ইরানের ওপর মার্কিন বিমান হামলার নেপথ্যে কি তবে ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল? মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে এমনটাই আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রুবিও জানিয়েছেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্ভাব্য সংঘাতের সময়জ্ঞান বিবেচনা করেই যুক্তরাষ্ট্র আগেভাগে হামলা চালিয়েছে।
ওয়াশিংটনের ভাষ্যমতে, তারা জানত যে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাতে যাচ্ছে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানবে। এই পরিস্থিতি এড়াতেই যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রি-এম্পটিভ’ বা প্রতিরোধমূলক হামলার পথ বেছে নেয়।
তবে এই ব্যাখ্যাকে ভালো চোখে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিকো বিষয়টিকে ‘ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, রুবিও প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলি কৌশলের জালে আটকা পড়েছে।
গ্রিকো আরও উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র, যা ওয়াশিংটনের হাতে বড় একটি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু ইসরায়েল নিজের মতো কাজ করবে বলেই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়াতে হবে—এমন যুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ কতটুকু একমুখী আর কোথায় আলাদা, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান এই প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–এর যৌথ হামলার পর ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা এই সরু সামুদ্রিক পথটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার হলেও জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত পথ মাত্র প্রায় ৩ কিলোমিটার। এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই দুই দিক থেকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল করে। OPEC–ভুক্ত সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকের মতো দেশগুলোর অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ এই পথ দিয়ে রপ্তানি হয়। এসব তেল মূলত এশিয়ার বাজারে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। দেশটি তাদের প্রায় পুরো এলএনজি উৎপাদন হরমুজ প্রণালী হয়ে পরিবহন করে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Reuters জানিয়েছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে কাতার সাময়িকভাবে গ্যাস উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও সাধারণ মানুষের চরম মানবিক বিপর্যয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর এর নিষ্ঠুর প্রভাব দেখে ব্যক্তিগতভাবে ‘মর্মাহত’ হওয়ার কথা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ফলকার টুর্ক। তিনি অবিলম্বে লিপ্ত পক্ষগুলোকে সহিংসতা বন্ধ করে সংঘাতের পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার জেনেভায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফলকার টুর্কের অবস্থান তুলে ধরেন তার মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের লাখো মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি চাইলেই এড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো পরিস্থিতি প্রতি মুহূর্তে আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং যুদ্ধের পরিধি ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। এই সংকটের সমাধান খুঁজতে ইরানের পক্ষ থেকেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই জানিয়েছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরাপত্তা পরিষদের বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলেই এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই ‘হুঁশে ফেরার’ কড়া বার্তা এল।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) কেবল রণক্ষেত্রেই নয়, মার্কিন অর্থনীতিতেও বড় ধরনের আঘাত হানতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ফোর্বস এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, গত শনিবার হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের প্রাথমিক ব্যয় ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ব্যয়ের নেপথ্যে যা রয়েছে: প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল ব্যয়ের একটি বড় অংশ খরচ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা ‘ভাস্ট আর্মাডা’ বা বিশাল নৌবহর এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর পেছনে। পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, হামলা শুরুর আগের সামরিক প্রস্তুতিতেই ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৬৩ কোটি ডলার। এরপর গত ২৪ ঘণ্টায় বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং টমাহক মিসাইল ব্যবহারের ফলে ব্যয়ের পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে। শুধুমাত্র বি-২ বোমারু বিমানের উড্ডয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচই কয়েক কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও ঝুঁকি: পেন হোয়ার্টন বাজেট মডেলের পরিচালক কেন্ট স্মেটার্স সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত যদি দুই মাস স্থায়ী হয়, তবে মার্কিন অর্থনীতির মোট ক্ষতির পরিমাণ ২১ হাজার কোটি (২১০ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে সরাসরি সামরিক খরচ হবে প্রায় ৬৫ থেকে ৯৫ বিলিয়ন ডলার। বাকিটা আসবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাণিজ্যে অচলাবস্থার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি থেকে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা: যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবার মার্কিন অপরিশোধিত তেলের (WTI) দাম ৬ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৭১ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, হরমুজ প্রণালী যদি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকে, তবে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের যাতায়াত ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। রাজনৈতিক চাপ: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুদ্ধকে ৪ থেকে ৫ সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, বিশেষজ্ঞরা একে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করছেন। ঘরোয়া রাজনীতিতেও ট্রাম্প চাপের মুখে রয়েছেন। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৪১ শতাংশ আমেরিকান এই সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন। বিরোধীরা দাবি করছেন, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই এই ‘বেআইনি’ যুদ্ধ সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা অপচয় করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উল্লেখ্য, গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেনিকে লক্ষ্য করে চালানো বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই সরাসরি সংঘাতের সূত্রপাত হয়। বর্তমানে তেহরান ও আশপাশের এলাকায় হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং ইরানও পাল্টা জবাব হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।