- প্রচ্ছদ
- Topic
মানবাধিকার
তালেবানের হাতে নির্যাতনের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে বহিষ্কার থেকে আইনি সুরক্ষা পাওয়া এক আফগান নাগরিককেও আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওই আফগান তরুণের বয়স ২০-এর কোঠায়। তার আইনজীবী আলমা ডেভিড জানিয়েছেন, তালেবানের কাছ থেকে তার পরিবারের সদস্যদের পাওয়া হুমকির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত তাকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়েছিল। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, তালেবান ক্ষমতা দখলের আগে তার এক ভাই আফগান ন্যাশনাল আর্মিতে কাজ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। আরেক ভাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাইলট ছিলেন, যিনি পরে তালেবানের হাতে নিহত হন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ওই আফগান নাগরিককে শুধু ‘খলিল’ নামে শনাক্ত করেছে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বাবা ও বোনও মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফার্স্টের কর্মকর্তা সাভি আরভেরি জানিয়েছেন, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি নির্বাসন ফ্লাইট মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুইয়ে পৌঁছেছে। ওই ফ্লাইটে ১২ জন আফগান ও আটজন ইরানিসহ নেপাল ও নিকারাগুয়ার কয়েকজন নাগরিক ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় নির্বাসন ফ্লাইট। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অংশ হিসেবে তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে এমন অনেক মানুষকে নিজ দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ ভ্রমণ সতর্কতায় মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে কোনো কারণেই ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে অস্থিরতা, অপরাধ, অপহরণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সন্ত্রাসবাদের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজায় পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর শুরু করা ফৌজদারি তদন্তে আস্থা নেই তার মা ওয়েসাম হামাদার। তার আশঙ্কা, এই তদন্ত প্রকৃত সত্য উদঘাটনের বদলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা হয়ে উঠতে পারে। এ সপ্তাহে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ জানায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হিন্দ ও তার পরিবারের সদস্যদের বহনকারী গাড়িতে ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালানোর ঘটনায় সামরিক পুলিশের মাধ্যমে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করা হবে। এর আগে ওই এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা উপস্থিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছিল আইডিএফ। শুক্রবার এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিন্দের মা ওয়েসাম হামাদা বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ, সরকার কিংবা দেশটির বিচারব্যবস্থার ওপর তার কোনো আস্থা নেই। তিনি এমন কোনো তদন্ত চান না, যার উদ্দেশ্য হবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দায় এড়িয়ে তাদের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। হামাদা বলেন, তার দাবি করা তদন্ত কোনো ‘বন্ধ সামরিক তদন্ত’ হওয়া উচিত নয়। তিনি চান স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং যারা দায়ী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক। তার ভাষায়, হিন্দ শুধু একটি সংবাদঘটনা নয়, সে তার সন্তান। হিন্দ রাজাবের হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। গাজা সিটিতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি গাড়িতে ছিল পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ। গাড়িটিতে থাকা অন্য কয়েকজন স্বজন নিহত হওয়ার পরও হিন্দ কিছু সময় জীবিত ছিল। পরে সে জরুরি সেবাকর্মীদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে সাহায্যের জন্য আকুতি জানায়। সেই ফোনালাপের রেকর্ডিং পরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দকে উদ্ধারের জন্য ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যাওয়ার পর উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় ১২ দিন পর হিন্দ, তার পরিবারের সদস্য এবং তাকে উদ্ধারে যাওয়া দুই প্যারামেডিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রথমে ওই এলাকায় তাদের কোনো সেনা উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনুসন্ধান ও প্রমাণে ঘটনাস্থলের আশপাশে ইসরায়েলি সামরিক যান ও সেনাদের অবস্থানের বিষয়ে তথ্য সামনে আসে। চলতি সপ্তাহে আইডিএফ প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে যে তাদের সেনারা হিন্দ ও তার পরিবারের সদস্যদের বহনকারী গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল। আইডিএফের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্সের চলাচল সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কথিত ব্যর্থতার বিষয়টি পর্যালোচনার পর ফৌজদারি তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্তটি সামরিক পুলিশ পরিচালনা করবে। এই তদন্তকে হিন্দের পরিবারের পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মীরাও যথেষ্ট মনে করছেন না। তাদের প্রশ্ন, দুই বছরেরও বেশি সময় পর ইসরায়েলি বাহিনী কেন নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে তদন্ত শুরু করল এবং এই তদন্ত আদৌ স্বাধীনভাবে দায় নির্ধারণ করতে পারবে কি না। হিন্দের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহির দাবি উঠেছে। তার মৃত্যুর আগে জরুরি সেবাকর্মীদের কাছে করা ফোনকলের রেকর্ডিং ঘটনাটিকে গাজা যুদ্ধের অন্যতম আলোচিত বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত করে। ঘটনাটি নিয়ে পরে নির্মিত ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’ চলচ্চিত্রটিও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক মনোযোগ পায় এবং অস্কারের মনোনয়ন লাভ করে। আইডিএফ একই সময়ে গাজায় আরও একটি বহুল আলোচিত ঘটনায় ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে রাফাহ এলাকায় ১৫ ফিলিস্তিনি প্যারামেডিক নিহত হওয়ার ঘটনাটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তবে গাজায় ত্রাণকর্মীদের নিহত হওয়ার আরও কয়েকটি ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে। হিন্দের মায়ের দাবি, তার পরিবারের জন্য শুধু একটি অভ্যন্তরীণ সামরিক তদন্ত যথেষ্ট নয়। তিনি এমন একটি প্রক্রিয়া চান, যেখানে তদন্তকারীরা স্বাধীনভাবে প্রমাণ পর্যালোচনা করবেন এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন আইডিএফের সামরিক পুলিশের তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে এবং এর ভিত্তিতে কোনো সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হিন্দের পরিবার অবশ্য শুরু থেকেই বলে আসছে, তারা শুধু তদন্তের ঘোষণা নয়, ঘটনার পূর্ণ সত্য ও দায়ীদের জবাবদিহি দেখতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল লেবানন। দেশটির পার্লামেন্ট মৃত্যুদণ্ডের বিধান আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে তার পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আইন অনুমোদন করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ বিলোপের স্বীকৃতি পেল লেবানন। মঙ্গলবার দেশটির পার্লামেন্টে এ-সংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার পর স্পিকারের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বর্তমানে যেসব আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড রয়েছে, সেগুলো পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। আইনে কঠোর শ্রমসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এখন বিলটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। এরই মধ্যে তার সরকার বিলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই লেবাননে কার্যত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ছিল না। সর্বশেষ ২০০৪ সালে সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর আর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও আদালত বিভিন্ন মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে আসছিল। এমনকি এই সপ্তাহের শুরুতেও একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। নতুন আইনের ফলে সেই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো। এর আগে হত্যা ও রাষ্ট্রদ্রোহের মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। নতুন আইনের অধীনে এসব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক হেবা মরায়েফ বলেন, লেবাননের এই সিদ্ধান্ত দেশটির মানবাধিকার অগ্রযাত্রায় একটি বড় মাইলফলক। দুই দশকের বেশি সময় ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়ার যে বাস্তবতা ছিল, নতুন আইন সেটিকে স্থায়ী আইনি সুরক্ষায় পরিণত করেছে এবং জীবন রক্ষার অধিকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, লেবাননের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশের জন্য একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে থাকবে। তবে পার্লামেন্টে বিলটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়নি। হিজবুল্লাহর সংসদীয় জোট এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। যদিও পার্লামেন্টের বিবৃতিতে ভোটের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পাশাপাশি লেবাননের পার্লামেন্ট কারাগারের অতিরিক্ত বন্দি সংকট মোকাবিলায় সাধারণ ক্ষমা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও বিবেচনা করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দিতে পূর্ণ। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, লেবাননের কারাগারে থাকা প্রায় ৮০ শতাংশ বন্দির বিচার তখনও শেষ হয়নি। বিশ্বজুড়ে বহু দেশ ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করলেও মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশে এখনো এই শাস্তি বহাল রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, ইরান ও মিসরে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে লেবাননের এই সিদ্ধান্তকে অঞ্চলটির বিচারব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইস) কর্মকর্তাদের জন্য বিদ্যুৎ শক দিতে সক্ষম বিশেষ ধরনের গ্লাভস কিনতে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের (ডিএইচএস) প্রকাশিত একটি ক্রয়সংক্রান্ত নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরিকল্পনাটি প্রকাশের পরই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডিএইচএসের নোটিশ অনুযায়ী, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে আইসের কর্মকর্তা ও এজেন্টদের ব্যবহারের জন্য হাজার হাজার 'গ্লোভ (Generated Low Output Voltage Emitter)' কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো তৈরি করে কেন্টাকির লেক্সিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কমপ্লায়েন্ট টেকনোলজিস এলএলসি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই গ্লাভস সাধারণ টহল গ্লাভসের মতোই ব্যবহার করা যায়। তবে প্রয়োজনে একটি সুইচ চাপলে এটি বিদ্যুৎ শক দেওয়ার মোডে চলে যায়। কারও খোলা ত্বকে স্পর্শ করালে এটি তীব্র ব্যথার অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং সাধারণত তিন সেকেন্ডেরও কম সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, এতে পোড়া দাগ, ক্ষত বা স্থায়ী চিহ্ন পড়ে না। কমপ্লায়েন্ট টেকনোলজিস এ প্রযুক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য তুলনামূলক কম দৃশ্যমান এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে সহায়ক একটি পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কারাগারেও এ ধরনের গ্লাভস ব্যবহারের নজির রয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য প্রিভেনশন অব ইন-কাস্টডি ডেথসের সভাপতি জন পিটার্স, যিনি এ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, বিদ্যুৎ শকের অনুভূতি অনেকটা মৌমাছির হুল ফোটানোর মতো তীব্র ও তাৎক্ষণিক। তার মতে, কেউ প্রতিরোধ করলে কর্মকর্তাদের জন্য এটি কার্যকর একটি নিয়ন্ত্রণমূলক সরঞ্জাম হতে পারে। তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিষয়ক কঠোর নীতি বাস্তবায়নের সময় আইসের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ আগেই উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ শক দেওয়ার নতুন সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ আরও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) পুলিশিং প্রকল্পের উপপরিচালক জেন রলনিক বোরকেটা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, বেসামরিক অভিবাসন আইন প্রয়োগে এ ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তার গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। তার ভাষায়, "গত এক বছরে আইস দেখিয়েছে যে তারা খুব দ্রুত বলপ্রয়োগে যায়। এখন একটি বোতাম চাপলেই তারা বিদ্যুৎ শক ব্যবহার করতে পারবে, যা হয়তো অন্য কেউ দেখতেও পারবে না। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।" অন্যদিকে জন পিটার্সের ধারণা, আইসের এই ক্রয়াদেশ সম্ভবত কোম্পানিটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্ডার হতে যাচ্ছে। তার মতে, গাড়ি, বাড়ি বা আটককেন্দ্রে সহযোগিতা না করা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্মকর্তারা এ গ্লাভস ব্যবহার করতে পারেন। তবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিজেও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছে। তাদের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এটি কোনোভাবেই শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। শুধু মৌখিকভাবে প্রতিবাদ বা অসহযোগিতা করছেন, এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধেও এটি ব্যবহার করা উচিত নয়। এছাড়া শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর এ গ্লাভস ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে কমপ্লায়েন্ট টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেফ নিকলাস ই-মেইলে জানান, এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে অপারগ। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আইসিইর হেফাজতে থাকা এক ক্যানসারজয়ী অভিবাসীকে চিকিৎসাজনিত জটিলতায় তিনবার হাসপাতালে নিতে হয়েছে। আদালতের নথি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত রেকর্ডে উঠে এসেছে, হেফাজতে থাকার সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা নিয়ে একাধিক অভিযোগ করেছেন তিনি। বিষয়টি নতুন করে আইসিই হেফাজতে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তি একজন রোমানিয়ান নাগরিক। ২০২৫ সালে জরুরি ট্রিপল বাইপাস অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে উঠছিলেন তিনি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন ১৬টি ওষুধ সেবনের প্রয়োজন ছিল। পরে তাকে আইসিই হেফাজতে নেওয়া হলে আদালতের নথিতে অভিযোগ করা হয়, কিছু সময় তিনি প্রয়োজনীয় ওষুধ পাননি এবং বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তার চিকিৎসা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এর ফলে বুকে ব্যথা নিয়ে তাকে তিন দফা হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। আদালতে দাখিল করা নথিতে আরও বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তির আইনজীবীরা মানবিক কারণে তাকে মুক্তি দেওয়ার আবেদন করেছেন। তাদের দাবি, গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে আটক রেখে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দেওয়া তার শারীরিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এদিকে আইসিই বরাবরের মতোই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থাটির দাবি, তাদের হেফাজতে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। এ ঘটনা এমন এক সময় সামনে এলো, যখন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও কেএফএফ হেলথ নিউজের যৌথ অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের অভিবাসন আটককেন্দ্রে চিকিৎসা অবহেলার শত শত অভিযোগের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আদালতের নথিতে বহু আটক ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থতা, প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়া এবং চিকিৎসায় বিলম্বের অভিযোগ করেছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আইসিই হেফাজতে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন আটককেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা সুবিধা ও নজরদারি জোরদারের দাবি জানালেও আইসিই বলছে, তাদের স্বাস্থ্যসেবা জাতীয় মানদণ্ড অনুসারেই পরিচালিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানিভেলের এক অভিবাসী কাঠমিস্ত্রিকে তার তিন বছর বয়সী শিশুকন্যার সামনেই চরম নিষ্ঠুরতায় মারধর এবং পরবর্তীতে জোরপূর্বক মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে মার্কিন অভিবাসন ও কাস্টমস প্রয়োগকারী সংস্থা (আইস)-এর বিরুদ্ধে। এই অমানবিক আচরণের শিকার উলিসেস পেনা লোপেজ ও তার পরিবার মার্কিন ফেডারেল সরকার এবং দুটি বেসরকারি কারা কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেছেন। সান জোসের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা এই মামলাটি স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন সকালে সানিভেলে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গাড়িতে বসে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন লোপেজ। ঠিক তখনই আচমকা মুখে মাস্ক পরা এবং বিশেষ রণসজ্জায় সজ্জিত একদল আইস (ICE) এজেন্ট তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন কর্মকর্তা লাঠি দিয়ে লোপেজের গাড়ির কাচে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকেন। লোপেজ গাড়ি থেকে নেমে আসামাত্রই কর্মকর্তারা তাকে জাপটে ধরেন। লোপেজের স্ত্রী আবি পেনা, যিনি একজন মার্কিন নাগরিক, সিঁড়ির ওপর থেকে বাধা পেয়ে পুরো ঘটনাটি দেখছিলেন। অন্যদিকে, তাদের তিন বছরের শিশু সন্তান জানলা দিয়ে বাবার ওপর এই নৃশংস নির্যাতন প্রত্যক্ষ করে ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদছিল। অভিযোগে বলা হয়েছে, এক কর্মকর্তা লোপেজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ধরেন এবং বাকিরা তাকে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর তাকে টেনে তুলে গাড়ির সঙ্গে চেপে ধরে বুক, পাঁজর ও ঘাড়ে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে থাকেন। লোপেজ ইংরেজি ভালো না বোঝায় কর্মকর্তারা তাকে ইংরেজিতে গালিগালাজ ও চিৎকার করছিলেন। গ্রেপ্তারের পর প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় লোপেজ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং খিঁচুনি শুরু হয়। চিকিৎসাগতভাবে তিনি এর আগে একটি ‘মিনি স্ট্রোক’-এর ভুক্তভোগী ছিলেন। কিন্তু গাড়ি থেকে নামানোর সময় হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় তাকে ৪ ফুট উঁচু ভ্যান থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়, যার ফলে তিনি মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। মাটিতে পড়া অবস্থায় আইস এজেন্টরা তাকে লাথি ও ঘুষি মারতে থাকেন। এমনকি এক কর্মকর্তা তার গলা চেপে ধরে পুরো শরীরের ভর দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেন, যার ফলে লোপেজ দুইবার জ্ঞান হারান। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্যারামেডিকস ডেকে তাকে মাউন্টেন ভিউয়ের এল ক্যামিনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর লোপেজকে বেকার্সফিল্ডের কাছে অবস্থিত ‘গোল্ডেন স্টেট এনেক্স’ এবং পরবর্তীতে ‘ক্যালিফোর্নিয়া সিটি’ নামের দুটি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। এগুলো পরিচালনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জিইও গ্রুপ ও কোরসিভিক। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও লোপেজকে সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, বরং তীব্র শীতের মধ্যে সারারাত লাইট জ্বালিয়ে রেখে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। মাসের পর মাস তার প্রয়োজনীয় ওষুধ ও হৃদরোগের জন্য নির্ধারিত খাবার বন্ধ রাখা হয়। অবশেষে গত বছরের অক্টোবরে তাকে মেক্সিকোতে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করা হয়। এদিকে মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) এই মামলার দাবিগুলো অস্বীকার করেছে। তাদের একজন মুখপাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ৩১ বছর বয়সী লোপেজ একজন চিহ্নিত অপরাধী, যিনি ২০১৩ সালে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। ২০২০ সালে তার বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য সহিংসতা এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার অপরাধে সাজা হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সর্বদা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বনিম্ন বল প্রয়োগ করে থাকে বলে দাবি করেন তিনি। তবে লোপেজের আইনজীবী এলেনা হজেস বলেন, অতীতে কারও কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকলেই তাকে এভাবে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার করার অধিকার আইস কর্মকর্তাদের নেই। আইস মূলত নিজেদের নির্মম নির্যাতন ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ার দায় এড়াতেই এখন লোপেজের অতীতের অপরাধের প্রসঙ্গ সামনে আনছে। বর্তমানে মেক্সিকোতে থাকা লোপেজ শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, নির্যাতনের কারণে তিনি ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। এদিকে সানিভেলে থাকা তার স্ত্রী তীব্র মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতায় ভুগছেন। আর তাদের তিন বছরের কন্যাসন্তানটি এখনো মাঝরাতে আতঙ্কে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। কদিন আগেই তাকে ঘরের কোণে বাবার ছবি জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখা গেছে। লোপেজের পরিবার এই অন্যায়ের বিচার এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে স্বাধীনতা দিবসের (৪ জুলাই) শোভাযাত্রার সময় শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী হিসেবে পরিচিত প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট নামের একটি সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে একই মেট্রো ট্রেনে যাত্রা করতে গিয়ে আতঙ্কের মুহূর্ত পার করেছেন এশীয় বংশোদ্ভূত এক মার্কিন নাগরিক। ঘটনাটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ওই ব্যক্তির নাম রসওয়েল এনসিনা। স্বাধীনতা দিবসে তিনি মেরিল্যান্ডে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই মুখোশ পরা প্যাট্রিয়ট ফ্রন্টের সদস্যরা তার মেট্রো ট্রেনে ওঠেন। পরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা গেটি ইমেজেস-এর তোলা কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, একা বসে থাকা এনসিনাকে ঘিরে রয়েছেন মুখোশধারী কয়েকজন সদস্য। এনবিসি ওয়াশিংটনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এনসিনা বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য কেউ প্রস্তুত থাকে না। এমন মুহূর্তে শরীর শক্ত হয়ে আসে, আর মনে প্রশ্ন জাগে, আসলে কী ঘটছে।” তিনি জানান, পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কারও সঙ্গে চোখাচোখি করেননি। নিজেকে নিরাপদ রাখাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। তবে এই অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস থেকে সাহস নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এনসিনা বলেন, “আমি প্রথম ব্যক্তি নই, যিনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। রুবি ব্রিজেসসহ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অসংখ্য আফ্রিকান-আমেরিকান শিশু, কিশোর ও শিক্ষার্থী আরও কঠিন সময় পার করেছেন। তখন বুঝতে পারি, তাদের মতো সাহসই আমাকে ধরে রাখতে হবে।” এটি এনসিনার জীবনের প্রথম বৈষম্যমূলক অভিজ্ঞতাও নয়। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে একই মেট্রোতে যাত্রার সময় একদল কিশোর তার এবং আরেক এশীয় বংশোদ্ভূত যাত্রীর ওপর কফি ছুড়ে মারে। কিন্তু একই ট্রেনের অন্য অ-এশীয় যাত্রীদের তারা কিছুই করেনি। সে সময়ও তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন। এনসিনার ভাষায়, “পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও মনে হচ্ছে যেন একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশে এখনো বিভাজন রয়ে গেছে।” এদিকে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম অন এক্সট্রিমিজম-এর গবেষক লুক বাউমগার্টনার এনবিসি ওয়াশিংটনকে বলেন, প্যাট্রিয়ট ফ্রন্টের মতো সংগঠনগুলো মূলত জনসম্মুখে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চায়। তার ভাষায়, “তাদের মূল বার্তা হলো, আমেরিকা শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য। প্রচার পাওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য এবং অধিকাংশ উগ্রপন্থী সংগঠন এ ধরনের কৌশলই অনুসরণ করে।” উল্লেখ্য, অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগ (ADL) প্যাট্রিয়ট ফ্রন্টকে একটি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংগঠনটি বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে মিছিল ও জনসমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করে। সবকিছুর পরও মানবতার প্রতি নিজের বিশ্বাস হারাতে চান না এনসিনা। তিনি বলেন, “আমাদের আশা ধরে রাখতে হবে। এমন সময়গুলোতে আশাই সবচেয়ে বড় ভরসা। আমি এখনো বিশ্বাস করি, অধিকাংশ মানুষ মূলত ভালো।”
