ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে অধিকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ভয়াবহ সংঘাত ও বর্বরতা চালাচ্ছে কট্টরপন্থী ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত এক মাসে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ‘ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশন’-এর প্রধান মুয়াইয়াদ শাবান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ‘ওয়াফা’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক মাসে বসতিস্থাপনকারীরা মোট ৪৪৩টি হামলা চালিয়েছে। শাবান জানিয়েছেন, অঞ্চলের ডেমোগ্রাফিক বা জনতাত্ত্বিক চিত্র বদলে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকেই অশান্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এই হামলাগুলো চালানো হচ্ছে। গত এক মাসের ভয়াবহ কিছু চিত্র: প্রাণহানি: বসতিস্থাপনকারীদের সরাসরি হামলায় অন্তত ৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জোরপূর্বক উচ্ছেদ: ৬টি বেদুইন সম্প্রদায়কে তাদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ৫৮টি পরিবারের ২৫৬ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭৯ জন নারী এবং ১৬৬ জন শিশু রয়েছে। অবৈধ দখলদারি: ফিলিস্তিনি ভূমিতে অন্তত ১৪টি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছে কট্টরপন্থীরা। নাশকতা ও অগ্নিসংযোগ: ১৮টি অগ্নিসংযোগসহ অন্তত ১২৩টি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রেকর্ড করা হয়েছে। ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত: দুমার মুহাম্মদ ফাইয়াদ মসজিদ এবং মাজদাল বানি ফাদিল মসজিদে অগ্নিসংযোগের চেষ্টাসহ অন্তত ৩টি ধর্মীয় স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া আল-আকসা মসজিদে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে কড়াকড়ি ও উস্কানিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মহলের নজর যখন ইরান যুদ্ধের দিকে, ঠিক তখনই পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার এই আগ্রাসন চালানো হচ্ছে।
গাজায় চলমান গণহত্যার নৃশংসতা যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এবার এক ১৮ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুর ওপর ইজরায়েলি বাহিনীর মধ্যযুগীয় বর্বরতার লোমহর্ষক চিত্র সামনে এসেছে। বাবার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে নিষ্পাপ শিশু করিমকে। তার কোমল শরীরে অসংখ্য সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া ছাড়াও পায়ে গেঁথে দেওয়া হয়েছে লোহার পেরেক। প্যালেস্টাইন টিভির সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই পৈশাচিক ঘটনাটি উঠে এসেছে। ঘটনাটি ঘটে আল মাঘাজি শরণার্থী শিবিরে। শিশুটির বাবা ওসামা আবু নাসর নিজের জীবিকা ও ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করার সময় হঠাৎ ইজরায়েলি সেনা ও হামাস যোদ্ধাদের মধ্যে গোলাগুলির কবলে পড়েন। ইজরায়েলি সেনারা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আটক করে এবং সঙ্গে থাকা ১৮ মাসের শিশু করিমসহ সেনা শিবিরে নিয়ে যায়। সেখানে ওসামাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে জেরা ও অকথ্য নির্যাতন শুরু হয়। কিন্তু পাশবিকতার চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করে যখন ওসামার চোখের সামনেই তার ছোট্ট শিশুটির ওপর শুরু হয় বর্বরতা। টানা ১০ ঘণ্টা ধরে চলে এই পৈশাচিক উল্লাস। শিশুটির আর্তচিৎকার ইজরায়েলি সেনাদের মনে বিন্দুমাত্র দয়া উদ্রেক করেনি, বরং তারা হিংস্র উল্লাসে মেতে ওঠে। নির্যাতনের পর শিশুটিকে রেডক্রস সোসাইটির মাধ্যমে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হলেও ওসামা আবু নাসর এখনও ইজরায়েলি হেফাজতেই বন্দি আছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, করিমের শরীরে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন রয়েছে এবং মানসিক ট্রমার কারণে সে ঘুমের ঘোরেও যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠছে। বিশ্বজুড়ে এই অমানবিক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
দখলকৃত জেরুজালেমের সালাহ আল-দীন স্ট্রিটে শুক্রবার ফিলিস্তিনিরা জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে ইসরাইলি বাহিনীর বাধার মুখে পড়েছে। ওয়াফা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে এ ঘটনা জানানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি বাহিনী সড়কে প্রবেশ করে কয়েক ডজন মুসল্লি ও ইমামকে মাত্র তিন মিনিট সময় দিয়েছে। এরপর তাদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়া হয়, ফলে নামাজ আদায় সম্ভব হয়নি। এই ঘটনার পেছনে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও প্রভাব ফেলেছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ দিন ধরে মসজিদটি সাধারণ ভক্তদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় তথাকথিত 'যুদ্ধবিরতি' চলাকালীন সময়েও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬৮৯ জন ফিলিস্তিনি। গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মাঠ পর্যায়ের সংবাদকর্মীরা এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে কেবল প্রাণহানিই ঘটেনি, বরং ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৮৬০ জন ফিলিস্তিনি। