যান্য সুবিধা দিলেও তাকে কোনো কাজ, দায়িত্ব বা কর্মস্থল দেয়নি। ফলে তিনি পেশাগতভাবে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা, মানসিক অবসাদ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। জন্মগতভাবে আংশিক পক্ষাঘাত ও মৃগীরোগে আক্রান্ত লরেন্স ১৯৯৩ সালে তৎকালীন ফ্রান্স টেলিকমে যোগ দেন, যা পরে অরেঞ্জে রূপান্তরিত হয়। শুরুতে তিনি সচিব ও মানবসম্পদ বিভাগে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০০২ সালে বাসস্থানের কাছাকাছি বদলির আবেদন করার পর তার কর্মজীবনে মোড় আসে। তার দাবি, নতুন কর্মস্থল তার শারীরিক অবস্থার উপযোগী ছিল না এবং পেশাগত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতামতেও সেটি উল্লেখ করা হয়। এরপর থেকে কার্যত তাকে কোনো নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। লরেন্সের অভিযোগ, ২০০৪ সাল থেকে তিনি কোনো অফিস, নির্দিষ্ট কর্মস্থল, সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ বা পেশাগত দায়িত্ব ছাড়াই কেবল বেতন পেয়ে গেছেন। তার ভাষ্য, বিষয়টি বাইরে থেকে সুবিধাজনক মনে হলেও বাস্তবে এটি তাকে গভীর মানসিক সংকটে ফেলে। দীর্ঘদিন কর্মহীন অবস্থায় থাকায় তিনি উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন। তার আইনজীবীর দাবি, অরেঞ্জ প্রতিবন্ধী কর্মীর জন্য আইনসম্মত ও যৌক্তিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং তাকে এমন অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে, যেখানে তিনি চাকরিতে থেকেও কার্যত কর্মজীবনের বাইরে চলে যান। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বৈষম্য ও মানসিক হয়রানির অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে অরেঞ্জ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কোম্পানির বক্তব্য, লরেন্সের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। তার আর্থিক ক্ষতি এড়াতে শতভাগ বেতন অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং তার জন্য উপযোগী বিভিন্ন পদে কাজের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে এবং নিয়মিত অসুস্থতার ছুটির কারণে সেসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি। এই মামলাটি ফ্রান্সে কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি, প্রতিবন্ধী কর্মীদের অধিকার এবং নিয়োগকর্তার দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। মামলার বিচার এখনো চলমান। আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত লরেন্স ভ্যান ওয়াসেনহোভের অভিযোগ এবং অরেঞ্জের জবাব, উভয়ই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ই-পাসপোর্ট সেবা আরও সহজ ও গতিশীল করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্যারিসে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংকট, অনলাইন ব্যবস্থার নানা জটিলতা এবং সেবা গ্রহণে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। প্রবাসীদের এই ভোগান্তি লাঘব করতে এবং ফরাসি প্রেফেকচারে রেসিডেন্স পারমিট সংক্রান্ত জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্টের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দূতাবাস এই বিশেষ কনস্যুলার কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রথম পর্যায়ে ২৫ জুলাই, ৮ আগস্ট এবং ২২ আগস্ট—এই তিনটি শনিবার বিশেষ কনস্যুলার সেবা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শনিবার (২৫ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ সেবার প্রথম দিনেই ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। এদিন ৮৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক সফলভাবে ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করেছেন। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, পূর্বনির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ পেয়েছেন অনেক আবেদনকারী। সম্প্রতি ইমেইলভিত্তিক আবেদন পদ্ধতির পরিবর্তে ওয়েবসাইটভিত্তিক অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা চালু করেছিল দূতাবাস। কিন্তু সীমিত স্লট ও কারিগরি ত্রুটির কারণে অনেকেই সময়মতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছিলেন না। এই বিশেষ সেবা সেই সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পাসপোর্ট সেবার এই কারিগরি দিক ও বর্তমান চাপ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব কে. এফ. এম. শারহাদ শাকিল জানান, ই-পাসপোর্ট একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া। এখানে আবেদনকারীর ছবি, আঙুলের ছাপ ও স্বাক্ষরসহ নানা তথ্য যাচাই-বাছাই করে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পাসপোর্ট প্রস্তুত করা হয়। আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কার্যক্রমে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও সেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। দূতাবাসের এই বিশেষ কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করছে ফ্রান্সে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও কমিউনিটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশ নাগরিক পরিষদ ফ্রান্স এবং বিএনপি ফ্রান্সসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত থেকে আবেদনকারীদের তথ্য প্রদান, সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে কার্যক্রমকে সুশৃঙ্খল করতে সহায়তা করছেন। কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ দূতাবাসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিএনপি ফ্রান্সের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনায়েদুর রহমান জুনেদ এবং কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা মিল্টন সরকার জানান, প্রবাসীরা যেন দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে সেবা পান, সেটি নিশ্চিত করতেই তারা প্রবাসীদের পাশে থেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশ নাগরিক পরিষদ ফ্রান্সের সভাপতি আবুল খায়ের লস্কর দূতাবাসের কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রশংসা করে সেবাকে আরও গতিশীল ও প্রবাসীবান্ধব করার আহ্বান জানান। সাধারণ প্রবাসীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও ত্রুটিমুক্ত ও কার্যকর করা হবে, যাতে ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ই-পাসপোর্ট সেবার পূর্ণ সুবিধা সহজেই পেতে পারেন।
ফ্রান্সে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ই-পাসপোর্ট প্রাপ্তি আরও সহজ ও দ্রুততর করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্যারিসের বাংলাদেশ দূতাবাস। দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংকট, অনলাইনের নানা জটিলতা এবং সেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ নিরসনে এই বিশেষ কনস্যুলার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ সেবার প্রথম দিনেই ৮৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশি ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত জরুরি সেবা গ্রহণ করেছেন। ফরাসি প্রেফেকচারে রেসিডেন্স পারমিট সংক্রান্ত জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে অনেকে এই দিনে সেবা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। দূতাবাস জানিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে আগামী ৮ আগস্ট এবং ২২ আগস্ট—এই তিনটি শনিবারে এই বিশেষ কনস্যুলার সেবা চালু থাকবে। সম্প্রতি ইমেইলভিত্তিক আবেদন পদ্ধতি পরিবর্তন করে ওয়েবসাইটভিত্তিক নতুন অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা চালু করেছে দূতাবাস। তবে সীমিত সংখ্যক স্লট এবং অতিরিক্ত আবেদনকারীর চাপের কারণে অনেক প্রবাসী যথাসময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। পাশাপাশি ওয়েবসাইটের কিছু কারিগরি সমস্যার কথাও জানান অনেকে। এসব সমস্যা এবং প্রবাসীদের ভোগান্তি দূর করতে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ বর্তমানে সেবার মান বাড়াতে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব কে. এফ. এম. শারহাদ শাকিল বলেন, ই-পাসপোর্ট হলো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া। আবেদনকারীর ছবি, আঙুলের ছাপ ও স্বাক্ষরসহ যাবতীয় তথ্য নিখুঁতভাবে যাচাইয়ের পরেই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পাসপোর্ট প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। অতিরিক্ত আবেদনকারীর চাপে কিছুটা কাজের চাপ তৈরি হলেও প্রবাসীদের নির্বিঘ্ন সেবা দিতে দূতাবাস সবসময় সচেষ্ট রয়েছে। এই বিশেষ কনস্যুলার কার্যক্রমে দূতাবাসের পাশাপাশি কমিউনিটির বিভিন্ন স্তরের স্বেচ্ছাসেবীরাও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন। আবেদনকারীদের সঠিক তথ্য প্রদান, সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে পুরো কার্যক্রমটিকে তারা আরও সুশৃঙ্খল করে তুলেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও কমিউনিটি সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন। প্রবাসীদের প্রত্যাশা, দূতাবাসের এই সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি অনলাইন ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী ও হয়রানিমুক্ত করা হলে এই সেবা আরও জনবান্ধব হবে।
ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আড়াই লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বা ঘরের ভেতরে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, দমকল বাহিনী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় বড় ধরনের অভিযান চলছে। পরিস্থিতিকে উভয় দেশই সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরন্দ ও লঁদ অঞ্চলে দাবানল সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বোর্দোর উপকণ্ঠ পর্যন্ত আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যাপকভাবে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জিরন্দ অঞ্চল থেকেই প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ফ্রান্সে প্রায় দুই লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রায় দেড় হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন করেছে ফরাসি সরকার। পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবে প্রবল বাতাস, শুষ্ক আবহাওয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রার কারণে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত জটিল বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। অন্যদিকে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে একাধিক দাবানল একত্রিত হয়ে বড় আকার ধারণ করায় দেশটির সরকার প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে দাবানল-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে নিরাপত্তার স্বার্থে ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। শনিবার মাদ্রিদের কাছে সেনিসিয়েন্তোস এলাকার অগ্নিনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনো কঠিন লড়াই বাকি রয়েছে। মাদ্রিদ অঞ্চলের জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দাবানল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি নিয়ন্ত্রণে দমকল বাহিনীকে নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ থেকেও অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও সহায়তা পাঠানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে চলমান ধারাবাহিক তাপপ্রবাহ, দীর্ঘদিনের খরা এবং প্রবল বাতাস দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।
দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া একটি বড় দাবানলের কারণে স্পেন সীমান্তসংলগ্ন অন্তত দুই ডজন ছোট শহর ও গ্রাম থেকে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবল বাতাসের কারণে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফ্রান্সের পিরেনিজ পর্বতমালার পাদদেশে শুরু হওয়া এ দাবানলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর বন ও প্রাকৃতিক এলাকা পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শত শত দমকলকর্মী, অগ্নিনির্বাপণ যান এবং আকাশপথে পানি নিক্ষেপকারী বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। তবে আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ ন্যুনেজ জানিয়েছেন, সোমবার সকালে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তাই নতুন করে আগুন নিয়ন্ত্রণের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। দাবানলের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতা ট্যুর ডি ফ্রান্স-এর তৃতীয় ধাপেও। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিযোগিতার নির্ধারিত ফিনিশিং এলাকায় দর্শকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে জরুরি সেবাকর্মীরা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন। তবে প্রতিযোগিতা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। ফ্রান্সে চলতি গ্রীষ্মের শুরু থেকেই তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে একের পর এক দাবানলের ঘটনা ঘটেছে, আর কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, অনুকূল আবহাওয়া না ফিরলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম শীর্ষ প্রভাবশালী রাষ্ট্র ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এই নির্বাচন কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতি, অর্থনৈতিক দিক-নির্দেশনা এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ টানা দুই মেয়াদ পূর্ণ করায় সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে আর প্রার্থী হতে পারছেন না। ফলে ক্ষমতার শীর্ষ পদে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার জন্য ফ্রান্স এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে প্রবেশ করেছে, যা প্রধান দলগুলোকে তাদের কৌশল পুনর্গঠনে বাধ্য করছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সাধারণত দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফায় কোনো প্রার্থী এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট না পেলে শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফায় চূড়ান্ত ভোট অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান সাংবিধানিক সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম দফার ভোট ১৮ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফার ভোট ২ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে জরিপভিত্তিক বিশ্লেষণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে দেশটির সংবেদনশীল ‘অভিবাসন ইস্যু’। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ জুড়ে অভিবাসন প্রবাহ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তি ‘ন্যাশনাল র্যালি’ অভিবাসন ইস্যুকে তাদের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা হিসেবে সামনে এনেছে। দলটি নতুন অভিবাসন কমানো, পরিবার পুনর্মিলনের শর্ত কঠোর করা এবং নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া আরও জটিল করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে ডানপন্থি শিবিরের মূল নেতৃত্ব নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে; দলটির প্রধান মুখ মেরিন ল্য পেন বর্তমানে একটি আইনি আপিল প্রক্রিয়ার রায়ের অপেক্ষায় আছেন। আদালতের রায়ে তিনি যদি অযোগ্য ঘোষিত হন, তবে দলটির সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব হিসেবে জর্দান বারদেলার নাম সামনে আসছে। অন্যদিকে, মধ্যপন্থি শিবির দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য বৈধ অভিবাসন চালু রেখে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির কথা বলছে এবং বামপন্থি দলগুলো একে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানাচ্ছে। এই নির্বাচনী টানাপোড়েনের কারণে ফ্রান্সে বসবাসরত বিশাল অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগ ও আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে রেসিডেন্স পারমিট, নাগরিকত্ব এবং পরিবার পুনর্মিলন সংক্রান্ত নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তাদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তবে ফরাসি প্রশাসনিক সূত্রগুলো স্পষ্ট করেছে যে, বর্তমানে কার্যকর অভিবাসন নীতিই অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তন হলে তা যথাযথ আইন প্রণয়ন ও সংসদীয় অনুমোদনের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের ২০২৭ সালের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি কাঠামো নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সূত্রঃ যুগান্তর
ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় দুঃসংবাদ সামনে এসেছে। ফরাসি সরকার তাদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবাসন-সহায়তা নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে অ-ইইউ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সরকারি আবাসন ভাতা বা এপিএল কর্মসূচির বাইরে থেকে যাবেন। ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক ঘোষণায় জানিয়েছে, আগামী ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকা (ইইএ) এবং সুইজারল্যান্ডের বাইরের যেসব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ক্রুসের (CROUS) সামাজিক বৃত্তি পান না, তাঁরা আর কাফের (CAF) মাধ্যমে দেওয়া এপিএল আবাসন ভাতার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। এতদিন ফ্রান্সে পড়তে যাওয়া অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মাসিক বাসাভাড়ার একটি বড় অংশ সরকারি সহায়তা হিসেবে পেতেন, যা শহর ও বাসস্থানের ধরন অনুযায়ী তাঁদের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক স্বস্তি এনে দিত। নতুন নীতির ফলে সেই সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর মাসিক ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মূলত সরকারি ব্যয় আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে এবং প্রকৃত প্রয়োজনীয়দের মাঝে সামাজিক সহায়তা কেন্দ্রীভূত করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকা ও সুইজারল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা আগের মতোই এই আবাসন ভাতা পাবেন। এর পাশাপাশি ক্রুসের সামাজিক বৃত্তিপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও এই সুবিধার আওতায় থাকবেন। সরকার আরও নিশ্চিত করেছে যে, আবাসন ভাতার নিয়ম পরিবর্তন হলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রুস পরিচালিত অন্যান্য সুবিধা, যেমন—স্বল্পমূল্যের খাবার এবং সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিগুলো আগের মতোই চালু থাকবে। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর। কারণ, এসব দেশের অনেক শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ফ্রান্সে পড়াশোনা করতে যান এবং খরচের দিক থেকে তাঁরা এই আবাসন ভাতার ওপর বেশ নির্ভরশীল থাকেন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে ভবিষ্যতে ফ্রান্সে পড়াশোনার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত আর্থিক প্রস্তুতি নিতে হবে এবং অনেকেই হয়তো উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের অন্যান্য দেশে সুযোগ খোঁজার দিকে ঝুঁকবেন।