আমেরিকার আটলান্টা শহরে আট বছর আগের এক নৃশংস ঘটনার চূড়ান্ত রায় দিয়েছে আদালত। রাস্তায় সাহায্য চেয়ে হাত পাতা এক নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ ও গৃহহীন মানুষকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে আজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেওয়ার অপরাধে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারকে এখন ২ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা গুনতে হবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আটলান্টা পুলিশের অফিসার জন গ্রাবসকে এখন থেকে প্রতি মাসে তার বেতন থেকে ৭০০ ডলার করে ভুক্তভোগী জেরি ব্লেসিংগেমের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হবে। যদি প্রতি মাসে ৭০০ ডলার করে কাটা হয়, তবে এই বিপুল পরিমাণ জরিমানা শোধ করতে ওই পুলিশ অফিসারের প্রায় আড়াই হাজার বছর সময় লাগবে! ২০১৮ সালের জুলাই মাসে এই ঘটনার সময় জেরির বয়স ছিল ৬৫ বছর। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে সাহায্য চাওয়ার অপরাধে পুলিশ তাকে ধাওয়া করে। কোনো রকম সতর্কবার্তা না দিয়েই জেরি পালানোর সময় পেছন থেকে তার পিঠে ইলেকট্রিক শক দেন অফিসার গ্রাবস। তীব্র শকের আঘাতে জেরি একটি উঁচু ঢাল থেকে ছিটকে নিচে কংক্রিটের ওপর পড়েন। এতে তার মাথার খুলি ও মেরুদণ্ড ভেঙে যায় এবং গলা থেকে নিচের পুরো অংশ আজীবনের জন্য অবশ হয়ে যায়। এই পঙ্গুত্ব নিয়ে পাঁচ বছর বেঁচে থাকার পর ২০২৩ সালে জেরি মারা যান। এই ঘটনার পর জেরি যখন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন, তখন এই পুলিশ অফিসার তার কেবিনে গিয়ে উল্টো তার নামেই মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন। এছাড়া ঘটনার সময় নিজের বডি ক্যামেরা বন্ধ রাখার অপরাধে পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিভাগ থেকে তাকে অভিযুক্ত করা হলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। ২০২৪ সালে তার বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ৯২ হাজার ডলার। এখন কর বাদ দিয়ে তার মাসের বেতনের প্রায় ১৩ শতাংশ এই ক্ষতিপূরণের পেছনে চলে যাবে। যদি তিনি চাকরিও হারান, তবুও তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করে এই টাকা আদায় করা হবে। আইনি লড়াইয়ে ওই পুলিশ অফিসার সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য থাকা বিশেষ সুরক্ষাকবচ বা 'কোয়ালিফাইড ইমিউনিটি'র দোহাই দিয়ে পার পাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, একজন নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষকে এভাবে পেছন থেকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক এবং চরম অপরাধ।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের কারাগারগুলোতে বন্দীদের ওপর নির্যাতন, চিকিৎসা অবহেলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে গত পাঁচ বছরে অন্তত ১৭০টি মামলা আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি করেছে রাজ্য সরকার। এসব মামলায় মোট ২৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও কোনো ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করা হয়নি। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে পাওয়া নথির ভিত্তিতে দ্যা সিটি রিপোর্টারের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই চিত্র। অ্যান্টোয়ান গ্যালোওয়ে এখনও স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির সেই দিনটির কথা। নিউইয়র্কের ক্লিনটন কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে এক কারারক্ষীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করার পর সাতজন কারারক্ষী তাকে ঘিরে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে মুখে ঘুষি মারা হয়। এরপর বুকে কিল, স্টিলের বুট দিয়ে লাথি এবং ব্যাটন দিয়ে পায়ের গোড়ালিতে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে তিনি বারবার জ্ঞান হারাতে থাকেন। বর্তমানে ৪৮ বছর বয়সী ইস্ট ফ্ল্যাটবুশের বাসিন্দা গ্যালোওয়ে দ্যা সিটি রিপোর্টারকে বলেন, "আমি মাথা ঢাকার চেষ্টা করছিলাম। দুইবার জ্ঞান হারিয়েছিলাম। ফিরে আসছিলাম, আবার হারাচ্ছিলাম। ওরা লাথি মারছিল, পা দিয়ে মাড়াচ্ছিল, জাতিবিদ্বেষী গালি দিচ্ছিল।" ঘটনার আট বছর পর নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য তার মামলা ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার দিয়ে নিষ্পত্তি করে। তবে সেই সমঝোতায় কোনো দায় স্বীকার করা হয়নি। দ্যা সিটি রিপোর্টার তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে যে নথি সংগ্রহ করেছে, তাতে দেখা যায় গত পাঁচ বছরে অন্তত ১৭০টি মামলায় নিউইয়র্ক সরকার ২৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। মামলাগুলোর অভিযোগের মধ্যে ছিল কারারক্ষীদের মারধর, নির্যাতন, চিকিৎসা অবহেলা এবং এমন ঘটনা, যেখানে চিকিৎসা না পাওয়ায় বন্দীদের কারও কারও অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগই আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও কোনো ক্ষেত্রেই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। গ্যালোওয়ের আইনজীবী ব্রায়ান ড্র্যাচ বলেন, "আমি রাজ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করি। সপ্তাহে দুইবারও করি।" প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এই ধরনের মামলা পরিচালনা করছেন। তার দাবি, এ ধরনের মামলার সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। পাঁচ মাস চিকিৎসা না পেয়ে ক্যানসারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছান বন্দী দ্যা সিটি রিপোর্টারের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে জর্ডান ওয়ার্নারের ঘটনাও। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি আপস্টেট কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে সাজা ভোগ করছিলেন। একসময় তার গলার পাশে মাংস ফুলে ওঠে, দ্রুত ওজন কমতে থাকে, দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয় এবং রাতে অতিরিক্ত ঘামে ভিজে যেতেন। ওয়ার্নার বলেন, "আমি প্রতিদিন ডাক্তার দেখাতে চাইতাম। পাঁচ মাস ধরে আবেদন করেছি। কারারক্ষীরা বলেছে আমি মিথ্যা বলছি।" তার অভিযোগ, ওষুধ বিতরণকারী নার্সরাও তার সেলের সামনে দিয়ে চলে যেতেন। একদিন করিডরে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অ্যালবেনি মেডিকেল সেন্টারে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ফুসফুসের চারপাশে জমে থাকা তরল বের করা হয়। পরে চিকিৎসকেরা শনাক্ত করেন স্টেজ ফোর-বি হজকিন্স লিম্ফোমা, যা ক্যানসারের অত্যন্ত অগ্রসর পর্যায়। মায়ের জন্মদিনে ফোন করে তিনি প্রথম নিজের অসুস্থতার কথা জানান। তার ভাষায়, "মা ভেবেছিলেন আমি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করেছি। আমি বললাম, আমার স্টেজ ফোর ক্যানসার। একজন আইনজীবী ধর, এখনই।" তার অভিযোগ, এরপরও কারা কর্তৃপক্ষ তিনবার কেমোথেরাপি নিতে অস্বীকৃতি জানানোর মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। তিনি বলেন, "বেঁচে থাকার জন্য কে কেমোথেরাপি নিতে অস্বীকৃতি জানায়?" ২০২১ সালে করা মামলার চার বছর পর নিউইয়র্ক সরকার তাকে ৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। ওয়ার্নার বলেন, "আমি টাকার চেয়ে চেয়েছিলাম যারা দায়ী, তারা চাকরি হারাক।" ২০২০ সালে মুক্তি পাওয়া ওয়ার্নার বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন। সম্প্রতি তিনি ছেলের প্রথম জন্মদিন উদ্যাপন করেছেন। অনুসন্ধানে আরও কয়েকটি গুরুতর ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে। গ্রিন হেভেন কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে এক বন্দীকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেয়াল ও লোহার রডে বারবার মাথা ঠুকেছিলেন এক কারারক্ষী। পরে বডি ক্যামেরার ভিডিওতে প্রমাণ হয়, কর্মকর্তাদের লিখিত প্রতিবেদন সত্যের সঙ্গে মিলছিল না। ঘটনায় এক কর্মকর্তা ফেডারেল আদালতে দোষ স্বীকার করলেও মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করা আরেক কর্মকর্তা এখনও চাকরিতে রয়েছেন। ওই মামলায় ৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দেয় রাজ্য। ক্লিনটন কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে রিকো সান্তানা নামের এক বন্দীর চোয়াল দুটি পৃথক হামলায় দুইবার ভেঙে দেওয়া হয়। প্রথম হামলার পর অস্ত্রোপচার এক সপ্তাহ বিলম্বিত হয়। সুস্থ হওয়ার আগেই তাকে সাধারণ কক্ষে ফেরত পাঠানো হলে আবার হামলার শিকার হন। এ মামলায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় ২ লাখ ডলার। ওয়াশিংটন কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে আরেক বন্দীর অণ্ডকোষে তীব্র ব্যথা ও ফোলাভাব দেখা দিলেও সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরে অস্ত্রোপচার করে অণ্ডকোষটি অপসারণ করতে হয়। এ ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় ৯০ হাজার ডলার। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল রাজ্যের ৪৪টি কারাগারে নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১১টি কারাগারে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলো এখনও নকশা বা নির্মাণ পর্যায়ে রয়েছে। কারা প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ডিন উইলিয়ামস, যিনি কলোরাডো ও আলাস্কার কারাব্যবস্থা পরিচালনা করেছেন, দ্যা সিটি রিপোর্টারকে বলেন, একটি সুস্থ কারাব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত হয়। তার ভাষায়, "একটা ঘটনা, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। এটা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু অকার্যকর ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক হয়ে যায়।" নথি অনুযায়ী, এসব মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে ছয় বছর সময় লাগে। এমন একটি মামলাও রয়েছে, যা নিষ্পত্তি হতে ১৫ বছর লেগেছে। অভিযোগ ছিল একজন বন্দীকে ১২ দিন অতিরিক্ত একাকী কারাবাসে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ৭৪৮ ডলার। বর্তমানে অ্যান্টোয়ান গ্যালোওয়ে ইস্ট ফ্ল্যাটবুশে বসবাস করেন। গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্রে কাজ করেন। নিজের এলাকায় শিশুদের জন্য উৎসবের আয়োজন করেন, খাবার ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেন। তবে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলেই তিনি পায়ের গোড়ালির ব্যথা অনুভব করেন। গ্যালোওয়ে বলেন, "আমি কখনো সন্তুষ্ট হব না। আমি সারাজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, আর ওরা এখনও চাকরি করছে। আমি জানি, ওরা এখনও অনেকের সঙ্গে একই কাজ করছে। কয়েক হাজার ডলার দিয়ে এটা ঠিক হয় না।" তার কথায়, "আমি ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার পেয়েছি। কিন্তু বিচার পাইনি। এই দুইয়ের পার্থক্য অনেক বড়।"
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের বিতর্কিত ‘অ্যালিগেটর অ্যালকাট্রেজ’ অভিবাসী আটক কেন্দ্র থেকে সব বন্দিকে সরিয়ে নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এর ফলে কেন্দ্রটি কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়েছে এবং কার্যক্রম স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় মৌসুম শুরু হওয়ার কারণে নিরাপত্তা বিবেচনায় বন্দিদের অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। বিভাগের মুখপাত্র লরেন বিস অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ‘অবৈধ অভিবাসী বন্দিদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা তাদের অন্য কেন্দ্রে স্থানান্তর করেছি।’ তবে কতজনকে সরানো হয়েছে এবং তাদের কোথায় পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। কেন্দ্রটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। গত মে মাসে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ফ্লোরিডার ‘বিগ সাইপ্রেস ন্যাচারাল প্রিজার্ভ’-এর ভেতরে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি পরিচালনা ব্যয় অত্যন্ত বেশি ছিল। ২০২৫ সালের ১৯ জুন এই আটক কেন্দ্রটি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। সান ফ্রান্সিসকোর কুখ্যাত ‘অ্যালকাট্রেজ’ কারাগারের আদলে এর নামকরণ করা হয়। জলাভূমিবেষ্টিত দুর্গম এলাকায় নির্মিত এই কেন্দ্রটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে পালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়। ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমিয়ার এক সময় বলেছিলেন, ‘কেউ যদি এখান থেকে পালায়, তবে বাইরে কুমির ও অজগর ছাড়া কিছুই অপেক্ষা করছে না।’ গত জুলাইয়ে কেন্দ্রটি চালুর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিসান্টিসকে সঙ্গে নিয়ে এটি পরিদর্শন করেন। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে গণ-ডিপোর্টেশন নীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। চালুর পর থেকেই এই কেন্দ্রটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। স্থানীয় মিকোসুকে ও সেমিনোল আদিবাসী নেতারা অভিযোগ করেন, এটি এভারগ্লেডস অঞ্চলে তাদের আবাসস্থল ও ধর্মীয় স্থানে ক্ষতি করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও কেন্দ্রটির অবস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফ্লোরিডায় তীব্র গরম, ভারী বৃষ্টি এবং ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতিতে এটি কতটা নিরাপদ, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এক বছরের কার্যক্রমে কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। বন্দিদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাদের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো না। চিকিৎসা অবহেলা এবং খাবারে পোকা থাকার অভিযোগও উঠে আসে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) আইনজীবী অ্যামি গডশাল বলেন, ‘এই নিষ্ঠুর কেন্দ্র থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, তবে এতে পূর্বের ক্ষতি মুছে যায় না।’ তিনি কেন্দ্রটি স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি জানান। প্রায় ৩ হাজার ধারণক্ষমতার এই কেন্দ্রটি হারিকেন প্রতিরোধে শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও নতুন করে তৈরি হওয়া ‘ট্রপিক্যাল স্টর্ম আর্থার’-এর পরিপ্রেক্ষিতে বন্দি সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সূত্র: আল-জাজিরা
আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তার আমলে জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া নিজের ছেলের খোঁজে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া কিংবদন্তি মানবাধিকার কর্মী লিদিয়া 'তাতি' আলমেইদা মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তার এই প্রয়াণে আর্জেন্টিনা জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আলমেইদা ছিলেন দেশটির বিখ্যাত অধিকার রক্ষা সংগঠন 'মাদার্স অব প্লাজা দে মায়ো'-র সভাপতি। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত চলা দেশটির রক্তক্ষয়ী একনায়কতন্ত্রের সময় নিখোঁজ হওয়া সন্তানদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে এই মায়েরা ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি প্রাসাদের সামনের চত্বরে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতীকী পদযাত্রা করে আসছিলেন। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে আর্জেন্টিনার সামরিক অভ্যুত্থানের ঠিক নয় মাস আগে আলমেইদার ছেলে আলেহান্দ্রোকে কমিউনিস্ট-বিরোধী আধাসামরিক বাহিনী অপহরণ করে। এরপর থেকে দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে আলমেইদা তার সন্তানের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, সেই সত্য উন্মোচনের জন্য অবিরাম সন্ধান চালিয়ে যান। আলেহান্দ্রোকে আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবে এই দীর্ঘ পথচলায় আলমেইদা হয়ে উঠেছিলেন এক অনুকরণীয় নৈতিক শক্তির প্রতীক এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের এক অন্যতম বাতিঘর। তিনি জীবনের শেষ বছর পর্যন্ত একনায়কতন্ত্রের বর্বরতার বিচার দাবির পাশাপাশি সমসাময়িক বিভিন্ন সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনে প্রকাশ্যে সক্রিয় ভূমিকা রেখে গেছেন। আলমেইদার পরিবার জানিয়েছে, রবিবার গভীর রাতে বুয়েনস আইরেসের একটি হাসপাতালে প্রিয়জনদের উপস্থিতিতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাদার্স অব প্লাজা দে মায়ো জানিয়েছে, গত কয়েক দিন আগে অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি তার এই মানবিক কাজ চালিয়ে গেছেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এক আবেগঘন শ্রদ্ধাবার্তায় বলা হয়, "আমাদের এটি শেখানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ যে ভালোবাসার অপর নামই হলো প্রতিরোধ করা। আমরা কেবল সেই লড়াইয়েই হেরে যাই যা আমরা ছেড়ে দিই এবং ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো শক্তি পৃথিবীতে আর নেই।" লিদিয়া স্তেলা মার্সিডিজ মি উরাঙ্গা নামের এই সাহসী নারী ১৯৩০ সালের ২৮ জুন বুয়েনস আইরেসে জন্মগ্রহণ করেন। স্বামী হোর্হে আলমেইদার সাথে সংসারে তাদের তিনটি সন্তান ছিল। সমাজকর্মী বা আন্দোলনের কর্মী হওয়ার আগে তিনি মূলত একজন শিক্ষক ছিলেন এবং পরবর্তীতে নিজের পরিবার লালন-পালনেই ব্যস্ত ছিলেন। আলমেইদার বাবা ছিলেন একজন সামরিক ক্যাভালরি অফিসার। ফলে ১৯৭৫ সালে যখন আলেহান্দ্রো নিখোঁজ হন, তখন তার প্রথম সহজাত তাগিদ ছিল সহায়তার জন্য সামরিক জানাশোনা লোকদের কাছে যাওয়া। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তিনি স্বৈরাচারের ভয়াবহ নৃশংসতার সত্য জানতে পারেন এবং নিজের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের খোঁজে থাকা অন্যান্য মায়েদের সাথে পরিচিত হন, তখন তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। তিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন। নিখোঁজ হওয়ার সময় আলেহান্দ্রো বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন এবং একই সাথে তিনি একটি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী গেরিলা দল 'পিপলস রেভল্যুশনারি আর্মি'-র সদস্য ছিলেন। তিনি একাধারে একজন কবিও ছিলেন। ২০০৮ সালে আলমেইদা তার ছেলের একটি ডায়েরি থেকে খুঁজে পাওয়া কবিতার সংকলন বই আকারে প্রকাশ করেছিলেন, যা তিনি ছেলের অপহরণের পর উদ্ধার করেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ১৯৮০-এর দশকে মূল সংগঠনটি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর ২০২৪ সালে আলমেইদা 'মাদার্স অব প্লাজা দে মায়ো ফাউন্ডিং লাইন'-এর সভাপতি নির্বাচিত হন। আর্জেন্টিনার সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ ডি কির্চনারসহ দেশটির বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই মহান নেত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাকে এমন একজন অক্লান্ত যোদ্ধা হিসেবে বর্ণনা করেছেন যিনি জীবনকে সম্মানিত করে গেছেন।
কারাবন্দী ইরানি মানবাধিকারকর্মী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নার্গিস মোহাম্মদি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার পরিবার ও নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে তেহরানে স্থানান্তরের আহ্বান জানিয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার ভাই হামিদরেজা মোহাম্মদি জানান, হৃদরোগজনিত জটিলতায় তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, মার্চের শেষ দিক থেকে অসুস্থতা শুরু হলেও পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় গত ১ মে তাকে উত্তর-পশ্চিম ইরানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে তিনি তীব্র মাথাব্যথা, বমিভাব ও বুকে ব্যথায় ভুগছেন। তার ভাই বলেন, “আমরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন তার হৃদ্যন্ত্র নিয়ে।” তিনি অভিযোগ করেন, যে প্রাদেশিক হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসা চলছে, সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের দাবি, তার পূর্বের চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকায় তাদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে পরিবার এবং নোবেল কমিটি তাকে তেহরান-এ স্থানান্তরের আহ্বান জানিয়েছে। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দাবিতে আন্দোলনের জন্য ২০২৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান নার্গিস মোহাম্মদি। তবে মানবাধিকার ইস্যুতে সক্রিয় থাকার কারণে তাকে বহুবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জানা গেছে, তিনি জীবনে ১৩ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং মোট ৩১ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫৪টি বেত্রাঘাতের সাজা পেয়েছেন। ২০২১ সালে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ১৩ বছরের সাজা ভোগ শুরু করেন তিনি, যদিও এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে আসছেন। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন।
২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর প্রণীত জবাবদিহি বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া একাধিক সংস্কার বাতিল বা স্থগিত করেছে বাংলাদেশের নতুন সংসদ। এতে করে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি থেকে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে কি না- তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও বিশ্লেষকেরা। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি-প্রধান নতুন সংসদ সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সেই অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর দায়িত্ব নিয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ১১০টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে- কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনসহ। তবে অন্তত ২৩টি অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় অকার্যকর হয়ে গেছে। এর মধ্যে মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন ও পুলিশ সংস্কারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধানও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বাতিল হওয়া এসব অধ্যাদেশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিরোধী দলগুলোর দাবি, এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংস্কারের মূল কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং ক্ষমতা আবার কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে সরকার বলছে, এটি সংস্কার বাতিল নয়; বরং আইনগুলো আরও পরিপূর্ণ ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা। আলোচনার মাধ্যমে সংশোধিত আইন পুনরায় আনা হবে বলেও জানিয়েছে তারা। পটভূমি: আন্দোলন থেকে সংস্কার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতা, মতপ্রকাশের দমন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’ নামে একটি সংস্কার কাঠামো প্রণয়ন করে, যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নির্বাচনব্যবস্থা ও বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থন পায় এই চার্টার। তবে সংসদ না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করতে পারেনি; পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধ্যাদেশ জারি করে। সংবিধান অনুযায়ী, এসব অধ্যাদেশ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন বা বাতিল করতে হয়। মানবাধিকার কমিশন: কী পরিবর্তন হলো বাতিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর একটি ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) সংক্রান্ত। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত, নির্দিষ্ট সময়সীমা, ক্ষতিপূরণ ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার বিধান ছিল। কিন্তু তা বাতিল হওয়ায় ২০০৯ সালের পুরোনো আইন পুনর্বহাল হয়েছে, যেখানে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত। সরকার বলছে, ওই অধ্যাদেশে আইনি অস্পষ্টতা ছিল। তবে সাবেক কমিশনারদের অভিযোগ, সরকারের যুক্তি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গুমের আইনগত স্বীকৃতি: শূন্যতা তৈরি গুমের ঘটনাকে আলাদা অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার উদ্যোগও বাতিল হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কমিশন ১ হাজার ৯০০-এর বেশি অভিযোগ পায়, যার মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, গুমকে স্পষ্টভাবে আইনে সংজ্ঞায়িত না করলে বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দায়মুক্তির ঝুঁকি তৈরি হয়। বিচার বিভাগীয় সংস্কার বাতিল হওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন সচিবালয় গঠন এবং বিচারক নিয়োগে নতুন পদ্ধতি চালু করা। এর লক্ষ্য ছিল নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানো। এসব প্রস্তাব বাতিল হওয়ায় আগের ব্যবস্থাই বহাল থাকছে। সরকারের অবস্থান: ‘পুনর্মূল্যায়ন, বাতিল নয়’ সরকার বলছে, স্বল্প সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করা কঠিন ছিল। তাই কিছু আইন পরে আলোচনা করে পুনরায় আনা হবে। আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধান হুইপের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আইনগুলো আরও পরিশীলিত করে পুনরায় প্রণয়ন করা হবে। বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি সংস্কারের পথ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত। তাদের দাবি, গণভোটে জনগণের যে প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছিল, তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল আইন বাতিল নয়; বরং ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের প্রশ্ন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য দুর্বল করতে পারে। এতে করে আগের মতোই নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে তারা এটিও মনে করেন, সরকার চাইলে আলোচনার মাধ্যমে সংস্কারগুলো আরও শক্তিশালী করে ফিরিয়ে আনার সুযোগ এখনো রয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো বিশ্বনেতাদের তীব্র সমালোচনা করেছে। অ্যামনেস্টি তাঁদের ‘মানবাধিকারের শিকারী’ (Predators) হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, তাঁদের কর্মকাণ্ডের ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়েছে। সোমবার প্রকাশিত সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই শীর্ষ নেতারা আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি ও বিচার ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, "আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো মানবাধিকারের সংজ্ঞাকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করছে। ট্রাম্প, পুতিন এবং নেতানিয়াহুর মতো নেতারা আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিশ্বকে এক অন্ধকার ও অস্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।" প্রতিবেদনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের কর্মকাণ্ডকে ‘গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে অভিবাসন নীতি, নাগরিক অধিকার খর্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহারের সমালোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা ও যুদ্ধাপরাধের বিষয়গুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এই প্রভাবশালী দেশগুলোর ‘শিকারী সুলভ’ আচরণের কারণে বিশ্বের অন্যান্য ছোট দেশগুলোও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাহস পাচ্ছে। যদি এখনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই ধারা প্রতিহত না করে, তবে আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সংস্থাটি আরও জানায়, ২০২৩ ও ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই নিম্নমুখী প্রবণতা ২০২৬ সালে এসে এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যেখানে বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জীবনের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে।
গাজার এক অস্থায়ী তাবু। ভেতরে বসে আছেন ৬২ বছর বয়সী বৃদ্ধা ইনাম আল-দাহদুহ। কোলে তার ছয় নাতি-নাতনি। হাতে একটি ছবি—যাতে রয়েছে তার আদরের তিন ছেলের মুখ। আজ ১৭ এপ্রিল, ফিলিস্তিনি বন্দি দিবস। কিন্তু ইনামের জন্য এই দিনটি উৎসবের নয়, বরং সীমাহীন যন্ত্রণার। গত দুই বছর ধরে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি তার তিন সন্তান মাহমুদ, আলা এবং দিয়া। তারা বেঁচে আছেন কি না, কেমন আছেন—তার কোনো সঠিক উত্তর নেই এই মায়ের কাছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজার আল-শিফা হাসপাতালের কাছে নিজ বাড়ি থেকে তাদের ধরে নিয়ে যায় ইসরায়েলি বাহিনী। সেই অভিযানে নিহত হন ইনামের স্বামী নাঈমও। এরপর থেকে যাযাবর জীবন আর সন্তানদের ফেরার প্রতীক্ষায় দিন কাটছে এই বৃদ্ধার। তবে ইনামের উদ্বেগ এখন বহুগুণ বেড়ে গেছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি পার্লামেন্টে বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রেখে একটি নতুন আইন পাস হয়েছে। ইনাম বলেন, "ক্ষুধা, কষ্ট বা নির্যাতন—সবই হয়তো ওরা সহ্য করে নেবে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড? একজন মা হিসেবে এই আতঙ্ক নিয়ে আমি কীভাবে শান্তিতে থাকি?" বন্দি অধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৯,৬০০ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি রয়েছেন, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৮৩ শতাংশ বেশি। এদের মধ্যে ৩৫০ জন শিশুও রয়েছে। কারাগারের ভেতর অমানবিক পরিবেশ এবং বন্দিদের মৃত্যুর খবরে ইনামের মতো হাজারো ফিলিস্তিনি মা আজ দিশেহারা। ইনম তার বড় ছেলে মাহমুদের সন্তানদের পবিত্র কোরআন শেখাচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তার ছেলেরা নির্দোষ এবং একদিন তারা ফিরে আসবে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তার আকুতি, "একজন বন্দিরও বেঁচে থাকার এবং সম্মানের অধিকার আছে। এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে বিশ্বকে এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে।"
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ৩৫ বছর বসবাসের পর ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক নারীকে আটক করেছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। আটক ওই নারী মীনু বাত্রা (৫৩) বর্তমানে টেক্সাসের একটি ডিটেনশন সেন্টারে রয়েছেন। জানা গেছে, গত ১৭ মার্চ টেক্সাসের হারলিনজেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করে আইসিই। বর্তমানে তিনি রেমন্ডভিলের এল ভ্যালে ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী আছেন। মীনু বাত্রা পেশায় একজন লাইসেন্সধারী দোভাষী। পাঞ্জাবি, হিন্দি ও উর্দু ভাষার দোভাষী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন আদালতে কাজ করে আসছিলেন। মিলওয়াকিতে আদালতের একটি দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রাপথে তাকে হাতকড়া পরিয়ে আটক করা হয়। কারাগার থেকে দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মীনু অভিযোগ করেন, তাকে অপরাধীর মতো আচরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “২৪ ঘণ্টা আমাকে খাবার ও পানি ছাড়া রাখা হয়েছিল, এমনকি জরুরি ওষুধও দেওয়া হয়নি।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, হাতকড়া পরা অবস্থায় তাকে ছবি তুলতে বাধ্য করা হয় এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারের কথা বলা হয়, যা তিনি চরম অপমানজনক বলে উল্লেখ করেন। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় বাবা-মাকে হারানোর পর ১৯৯১ সালে শিশু অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান মীনু। দক্ষিণ টেক্সাসে বসবাস করে তিনি চার সন্তানকে বড় করেছেন। তাঁর এক ছেলে বর্তমানে মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত। মীনুর আইনজীবী দীপক আহলুওয়ালিয়া জানান, ২০০০ সালে একটি অভিবাসন আদালত তাকে ভারতে ফেরত না পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল, কারণ সেখানে তার নির্যাতনের ঝুঁকি রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। আইনজীবীর আশঙ্কা, তার অভিবাসন মামলাটি পুনরায় চালু না হওয়ায় তাকে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি দেশের সঙ্গে বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের গ্রহণসংক্রান্ত চুক্তিও করেছে। বর্তমানে মীনু একটি হ্যাবিয়াস কর্পাস আবেদন করে তার আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছেন। তবে আটক হওয়ার এক মাস পার হলেও এখনো তাকে কোথায় পাঠানো হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।