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও গাজার সাধারণ মানুষের ওপর এই নিরবচ্ছিন্ন হামলা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মানবিক পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতির তোয়াক্কা না করেই ফের হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। বুধবার ভোরে মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া পৃথক এক হামলায় তিন শিশুসহ আরও চারজন আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি চিকিৎসা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা আনাদোলু এ তথ্য জানিয়েছে। চিকিৎসা সূত্রগুলো জানায়, নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ভোরের আলো ফোটার আগেই একটি ইসরায়েলি ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। দিনের অন্য এক ঘটনায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে চারজন গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলি বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘন করছে। ১৮ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি চলাকালীন ইসরায়েলি হামলায় ৬৭৭ জন নিহত এবং ১,৮১৩ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত ৭২,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১,৭২,০০০ মানুষ। দীর্ঘস্থায়ী এই হামলায় গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে, যা উপত্যকাটিকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং শান্তি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ইসরায়েলি বাহিনীর এমন ধারাবাহিক হামলা গাজায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।
ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয় কাটাতে এবং ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব রক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের অর্থনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ। মঙ্গলবার জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলি পদক্ষেপ রুখতে 'তীব্র হস্তক্ষেপ' (massive intervention) ছাড়া গাজার মানুষকে বাঁচানো সম্ভব নয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার বিষয়ক এই বিশেষ দূত প্রশ্ন তোলেন, "কীভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলো এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে?" তিনি মনে করিয়ে দেন যে, যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত কোনো রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র হস্তান্তর না করা প্রতিটি দেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। আলবানিজ উল্লেখ করেন, গাজায় কথিত যুদ্ধবিরতি চললেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং আরও অবনতি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় আরও অন্তত ৬৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া অসহায় মানুষদের ওপরও ক্রমাগত হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের মুছে ফেলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার প্রভাব লেবানন ও ইরানেও ছড়িয়ে পড়ছে। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক ফিলিস্তিনিদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দিদের প্রচণ্ড মারধর, হাড় ভেঙে দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ চোখ বেঁধে রাখা, ঘুম ও খাবার থেকে বঞ্চিত করা এবং এমনকি যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। বন্দি অবস্থায় প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ইসরায়েলি সমালোচনার জবাবে আলবানিজ সপাটে বলেন, "ইসরায়েল যা খুশি বলতে পারে, কিন্তু তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে। তাদের নেতাদের বিচার হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হওয়া উচিত।" তিনি বিশ্ব নেতাদের সমালোচনা করে বলেন, অনেক দেশের সরকার ও মন্ত্রীরা নীরব থেকে কার্যত ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের 'লাইসেন্স' দিয়ে রেখেছে। গাজায় বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি 'পরিকল্পিত এবং ইচ্ছাকৃত গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করেন। সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আনাদোলু এজেন্সি।
গাজায় চলমান সামরিক অভিযান ও আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে গত দুই বছরে ইসরায়েলি অর্থনীতি এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই সময়ে দেশটির মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৫৭ বিলিয়ন (৫ হাজার ৭০০ কোটি) মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, ব্যাংক অফ ইসরায়েলের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলের মোট ১৭ হাজার ৭০০ কোটি শেকেল বা প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা দেশটির বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮.৬ শতাংশের সমান। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির পেছনে প্রধান কারণ হলো গাজায় দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযান এবং লেবাননে ইসরায়েলি অনুপ্রবেশের উচ্চ ব্যয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের সাথে চলমান উত্তেজনার প্রভাব এই হিসাবে এখনও পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইরানের সাথে গত জুন মাসে মাত্র ১২ দিনের সংঘাত ইসরায়েলের জিডিপি প্রায় ০.