দেশের আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া জন্মহার বাড়াতে মা ও বাবা উভয়ের জন্যই নতুন বেতনসহ ছুটির ব্যবস্থা চালু করেছে ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর পূর্বঘোষিত ‘জনসংখ্যাগত পুনর্গঠন’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বুধবার (১ জুলাই) থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আগের নিয়ম অনুযায়ী ফ্রান্সে প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে মায়েরা প্রায় চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পেতেন এবং বাবারা সন্তানের জন্মের পর ২৮ দিনের ছুটি উপভোগ করতে পারতেন। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মা ও বাবা এখন থেকে এই বিদ্যমান ছুটির পাশাপাশি আরও এক বা দুই মাসের অতিরিক্ত ছুটি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিতে পারবেন। এই অতিরিক্ত ছুটির প্রথম মাসে তারা মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় মাসে ৬০ শতাংশ অর্থ আর্থিক সুবিধা হিসেবে পাবেন। নতুন এই নিয়মটি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি বা এর পরে জন্ম নেওয়া শিশুদের অভিভাবকদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এমনকি যারা সন্তান দত্তক নিয়েছেন, সেইসব অভিভাবকরাও সমপরিমাণ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। ফরাসি সরকারের আশা, এই আর্থিক ও ছুটি সংক্রান্ত প্রণোদনা তরুণ দম্পতিদের সন্তান নিতে উৎসাহিত করবে। ইউরোপজুড়েই বর্তমানে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, যার ব্যতিক্রম নয় ফ্রান্সও। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত বছর ফ্রান্সে জন্মের সংখ্যা মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে নিচে নেমে গেছে। ফলে দেশটিতে এক ধরণের জনসংখ্যাগত সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সরকারের এই নতুন পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও এটি পুরোপুরি যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে স্থানীয় নারীবাদী সংগঠনগুলো। তাদের মতে, এই নতুন নিয়মে পরিবারে নারী-পুরুষের সমতা খুব বেশি বাড়বে না। কারণ বাস্তবতার নিরিখে সাধারণত দম্পতির মধ্যে যার আয় কম (অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী), তিনিই এই অতিরিক্ত ছুটি নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
ফিফা বিশ্বকাপে কোচ হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়লেন ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম। তাঁর অধীনে বিশ্বকাপে ১৮তম জয়ের দেখা পেয়েছে ফ্রান্স, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো কোচের সর্বোচ্চ জয়। একই ম্যাচে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোলে সুইডেনকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে ফরাসিরা। মঙ্গলবার (১ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট রাদারফোর্ডে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে ফ্রান্স। কোচ দিদিয়ের দেশমের কৌশল মাঠে দারুণভাবে বাস্তবায়ন করেন তাঁর শিষ্যরা। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ৫৭ বছর বয়সী দেশম বিশ্বকাপে কোচ হিসেবে নিজের ১৮তম জয় তুলে নিলেন। এর আগে গত সপ্তাহে নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারানোর ম্যাচে তিনি জার্মানির কিংবদন্তি কোচ হেলমুট শনের ১৭ জয়ের রেকর্ড ভেঙেছিলেন। তবে মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে জরুরি ভিত্তিতে ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ায় সেই ম্যাচে ডাগআউটে উপস্থিত থাকতে পারেননি তিনি। এবার মাঠে ফিরে দলের আরেকটি জয় দেখলেন স্বচক্ষে। ম্যাচের প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের আগে, ৪৫তম মিনিটে বাঁ দিক থেকে দুর্দান্ত একক প্রচেষ্টায় গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিরতির পরও আধিপত্য ধরে রাখে ফ্রান্স। ৫৩তম মিনিটে মাইকেল অলিসের নিখুঁত পাস থেকে ব্যবধান ২-০ করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। এরপর ৭৪তম মিনিটে অলিসের আরেকটি রক্ষণচেরা পাস ধরে অফসাইডের ফাঁদ এড়িয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন এমবাপ্পে। তাঁর জোড়া গোলে ৩-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে ফ্রান্স। এই জয়ের মাধ্যমে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল কোচদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করলেন দিদিয়ের দেশম।
