ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) শতাধিক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি পাস না হলেও, এই ভোটাভুটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান নীতিগত বিভাজনকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচক হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসি একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ওই প্রস্তাবে ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। ভোটাভুটিতে সংশোধনীটি ৩১৪ ভোটে নাকচ হয়। এর বিপক্ষে ভোট পড়ে ৩১৪টি এবং পক্ষে পড়ে ১০৪টি ভোট। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পক্ষে দেওয়া ১০৪ ভোটের মধ্যে ১০৩ জনই ছিলেন ডেমোক্র্যাট এবং একজন ছিলেন রিপাবলিকান সদস্য। অন্যদিকে ৯৮ জন ডেমোক্র্যাট প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেন এবং ১০ জন ভোটদানে বিরত থাকেন। এই ফলাফল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ইসরায়েল নীতি নিয়ে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট করেছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেও ভিন্ন অবস্থান দেখা গেছে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিস এবং পিট অ্যাগুইলার সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দেন। তবে দলের হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়ে আলোচনার জন্ম দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। মাত্র দুই বছর আগে একই ধরনের একটি প্রস্তাবে ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন মাত্র ৩৭ জন ডেমোক্র্যাট। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে ১০৩-এ পৌঁছেছে। ভোটের পর কংগ্রেসনাল প্রোগ্রেসিভ ককাসের চেয়ারম্যান গ্রেগ ক্যাসার বলেন, প্রথমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলের কাছে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা পাঠানোর পক্ষে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার দাবি, এই ভোট ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তার ভাষায়, যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নিঃশর্ত সমর্থনের সময় শেষ হয়ে আসছে এবং এই ভোট ভবিষ্যতের মার্কিন নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ক্যাথরিন ক্লার্ক বলেছেন, রিপাবলিকানদের আনা সংশোধনীটি তার দৃষ্টিতে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। কারণ এতে গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তাও বন্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও মূল্যবোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সামরিক সহায়তা পুনর্বিবেচনার বার্তা দিতেই প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে ভোটদানে বিরত থাকা ডেমোক্র্যাট সদস্য জ্যারেড হাফম্যান বলেন, ডেমোক্র্যাটদের একটি বড় অংশের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দলের অভ্যন্তরে বিভাজন আরও গভীর না করতে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ভোট নির্দেশনা বা 'হুইপ' জারি করেনি। ফলে সদস্যরা নিজ নিজ বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। বিশ্লেষকদের মতে, সংশোধনীটি পাস না হলেও এই ভোটাভুটি মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অবস্থানের পরিবর্তনশীল চিত্রকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। আগামী দিনে এ ইস্যুতে কংগ্রেসে আরও বিতর্ক এবং নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সূত্র: সিএনএন ও আল-জাজিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মেরিল্যান্ডে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন। তবে বক্তব্য শেষ হওয়ার পর মঞ্চ ছাড়ার পথ খুঁজতে গিয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শনিবার বাল্টিমোরের কাছে হ্যানোভারের লাইভ! ক্যাসিনো অ্যান্ড হোটেলে আয়োজিত মেরিল্যান্ড ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ‘ফাইট ব্যাক অ্যান্ড উইন’ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ৮৩ বছর বয়সী বাইডেন। বক্তব্যে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেন। বাইডেন অভিযোগ করেন, ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে ন্যাটোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি হোয়াইট হাউসে নতুন বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনাকে তিনি ‘ব্যক্তিগত অহমিকার প্রকল্প’ বলে মন্তব্য করেন। বক্তৃতার শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার কথা তুলে ধরেন বাইডেন। এরপর মঞ্চ ছাড়তে গিয়ে তিনি একপাশে তাকিয়ে দিকনির্দেশনা চান। পরে দুই দিকেই ইশারা করে কোন পথে নামবেন তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। সঠিক পথ বুঝে নেওয়ার পর দর্শকদের দিকে পিঠ রেখে মঞ্চ ত্যাগ করেন। এর কয়েকদিন আগেই শিকাগোতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন বাইডেন। ওই অনুষ্ঠানেও সমাপ্তির সময় তাকে কিছুটা বিভ্রান্ত দেখা যায়। সে সময় তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের নাতনিকে খুঁজছিলেন। পরে সাবেক ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন তাকে পথ দেখান। শনিবারের বক্তব্যে বাইডেন টেলিপ্রম্পটার ব্যবহার করেন। বক্তব্যের সময় কয়েকবার কাশি দিতেও দেখা যায় তাকে। তিনি দাবি করেন, তার প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান সময়ের তুলনায় ভালো ছিল। ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বাইডেন বলেন, তিনি হোয়াইট হাউসে ফিরে এসে বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রকল্প বাস্তবায়নে মনোযোগ দিচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইংয়ে বলরুম নির্মাণ, কেনেডি সেন্টারে নিজের নাম যুক্ত করা এবং ন্যাশনাল মলের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন তিনি। বাইডেন আরও অভিযোগ করেন, হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর ট্রাম্প বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন এবং এ বিষয়ে তার কোনো লজ্জাবোধ নেই। এর আগে প্রেসিডেন্ট থাকাকালেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ও জনসমাবেশে মঞ্চে চলাফেরা বা দিকনির্দেশনা নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কয়েকটি ঘটনা আলোচনায় এসেছিল। বর্তমানে বাইডেন স্টেজ-৪ প্রোস্টেট ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্যদিকে সাবেক ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন তার নতুন বইয়ের প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছেন। বইটিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিতর্কে বাইডেনের পারফরম্যান্স দেখে প্রথমে তার মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন।
নিউইয়র্কের রাজনীতি অনেক কিছু দেখেছে- তামানি হলের দিন, রুজভেল্টের নিউ ডিল, কেনেডি যুগের উদারপন্থা, কুওমো পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাব, এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থানের অভিঘাতও। কিন্তু মঙ্গলবারের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি নির্বাচনের ফলাফল যে বার্তা দিয়েছে, তা কেবল কয়েকটি আসনের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রজন্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত। রাজনীতিতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নির্বাচনের ফলাফল সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। এবারের নির্বাচন তেমনই একটি মুহূর্ত। কয়েক বছর আগেও নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতির সমীকরণ ছিল মোটামুটি নির্ধারিত। দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব যাকে সমর্থন দিত, বড় অর্থদাতা, ইউনিয়ন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং দলীয় সংগঠনের সমর্থন নিয়ে তিনি এগিয়ে থাকতেন। কিন্তু মঙ্গলবারের ফলাফল দেখিয়েছে, সেই পুরোনো সমীকরণ আর আগের মতো কার্যকর নয়। মেয়র জোহরান মামদানির রাজনৈতিক প্রভাব এখন আর শুধু সিটি হলের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সমর্থিত প্রার্থীদের ধারাবাহিক সাফল্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নিউইয়র্কে নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটছে। এটি শুধু একজন জনপ্রিয় নেতার ব্যক্তিগত প্রভাব নয়; বরং এমন একটি আদর্শিক প্রবাহ, যা তরুণ ভোটার, শ্রমজীবী মানুষ, অভিবাসী সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিকভাবে হতাশ অনেক নাগরিককে একত্রিত করছে। ব্র্যাড ল্যান্ডারের জয়, ক্লেয়ার ভালদেজের বিজয় কিংবা দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ারের উত্থান—প্রতিটি ফলাফলের মধ্যে একটি সাধারণ বার্তা রয়েছে। ভোটারদের একটি অংশ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে নয়, বরং স্থবিরতার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মূলধারার নেতৃত্ব ধরে নিয়েছিল যে ট্রাম্পবিরোধিতা নিজেই একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা। তবে নিউইয়র্কের ভোটারদের একটি অংশ যেন এবার জানিয়ে দিয়েছে, শুধু ট্রাম্পের বিরোধিতা যথেষ্ট নয়; নিজেদের পক্ষেও স্পষ্ট অবস্থান থাকতে হবে। বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, গাজা যুদ্ধ এবং আয় বৈষম্যের মতো প্রশ্নে তারা আরও নির্দিষ্ট উত্তর চায়। এখানেই মামদানির রাজনীতির শক্তি। তিনি এমন ভাষায় কথা বলেন, যা প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তব্যের তুলনায় অনেক বেশি সরাসরি। তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি সমস্যাগুলোকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পিছপা হন না। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, তাঁর কিছু অবস্থান অতিরিক্ত আদর্শিক। তবে উভয় পক্ষই একমত যে তিনি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা গেছে ডেমোক্র্যাটিক প্রতিষ্ঠানের কাছে। হাকিম জেফ্রিস, ক্যাথি হকুলসহ দলের মূলধারার নেতারা এখনো শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থানে রয়েছেন। কিন্তু মঙ্গলবারের ফলাফল দেখিয়েছে, তাদের সমর্থন আর আগের মতো নিরঙ্কুশ নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পছন্দের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে; বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। নিউইয়র্কের রাজনীতিতে গাজা ইস্যুর প্রভাবও এবারের নির্বাচনে দৃশ্যমান হয়েছে। একসময় বিদেশনীতি স্থানীয় নির্বাচনে খুব বেশি গুরুত্ব পেত না। কিন্তু আজকের নিউইয়র্কে অভিবাসী, মুসলিম, আরব, লাতিনো এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। গাজা নিয়ে প্রার্থীদের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। তবে এই ফলাফলকে শুধুমাত্র মতাদর্শিক বিজয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে সাংগঠনিক রাজনীতিরও সাফল্য। মামদানির সমর্থকেরা শুধু সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন না; তারা মাঠে নেমে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন, ফোন ব্যাংকিং করেছেন, স্বেচ্ছাসেবক সংগঠিত করেছেন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়িয়েছেন। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রে ভোট গণনা হয়, সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট নয়। বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির জন্যও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। নিউইয়র্কের রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব কম থাকার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। সেই অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি থাকলেও রাজনৈতিক শক্তি শুধু জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। সংগঠন, ধারাবাহিক অংশগ্রহণ এবং ভোটদানের মাধ্যমেই রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয়। যেসব সম্প্রদায় আজ প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছেছে, তারা দীর্ঘ সময় ধরে ভোটার সংগঠিত করেছে, নেতৃত্ব তৈরি করেছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থেকেছে। পিয়া রহমানের মতো বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রার্থীর পরাজয় অনেকের জন্য হতাশাজনক হতে পারে। তবে রাজনৈতিক সাফল্য খুব কম ক্ষেত্রেই প্রথম প্রচেষ্টায় আসে। প্রতিনিধিত্বের পথ সাধারণত দীর্ঘ, ধৈর্য ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। সবশেষে, মঙ্গলবারের নির্বাচন একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেছে। মামদানির ঢেউ কি সাময়িক, নাকি এটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যতের ইঙ্গিত? ইতিহাস বলে, বিদ্রোহী আন্দোলন ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছালে তার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা শুরু হয়। প্রতিবাদ করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু শাসন করা কঠিন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু বাজেট পাস করা কঠিন। আন্দোলন গড়ে তোলা সহজ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জোট ধরে রাখা কঠিন। মামদানি এবং তাঁর সমর্থিত প্রার্থীরা এখন সেই কঠিন পথের শুরুতে দাঁড়িয়ে আছেন। মঙ্গলবার তারা নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। কিন্তু আগামী দিনগুলোতে তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা শুধু পরিবর্তনের প্রতীক নন, পরিবর্তন বাস্তবায়নের সক্ষমতাও রাখেন। নিউইয়র্কের ভোটাররা তাদের জন্য একটি দরজা খুলে দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, নতুন প্রজন্ম সেই দরজা দিয়ে ইতিহাসের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনের আগে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা চলছে। সোমবার প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে শেষবারের মতো নিজেদের বার্তা পৌঁছে দেন। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে দলটির ভেতরে প্রগতিশীল বামপন্থী ধারা এবং প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনটি নিউইয়র্ক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র যোরান মামদানির রাজনৈতিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। তরুণ ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট নেতা মামদানি গত বছর যে জনসমর্থন তৈরি করেছিলেন, তা এবার কংগ্রেস নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েই রাজনৈতিক মহলে নজর রয়েছে। তিনি তার সমর্থিত তিনজন হাউস প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় প্রচারণা চালিয়েছেন এবং একাধিক প্রচারণামূলক ভিডিওতে অংশ নিয়েছেন। গত সপ্তাহে তিনি সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে এক সমাবেশেও অংশ নেন। প্রচারণায় মামদানি বলেন, “অতীতের দল ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে পারবে না। আমাদের এমন একটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টি দরকার, যার মেরুদণ্ড আছে।” অন্যদিকে ম্যানহাটনের একটি আসনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির নাতি জ্যাক শ্লসবার্গ প্রার্থী হয়েছেন। পারিবারিক পরিচিতি এবং সামাজিকমাধ্যমে জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা হলেন স্টেট অ্যাসেম্বলি সদস্য অ্যালেক্স বোরিস, মাইকা ল্যাশার এবং আইনজীবী জর্জ কর্নওয়ে। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় শ্লসবার্গ সাবেক টক শো উপস্থাপক ডেভিড লেটারম্যানের সঙ্গে সমাবেশ করেন এবং তার মা ক্যারোলিন কেনেডি তার পক্ষে নির্বাচনী বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। অন্যদিকে মামদানি এখনো এই আসনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেননি। তিনি আরও তিনটি কংগ্রেস আসনের প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন, যার মধ্যে দুটি বর্তমান ডেমোক্র্যাট সদস্যের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর মধ্যে ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ারের সঙ্গে আদ্রিয়ানো এসপায়াতের এবং সাবেক নিউইয়র্ক সিটি কম্পট্রোলার ব্র্যাড লেন্ডারের সঙ্গে ড্যান গোল্ডম্যানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। আরেকটি আসনে ক্লেয়ার ভালদেজ ব্রুকলিন বরো প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও রেইনোসোর বিরুদ্ধে লড়ছেন। ভালদেজ নিজেকে মামদানির ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যদিও রেইনোসোও প্রগতিশীল অবস্থান থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রাইমারি নির্বাচন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিউ জার্সির ইলিভেন্থ ডিস্ট্রিক্ট কংগ্রেসনাল আসনের উপনির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন উদারপন্থী ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী অ্যানালিলিয়া মেহিয়া। রিপাবলিকান প্রার্থী জো হ্যাথাওয়েকে পরাজিত করে তিনি এই জয় ছিনিয়ে নেন। নিউ জার্সির বর্তমান গভর্নর মিকি শেরিল নিয়ম অনুযায়ী কংগ্রেস সদস্যের পদ ত্যাগ করার পর এই আসনটি শূন্য হয়েছিল। ভোট শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস মেহিয়াকে বিজয়ী ঘোষণা করে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রাইমারি নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই মেহিয়া এই নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বের ওপর একটি ‘পরীক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করে আসছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি রিপাবলিকানদের নীতির সমালোচনা করে স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানি খাতে সাধারণ মানুষের কর সুবিধা কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। মেহিয়ার এই লড়াইয়ে তাঁর পাশে ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিক ও স্বতন্ত্র সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। বিশ্লেষকদের মতে, একসময় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয় মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সফলতাকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে নিউ জার্সির ইলিভেন্থ ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।