ইরানে কয়েক বিলিয়ন ডলার স্থানান্তর বা অবরুদ্ধ তহবিল ছাড় করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সরাসরি অস্বীকার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এসব প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ এবং ‘ভিত্তিহীন’ বলে উল্লেখ করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আবুধাবি তেহরানকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রতিবেদনে চারজন কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক সূত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়। তবে ইউএই সরকার বলছে, এমন কোনো অর্থ ছাড়, স্থানান্তর বা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণের তথ্য সঠিক নয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে ইরানের কোনো অবরুদ্ধ তহবিল ছাড় করা হয়নি, স্থানান্তর করা হয়নি এবং এমন কোনো উদ্যোগে সহায়তাও করা হয়নি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে তথ্য প্রকাশের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সংবেদনশীল আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর তথ্যের পরিবর্তে সরকারি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের ওপর নির্ভর করা উচিত। যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।
তবে এর আগে রয়টার্সের প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। সংবাদ সংস্থাটি দাবি করে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ইরান-সম্পর্কিত নিরাপত্তা উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে আমিরাত তার কৌশলগত অবস্থানে পরিবর্তন এনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বৃহত্তর যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা প্রশমনের আলোচনার সঙ্গেও এই উদ্যোগের যোগসূত্র থাকতে পারে।
রয়টার্সের বরাত অনুযায়ী, দুটি আঞ্চলিক সূত্র দাবি করেছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানকে মোট ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ দিতে সম্মত হয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র বলেছে, এই সমঝোতার পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
তবে ওই অর্থের প্রকৃত উৎস নিয়ে তখনও স্পষ্টতা ছিল না। অর্থটি আমিরাতের নিজস্ব তহবিল, নাকি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানের তেল বিক্রির রাজস্ব, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের গোপন যোগাযোগ ও বৈঠক হয়েছে। একটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা আবুধাবি সফর করেন এবং সেখানে ইউএইর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে আলোচনার পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নিতে আমিরাতের একটি প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করেছে বলেও দাবি করা হয়।
যদিও এসব দাবির কোনো অংশই ইউএই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমীকরণের সঙ্গেও জড়িত। গত কয়েক বছরে ইরান ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের সম্পর্ক ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দুবাইয়ের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমানত রয়েছে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের সঙ্গে লেনদেন করলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে ইরান-সংশ্লিষ্ট অর্থ স্থানান্তরের প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়।
এদিকে ওয়াশিংটনও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি বলেছেন, কেবল কোনো বৈঠক বা চুক্তির বিনিময়ে ইরানকে অর্থ দেওয়া হবে না। সম্ভাব্য কোনো সমঝোতা হলে তা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।
অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষও এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে রয়টার্সের সূত্রভিত্তিক দাবির বিপরীতে ইউএই সরকারের আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতির পর পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অভিযোগ ও পাল্টা অস্বীকৃতির মধ্যে বাস্তবে কোনো অর্থ স্থানান্তর হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটেনি।
সূত্র: রয়টার্স, ইউএই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুন্দর পিচাইয়ের বক্তব্য চলাকালীন ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ ও অনুষ্ঠান বর্জনের (ওয়াকআউট) ঘটনা ঘটেছে। রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৫তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সুন্দর পিচাই প্রধান বক্তা হিসেবে মঞ্চে ওঠার পরপরই এই ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, সুন্দর পিচাই বক্তব্য শুরু করার মুহূর্তেই সমাবর্তনস্থলে উপস্থিত ১০০ জনেরও বেশি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী তাদের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। এ সময় তারা "ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন" (ফিলিস্তিনের মুক্তি চাই) বলে উচ্চকণ্ঠে স্লোগান দিতে দিতে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। কট্টর বামপন্থী ছাত্র সংগঠন 'স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন' এবং 'নো টেক ফর অ্যাপার্থাইড'-এর যৌথ আহ্বানে এই প্রতিবাদের আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে ইসরায়েল সরকারের সাথে গুগলের ১.