ফ্রান্সে রেকর্ড ভাঙা তীব্র দাবদাহে অন্তত ১ হাজার মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যেই প্যারিসে এয়ার কন্ডিশনার (এসি) না থাকা নিয়ে মার্কিন পর্যটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের সমালোচনার জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শহরটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক ডেপুটি মেয়র অড্রে পুলভার। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং এর ফলে সৃষ্ট তাপপ্রবাহের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আংশিক দায়ী করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অড্রে পুলভার লেখেন, ‘প্রিয় মার্কিন সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সাররা, কয়েক দিন ধরে আপনারা প্যারিসের সমালোচনা করছেন, কারণ এই শহরের প্রতিটি ঘরে এসি নেই। এটি নিয়ে উপহাস করার কিছু নেই।’ তিনি আরও বলেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং এর ফলে ফ্রান্সে সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের দায় রয়েছে। তার ভাষায়, ‘আপনাদের শহরগুলোর ৯০ শতাংশ জায়গায় এসির ব্যবহারও এই পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।’ প্যারিসের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলোর কথা তুলে ধরে পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, ‘আমাদের উপদেশ দেওয়া বন্ধ করুন। আগে নিজেদের দায়িত্ব পালন করুন।’ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্সে এসির ব্যবহার অনেক কম। দেশটিতে মাত্র এক-চতুর্থাংশ পরিবারের ঘরে এয়ার কন্ডিশনার রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে অনেক ফরাসিই এসিকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর মনে করেন। চলতি মাসে প্রকাশিত ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ ফরাসি নাগরিকের মতে, এসির ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এমনকি প্রতি ছয়জনের একজন জানিয়েছেন, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে তারা দাবদাহের কষ্টও সহ্য করতে প্রস্তুত। তবে সাম্প্রতিক তীব্র গরমে সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। দেশজুড়ে বহনযোগ্য এসির চাহিদা বেড়েছে এবং বিভিন্ন দোকানে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ফ্রান্সের পাবলিক হেলথ বিভাগ জানিয়েছে, গত বুধবার থেকে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পর দেশে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বাড়িতে মৃত্যুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট সতর্ক করে বলেছেন, তীব্র দাবদাহের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা ট্রিবুন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দিনের তীব্র গরমের প্রভাব বিলম্বিতভাবে দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও তরুণদের ক্ষেত্রে। অনেক সময় দাবদাহ শেষ হওয়ার পাঁচ থেকে ১০ দিন পরও রোগীরা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসছেন।’ তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ফলে তাপমাত্রা কমে গেলেও হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। প্যারিসের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, গত শুক্রবার শেষ হওয়া ২৪ ঘণ্টায় তারা ৩ হাজার ৪০০টি কল পেয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চার গুণ বেশি। একই সময়ে হৃদরোগে আক্রান্ত ৩০ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্যারিসের পশ্চিমে ইভলিন অঞ্চলে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। তবে তার ১৫ বছর বয়সী ভাইকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন চিকিৎসাকর্মীরা। এছাড়া তীব্র গরম থেকে বাঁচতে পানিতে নেমে এ পর্যন্ত ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্যারিসের কানাল সেন্ট-মার্টিনে সাঁতার নিষিদ্ধ এলাকায় ডুবে একজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে অনেক প্যারিসবাসী নিজেদের উত্তপ্ত অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বাট-শমঁ পার্কের মতো খোলা সবুজ এলাকায় রাত কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার এসিযুক্ত হোটেলে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। রোববার রাতে বজ্রঝড়ের কারণে প্যারিসে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও বজ্রপাতে আইসিন, ইভলিন ও ইন্দ্র-এ-লোয়ার অঞ্চলের প্রায় ৩৬ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি প্যারিসের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শনিবার থেকে টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টা ১ হাজার ৩০০ পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে লিফট, ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক পাখা বন্ধ হয়ে বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট সবাইকে প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যদি আপনার কোনো প্রতিবেশী একা থাকেন, তাহলে এখনই তার দরজায় কড়া নাড়ুন। আমাদের প্রত্যেককেই দায়িত্ব নিতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।