ফিলিস্তিনের সমর্থনে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করার জেরে ফ্রান্সে এক বছরের বেশি সময় বন্দী থাকার পর অবশেষে দেশে ফিরেছেন ইরানি নাগরিক মাহদিয়া এসফানদিয়ারি। বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাঁর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে বন্দী বিনিময়ের অংশ হিসেবেই তিনি মুক্তি পেয়েছেন। মাহদিয়া এসফানদিয়ারি ২০১৮ সাল থেকে ফ্রান্সে বসবাস করছিলেন এবং লিঁও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে সেখানে অনুবাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের অভিযানের পর গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিনের সমর্থনে অনলাইনে সরব হওয়ায় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘সন্ত্রাসবাদে উস্কানি’ দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করে। তেহরানে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাহদিয়া ফ্রান্সের বিচারব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “সবার কাছে এখন এটা পরিষ্কার যে, অন্তত ফ্রান্সে মতপ্রকাশের কোনো স্বাধীনতা নেই। আমার বিরুদ্ধে আদালতের রায়টি ছিল চরম অন্যায়।” উল্লেখ্য, গত বছর অক্টোবরে জামিনে মুক্তি পেলেও তাঁর ওপর নানা বিধিনিষেধ ছিল। মাহদিয়ার এই মুক্তি এমন এক সময়ে এলো, যখন এক সপ্তাহ আগেই ইরান তাদের দেশে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বন্দী দুই ফরাসি নাগরিক সিসিল কোহলার এবং জ্যাক প্যারিসকে মুক্তি দিয়েছে। যদিও ফ্রান্স সরাসরি এটিকে ‘বন্দী বিনিময়’ হিসেবে স্বীকার করেনি, তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা আগেই জানিয়েছিল যে, ফরাসি নাগরিকদের মুক্তির বিনিময়ে মাহদিয়াকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। ফ্রান্সে মাহদিয়ার মুক্তির দাবিতে এর আগে তেহরানে ফরাসি দূতাবাসের সামনে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক বিক্ষোভও প্রদর্শন করেছিল।
ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনের কিংবদন্তি ফাতাহ নেতা মারওয়ান বারঘোতির ওপর ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের খবর নিশ্চিত করেছেন তার আইনজীবী। সম্প্রতি বারঘোতির সাথে কারাগারে দেখা করার পর আইনজীবী বেন মারমারেলে জানান, গত কয়েক সপ্তাহে তার মক্কেল অন্তত তিনবার বড় ধরনের সহিংস হামলার শিকার হয়েছেন। আইনজীবী মারমারেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে এই পরিস্থিতিকে "গভীর উদ্বেগজনক" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, গত ২৪শে মার্চ বারঘোতির সেলে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কুকুর লেলিয়ে দেয় ইসরায়েলি কারারক্ষীরা। এছাড়া গত ৮ই এপ্রিল তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে মারধর করা হয়। এর ফলে তিনি দীর্ঘক্ষণ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও প্রায় দুই ঘণ্টা তাকে কোনো চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়নি। মারমারেলে বলেন, "এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি পরিকল্পিত নির্যাতনের অংশ। সহিংসতা এবং সুচিকিৎসার অভাব তার জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।" উল্লেখ্য, ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০২ সালে ইসরায়েল বারঘোতিকে গ্রেপ্তার করে। তাকে পাঁচটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও বারঘোতি বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। ফিলিস্তিনিদের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন নেতা এবং অনেকেই তাকে 'ফিলিস্তিনের নেলসন ম্যান্ডেলা' হিসেবে গণ্য করেন।
নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে চালানো বিমান বাহিনীর এক হামলা ‘ভুলবশত’ একটি জনবহুল বাজারে আঘাত হানায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ হামলাটি ভুলবশত হয়েছে বলে স্বীকার করলেও বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, বর্নো রাজ্যের সীমান্তবর্তী ইয়োবি রাজ্যের একটি গ্রামে এই হামলা চালানো হয়, যেখানে অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছেন বলে জীবিতদের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জিহাদি সহিংসতায় এই অঞ্চলটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার লক্ষ্য ছিল জঙ্গিগোষ্ঠী বোকো হারামের একটি ঘাঁটি। তবে ভুলবশত কাছাকাছি একটি সাপ্তাহিক বাজারে অবস্থানরত সাধারণ মানুষ এতে হতাহত হন। নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম বনাঞ্চলে অবস্থান নেওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। তবে এসব অভিযানে বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও নতুন নয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ ধরনের অভিযানে অন্তত ৫০০ সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্য নির্ধারণে ভুল এবং স্থলবাহিনী ও বিমান ইউনিটের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি—এসব কারণেই এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে নাইজেরিয়ার বিমান বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
২০২৫ সালে ইরান এ অন্তত ১ হাজার ৬৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ১৯৮৯ সালের পর এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যক ফাঁসি কার্যকর হওয়ার ঘটনা। নরওয়ে-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস এবং প্যারিসভিত্তিক টুগেদার অ্যাগেইনস্ট দ্য ডেথ পেনাল্টি যৌথভাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে যেখানে ৯৭৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৪৮ জন নারীও ছিলেন। এতে আরও বলা হয়েছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র যদি বর্তমান সংকট থেকে টিকে যায়, তাহলে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে মৃত্যুদণ্ড আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার টিকে থাকলে দমন-পীড়নের উপায় হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মাত্র কয়েক মাস আগের ঘটনা হলেও ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এখন অনেকের কাছে যেন পুরোনো স্মৃতি। জানুয়ারিতে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদ দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই সরকারবিরোধী বিস্তৃত ক্ষোভে রূপ নেয়। তবে এই বিক্ষোভ চলাকালে কিছু রহস্যময় ও সহিংস ঘটনার বর্ণনা এখনো আলোচনায় রয়েছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, তেহরানের একটি নিরিবিলি গলিতে তিনি দেখেছেন—পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বেশে থাকা এক ব্যক্তি আচমকা আগ্নেয়াস্ত্র বের করে দুই তরুণীকে গুলি করে পালিয়ে যায়। একই ধরনের আরেকটি ঘটনার কথা জানা গেছে কাস্পিয়ান সাগরসংলগ্ন একটি শহর থেকেও, যেখানে একটি বাসার ছাদ থেকে এমন দৃশ্য দেখার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া তেহরান থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের কাজভিন শহরেও অস্বাভাবিক একটি হত্যাকাণ্ডের তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে কোনো বিক্ষোভ না থাকলেও একটি রাস্তায় এক মা ও তার শিশুকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবহৃত অস্ত্রটি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মিল নেই বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরেকজন জানান, পূর্ব তেহরানে তিনি মুখোশধারী একটি দলের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। তারা মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল এবং স্লোগান দিচ্ছিল। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হলেই তারা হঠাৎ করে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত। এই ধরনের কৌশল ইউরোপের ‘ব্ল্যাক ব্লক’ পদ্ধতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা ইরানের জন্য নতুন বলে মনে করা হচ্ছে। ইরান সরকার জানিয়েছে, এসব বিক্ষোভে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এদিকে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইরানে মোসাদের উপস্থিতি নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। পাশাপাশি ইসরায়েলের এক মন্ত্রীও দাবি করেন, তাদের লোকজন ইরানে সক্রিয় রয়েছে। এসব বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।