২ বিলিয়ন ডলারের ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি 'প্রজেক্ট নিম্বাস'-কে দায়ী করা হচ্ছে। আমাজনের সাথে যৌথভাবে পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে গুগল ইসরায়েল সরকারকে ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, গুগলের এই প্রযুক্তি ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি এবং ইসরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও গুগল বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, এটি কেবল সরকারি বেসামরিক কাজের জন্য একটি ক্লাউড সেবা। উল্লেখ্য, সুন্দর পিচাই নিজে ১৯৯৫ সালে এই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই মেটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসে তাকে এমন নজিরবিহীন প্রতিবাদের মুখে পড়তে হলো। এর আগে ২০২৪ সালেও এই প্রজেক্ট নিম্বাসের বিরুদ্ধে গুগলের ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্ক অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবস্থান ধর্মঘট করলে গুগল কয়েক ডজন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছিল। চলতি বছর আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের লক্ষ্য করে শিক্ষার্থীদের এমন ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনা নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগেই অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গুগলের সাবেক সিইও এরিক শ্মিড বক্তব্য দিতে গেলে এআই প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে শিক্ষার্থীরা তাকে ধুয়ে দেয়। তবে স্ট্যানফোর্ডের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এই তুমুল হট্টগোল ও কক্ষ ত্যাগের মাঝেও সুন্দর পিচাই তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যান, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ভূ-রাজনীতির চেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষার্থীদের আশাবাদী থাকার পরামর্শই বেশি প্রাধান্য পায়।
সুইজারল্যান্ডে অভিবাসন সীমিত করে দেশের জনসংখ্যা এক কোটির মধ্যে আটকে রাখার প্রস্তাব গণভোটে প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা। ডানপন্থি সুইস পিপলস পার্টি (এসভিপি-ইউডিসি) সমর্থিত এই উদ্যোগের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ৫৪ শতাংশের বেশি নাগরিক। রোববার অনুষ্ঠিত গণভোটের ফল প্রকাশের পর স্বস্তি প্রকাশ করেছে সুইস সরকার, প্রধান রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন এবং ব্যবসায়ী মহল। বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবটি পাস হলে সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারত। ফলাফল ঘোষণার পর দেশটির বিচার ও পুলিশমন্ত্রী বিট ইয়ান্স বলেন, “আজকের ভোটের মাধ্যমে সুইস জনগণ স্থিতিশীলতা, উন্মুক্ততা এবং আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্যতার পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।” গণভোটের আগে পরিচালিত বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল, প্রস্তাবটির বিরোধীরা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল সেই পূর্বাভাসকেই সত্য প্রমাণ করেছে। প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য ছিল ২০৫০ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের স্থায়ী জনসংখ্যা এক কোটির বেশি হতে না দেওয়া। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৯৫ লাখ। ইউডিসির দাবি ছিল, অব্যাহত অভিবাসনের কারণে আবাসন সংকট, যানজট, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সুইজারল্যান্ডে বর্তমানে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। ডানপন্থি দলটির মতে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে অবকাঠামোগত সংকট আরও তীব্র হবে। তবে প্রস্তাবটির বিরোধীরা যুক্তি দেন, সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। অভিবাসন কঠোরভাবে সীমিত করা হলে শ্রমবাজারে সংকট তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশটি পিছিয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। যদিও দেশটি ইইউর সদস্য নয়, তবুও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে এবং ২০৫০ সালের আগেই জনসংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে গেলে সুইস সরকারকে দুই বছরের মধ্যে ইইউর সঙ্গে মানুষের অবাধ চলাচলসংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করতে হতো। এর ফলে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিল। গণভোটে শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, অধিকাংশ ক্যান্টনেও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা দেখা গেছে বাসেল-শ্টাড, জেনেভা এবং নিউশাতেল ক্যান্টনে। সুইস ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই ফলাফল প্রমাণ করেছে যে সুইস জনগণ নিজেদের সমাজকে আরও বন্ধ ও বিচ্ছিন্ন করার পথ বেছে নেয়নি। তারা বহুত্ববাদ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ইউডিসির সভাপতি মার্সেল ডেটলিং ফলাফলকে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করলেও তিনি দাবি করেন, অভিবাসন প্রশ্নে জনগণের উদ্বেগ এখনও রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে তাদের প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। গ্রিন পার্টি ফলাফলকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, ভোটাররা বিভাজনমূলক রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন সোশ্যালিস্ট পার্টির সংসদ সদস্য বেনোয়া গাইয়ার। তিনি বলেন, এই ফলাফল এমন রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি বার্তা, যা সমস্যার সমাধানের বদলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করার চেষ্টা করে। ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের বিশ্লেষক জেস মিডলটন মনে করেন, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সুইজারল্যান্ড সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতা থেকে রক্ষা পেয়েছে। গণভোটে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৯ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর গড় উপস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি। জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক পাসকাল সিয়ারিনি বলেন, অভিবাসন ও ইউরোপনীতি ঘিরে তীব্র বিতর্ক থাকায় ভোটারদের আগ্রহও ছিল বেশি। তবে তিনি মনে করেন, প্রস্তাবটি ব্যর্থ হলেও ইউডিসি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পাওয়া দেখায় যে অভিবাসন প্রশ্নটি এখনও সুইস রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত আরেকটি গণভোটে সুইস ভোটাররা বেসামরিক সেবায় যোগদানের নিয়ম কঠোর করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন। ইউরোপজুড়ে সামরিক সক্ষমতা জোরদারের আলোচনার মধ্যে সুইস সরকার এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ গণভোটের ফলাফল একদিকে যেমন অভিবাসন বিষয়ে সুইস জনগণের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরেছে, অন্যদিকে দেশটির ইউরোপমুখী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতির প্রতি জনগণের সমর্থনেরও ইঙ্গিত দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নতুন চুক্তির পর ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করেছে ওয়াশিংটন। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে কার্যকর থাকা নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি চুক্তি বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জানান, চুক্তির কিছু বিষয় নিয়ে তার ব্যক্তিগত আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি এতে অনুমোদন দিয়েছেন। খামেনির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তাকে আশ্বস্ত করার পরই তিনি চুক্তিতে সম্মতি দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরান তার নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসেছে বা যুক্তরাষ্ট্রের সব অবস্থান মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি খামেনির মন্তব্যের জবাব না দিলেও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেও শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প বিশেষভাবে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। এদিকে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, চুক্তি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পর্ব শুরু হয়েছে। এই সময়ে দুই দেশ বিভিন্ন কারিগরি ও রাজনৈতিক বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করবে। ভ্যান্স জানান, আলোচনার পরবর্তী ধাপ পরিচালনার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে সুইজারল্যান্ড সফর করতে পারেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান চুক্তির সব শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা বা নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের সুযোগ পাবে না। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির নিরাপদ ও স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দীর্ঘদিন ধরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এ ছাড়া চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। তবে ওই তহবিলে অর্থায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে জানানো হয়েছে। চুক্তির আওতায় উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। প্রয়োজন হলে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তি স্বাক্ষরের একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, দুই পক্ষ ইতোমধ্যে দূরবর্তী পদ্ধতিতে নথিতে স্বাক্ষর করায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চুক্তি বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ সমঝোতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা শিগগিরই সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ বৈরিতার পর এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনা কতটা কার্যকরভাবে এগিয়ে যায় এবং উভয় পক্ষ চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিকতা দেখায় তার ওপর।
বর্তমানে মূল ভূখণ্ড চীনে অনেক পশ্চিমা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ। তবে হংকংয়ে তুলনামূলকভাবে কিছু আন্তর্জাতিক এআই সেবা এখনও সীমিত আকারে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে জেপিমরগানের এই সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও তথ্যের গোপনীয়তা, গ্রাহক ডেটার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগও সমানভাবে বাড়ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এআই ব্যবহারে আরও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছে। এদিকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক অ্যানথ্রোপিককে তাদের কিছু উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল বিদেশি নাগরিকদের কাছে সরবরাহ সাময়িকভাবে সীমিত রাখার নির্দেশ দেন। তার দাবি, অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক বা গোয়েন্দা কার্যক্রমে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অ্যানথ্রোপিকের ‘মাইথোস’ এবং ‘ফেবল’ নামের উন্নত মডেলগুলো নিয়েও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছেন, উন্নত এআই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ভবিষ্যতে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু ব্যবসা বা প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি ক্রমেই ভূরাজনীতি, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও বাছাই করা নীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। জেপিমরগানের সর্বশেষ এই পদক্ষেপও সেই বৃহত্তর বৈশ্বিক বাস্তবতারই একটি অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।