৩ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল। ইসরায়েলের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আটটি দেশের সাথে তাদের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই দেশগুলোতে ইসরায়েলি রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালে ১.৫ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে। ব্যাংক অফ ইসরায়েল স্বীকার করেছে যে, দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ইসরায়েলি পণ্যের চাহিদাকে প্রভাবিত করছে। যুদ্ধব্যয় মেটাতে চলতি মাসেই ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা ২০২৬ সালের জন্য সংশোধিত রাষ্ট্রীয় বাজেট অনুমোদন করেছে, যেখানে যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য অতিরিক্ত ১৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশ নারী ও শিশু। এই আগ্রাসনে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। একদিকে মানবিক বিপর্যয়, অন্যদিকে নিজ দেশের অর্থনীতির এই টালমাটাল অবস্থা—সব মিলিয়ে ইসরায়েল এখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রানচেসকা আলবানিজ। সোমবার জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদে তিনি একটি নতুন প্রতিবেদন পেশ করে বলেন, “ইসরায়েলকে কার্যত ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী অন্তত ১৮,৫০০ ফিলিস্তিনিকে, যার মধ্যে শিশুও রয়েছে, গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় অন্তত ১০০ জন বন্দি হেফাজতে মারা গেছেন এবং প্রায় ৪,০০০ জন ‘জোরপূর্বক নিখোঁজ’ হয়েছেন। আলবানিজ বলেন, প্রতিবেদনটিতে ইসরায়েলের “ব্যাপক ও পদ্ধতিগত নির্যাতন এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক পরিবেশ সৃষ্টির” বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিভিন্ন দেশের সরকার এবং মন্ত্রীরা ইসরায়েলকে এই নির্যাতন চালানোর জন্য প্ররোচনা দিচ্ছে। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক করা হয়েছে এবং অমানবিক পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছে। আলবানিজের দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সূত্র: আল-জাজিরা
ঐতিহাসিক নজির ভেঙে পবিত্র আল-আকসা মসজিদ ঈদুল ফিতরের দিনে বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথমবার ঈদের দিনে মুসল্লিদের জন্য মসজিদটি বন্ধ রাখা হলো বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি সেনারা মসজিদের প্রধান ফটকগুলো বন্ধ করে দিলে শত শত ফিলিস্তিনি মুসল্লি ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে তারা মসজিদের প্রবেশদ্বার ও আশপাশের সড়কে ঈদের নামাজ আদায় করেন। শুক্রবার থেকে মসজিদের ভেতরের চত্বরে প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে মুসল্লিরা দামেস্ক গেট এলাকায় জড়ো হয়ে নামাজ আদায় করেন, যেখানে গিয়ে তারা তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি অবস্থান নিতে পেরেছেন। এ ঘটনায় জেরুজালেম গভর্নরেট তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ এবং ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত’ বলে অভিহিত করেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা এক বিবৃতিতে বলেছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন করে ‘ইহুদিকরণ’ বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং মসজিদটিকে ফিলিস্তিনি ও ইসলামি পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।উল্লেখ্য, ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত শুরুর পর গত ২১ দিন ধরে আল-আকসা মসজিদ-এ মুসল্লিদের প্রবেশ সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, গাজা উপত্যকা-য় ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ঈদ পালন করেছেন ফিলিস্তিনিরা। খোলা জায়গা ও ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদের সামনে জড়ো হয়ে তারা নামাজ আদায় করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজার প্রায় ১ হাজার ২৪০টি মসজিদের মধ্যে ১ হাজার ১০০টির বেশি ধ্বংস হয়ে গেছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের আল-আকসা মসজিদে প্রবেশে বাধা প্রদান ও মুসল্লিদের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি দখলদার বাহিনী। শুক্রবার (২০ মার্চ) মসজিদ প্রাঙ্গণের বাইরে নামাজ পড়তে গেলে মুসল্লিদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়া হয়। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে রেখেছে। প্যালেস্টাইন ক্রনিকল জানিয়েছে, ১৯৬৭ সালে জেরুজালেম দখলের পর এবারই প্রথম আল-আকসা মসজিদে ঈদের নামাজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কড়া সামরিক বিধিনিষেধের কারণে কেবল ওয়াকফ-এর অল্প সংখ্যক কর্মীকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। সাধারণ মুসল্লিরা মসজিদে ঢুকতে না পেরে বাধ্য হয়ে রাজপথে নামাজের কাতার করলে সেখানেও হামলা ও ধরপাকড় চালায় ইসরাইলি পুলিশ। একই চিত্র দেখা গেছে হেব্রনের ইব্রাহিমি মসজিদেও। সেখানেও হাজার হাজার মানুষকে প্রবেশ করতে না দিয়ে মাত্র কয়েক ডজন লোককে ভেতরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। জেরুজালেমের পুরানো শহরজুড়ে ব্যারিকেড দিয়ে যাতায়াতের পথগুলো বন্ধ করে দেয় দখলদার বাহিনী। নজিরবিহীন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে পবিত্র এই ধর্মীয় উৎসবেও মুসল্লিশূন্য ছিল ঐতিহাসিক আল-আকসা প্রাঙ্গণ।
