মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে এবং উপযুক্ত সময়ে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া উচিত। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানের অনেক অর্থ আটকে রেখেছি। সেই অর্থ আমাদের নয়, ইরানের। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমরা সেই অর্থ জব্দ করেছিলাম। আমার বিশ্বাস, একসময় সেই অর্থ ফেরত দিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ধরে রাখতে এ ধরনের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, “যদি বৈধ অর্থ ফেরত না দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কেউই ডলারের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে চাইবে না।”
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নতুন সমঝোতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
চলমান আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো। বিশেষ করে লেবাননসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রম সীমিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
ট্রাম্প জানান, ইরান যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং সমঝোতার শর্তগুলো মেনে চলে, তাহলে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা সরাসরি কোনো অর্থ সহায়তা দিচ্ছি না। তবে ইরান যদি চুক্তির শর্ত মেনে চলে এবং ইতিবাচক পথে এগোয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করতে পারবেন।”
তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে ইরান বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের মতে, দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবং ইরান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চললে নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো দুই দেশের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে যেকোনো চূড়ান্ত সমঝোতার আগে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের অর্থ ফেরত দেওয়া, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার গতিপথই নির্ধারণ করবে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পরিণতির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হলেও, পুলিশ ধারণা করছে নাহিদা বৃষ্টিকেও (২৭) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ঘাতক ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর রক্ত’ পাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভবত আর কখনোই সম্ভব হবে না। নিহত বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘১০ টাম্পা বে নিউজ’-কে জানান, শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, লিমন ও হিশামের শেয়ার করা ফ্ল্যাটে যে পরিমাণ রক্ত পাওয়া গেছে, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বৃষ্টি আর বেঁচে নেই। পুলিশের আশঙ্কা, হত্যার পর মরদেহটি সম্ভবত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বা টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে এটি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। পুলিশ হিশামের বাড়িতে পৌঁছালে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ (SWAT) তলব করা হয়। প্রায় ২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির পর হিশাম আত্মসমর্পণ করেন। তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং অবৈধভাবে মরদেহ সরানোর মতো ছয়টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হিশাম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি লিমনের রুমমেট হিসেবে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অন্যদিকে, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। লিমনের সাথে তার আগে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে ছিল না বলে জানিয়েছেন বৃষ্টির পরিবার। তদন্তকারীরা লিমনের মৃত্যু নিশ্চিত করলেও বৃষ্টির নিখোঁজ রহস্য ও তাকে হত্যার নৃশংসতা এখন পুরো ফ্লোরিডা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক নিয়ে নিজ দেশেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সমালোচকদের জবাবে এবার বেশ কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন তিনি। ইরানের বিষয়ে নিজের অবস্থানকে যথেষ্ট কঠোর নয় বলে যারা অভিযোগ করছেন, তাদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছেন, তারা হয় “ঈর্ষান্বিত”, “খারাপ লোক” অথবা “নির্বোধ”। বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার প্রশাসনের পদক্ষেপের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প লিখেছেন, “যারা মনে করে আমি ইরানের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর ছিলাম না, তারা হয় ঈর্ষান্বিত, নয়তো খারাপ লোক, অথবা স্রেফ নির্বোধ। কারণ শেয়ারবাজার এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং তেলের দামও দ্রুত কমছে।” তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন সমঝোতা স্মারক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল বিতর্ক চলছে। দেশটির কিছু নীতিনির্ধারক, বিশ্লেষক এবং বিরোধী রাজনৈতিক মহলের দাবি, চুক্তির মাধ্যমে ইরানের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়তা দেখানো হয়েছে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের জন্য কতটা উপকারী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, সাম্প্রতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিটি একটি ‘পারফরম্যান্সভিত্তিক’ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ ইরান চুক্তির শর্তগুলো মেনে চললে ধাপে ধাপে বিভিন্ন সুবিধা পাবে। সম্প্রতি ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার পর একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মতি হয়। এতে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং নিষেধাজ্ঞা ইস্যুসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তির অনেক বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নিয়ে সামনে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য মূলত নিজ সমর্থকদের আশ্বস্ত করার পাশাপাশি চুক্তি নিয়ে বাড়তে থাকা সমালোচনার জবাব। একই সঙ্গে তিনি অর্থনৈতিক সূচক, বিশেষ করে শেয়ারবাজার ও জ্বালানি তেলের দামকে নিজের নীতির সফলতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। এদিকে সমঝোতা স্মারকটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি এটিকে নিজের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবেই দেখছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের পতাকাবাহী তিনটি সুপারট্যাংকার সফলভাবে অতিক্রম করেছে। জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ট্যাংকারগুলোতে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করা হচ্ছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সৌদি বন্দর থেকে হরমুজ হয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় তেল চালানগুলোর একটি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার পর এই বড় আকারের তেল পরিবহন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইরানকে ঘিরে চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন অগ্রগতির খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সৌদি ট্যাংকারগুলোর যাত্রা শুরু হয়। ফলে এই ঘটনা শুধু বাণিজ্যিক নয়, ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন করিডর। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ এই নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে এই রুটে যেকোনো অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সংঘাত ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখে। এর মাধ্যমে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। তবে সর্বশেষ এই সুপারট্যাংকার চলাচল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরছে। জাহাজ-পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিনটি সুপারট্যাংকারে মোট প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে। সাধারণত এ ধরনের বিশাল আকারের ট্যাংকার আন্তর্জাতিক বাজারে বৃহৎ পরিসরের জ্বালানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপ, এশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদা পূরণে উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়লেও কূটনৈতিক তৎপরতা সমান্তরালভাবে চলেছে। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা এবং উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে আস্থা ফিরবে এবং বাজারে অস্থিরতা কমতে পারে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরবের এই বৃহৎ তেল পরিবহনকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। এদিকে তেলবাহী সুপারট্যাংকারগুলোর নির্বিঘ্ন যাত্রা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বাজারে কিছুটা আশাবাদ তৈরি করেছে। এর প্রভাব আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য ও তেলের দামে প্রতিফলিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে সামরিক সংঘাত যত জটিল হচ্ছে, ততই বাড়ছে বেসামরিক পরমাণু অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ইরানের নাতানজ, ফোরদো ও ইসফাহানের পরমাণু স্থাপনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, যুদ্ধের সময় এসব স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, পরমাণু স্থাপনায় হামলাকে আন্তর্জাতিকভাবে এক ধরনের অলঙ্ঘনীয় নিষেধাজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ এ ধরনের হামলা শুধু একটি দেশের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এমন এক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে ভারত ও পাকিস্তানের একটি পুরোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, যা কয়েক দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে পরমাণু স্থাপনাগুলোকে সামরিক হামলার বাইরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারত ও পাকিস্তান বিশ্বের দুই পরমাণু অস্ত্রধারী প্রতিবেশী রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘাত এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সম্পর্কের অবনতি হয়েছে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবুও একটি বিষয়ে দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে আশ্চর্যজনক সংযম বজায় রেখেছে। তা হলো, কোনো পরিস্থিতিতেই একে অপরের পরমাণু স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু না করা। এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে ১৯৮৮ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর নেতৃত্বে ‘পরমাণু স্থাপনা ও কেন্দ্রে হামলা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। পরে ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে এটি কার্যকর হয়। চুক্তিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতি বছর ১ জানুয়ারি ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের পরমাণু স্থাপনাগুলোর তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে একে অপরের কাছে হস্তান্তর করে। এর উদ্দেশ্য হলো, যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাতের সময় এসব স্থাপনাকে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না করা। ১৯৯২ সালে এই তথ্য বিনিময় প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে একবারের জন্যও তা বন্ধ হয়নি। চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারিতেও দুই দেশ টানা ৩৫তম বারের মতো এই তালিকা বিনিময় করেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই তালিকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং সংশ্লিষ্ট বেসামরিক অবকাঠামোর তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে। নিউ দিল্লি ও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এসব তথ্য নিয়মিত আদান-প্রদান করা হয়। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত ডি বি ভেঙ্কটেশ বর্মা এই ব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম সফল আস্থা-নির্মাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ এই চুক্তিকে কার্যকর রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় ভারতের সাবেক প্রতিনিধি সৈয়দ আকবরউদ্দিনও চুক্তিটির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ১৯৯০-এর দশকে ইসলামাবাদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজেই এই তালিকা বিনিময় প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন। তার মতে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির বর্তমান বাস্তবতায় এই ব্যবস্থা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরমাণু স্থাপনায় হামলার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো তেজস্ক্রিয় দূষণ। একটি বড় দুর্ঘটনা বা হামলার প্রভাব কেবল একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাতাস, পানি এবং পরিবেশের মাধ্যমে তা সীমান্ত পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরমাণু অবকাঠামোকে যুদ্ধের বাইরে রাখার নীতি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তবে আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি মনে করেন, ভারত-পাকিস্তান মডেলটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব অঞ্চলে সরাসরি একইভাবে প্রয়োগ করা সহজ হবে না। কারণ প্রতিটি অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং কৌশলগত পরিবেশ ভিন্ন। বর্তমানে ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পরমাণু স্থাপনাকেও ঘিরে উত্তেজনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের চুক্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বিরোধ এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে পরমাণু স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গড়ে ওঠা এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দেখিয়েছে, চরম বৈরিতার মধ্যেও কিছু বিষয়ে সহযোগিতা ও সংযম বজায় রাখা সম্ভব। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এটিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।