- প্রচ্ছদ
- Topic
নাগরিকত্ব
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়ম পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় আবারও আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটতে চাইছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দেশটির কয়েকটি আদালতের বাধার পর সুপ্রিম কোর্টের কাছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া সব শিশুকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব দেওয়ার দীর্ঘদিনের নীতিতে পরিবর্তন আনা। প্রশাসনের দাবি, বর্তমান ব্যবস্থার অপব্যবহার হচ্ছে এবং এটি সীমান্ত ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একাধিক অঙ্গরাজ্য ও অধিকার সংগঠন আদালতে মামলা করেছে। নিম্ন আদালতগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের আদেশ কার্যকর হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। এই নীতির অধীনে সাধারণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া শিশুরা নাগরিকত্ব পেয়ে থাকে, বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থান যাই হোক না কেন। ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই নিয়ম সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আদালতগুলোতে এর বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। বিরোধীরা বলছেন, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ দিয়ে সাংবিধানিক অধিকার পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এখন প্রশাসনের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তারা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করবে কি না এবং সর্বোচ্চ আদালত বিষয়টি শুনতে রাজি হবে কি না। যদি সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন ও নাগরিকত্ব নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রে বহু বছর ধরে চলে আসছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগের পর বিষয়টি আবারও দেশটির রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু আবেদনকারীকে আর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা এর আশ্রয় কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। তাদের আবেদন সরাসরি অভিবাসন আদালতে পাঠানো যাবে, যেখানে মামলার শুনানি হবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত বহিষ্কারের প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে। মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়া এই নিয়মকে ট্রাম্প প্রশাসন আশ্রয়ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের জট কমানোর উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রশাসনের দাবি, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন নীতির ফলে যেসব আবেদন আদালতেই নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত বিচারকের কাছে পাঠানো সম্ভব হবে। তবে অভিবাসন অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই পরিবর্তনের ফলে আশ্রয়প্রার্থীরা তাদের আবেদন ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারাবেন। আগে আশ্রয় কর্মকর্তা আবেদনকারীর বক্তব্য শুনে প্রাথমিক মূল্যায়ন করতেন। নতুন ব্যবস্থায় অনেক আবেদনকারী সেই ধাপ ছাড়াই সরাসরি অভিবাসন আদালতের মুখোমুখি হবেন, যেখানে প্রত্যাখ্যাত হলে গ্রেপ্তার বা বহিষ্কারের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। শরণার্থী সহায়তা সংস্থা হিয়াসের প্রধান নির্বাহী বেথ ওপেনহাইম বলেন, এই নীতির প্রভাব নিরাপত্তার আশায় যুক্তরাষ্ট্রে আসা মানুষের জন্য গুরুতর হতে পারে। তার মতে, এতে এমন মানুষও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে পড়বেন, যারা বাস্তবে নির্যাতন বা প্রাণনাশের আশঙ্কা থেকে পালিয়ে এসেছেন। অন্যদিকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বলছে, আশ্রয়প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার পাওয়ার কোনো আইনগত অধিকার নেই। সংস্থাটির দাবি, নতুন নিয়মের মাধ্যমে জননিরাপত্তা বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আদালতের মাধ্যমে তাদের আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রশাসনিক সম্পদ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে। এই নীতিগত পরিবর্তন এমন সময় এলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন আদালতের কার্যক্রমেও একাধিক পরিবর্তন এনেছে। গত এক বছরে শতাধিক অভিবাসন বিচারক চাকরি হারিয়েছেন বা পদ ছেড়েছেন, আবার নতুন বিচারকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন অবৈধ অভিবাসন কমানো এবং বহিষ্কার প্রক্রিয়া দ্রুত করার লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে আশ্রয়প্রার্থীদের ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে ১০ ধাপের একটি নির্দেশনা প্রকাশ করেছে দেশটির নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা ইউএসসিআইএস। বিশেষ করে গ্রিন কার্ডধারীদের নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে কী কী ধাপ সম্পন্ন করতে হবে, সেই প্রক্রিয়াই এতে ধারাবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইউএসসিআইএসের নির্দেশনা অনুযায়ী, নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে যে আবেদনকারী ইতোমধ্যে কোনোভাবে মার্কিন নাগরিকত্বের অধিকারী কি না। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ না করলেও কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। এমন কোনো সুযোগ না থাকলে আবেদনকারীকে ন্যাচারালাইজেশন বা আইনি প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে। এরপর আবেদনকারীকে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। সাধারণভাবে আবেদনকারীর বয়স, যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ স্থায়ী বসবাসের সময়কাল, নির্দিষ্ট সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে শারীরিকভাবে অবস্থান এবং ভালো নৈতিক চরিত্রের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত যোগ্যতার শর্তও প্রযোজ্য হতে পারে। যোগ্যতা নিশ্চিত করার পর নাগরিকত্বের জন্য ফরম এন-৪০০, অর্থাৎ ন্যাচারালাইজেশনের আবেদনপত্র প্রস্তুত করতে হবে। ইউএসসিআইএসের অনলাইন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অনেক আবেদনকারী অনলাইনে এই ফরম জমা দিতে পারেন। আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়ক নথিও প্রস্তুত করতে হয়। পরবর্তী ধাপে ফরম এন-৪০০ জমা দেওয়া এবং নির্ধারিত আবেদন ফি পরিশোধ করতে হয়। আবেদন গ্রহণের পর ইউএসসিআইএস একটি রসিদ নোটিশ দেয়। অনলাইন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আবেদনকারী নিজের মামলার অগ্রগতি ও আবেদনের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কিছু আবেদনকারীর ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিকস দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইউএসসিআইএস নির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নোটিশ পাঠায়। প্রয়োজন অনুযায়ী আঙুলের ছাপ, ছবি বা স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হতে পারে। বায়োমেট্রিকস ও প্রাথমিক যাচাইয়ের ধাপ শেষ হলে আবেদনকারীকে ইউএসসিআইএসের নির্ধারিত কার্যালয়ে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়। এই সাক্ষাৎকারে আবেদনপত্রের তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি নাগরিকত্বের যোগ্যতা এবং প্রযোজ্য ইংরেজি ও নাগরিকত্ব জ্ঞান পরীক্ষার বিষয়গুলোও মূল্যায়ন করা হতে পারে। সাক্ষাৎকারের পর ইউএসসিআইএস আবেদনটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানায়। আবেদন অনুমোদিত হতে পারে, অতিরিক্ত নথি বা তথ্যের প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হতে পারে, অথবা আবেদনকারী যোগ্য নন বলে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে। ইংরেজি বা নাগরিকত্ব পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রথমবার সফল না হলে আইন ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ থাকতে পারে। আবেদন অনুমোদিত হলে পরবর্তী ধাপে আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ বা ওথ অব অ্যালিজিয়েন্স গ্রহণের জন্য ন্যাচারালাইজেশন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারের দিনই শপথ গ্রহণের সুযোগ থাকতে পারে। তা সম্ভব না হলে ইউএসসিআইএস আলাদা নোটিশের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের তারিখ, সময় ও স্থান জানিয়ে দেয়। শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আবেদনকারী আইনগতভাবে মার্কিন নাগরিক হিসেবে গণ্য হন না। অনুষ্ঠানে সাধারণত নির্ধারিত ফরমের প্রশ্নমালা পূরণ, ইউএসসিআইএস কর্মকর্তাদের কাছে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং গ্রিন কার্ড জমা দেওয়ার পর আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতে হয়। এরপর আবেদনকারীকে ন্যাচারালাইজেশনের সনদ দেওয়া হয়। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নাগরিকত্বের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও নতুন নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকাও এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মধ্যে ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়া, জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন মেনে চলার মতো নাগরিক দায়িত্ব রয়েছে। ইউএসসিআইএসের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নাগরিকত্বের আবেদনসংক্রান্ত ফরম, নির্দেশনা এবং আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সরকারি ব্যবস্থা তাদের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়। তবে নাগরিকত্বের যোগ্যতা ও আবেদন প্রক্রিয়া ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী ইউএসসিআইএসের সর্বশেষ সরকারি নিয়ম ও নির্দেশনা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
গৃহহীন সংকট মোকাবিলায় বছরে প্রায় ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় করা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত দুই বছরের টানা হ্রাসের পর ২০২৬ সালের নতুন তথ্য-উপাত্তে এই বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে। একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি ও কাউন্টিতে মোট গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩.৪ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে রাস্তাঘাট, ফুটপাত এবং অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসকারী চরম গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭.৯ শতাংশ। সংকট নিরসনে লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র ক্যারেন বাস-এর বিশেষ কর্মসূচি 'ইনসাইড সেফ'-এর পেছনে চলতি বছরই প্রায় ১০ কোটি ডলার বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যেখানে প্রতিটি গৃহহীন ব্যক্তির পেছনে শহরের প্রায় ৩৪ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এছাড়া 'প্রজেক্ট হোমকি' ও কাউন্টির ভোটারদের অনুমোদিত 'মেজার এ' সেলস ট্যাক্স থেকে প্রাপ্ত বার্ষিক ১০০ কোটি ডলারসহ সিটি ও কাউন্টি প্রশাসন যৌথভাবে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের বিশাল তহবিল ব্যবহার করছে। তবে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও সংকটের গভীরতা বাড়তে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো। তাদের মতে, প্রশাসনের ব্যর্থতা, সুনির্দিষ্ট রূপরেখার অভাব এবং জবাবদিহিতা না থাকায় বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে, এই ব্যর্থতার দায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ওপর চাপিয়েছেন মেয়র ক্যারেন বাস। মেয়র কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে জ্বালানি, নিত্যপণ্য ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পেয়ে কম আয়ের বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। একই সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর তহবিল ছাঁটাইয়ের ফলে গৃহহীনদের জন্য রক্ষাকবচ দুর্বল হয়ে গেছে। তবে আসন্ন মেয়র নির্বাচনের মুখে লস অ্যাঞ্জেলেসে এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক উত্তাপ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মেয়রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সিটি কাউন্সিল সদস্য নিথিয়া রমন এই অস্থায়ী আশ্রয় ব্যবস্থার সমালোচনা করলেও, তার নিজস্ব বেশ কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার খবরও সম্প্রতি গণমাধ্যমে সামনে এসেছে। এদিকে অঞ্চলটির গৃহহীন ব্যবস্থাপনা সমন্বয়কারী সংস্থা 'লস অ্যাঞ্জেলেস হোমলেস সার্ভিসেস অথরিটি' (LAHSA)-র পরিচালনা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। সাধারণত বছরের শুরুর দিকে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও, এবার ব্যাপক বিলম্বের পর শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফলটি প্রকাশ পেতে যাচ্ছে। এমনকি চরম অনিয়মের অভিযোগে বর্তমানে সংস্থাটির বেশ কিছু প্রস্তাবিত বরাদ্দ স্থগিত রেখেছে মার্কিন নির্দেশক কর্তৃপক্ষ। সার্বিকভাবে, বিশাল বাজেট সত্ত্বেও লস অ্যাঞ্জেলেসে গৃহহীনদের পুনর্বাসনে ইতিবাচক ফল না আসায় নগর প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসীদের নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া আরও ব্যয়বহুল হতে পারে। দেশটির প্রশাসন নাগরিকত্ব আবেদন ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, যা কার্যকর হলে আবেদনকারীদের অতিরিক্ত কয়েকশ ডলার ব্যয় করতে হবে। মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা (USCIS) প্রস্তাবিত বিধিমালায় জানিয়েছে, নাগরিকত্বের জন্য ব্যবহৃত এন-৪০০ (N-400) ফরম কাগজে জমা দিলে আবেদন ফি বর্তমান ৭৬০ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৩০ ডলার হবে। অনলাইনে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ফি ৭১০ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ২৮০ ডলার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে নাগরিকত্ব আবেদনকারীদের ব্যয় গড়ে প্রায় ৫৭০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রস্তাবে নিম্ন আয়ের আবেদনকারীদের জন্য বিদ্যমান ফি মওকুফ এবং ফি কমানোর সুবিধা বাতিলের কথাও বলা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের জন্য এ সুবিধা বহাল থাকবে। তবে এ পরিবর্তন এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এটি একটি প্রস্তাবিত বিধিমালা, যা বাস্তবায়নের আগে জনমত গ্রহণ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। প্রশাসনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব আবেদন যাচাই, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যয়ের পূর্ণ অর্থ জোগান দিতেই ফি বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে। অন্যদিকে অভিবাসন অধিকারকর্মী ও সমালোচকদের দাবি, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে বৈধ অভিবাসীদের জন্য নাগরিকত্ব অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের আবেদনকারীরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব আবেদন ফি তুলনামূলকভাবে এমন পর্যায়ে রাখা হয়েছিল যাতে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দারা নাগরিকত্ব গ্রহণে উৎসাহিত হন। নতুন প্রস্তাব সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তারা মনে করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরোপের সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই এই উদ্যোগ এসেছে। ফলে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে থাকা ‘জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব’ বা বার্থরাইট সিটিজেনশিপের ঐতিহাসিক অধিকার রক্ষা নিয়ে দেশটিতে নতুন করে এক বড় ধরণের আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর প্রথম লাইনেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা প্রাকৃতিক নিয়মে নাগরিকত্ব পাওয়া এবং মার্কিন বিচারব্যবস্থার অধীনস্থ সকল ব্যক্তিই দেশটির পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন। এই নিয়মের অধীনে মা-বাবার পরিচয় বা বংশমর্যাদা যাই হোক না কেন, মার্কিন মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করে। তবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ নির্বাহী আদেশ এই ঐতিহাসিক অধিকারটিকে এক বড় ধরণের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রবিবার (২১ জুন) মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর সাংবিধানিক বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার আইনের অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্ট এই নাগরিকত্ব ধারার সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, আমেরিকার মাটিতে জন্মালে যে কেউ নাগরিক হবেন—এই বিষয়ে সংবিধানে কোনো অস্পষ্টতা বা দ্বিমত নেই। এর কেবল দুটি অত্যন্ত সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে, যা হলো কোনো বিদেশি কূটনীতিকের সন্তান অথবা দেশ আক্রমণকারী কোনো বিদেশি সেনাবাহিনীর সন্তান। এই দুটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সবার ক্ষেত্রেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়মটি শতভাগ প্রযোজ্য। তবে পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে যে, আমেরিকার সাধারণ মানুষ এই বিষয়ে প্রায় সমান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে, নথিপত্রহীন বা অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদেরও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত, পক্ষান্তরে বাকি ৪৯ শতাংশ নাগরিক এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। জনগণের এই মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মাঝেই গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ জারি করেন। সেই আদেশে বলা হয়, ১৪তম সংশোধনীকে কখনই এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি যাতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকেই বিশ্বজনীনভাবে নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে। এই আদেশের মাধ্যমে মূলত দেশটিতে অবৈধভাবে বা সাময়িকভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার পুরোপুরি অস্বীকার করার কথা বলা হয়। এই নিয়ম কার্যকর হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখেরও বেশি শিশু সরাসরি নাগরিকত্বহীনতার সংকটে পড়বে। তবে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত নির্বাহী আদেশটি জারির পরপরই দেশটির একটি নিম্ন আদালত সেটির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা ব্লক আরোপ করে। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন রয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮৫৭ সালে প্রথমবার নাগরিকত্বের এই স্পর্শকাতর বিষয়ে রায় দিয়েছিল, যা ‘ড্রেড স্কট বনাম স্যান্ডফোর্ড’ মামলা নামে পরিচিত। আইনের অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্টের মতে, এটিকে সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক এবং লজ্জাজনক রায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ সেই রায়ে আদালত বলেছিল যে, কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি—তিনি দাস হোন বা মুক্ত—কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারবেন না। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ট্যানি তাঁর রায়ে উগ্র মন্তব্য করে বলেছিলেন, এই নিয়ম পছন্দ না হলে সংবিধান সংশোধন করা হোক। আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর ১৮৬৮ সালে, যখন কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার ও সমতা নিশ্চিত করতে সংবিধানে বিখ্যাত ১৪তম সংশোধনী পাস করা হয়। পুনর্গঠন কংগ্রেসের মূল লক্ষ্যই ছিল ৪০ লাখের বেশি প্রাক্তন দাস ও সকল অভিবাসীর সন্তানদের মার্কিন নাগরিকত্ব দেওয়া। এর প্রায় ৩০ বছর পর ১৮৯৫ সালে ‘ওয়ং কিম আর্ক’ নামের এক মার্কিন বংশোদ্ভূত চীনা নাগরিকের মামলাকে কেন্দ্র করে এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারটি আরও বেশি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। সান ফ্রান্সিসকো শহরে জন্ম নেওয়া ওয়ংকে একবার চীন সফর শেষে পুনরায় আমেরিকায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি আদালতে নিজের নাগরিকত্বের অধিকারের পক্ষে লড়াই করেন এবং তীব্র বর্ণবাদের যুগেও সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পক্ষে রায় দেয়। তবে বর্তমান যুগেও এর কিছু ভিন্নমত রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজার্স স্মিথ মনে করেন, সংবিধানে এই ধারাটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হওয়ায় অনেক বিষয় সেখানে সরাসরি বলা নেই। বিশেষ করে অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের বিষয়ে সংবিধান রচনার সময় স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত স্মিথের এই গবেষণাকেই তাদের আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে স্মিথ নিজে ট্রাম্পের এই কট্টর অভিবাসী বিরোধী কঠোর পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছেন এবং তাঁর গবেষণা বর্ণবাদী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের সিংহভাগ দেশ, বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো ইতিমধ্যেই জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব দেওয়ার এই নিয়ম থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে। ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসে আয়ারল্যান্ড ছিল ইউরোপের সর্বশেষ দেশ, যারা তাদের দেশের ৭৯ শতাংশ জনগণের ভোটের ভিত্তিতে এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। অন্যদিকে, আইনের অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্ট মনে করেন যে, অভিবাসীদের এই দ্রুত নাগরিকত্ব ও অধিকার দেওয়ার কারণেই আমেরিকা আজ অনন্য। তিনি জানান, আমেরিকার ফরচুন ৫০০ কোম্পানির প্রায় অর্ধেকই পরিচালিত হচ্ছে অভিবাসী বা তাদের সন্তানদের দ্বারা। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সাথে দ্বিমত পোষণ করলেও ফ্রস্ট মনে করেন, এই বিতর্কের মাধ্যমে আমেরিকার আদি ও আসল মূল্যবোধ, যা রাজতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষের জন্মগত সমতাকে ধারণ করে, তা নিয়ে পুনরায় নতুন করে ভাবার এক দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর এই কারণে সাংবিধানিক গ্যারান্টির এই ধারাটি আমাদের জাতীয় মূল্যবোধের স্বার্থেই বজায় রাখা উচিত। সূত্র: সিবিএস নিউজ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে থাকা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বা ‘বার্থরাইট সিটিজেনশিপ’ আইনটি বর্তমানে এক নতুন আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী অনুযায়ী, দেশটিতে জন্মগ্রহণকারী বা প্রাকৃতীকৃত যেকোনো ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারির মাধ্যমে এই নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। ট্রাম্পের আদেশে বলা হয়, চতুর্দশ সংশোধনী কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সবার জন্য সর্বজনীনভাবে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলেনি। মূলত অবৈধ বা সাময়িকভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের সন্তানদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করাই এই আদেশের লক্ষ্য, যার ফলে দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ শিশু নাগরিকত্বহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বর্তমানে একটি নিম্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে আদেশটি সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চতুর্দশ সংশোধনীর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক পটভূমি। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্ট জানান, ১৮৫৭ সালের কুখ্যাত ‘ড্রেড স্কট বনাম স্যান্ডফোর্ড’ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল যে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি কখনোই মার্কিন নাগরিক হতে পারবেন না। এই বৈষম্যমূলক ও কলঙ্কজনক রায়ের জবাব দিতেই ১৮৬৮ সালে গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চতুর্দশ সংশোধনী পাস করা হয়, যার মাধ্যমে সাবেক দাস এবং ক্রমবর্ধমান অভিবাসীদের সন্তানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৯৮ সালে ‘ওং কিম আর্ক’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট চীনা বংশোদ্ভূত এক মার্কিনির পক্ষে রায় দিয়ে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকারকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করে। তবে পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন জনগণ বর্তমানে প্রায় সমানভাবে বিভক্ত; ৫০ শতাংশ মানুষ এর পক্ষে এবং ৪৯ শতাংশ বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন তাদের এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজার্স স্মিথের ১৯৮৫ সালের একটি গবেষণার কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে। স্মিথ বিশ্বাস করেন, অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের নাগরিকত্ব সীমিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কংগ্রেসের থাকা উচিত, আদালতের নয়। তবে মজার বিষয় হলো, স্মিথ নিজেই ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান এই উদ্যোগের ঘোর বিরোধী। নিজের গবেষণাকে কট্টর অভিবাসীবিরোধী উদ্দেশ্যে এবং নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করায় তিনি চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, আমেরিকার বাইরের বেশিরভাগ দেশই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের এই নীতি থেকে ক্রমশ সরে আসছে। ইউরোপের সর্বশেষ দেশ হিসেবে আয়ারল্যান্ড ২০০৫ সালে এক গণভোটের মাধ্যমে (৭৯ শতাংশ ভোটে) জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বাতিল করে। এর ফলে দেশটিতে অনেক শিশু রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার মতো জটিলতায় ভোগে, যেমনটি ঘটেছিল নাইজেরীয় অভিবাসীর সন্তান মরিয়ম সোবায়োর ক্ষেত্রে, যিনি আয়ারল্যান্ডে জন্মেও ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত নাগরিকত্বহীন ছিলেন। অধ্যাপক ফ্রস্ট মনে করেন, অভিবাসীদের আপন করে নেওয়ার এই দীর্ঘস্থায়ী নীতিই আমেরিকাকে অনন্য করে তুলেছে। ফরচুন ৫০০ কোম্পানিগুলোর প্রায় অর্ধেকই আজ অভিবাসী বা তাদের সন্তানদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবার সমতা নিশ্চিত করার এই সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করা কখনোই অভিবাসন সমস্যার সঠিক সমাধান হতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা (ইউএসসিআইএস) ফেডারেল আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে শরণার্থী ও অভিবাসনসংক্রান্ত আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াকরণ পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। আদালতের রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। গত শুক্রবার (১২ জুন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইউএসসিআইএস জানায়, রোড আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের প্রভিডেন্সে ফেডারেল আদালতের প্রধান বিচারকের দেওয়া রায়ের সঙ্গে সংস্থাটি একমত না হলেও পরবর্তী বিচারিক পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা আদালতের নির্দেশনা মেনে চলবে। সংস্থাটি আরও জানায়, গত বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত আদালতের আদেশ জারি হওয়ার পর থেকেই ইউএসসিআইএস এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দেশনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। গত সপ্তাহে রোড আইল্যান্ডের প্রধান বিচারক জন ম্যাককনেল এক রায়ে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ৩৯টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন সুবিধা সীমিত করে আইন লঙ্ঘন করেছে। এসব দেশের মধ্যে আফগানিস্তানও রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে একজন আফগান নাগরিকের সঙ্গে জড়িত একটি বন্দুক হামলার ঘটনার পর ট্রাম্প প্রশাসন ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন, ওয়ার্ক পারমিট, গ্রিন কার্ড এবং অন্যান্য অভিবাসন সুবিধার আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত বা বিলম্বিত করেছিল। আদালতের রায়ে বলা হয়, এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও প্রশাসনিক আইনের পরিপন্থী। এর ফলে হাজারো আবেদনকারী দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও সহায়তা কর্মসূচিতে কাজ করা বহু আফগান নাগরিক নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করার পরও তাদের অভিবাসন আবেদন স্থগিত অবস্থায় ছিল। আদালতের নির্দেশনার পর ইউএসসিআইএস জানিয়েছে, পরবর্তী আইনি কার্যক্রম চলমান থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াকরণ পুনরায় শুরু করা হবে। এতে আফগান শরণার্থী, বিশেষ অভিবাসী ভিসা (এসআইভি) সুবিধাভোগী এবং মানবিক সুরক্ষা প্রত্যাশী হাজারো আবেদনকারী কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে কঠোর নিরাপত্তা যাচাই, শরণার্থী গ্রহণ সীমিতকরণ এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত দেশগুলোর নাগরিকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ নাগরিকের জন্য খুলে গেল কানাডার নাগরিকত্ব পাওয়ার এক অভাবনীয় সুযোগ। কানাডার নাগরিকত্ব আইনে বড় ধরনের এক সংশোধনী আনার ফলে এখন থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যারা যুক্তরাষ্ট্রের বসবাস করছেন, তাদের অনেকেই আইনিভাবে কানাডীয় হিসেবে গণ্য হবেন। মূল ঘটনা কী? ২০০৯ সাল থেকে কানাডায় একটি নিয়ম প্রচলিত ছিল যে, দেশের বাইরে জন্ম নেওয়া কোনো কানাডীয় নাগরিকের সন্তান যদি দেশের বাইরেই জন্ম নেয়, তবে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পেত না। একে বলা হতো 'ফার্স্ট জেনারেশন লিমিট'। কিন্তু গত বছর ওন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট এই নিয়মটিকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এই নিয়মটি বৈষম্যমূলক। এরই প্রেক্ষিতে কানাডা সরকার 'বিল সি-৩' পাস করে, যা গত ডিসেম্বরে কার্যকর হতে শুরু করেছে। এই নতুন আইনের আওতায় যারা জন্মসূত্রে কানাডীয় কিন্তু দেশের বাইরে থাকার কারণে নাগরিকত্ব পাননি (যাদের 'লস্ট কানাডিয়ান্স' বলা হয়), তারা এবং তাদের উত্তরসূরিরা এখন নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন। কেন এই আইন গুরুত্বপূর্ণ? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। কয়েক প্রজন্ম আগে যাদের পূর্বপুরুষরা কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়েছিলেন, তারা এখন সহজেই কানাডীয় পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক আমেরিকান একটি 'প্ল্যান বি' বা বিকল্প নাগরিকত্ব হিসেবে কানাডার দিকে ঝুঁকছেন। আবেদন প্রক্রিয়া: ইতিমধ্যেই এই নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য নথিপত্র সংগ্রহের হিড়িক পড়ে গেছে। আবেদনকারীদের প্রমাণ করতে হবে যে তাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি বা তার আগের কোনো প্রজন্মের সরাসরি রক্তসম্পর্কিত কেউ কানাডার নাগরিক ছিলেন। তবে এক্ষেত্রে আবেদনকারীর কানাডার সাথে একটি 'সুদৃঢ় সংযোগ' (Substantial Connection) থাকতে হবে, যার অর্থ হলো আবেদনকারীর অভিভাবককে কানাডায় নির্দিষ্ট সময় (প্রায় ৩ বছর) বসবাসের প্রমাণ দেখাতে হতে পারে। ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টরা জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে আসা আবেদনের হার আগের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। অনেকে কেবল পারিবারিক শেকড়ের টানে নয়, বরং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই কানাডীয় নাগরিকত্ব পেতে আগ্রহী হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানের নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশি নারীদের ভ্রমণ ঠেকাতে নতুন অভিযান শুরু করেছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নামে পরিচিত এই কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় এমন সংগঠিত চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে ভেঙে দেওয়া হবে, যারা গর্ভবতী বিদেশি নারীদের ভিসা আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিতে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দিতে উৎসাহিত করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই এই ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তাদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এক বিবৃতিতে বলেন, নিয়ন্ত্রণহীন এই প্রবণতা করদাতাদের জন্য বড় ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটি দেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়া নিজেই অবৈধ নয়। কিন্তু কেউ যদি ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার বা প্রতারণার মাধ্যমে এই সুবিধা নিতে চায়, তাহলে তা আইনের আওতায় পড়বে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় সংবিধানের একটি সংশোধনীর ভিত্তিতে। তবে এই নিয়ম সীমিত করার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে বলা হয়, যদি শিশুর বাবা-মা কেউই মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা না হন, তাহলে সেই শিশুকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এই আদেশ ইতোমধ্যে একাধিক ফেডারেল আদালত স্থগিত করেছে এবং বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। অভিযান সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই উদ্যোগে মূলত জালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ এবং সংগঠিত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও এ ধরনের ঘটনার নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই। এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ সময়ে প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার নারী এই উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় পরিচালিত এক অভিযানে ‘বার্থ হাউস’ পরিচালনার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়। ওই ঘটনায় এক চীনা নাগরিক দোষ স্বীকার করে কারাদণ্ড ভোগ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ সীমিত করতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। গর্ভবতী নারীদের ভিসা আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিতে সহায়তাকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রয়টার্সের হাতে আসা একটি অভ্যন্তরীণ বার্তা থেকে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা দেশজুড়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ‘জন্ম পর্যটন’ প্রতিরোধে বিশেষভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বিদেশি নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে এনে সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে এমন চক্রগুলো শনাক্ত ও ভেঙে দেওয়া। প্রশাসনের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নবজাতকের জন্য নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার প্রবণতা বাড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ ধরনের কার্যক্রম করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই নাগরিকত্ব পাওয়ার যে নিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে, সেটি সীমিত করার প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন। এ লক্ষ্যে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—বাবা-মায়ের কেউ নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা না হলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ উঠেছে। একাধিক ফেডারেল বিচারক আদেশটি স্থগিত করে দিয়েছেন এবং বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়া নিজেই কোনো অপরাধ নয়। তবে ভিসা জালিয়াতি, প্রতারণা বা তথ্য গোপনের মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জন্ম পর্যটনের প্রকৃত সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও অতীতে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর কয়েক হাজার নারী এই উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেছেন। তবে সামগ্রিক জন্মহারের তুলনায় এই সংখ্যা খুবই সীমিত। এর আগে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘জন্ম নিবাস’ পরিচালনার অভিযোগে একটি চক্রের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, যেখানে বিদেশি নারীদের এই সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই মামলায় কয়েকজন দোষী সাব্যস্তও হন। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বে পাসপোর্টের শক্তিমত্তার বিচারে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হলো উত্তর আমেরিকা। দীর্ঘ কয়েক দশকের আধিপত্য ভেঙে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নীল পাসপোর্টকে পেছনে ফেলে দিয়েছে কানাডিয়ান পাসপোর্ট। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সর্বশেষ ‘হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স’ (Henley Passport Index) অনুযায়ী, বৈশ্বিক ভ্রমণের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কানাডা এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে। র্যাঙ্কিংয়ের চিত্র: সর্বশেষ তথ্যমতে, কানাডিয়ান পাসপোর্ট বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম শক্তিশালী পাসপোর্ট হিসেবে অবস্থান করছে। এই পাসপোর্টের অধিকারীরা বিশ্বের ১৮২টি গন্তব্যে কোনো পূর্ব ভিসা ছাড়াই (ভিসা-মুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল ভিসা) ভ্রমণ করতে পারছেন। অন্যদিকে, এক সময়ের শীর্ষস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট এখন দশম স্থানে নেমে এসেছে, যার মাধ্যমে ১৭৯টি গন্তব্যে ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার মিলছে। কেন এই পরিবর্তন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার সফল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিভিন্ন দেশের সাথে ভিসা অব্যাহতি চুক্তি এই উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে চীনের পক্ষ থেকে কানাডিয়ানদের জন্য ৩০ দিনের ভিসা-মুক্ত সুবিধা প্রদান কানাডাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে, যা এখনো অনেক মার্কিন নাগরিকের জন্য অধরা। আমেরিকানদের জন্য সুখবর: এই র্যাঙ্কিং পরিবর্তনের পাশাপাশি একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বর্তমানে লাখ লাখ আমেরিকান নাগরিক চাইলেই শক্তিশালী কানাডিয়ান পাসপোর্টের মালিক হতে পারেন। কানাডার নতুন নাগরিকত্ব আইন (Bill C-3) অনুযায়ী, বংশসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে পূর্বের ‘প্রথম প্রজন্ম’ বা ফার্স্ট জেনারেশন সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যেসব আমেরিকান নাগরিকের বাবা-মা, দাদা-দাদি বা পূর্বপুরুষ কানাডিয়ান ছিলেন, তারা খুব সহজেই কানাডার নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ার জন্য কোনো পরীক্ষা বা কানাডায় বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই। শুধুমাত্র বংশগত প্রমাণপত্রের মাধ্যমেই তারা এই শক্তিশালী পাসপোর্টটি পেতে পারেন। অতিরিক্ত সুবিধা: কানাডিয়ান পাসপোর্টধারী হলে কেবল ভ্রমণ সুবিধাই নয়, বরং 'ইন্টারন্যাশনাল এক্সপেরিয়েন্স কানাডা' (IEC) প্রোগ্রামের আওতায় তরুণরা বিশ্বের ৩৬টি দেশে কাজ করার সুযোগ পাবেন। যেখানে মার্কিন পাসপোর্টধারীরা মাত্র ৬টি দেশে এই ধরণের সুবিধা পান।বিশ্বজুড়ে সীমান্ত নীতি যখন কঠোর হচ্ছে, তখন কানাডার এই অগ্রগতি দেশটির বৈশ্বিক মর্যাদা ও এর নাগরিকদের অবাধ চলাচলের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করল।
যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশক ধরে চলে আসা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিধান বাতিলের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আইনি লড়াই। বিষয়টি বর্তমানে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনাধীন রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যদি এই আদেশ কার্যকর হয়, তবে নবজাতকদের নাগরিকত্ব প্রমাণ এবং নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় দেশজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা বা ‘চাওস’ সৃষ্টি হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই স্বাক্ষরিত এই বিতর্কিত আদেশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সকল শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাবে না—বিশেষ করে যাদের বাবা-মায়ের বৈধ অভিবাসন মর্যাদা নেই। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ১৮৯৮ সালের ‘ইউনাইটেড স্টেটস বনাম ওং কিম আরক’ মামলার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান আইনি ব্যাখ্যাটি ভুল এবং এটি অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করছে। গত বছরের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ব্রেট কাভানা এই আদেশের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদি জন্ম সনদ (Birth Certificate) নাগরিকত্বের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে আর কাজ না করে, তবে হাসপাতালগুলো নবজাতকদের কীভাবে নথিভুক্ত করবে? ফেডারেল কর্মকর্তারা কীভাবে নিশ্চিত করবেন কে নাগরিক আর কে নয়? বর্তমানে এই আইনি লড়াই ‘বারবারা বনাম ট্রাম্প’ (Barbara v. Trump) মামলার মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী ১ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার মৌখিক যুক্তি উপস্থাপন (Oral Argument) শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং ডেমোক্র্যাট শাসিত অঙ্গরাজ্যগুলো এই আদেশের তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, এটি মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর সরাসরি লঙ্ঘন। নাগরিক অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলোর দাবি, এই নিয়ম কার্যকর হলে কয়েক হাজার শিশু আইনি জটিলতায় পড়বে, যা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করবে। ‘পাবলিক রাইটস প্রজেক্ট’-এর প্রধান জিল হ্যাবিগ বলেন, “এটি মার্কিন নাগরিকত্বের মৌলিক ধারণাকেই বদলে দেবে এবং একটি বিশাল আইনি বিভ্রান্তি তৈরি করবে।” উল্লেখ্য যে, এর আগে বিভিন্ন নিম্ন আদালত ট্রাম্পের এই আদেশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট এখন এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যা ২০২৬ সালের জুন বা জুলাই মাসের মধ্যে আসতে পারে। আদালতের এই রায়ের ওপরই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং শত বছরের পুরনো নাগরিকত্ব আইনের ভাগ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।