দখলকৃত পশ্চিম তীরের হেব্রনে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিন ফিলিস্তিনি নারী নিহত হয়েছেন। বুধবার রাতে ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ সরাসরি হেব্রনের একটি বিউটি স্যালনের ওপর এসে পড়লে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা 'ওয়াফা'র তথ্যমতে, নিহতরা হলেন ১৭ বছর বয়সী কিশোরী মাইস গাজী মুসালামেহ, ৫০ বছর বয়সী সাহেরা রিজক মুসালামেহ এবং ৩৬ বছর বয়সী আমাল সুবহি আবদেল করিম মুতাওয়া। ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি ধাতব ক্যারাভানে নির্মিত স্যালনের ওপর পড়লে ভেতরে থাকা আরও ১৩ জন নারী গুরুতর আহত হন। ইসরায়েলের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সুরক্ষিত শেল্টার বা বাঙ্কার থাকলেও, পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য এমন কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। ঘিঞ্জি পরিবেশ এবং অস্থায়ী বসতিতে বসবাসের কারণে আকাশপথের যেকোনো হামলায় চরম ঝুঁকিতে থাকেন এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। এই বিয়োগান্তক ঘটনাটি যুদ্ধের ডামাডোলে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের চরম নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গত অক্টোবর মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর ওপর হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। গাজা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১১ জন ফিলিস্তিনি পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। হামাস পরিচালিত এই পুলিশ বাহিনী বর্তমানে গাজার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করছে। ইসরায়েলের এই হামলাকে যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং গাজার বেসামরিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ২ হাজার ৮০০-এর বেশি পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর থেকেও কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই হামলার মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনাটি ঘটে গত রবিবার মধ্য গাজার জাওয়াইদা এলাকায়। সেখানে একটি পুলিশ ভ্যানে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবশ্য দাবি করেছে, তারা হামাসের একটি 'সশস্ত্র সেল'কে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যারা হামলার পরিকল্পনা করছিল। তবে এই দাবির সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেহাম ওদা বলেন, "এই হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে চায় যে, গাজায় হামাসের কোনো ধরণের নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ তারা মেনে নেবে না। মূলত বেসামরিক শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়াই এসব হামলার লক্ষ্য।" অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই পুলিশ বাহিনীর ওপর এই আক্রমণ এক নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। হামাস চায় তাদের ১০ হাজার পুলিশ সদস্যকে নতুন প্রস্তাবিত নিরাপত্তা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে, কিন্তু ইসরায়েল সরাসরি এর বিরোধিতা করছে। গাজার সাধারণ মানুষ এই পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। গাজা সিটির একটি তাবু শিবিরের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল-আরাইশা বলেন, "পুলিশ না থাকলে এখানে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো। তারা অপরাধ দমনে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় কাজ করছে। তাদের ওপর এই হামলা মানে আমাদের নিরাপত্তার ওপর হামলা।" গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অক্টোবর মাসের যুদ্ধবিরতির পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ও হামলায় অন্তত ৬৭০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহল এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক শিশুসহ অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মঙ্গলবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি চলন্ত যানবাহনকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, হামলায় একটি সাদা রঙের জিপ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ইয়াহিয়া আবু লাবদা, এহসান হামেদ আল-সামিরি এবং তামের বারাকা নামে এক শিশু নিহত হয়। এই হামলায় আরও ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১০ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬৭৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৯৯ জনই শিশু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ যুদ্ধে মোট নিহতের সংখ্যা ৭২,২৫০ ছাড়িয়ে গেছে। গাজায় হামলার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও দমন-পীড়ন জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সোমবার দিবাগত রাত ও মঙ্গলবার ভোরে হেবরন (আল-খলিল), রামাল্লাহ এবং নাবলুসের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। হেবরনের আল-আরউব শরণার্থী শিবিরে হানা দিয়ে অন্তত ১৫ জন যুবককে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি সেনারা। রামাল্লাহর আল-আমামারি শরণার্থী শিবিরে অভিযানের সময় শব্দবোমা (stun grenades) ব্যবহার করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয় এবং ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এদিকে নাবলুসের বেইতা এলাকার কাছে আল-ইয়াতমাউইতে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়েছে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার শিকার পরিবারগুলোর সহায়তায় আসা অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও বাধা দেয় তারা। এছাড়া জোসেফের সমাধির কাছেও ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে উগ্রবাদী বসতি স্থাপনকারীরা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, গাজা এবং পশ্চিম তীরে একই সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলের যুদ্ধবিরতির আহ্বান সত্ত্বেও ইসরায়েলি অভিযান অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি সম্প্রতি তার স্ত্রীর পুরনো একটি শিল্পকর্মকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তার স্ত্রী রামা দুওয়াজির একটি কাজ ফিলিস্তিনি লেখক সুসান আবুলহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত। ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন ফ্রি বিকন গত সপ্তাহে প্রথম এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ২৮ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স শিল্পী দুওয়াজি গাজার লেখকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত একটি সংকলনের জন্য একটি চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলেন। ‘এভরি মোমেন্ট ইজ আ লাইফ’ শিরোনামের ওই সংকলনে আবুলহাওয়ার সম্পাদনায় বিভিন্ন লেখা স্থান পেয়েছিল। পরে আবুলহাওয়া জানান, সংকলনে থাকা ‘এ ট্রেইল অব সোপ’ নামের ছোটগল্পটি আসলে গাজার এক বাস্তুচ্যুত বাসিন্দার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। মামদানি বলেন, তার স্ত্রী এই কাজটি একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পেয়েছিলেন এবং আবুলহাওয়ার সঙ্গে তার সরাসরি কোনো যোগাযোগ বা সাক্ষাৎ হয়নি। আবুলহাওয়াও পরবর্তীতে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মূল বিতর্কটি তৈরি হয়েছে আবুলহাওয়ার আগের কিছু সামাজিকমাধ্যম পোস্ট ঘিরে। সমালোচকদের অভিযোগ, ওই পোস্টগুলোর কিছু বক্তব্য ইহুদি-বিরোধী মনোভাব প্রকাশ করে। তবে আবুলহাওয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, সেসব মন্তব্য একজন ফিলিস্তিনির অভিজ্ঞতা ও বেদনা থেকে উঠে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে তিনি গাজায় হত্যাকাণ্ডকে “ইহুদি আধিপত্যবাদী গণহত্যা” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া এক নিবন্ধে তিনি ৭ অক্টোবর হামলার ঘটনাকে “চমকপ্রদ মুহূর্ত” বলে বর্ণনা করেছিলেন। এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মামদানি বলেন, আবুলহাওয়ার কিছু মন্তব্য তার কাছে “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” এবং “ঘৃণ্য”। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার প্রশাসন সব ধরনের বিদ্বেষ ও গোঁড়ামির বিরোধী। তবে এই অবস্থান নেওয়ার কারণে মামদানির কিছু সমর্থকই তাকে সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, এতে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানকে ইহুদি-বিরোধিতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার একটি ক্ষতিকর ধারণা আরও জোরদার হচ্ছে। কর্মী শায়েল বেন-ইফ্রাইম সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন, মামদানির ক্ষমা চাওয়া ও ব্যাখ্যা দেওয়া ছিল অপ্রয়োজনীয়। তার মতে, এই ধরনের সমালোচকদের সন্তুষ্ট করা কখনোই সম্ভব নয়। অন্যদিকে আবুলহাওয়া বলেছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মামদানির ওপর ক্ষুব্ধ নন। তবে তার মতে, এই ঘটনাটি থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি মন্তব্য করেন, শক্তিশালী কিছু গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে তা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে। উল্লেখ্য, মামদানি অতীতেও একাধিকবার ইসলামোফোবিক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। গাজার গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে একে “গণহত্যা” বলায় তাকে প্রায়ই ইহুদি-বিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এদিকে রিপাবলিকান সিনেটর টমি টিউবারভিল মামদানির ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও আক্রমণ করেছেন। এক্স-এ দেওয়া একটি পোস্টে তিনি ইফতারের একটি ছবির পাশে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ছবি জুড়ে দিয়ে লিখেছিলেন, “শত্রু এখন ভেতরে ঢুকে গেছে।” তবে এই মন্তব্যের জন্য তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো জবাবদিহির ঘটনা ঘটেনি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু, এক গর্ভবতী নারী এবং ৯ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার (১৫ মার্চ) মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের একটি আবাসিক ভবনে বিমান হামলা চালানো হয়। আল-আকসা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় চারজন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ত্রিশোর্ধ্ব এক দম্পতি, তাদের প্রায় ১০ বছর বয়সী ছেলে এবং পাশের বাড়ির ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর রয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, নিহত নারীটি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং তার গর্ভে যমজ সন্তান ছিল। স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদ আল-মুহতাসেব জানান, গভীর রাতে তারা ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বলেন, আঘাতটি খুবই প্রবল ছিল এবং হামলার আগে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। এছাড়া একই দিনে মধ্য গাজার আজ-জাওয়াইদা শহরের প্রবেশমুখে একটি পুলিশ গাড়িকে লক্ষ্য করে আরেকটি হামলা চালানো হয়। ফিলিস্তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ৯ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে মধ্য গাজার জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা কর্নেল ইয়াদ আবু ইউসুফও রয়েছেন। আল-আকসা হাসপাতাল জানিয়েছে, এই হামলায় আরও অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন এবং তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফিলিস্তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে ‘গুরুতর অপরাধ’ বলে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের দাবি, নিহত পুলিশ সদস্যরা পবিত্র রমজান মাসে বাজার তদারকি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে এ ঘটনায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
লেবাননের ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলায় পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশটির সরকারি তথ্যমতে, যুদ্ধের ভয়াবহতায় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা এখন আকাশচুম্বী। লেবাননের 'ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট' এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে লড়াই চরম আকার ধারণ করার পর এ পর্যন্ত প্রায় ৮,৩১,৮৮২ জন মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। বৈরুতসহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে খোলা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। প্রতিনিয়ত বোমা হামলার শব্দ আর স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছে লেবাননের আকাশ।
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা ও ‘গণহত্যা’ থামার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত গাজা সিটি এবং খান ইউনিসে নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় আরও অন্তত ৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আঞ্চলিক উত্তজনা এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গাজার মানবিক পরিস্থিতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গাজা সিটি এবং খান ইউনিসের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় রাতভর বিমান ও স্থল হামলা চালায় ইসরায়েলি সেনারা। স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রগুলো নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া খান ইউনিসে একটি পুলিশ পোস্টে হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১০ অক্টোবর ঘোষিত তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ইসরায়েল শত শত বার লঙ্ঘন করেছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধবিরতির নাটক শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা ৬৫৫ ছাড়িয়ে গেছে। ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেই গাজায় আঘাত হেনেছে তীব্র ধূলিঝড়। এতে তাঁবুতে বসবাসকারী হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনির কষ্ট কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। জীর্ণ তাঁবুর ভেতরে ধুলোবালি ঢুকে পড়ায় বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। রাফাহ সীমান্ত পারাপার বন্ধ থাকায় হাজার হাজার আহত ফিলিস্তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যেতে পারছেন না। ১২ বছর বয়সী হামদির মতো অনেক শিশু মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে পঙ্গুত্বের পথে। হামদির বাবা আমের হামাদি আল জাজিরাকে বলেন, "আমার ছেলে প্রতিদিন অন্য শিশুদের ফুটবল খেলা দেখে কাঁদে আর জিজ্ঞেস করে— বাবা, আমি কেন হাঁটতে পারি না?" চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জরুরি অস্ত্রোপচার করা গেলে হামদি হয়তো আবার হাঁটতে পারতেন, কিন্তু সীমান্ত বন্ধ থাকায় তার জীবন এখন অনিশ্চিত। দুই সপ্তাহ আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি সংঘাত গাজা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সীমান্ত বন্ধ থাকায় খাদ্য ও জ্বালানি সংকট চরমে পৌঁছেছে। রান্নার গ্যাসের অভাবে মানুষ প্লাস্টিক ও কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, গাজায় নারীদের বাঁচার ন্যূনতম পরিবেশ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং এটি যুদ্ধের একটি পরিকল্পিত কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল। গাজাবাসীর বর্তমান অবস্থাকে মানবিক সহায়তাকারীরা ‘নরকযন্ত্রণা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার কারণে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদে প্রবেশ করতে পারছেন না হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মুসল্লি। রমজানের শেষ সময়েও তারা মসজিদের ভেতরে যেতে না পেরে আশপাশের রাস্তায় জামাতে নামাজ আদায় করছেন। গত বছরগুলোতে রমজানের এই সময়টায়, বিশেষ করে জুমার নামাজে, লাখো মানুষের সমাগম হতো আল-আকসা প্রাঙ্গণে। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নিরাপত্তার অজুহাতে জেরুজালেমের পুরনো শহর ও পবিত্র স্থানগুলোতে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরাইলি বাহিনী। সব বাধা সত্ত্বেও অনেক ফিলিস্তিনি আল-আকসা প্রাঙ্গণে ঢুকতে না পেরে নিকটবর্তী বাব আল-সাহিরা গেটের আশপাশে মাদুর বিছিয়ে মাগরিব, এশা ও তারাবির নামাজ আদায় করছেন। ৬৫ বছর বয়সী জেরুজালেমের বাসিন্দা ইকরিমা আল-হুসাইনি জানান, গত পাঁচ দশক ধরে তিনি কখনও আল-আকসায় তারাবির নামাজ মিস করেননি। তিনি বলেন, অর্ধ শতাব্দী ধরে প্রতি রমজানে এখানে আসছেন, কিন্তু এ বছরের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। শেষ দশ দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভেতরে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে নামাজ আদায় করার সুযোগ না পেয়ে মনে হচ্ছে মূল্যবান কিছু হারিয়ে গেছে। ৪০ বছর বয়সী রামি মোহাম্মদ বলেন, পুরনো শহরের বাইরে শত শত মানুষকে জায়নামাজ বিছিয়ে একসঙ্গে নামাজ পড়তে দেখা যাচ্ছে। তার ভাষায়, মানুষ ভেতরে ঢুকতে না পারলেও যতটা সম্ভব মসজিদের কাছেই থাকতে চায়। রাস্তায় নামাজ পড়ার কষ্টের মধ্যেও আল-আকসার প্রতি মানুষের টান ও সংহতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জেরুজালেমভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ওয়াদি হিলওয়েহ ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছে, গত বুধবার বাব আল-সাহিরার কাছে নামাজ পড়তে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনী চড়াও হয়। অনেককে তল্লাশি করা হয়, কয়েকজনকে মারধর করা হয় এবং অনেককে পুরনো শহরে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়। কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই এই তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালের পর এবারই প্রথম আল-আকসা মসজিদ এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগেই বিধিনিষেধ আরোপের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল ইসরাইল। রমজানের প্রথম জুমায় অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে মাত্র ১০ হাজার মানুষকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে প্রায় পাঁচ লাখ মুসল্লির সমাগম হতো। জর্ডান পরিচালিত পবিত্র আল-আকসা পরিচালনা পরিষদ (ওয়াকফ) জানিয়েছে, রমজানের আগে থেকেই তাদের পাঁচজন কর্মীকে প্রশাসনিকভাবে আটক করেছে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত। পাশাপাশি ৩৮ জন কর্মী ও ৬ জন ইমামের ওপর মসজিদে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এদিকে আটটি মুসলিম ও আরব দেশ যৌথভাবে ইসরাইলের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা এটিকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও উপাসনালয়ে অবাধ প্রবেশাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইসরাইলকে এই নীতি থেকে বিরত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জেরুজালেম গভর্নরেটও সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, রমজানের শেষ জুমার নামাজেও আল-আকসা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রে আটক ফিলিস্তিনি নারী লেকা করদিয়াকে তৃতীয়বারের মতো জামিনে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন এক অভিবাসন বিচারক। তবে আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো মুক্তি পাবেন কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, নিয়মিত ইমিগ্রেশন চেক-ইনের জন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাকে আটক করা হয়। এর আগে একটি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে সেই অভিযোগ বাতিল হয়ে যায়। অভিবাসন আদালত একাধিকবার মত দিয়েছে যে তিনি জননিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নন এবং তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। তবুও প্রশাসনিক আপিল ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তার মুক্তি বারবার বিলম্বিত হচ্ছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে আটক রয়েছেন। আটক অবস্থায় তার অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরও সামনে এসেছে, যা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আইনজীবীদের দাবি, আদালতের বারবার নির্দেশ সত্ত্বেও তাকে আটক রাখার ঘটনা অস্বাভাবিক এবং এটি অভিবাসন আইনের প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তার অভিবাসন সংক্রান্ত মামলার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে হেফাজতে রাখা হতে পারে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় কথিত 'ইয়েলো লাইন' বা হলুদ রেখা অতিক্রম করার অভিযোগে চার ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবার রাতে উত্তর গাজায় এই ঘটনা ঘটে বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, উত্তর গাজায় দায়িত্বরত তাদের সেনারা চার ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে যারা নির্ধারিত নিরাপত্তা সীমানা বা 'ইয়েলো লাইন' অতিক্রম করেছিল। এরপরই সেনারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন। উল্লেখ্য, 'ইয়েলো লাইন' হলো গাজার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট সীমানা, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত গাজা যুদ্ধ সমাপ্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল। এই রেখাটি ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং ফিলিস্তিনিদের বসবাসের এলাকার মধ্যে বিভাজন হিসেবে কাজ করে। একই দিনে উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরও দুইজন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো। এছাড়াও গাজা সিটিসহ উপত্যকার মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান হওয়ার কথা থাকলেও গাজায় সহিংসতার ঘটনা থামছে না। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৭০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়ে গেছে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো। জাতিসংঘ মনে করছে, এই বিধ্বস্ত জনপদ পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হবে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বারবার এমন প্রাণঘাতী হামলা গাজায় স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনাকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনের সরকারি সংস্থা প্যালেস্টাইন সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ স্ট্যাটিকস জানিয়েছে, চলমান গাজা যুদ্ধের ফলে নারীদের মধ্যে বিধবার সংখ্যা ও বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট গভীর হয়েছে এবং স্বাস্থ্যখাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ফিলিস্তিনে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী হবে, যার সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার নারী পশ্চিম তীরে এবং প্রায় ১০ লাখ ৬০ হাজার নারী গাজা উপত্যকায় বসবাস করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় ২২ হাজার ৫৭ জন নারী তাদের স্বামীকে হারিয়েছেন। ফলে নারী-প্রধান পরিবারের হার যুদ্ধের আগে ১২ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে। শ্রমবাজারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গাজায় নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ১৭ শতাংশ, আর নারীদের বেকারত্বের হার বেড়ে ৯২ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে পুরুষদের বেকারত্বের হার ৮১ শতাংশ। অন্যদিকে পশ্চিম তীরে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ প্রায় ১৯ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণ ৭২ শতাংশ। সেখানে বেকারত্বের হার নারীদের মধ্যে ২৭ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে ২৮ শতাংশ। ১৯ থেকে ২৯ বছর বয়সী ডিপ্লোমা বা উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নারীদের বেকারত্ব ৮৬ শতাংশ এবং পুরুষদের ৭০ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে পরিবার, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নারী ও শিশুদের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বিয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বা গ্রীন কার্ড পাওয়ার নিয়ম বন্ধ হয়ে গেছে। তবে মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ইউএস সিটিজেনশিপ এন্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস এর অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী এই দাবি সঠিক নয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিয়ের মাধ্যমে এখনও গ্রীন কার্ড এবং পরে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তবে আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং বর্তমানে যাচাই-বাছাই আগের তুলনায় বেশি কঠোর করা হয়েছে। ইউএসসিআইএসের নিয়ম অনুযায়ী, একজন মার্কিন নাগরিক বা গ্রীন কার্ডধারী তার স্বামী বা স্ত্রীর জন্য পারিবারিক ভিত্তিতে অভিবাসনের আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে বৈধ বিয়ের প্রমাণসহ আবেদন জমা দিতে হয়। আবেদন অনুমোদিত হলে বিদেশি স্বামী বা স্ত্রী গ্রীন কার্ড পেতে পারেন এবং স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি পাবেন। সাধারণত মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করলে প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত হয়, আর গ্রীন কার্ডধারীকে বিয়ে করলে অপেক্ষার সময় কিছুটা বেশি হতে পারে। গ্রীন কার্ড পাওয়ার পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার নিয়মও আগের মতোই রয়েছে। ইমিগ্রেশন নীতিমালা অনুযায়ী, যদি কেউ মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করে গ্রীন কার্ড পান এবং কমপক্ষে তিন বছর একসাথে বসবাস করেন, তাহলে তিনি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। আর যদি গ্রীন কার্ডধারীকে বিয়ে করেন, তাহলে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পাঁচ বছর পূর্ণ হলে নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়। ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে বেশি সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে, অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে এবং যৌথ ব্যাংক হিসাব, বাসার ঠিকানা, ট্যাক্স নথি ও পারিবারিক প্রমাণ জমা দিতে হচ্ছে। ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া ঠেকাতে এই যাচাই-বাছাই বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া আবেদন প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগার কারণেও অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিয়ের মাধ্যমে আমেরিকার নাগরিকত্ব বা গ্রীন কার্ড বন্ধ হয়নি। তবে বর্তমানে আবেদন প্রক্রিয়া কঠোর হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈধ বিবাহ, একসাথে বসবাস এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক।