ইরান ইস্যুতে সুর আরও কঠোর করল ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্রতা ও গোলাবারুদ নিক্ষেপের পরিমাণ এখন থেকে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।
গত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের ব্রিফিং শেষে এই হুঁশিয়ারি দেন হেগসেথ। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তেহরানকে লক্ষ্য করে মার্কিন অভিযানের গতিপ্রকৃতি এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
এই অভিযানে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ায় যুক্তরাজ্যের ভূমিকার প্রশংসা করেন হেগসেথ। তবে কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ব্রিটিশরা যদি আরও আগে এই অনুমতি দিত, তবে সেটি আরও ভালো হতো। তবুও শেষ পর্যন্ত এই সুবিধা পাওয়ায় ওয়াশিংটনের পক্ষে হামলা জোরদার করা অনেক সহজ হবে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টার্মার জানিয়েছেন, তারা কাতারে অবস্থিত ব্রিটিশ স্কোয়াড্রনে আরও চারটি অত্যাধুনিক টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছেন। ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে মূলত "প্রতিরক্ষামূলক অভিযান" পরিচালনার জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতে নতুন করে হামলার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড। তারা জানিয়েছে, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ২৩তম দফার হামলা শুরু করা হয়েছে। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত প্রায় পৌনে ১২টার দিকে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে এই হামলা পরিচালিত হচ্ছে। এর আগে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে সামরিক হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই হামলার জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক পাল্টা হামলা শুরু করে। বিপ্লবী গার্ডের সর্বশেষ ঘোষণার আগে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র আসার খবরও পাওয়া যায়, যা অঞ্চলজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের আঞ্চলিক উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি গত চার দশক ধরে পরিকল্পিত একটি যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপ। সম্প্রতি মিডল ইস্ট আই-তে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে যে 'ইরানি পারমাণবিক হুমকির' কথা বলে আসছিলেন, তা মূলত বিশ্ববাসীর চোখে ধুলো দেওয়ার একটি 'স্মোক স্ক্রিন' বা ধোঁয়াশামাত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত রবিবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই যুদ্ধের পরিকল্পনা তিনি চার দশক ধরে লালন করছেন। নেতানিয়াহু দম্ভোক্তি করে বলেন, "এই সম্মিলিত শক্তি আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে যা আমি ৪০ বছর ধরে অর্জন করতে চেয়েছিলাম: এই সন্ত্রাসী শাসন ব্যবস্থাকে (ইরান) সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ করা।" বিশ্লেষকদের মতে, গত ৪০ বছর ধরে ইসরায়েলি নেতারা বারবার সতর্ক করে আসছিলেন যে তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কিন্তু চার দশক পার হলেও সেই বোমার অস্তিত্ব মেলেনি। নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের আসল লক্ষ্য কখনোই কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা ছিল না; বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা এবং ইরানকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ জোনাথন কুকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এ অঞ্চলের সবচেয়ে বৃহৎ এবং ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র। দেশটির সমৃদ্ধ ইতিহাস, শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের ঔপনিবেশিক আধিপত্যের পথে প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে ইরাক, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনের শিয়া সম্প্রদায়গুলোর ওপর ইরানের প্রভাব ইসরায়েলের আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের (Hegemony) জন্য হুমকি স্বরূপ। ইসরায়েল ভয় পায় যে ইরান যদি সত্যিই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে, তবে এ অঞ্চলে ইসরায়েলের "একচ্ছত্র ক্ষমতার" অবসান ঘটবে। প্রতিবেদনে ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা হয়েছে। তখন যেমন 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' বা WMD-এর অজুহাত দিয়ে একটি সাজানো মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে ইরাক আক্রমণ করা হয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রেও নেতানিয়াহু একই কৌশল অবলম্বন করছেন। পার্থক্য শুধু এই যে, ইরাকের ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীকে বোঝাতে কয়েক মাস সময় লেগেছিল, আর ইরানের ক্ষেত্রে ইসরায়েল গত ৪০ বছর ধরে তিল তিল করে যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল যে "আত্মরক্ষার" অধিকার দাবি করে গাজায় অভিযান শুরু করেছিল, তা মূলত তাদের বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। গাজায় চালানো ধ্বংসযজ্ঞ এবং পরবর্তীতে ইরানকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে আনা—সবই একটি সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নব্য-রক্ষণশীলদের (Neocons) সহযোগিতায় ইসরায়েল এখন মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে চাইছে। বর্তমান যুদ্ধটি কেবল সীমান্ত সংঘাত বা পারমাণবিক কর্মসূচি রক্ষার লড়াই নয়। এটি মূলত ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দিয়ে দেশটিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগত অঞ্চলে বিভক্ত করার একটি চেষ্টা, যাতে ইসরায়েল এ অঞ্চলের একমাত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারে। বিশ্বনেতারা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে নেতানিয়াহুর এই বয়ান বিশ্বাস করে আসলেও, বর্তমান যুদ্ধ প্রমাণ করছে যে এর নেপথ্যে কাজ করছে এক দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর নীল নকশা। তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই।
ইরান ইস্যুতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। এই সংঘাতকে একটি ‘অসাধারণ ভুল’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি সাফ জানিয়েছেন, এই যুদ্ধের কোনো আন্তর্জাতিক বৈধতা নেই। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে সানচেজ বলেন, "প্রকৃত মিত্রের পরিচয় হলো বন্ধু যখন সঠিক পথে থাকে তখন তাকে সাহায্য করা, আর যখন সে ভুল পথে হাঁটে তখন সেই ভুলটি ধরিয়ে দেওয়া।" আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এই ধরণের সামরিক অভিযান বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এদিকে, স্পেনের এই অবস্থানের কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্পেনের মোরন এবং রোটাফোর সামরিক ঘাঁটি ইরান অভিমুখে হামলার জন্য ব্যবহার করতে না দেওয়ায় তিনি স্পেনের ওপর পূর্ণ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস এই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই ‘প্রক্সি যুদ্ধের’ ক্ষেত্র বানানো উচিত নয়। ইরানি জনগণের নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে মেৎস বলেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ‘ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি’ তৈরি হবে।