যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কাউন্টিতে পৃথক দুটি অভিযানে দুটি যানবাহনের ভেতর লুকিয়ে থাকা মোট ৩৪ জন অভিবাসীকে আটক করেছে মার্কিন সীমান্ত টহল বাহিনী (ইউএস বর্ডার প্যাট্রোল)। মার্কিন সংবাদমাধ্যম FOX 5/KUSI–এর প্রতিবেদন এবং ইউএস বর্ডার প্যাট্রোলের এল সেন্ট্রো সেক্টর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাগুলো ঘটেছে ইম্পেরিয়াল কাউন্টির ওয়েস্টমোরল্যান্ড এলাকায়, যা হাইওয়ে–৭৮–এর পাশে অবস্থিত। সীমান্ত টহল বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, প্রথম অভিযানে একটি শেভ্রোলেট তাহো (Chevy Tahoe) এসইউভি থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। গাড়িটির ভেতরে সাতজন অভিবাসীকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এটি একটি মানবপাচারের প্রচেষ্টা বলে সন্দেহ করছে কর্তৃপক্ষ। একই এলাকায় পরিচালিত আরেকটি অভিযানে একটি মিনি বটম ডাম্প ট্রেইলার থেকে আরও ২৭ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়। ট্রেইলারের ভেতরে তাদের গোপনে বহন করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে সীমান্ত টহল বাহিনী। দুটি অভিযানে মোট ৩৪ জন অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। তবে তাদের জাতীয়তা, পরিচয়, স্বাস্থ্যগত অবস্থা কিংবা মানবপাচারের অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। এল সেন্ট্রো সেক্টর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, সীমান্ত এলাকায় মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অতিরিক্ত ভিড় করে বা গোপনে যানবাহনে মানুষ পরিবহন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে যাত্রীদের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। ইম্পেরিয়াল কাউন্টি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এ অঞ্চল দিয়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা এবং মানবপাচারের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এসব কর্মকাণ্ড ঠেকাতে মার্কিন সীমান্ত টহল বাহিনী নিয়মিত তল্লাশি ও নজরদারি পরিচালনা করে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিবাসন আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশজুড়ে বিদেশিবিরোধী প্রচারণা ও সহিংসতার আশঙ্কার মধ্যে বহু অভিবাসী নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকেই সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন। জোহানেসবার্গের উপকণ্ঠে বসবাসকারী মালাউইয়ের নাগরিক কাউঙ্গা নিয়ারেন্ডা জানান, দুই ব্যক্তি তাকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, “এখনই দেশ ছাড়ো, না হলে কফিনে ফিরতে হবে।” তিনি বলেন, “তারা জানতে চেয়েছিল আমি কবে দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ব। বলেছে, ৩০ জুনের পর এখানে আমাদের আর প্রয়োজন নেই। যদি না যাই, তাহলে জীবিত নয়, কফিনে করেই ফিরতে হবে।” বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলন। এর মধ্যে ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ এবং ‘অপারেশন দুদুলা’ সবচেয়ে সক্রিয়। এসব গোষ্ঠীর অভিযোগ, বিদেশিরা দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে, অপরাধ বাড়াচ্ছে এবং জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তারা ৩০ জুনের মধ্যে নথিবিহীন অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার আহ্বান জানায় এবং এরপর গণবিক্ষোভের কর্মসূচিও ঘোষণা করে। অপারেশন দুদুলা বিদেশিদের মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা, পরিচয়পত্র যাচাই এবং বিদেশিদের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আগেও সমালোচিত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ৩০ জুনের তথাকথিত ‘ডেডলাইন’কে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেছেন, বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামলা সরকারের নীতির প্রতিফলন নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, পদযাত্রা বা অন্য কোনো উপায়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না। তিনি আরও বলেন, অনিয়মিত অভিবাসন জনসেবা ও শ্রমবাজারে চাপ সৃষ্টি করলেও দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য অভিবাসীদের বলির পাঁঠা বানানো উচিত নয়। পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় বিদেশিদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। মোসেল বেতে সহিংসতায় দুই মোজাম্বিক নাগরিক নিহত হন এবং ৫০টির বেশি ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। মোজাম্বিক সরকারের দাবি, বিদেশিবিদ্বেষী হামলায় তাদের মোট পাঁচ নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পিটারমারিৎজবার্গে গণপিটুনিতে এক মালাউই নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাও তদন্ত করছে পুলিশ। হামলার আশঙ্কায় শত শত অভিবাসী গির্জা ও মসজিদে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম। দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে মালাউই, জিম্বাবুয়ে, ঘানা ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ১৩ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিক হয় স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে গেছেন, নয়তো তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশিবিদ্বেষী সহিংসতা নতুন নয়। ২০০৮ সালের দাঙ্গায় অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০১৫ ও ২০১৯ সালেও একই ধরনের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। বর্তমানে দেশটিতে বেকারত্বের হার প্রায় ৩২ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। তবে গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো থেকে আসা কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসীরা। কারণ কম মজুরিতে কাজ করায় নিয়োগকর্তারা তাদের বেশি নিয়োগ দেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। ১৬ বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী মালাউইয়ের নাগরিক নিয়ারেন্ডা এখন দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার প্রশ্ন, “যারা প্রকৃত অর্থে দেশের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের ছেড়ে কেন আমাদের মতো দরিদ্র আফ্রিকানদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে?”
যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা (টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বা টিপিএস) নিয়ে বসবাসকারী অভিবাসীদের স্থায়ীভাবে বৈধ থাকার ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যথায় নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের (ডিএইচএস) প্রধান মার্কওয়েন মুলিন। রোববার সিএনএনের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, টিপিএস কোনো স্থায়ী অভিবাসন মর্যাদা নয়। তাই যাঁরা এই কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন, তাঁদের উচিত স্থায়ী আবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় আবেদন করা। অন্যথায় সরকার তাঁদের নিজ দেশে ফিরে যেতে সহায়তা করবে। মুলিন বলেন, "যাঁরা স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে চান, তাঁরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করুন। আর যদি তা না করেন, তাহলে আমরা আপনাকে নিজ দেশে ফিরে যেতে সহায়তা করব।" তিনি আরও জানান, স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য বিমান টিকিটের পাশাপাশি পুনর্বাসনের প্রাথমিক ব্যয় মেটাতে প্রায় ২ হাজার ১০০ মার্কিন ডলার দেওয়া হবে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে হাইতি ও সিরিয়ার নাগরিকদের জন্য দেওয়া টিপিএস সুবিধা বাতিলের সুযোগ করে দেয়। এর ফলে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার হাইতির এবং প্রায় ৬ হাজার সিরীয় নাগরিক ভবিষ্যতে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়েছেন। টিপিএস কর্মসূচির আওতায় যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো বড় মানবিক সংকট থেকে পালিয়ে আসা বিদেশি নাগরিকদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। ২০১০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর হাইতির নাগরিকদের এবং ২০১২ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সিরিয়ার নাগরিকদের এই সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তবে টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো হাইতি ও সিরিয়ায় ভ্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি রেখেছে। দুই দেশেই সহিংসতা, সংঘাত, সন্ত্রাসী তৎপরতা, অপহরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে নাগরিকদের সেখানে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর অভিবাসী অধিকারকর্মী ও হাইতিয়ান সম্প্রদায়ের নেতারা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, বহু মানুষ বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করছেন। হঠাৎ করে সুরক্ষা তুলে নেওয়া হলে তাঁদের পরিবার, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। ওহাইও অঙ্গরাজ্যের স্প্রিংফিল্ড শহরে বসবাসকারী হাইতিয়ানরাও এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অভিবাসীরা বলছেন, গত এক দশকে হাইতিয়ান সম্প্রদায় শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন টিপিএস বাতিল হলে অনেক পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা শুধু ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকেই আসেনি। রিপাবলিকান দলের কয়েকজন নেতাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ওহাইওর গভর্নর মাইক ডিওয়াইন এক বিবৃতিতে বলেন, বর্তমান হাইতির পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দৌরাত্ম্য, দুর্বল সরকারি ব্যবস্থা এবং ভেঙে পড়া অর্থনীতির কারণে এখনই মানুষকে ফেরত পাঠানো যুক্তিযুক্ত হবে না। নিউইয়র্কের কংগ্রেসম্যান মাইক ললার এবং নেব্রাস্কার কংগ্রেসম্যান ডন বেকনও হাইতির নাগরিকদের জন্য টিপিএসের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। বর্তমানে ১৭টি দেশের প্রায় ১৭ লাখ মানুষ টিপিএস কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, ট্রাম্প প্রশাসন ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর টিপিএস সুবিধাও বাতিলের উদ্যোগ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১৯৯০ সালে চালু হওয়া এই মানবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা অভিবাসীদেরও গ্রেপ্তার করার পর জামিনের কোনো সুযোগ না দিয়ে আটকে রাখার অনুমতি চেয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার প্রকাশ্যে আসা এক আইনি নথিতে দেখা যায়, প্রশাসন একটি ফেডারেল আপিল আদালতের গত মে মাসের সিদ্ধান্ত বাতিল করার আবেদন জানিয়েছে। মে মাসের ওই রায়ে কয়েক দশকের পুরোনো অভিবাসন আইনের যে নতুন ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে বর্তমান প্রশাসনের 'গণ-আটক নীতি' পরিচালিত হচ্ছে, তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ৬-৩ রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চ অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে দুটি বড় আইনি জয় এনে দেয়। এর মধ্যে লাখ লাখ হাইতিয়ান ও সিরীয় অভিবাসীর নির্বাসন ঠেকানোর সুরক্ষা প্রত্যাহার করার অনুমতিও ছিল। ওই রায়ের ঠিক আগেই চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে সুপ্রিম কোর্টে এই আপিলটি দায়ের করেছিল প্রশাসন। সিনসিনাটি-ভিত্তিক ষষ্ঠ ইউএস সার্কিট কোর্ট অব আপিলস-এর ২-১ প্যানেলের দেওয়া রায় পর্যালোচনার জন্যই এই আবেদন জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, শত শত নিম্ন আদালতের বিচারকদের পাশাপাশি যে তিনটি আপিল আদালত প্রশাসনের এই বিনা জামিনে আটক রাখার নীতির বিরোধিতা করেছে, ষষ্ঠ সার্কিট কোর্ট তার মধ্যে অন্যতম। তবে আরও দুটি আপিল আদালত প্রশাসনের এই নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মার্কিন সলিসিটর জেনারেল ডি. জন সয়ার এই বিষয়টি উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি জানান, 'অভিবাসন আইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নটির' কারণে আটকে থাকা ব্যক্তিরা হাজার হাজার মামলা দায়ের করছেন, যার দ্রুত মীমাংসা প্রয়োজন। এক পিটিশনে সয়ার যুক্তি দিয়ে বলেন, অবৈধভাবে প্রবেশের পর যেসব বিদেশি নাগরিক দেশে বসবাস করছেন, তাদের অপসারণ প্রক্রিয়ার সময় আটকে রাখলে তারা শুনানির সময় পালাতে পারবেন না এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের অপসারণ নিশ্চিত করা সহজ হবে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত অভিবাসন আইনের ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে গত বছর মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট (ডিএইচএস) একটি নতুন অবস্থান গ্রহণ করে। তারা জানায়, কেবল সীমান্তে পৌঁছানো ব্যক্তিরাই নন, বরং আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনাগরিকরাও 'প্রবেশের আবেদনকারী' (applicants for admission) হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং বাধ্যতামূলক আটকের আওতাধীন থাকবেন। কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে 'প্রবেশের আবেদনকারী' ব্যক্তিরা অভিবাসন আদালতে তাদের মামলার কার্যক্রম চলাকালীন বাধ্যতামূলকভাবে আটক থাকবেন এবং তারা জামিন শুনানির জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। বিচার বিভাগের অধীনস্থ 'বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিলস' গত সেপ্টেম্বরে একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই ব্যাখ্যাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে, যার ফলে দেশজুড়ে অভিবাসন বিচারকরা বাধ্যতামূলক আটকের নির্দেশ দেওয়া শুরু করেন। ষষ্ঠ সার্কিট কোর্টের রায়টি মূলত মিশিগানের কিছু মামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছিল। মেক্সিকো, এল সালভাদর, ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া এবং গুয়াতেমালার ওই নাগরিকরা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) বা কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)-এর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। ষষ্ঠ সার্কিট কোর্ট তাদের রায়ে জানায়, প্রশাসন ১৯৯৬ সালের 'ইলিগ্যাল ইমিগ্রেশন রিফর্ম অ্যান্ড ইমিগ্র্যান্ট রেসপনসিবিলিটি অ্যাক্ট'-এর একটি ধারার অপব্যাখ্যা করেছে। আদালত আরও উল্লেখ করে যে, জামিন শুনানি থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে ওই অভিবাসীদের মার্কিন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর অধীনে থাকা আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার বা 'ডিউ প্রসেস' চরমভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে দেশটিতে অস্থায়ী সুরক্ষা কর্মসূচি (টেম্পোরারি প্রোটেকটেড স্ট্যাটাস বা টিপিএস) বাতিলের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আরও জোরালো হয়েছে। এই রায়ের ফলে হাইতি ও সিরিয়ার হাজারো অভিবাসী তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা, হন্ডুরাসসহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকদের টিপিএস সুবিধা বাতিলের পথও সহজ হয়ে গেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৩ লাখ অভিবাসী এই সিদ্ধান্তের প্রভাবের মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ৬-৩ ভোটের রায়ে মুলিন বনাম ডো (Mullin v. Doe) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেন, টিপিএস প্রদান বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত মূলত প্রেসিডেন্টের এখতিয়ার। এ ধরনের সিদ্ধান্তে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ খুবই সীমিত। এর মাধ্যমে নিম্ন আদালতের সেইসব আদেশও বাতিল হয়ে যায়, যেগুলো ট্রাম্প প্রশাসনকে টিপিএস বাতিলে বাধা দিয়েছিল। বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে বলেন, ১৯৯০ সালে কংগ্রেস যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য সংকটের কারণে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরতে না পারা বিদেশি নাগরিকদের সাময়িক মানবিক সুরক্ষা দিতে টিপিএস চালু করেছিল। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই সাময়িক সুবিধা কয়েক দশক ধরে বহাল ছিল, যা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রায়ে আরও বলা হয়, হাইতির নাগরিকদের ২০১০ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর টিপিএস দেওয়া হয়েছিল। আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুক্তিও গ্রহণ করেন যে, হাইতির টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্ত বর্ণবৈষম্যের কারণে নয়, বরং নীতিগত কারণে নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে টিপিএস সুবিধাভোগী প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার হাইতির নাগরিক এবং প্রায় ৪ হাজার সিরিয়ান নাগরিক বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, যদি তাদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অন্য কোনো বৈধ অভিবাসন মর্যাদা না থাকে। অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রায়টির প্রভাব শুধু হাইতি ও সিরিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভেনেজুয়েলা, হন্ডুরাসসহ আরও কয়েকটি দেশের টিপিএস বাতিলের প্রচেষ্টাও এখন আইনি বাধা ছাড়াই এগিয়ে নিতে পারবে ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমানে ১৭টি দেশের প্রায় ১৩ লাখ মানুষ টিপিএস কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। বিশেষ করে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে। সেখানে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টিপিএসধারী বাস করেন। তাদের অনেকেই বৈধভাবে চাকরি করছেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তবে সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হননি বিচারপতি এলেনা কাগান। বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র ও কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসনকে সঙ্গে নিয়ে দেওয়া ভিন্নমত পোষণকারী রায়ে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুরক্ষা দুর্বল করেছে এবং টিপিএস বাতিলের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক বিবেচনার অভিযোগ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশের টিপিএস বাতিল করেছে বা বাতিলের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। প্রশাসনের দাবি, সংকট মোকাবিলায় অস্থায়ী সহায়তা দেওয়ার জন্য চালু হওয়া এই কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী সুবিধায় পরিণত হয়েছে, যা আইন প্রণেতাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল না। অন্যদিকে অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, অনেক মানুষ বৈধভাবে কাজ করার অধিকার হারাবেন এবং এমন দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন, যেখানে এখনো নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোরও উদ্বেগ রয়েছে। কারণ টিপিএস সুবিধাভোগীদের বড় একটি অংশ স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, খাদ্য সরবরাহ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মরত। আন্তর্জাতিক শরণার্থী সহায়তা প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হুসেইন এলবাকরি বলেন, টিপিএসধারীদের মধ্যে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষক, নির্মাণশ্রমিক, খাদ্যসেবা কর্মী এবং হোম হেলথ কেয়ার কর্মীর মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী রয়েছেন। তাদের হারালে শ্রমবাজারে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরেকটি বড় আইনি সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে একই দিনে আদালত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য প্রশাসনের 'ওয়েট ইন মেক্সিকো' নীতিও বহাল রাখার সুযোগ দেয়। তবে আদালতের এই সিদ্ধান্তের পরও টিপিএস কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক যে দ্রুত শেষ হচ্ছে না, তা স্পষ্ট। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসীদের সহায়তায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে সিরীয় ও হাইতিয়ান অভিবাসীদের অস্থায়ী আইনি সুরক্ষা (টিপিএস) বাতিলের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে সবুজ সংকেত দিয়েছে। বৃহস্পতিবার দেওয়া ৬-৩ ব্যবধানের এই বিভক্ত রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ পাওয়া প্রায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার সিরীয় এবং হাইতিয়ান নাগরিক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়লেন। এর আগে নিম্ন আদালত সরকারের এই সুরক্ষা কর্মসূচি বাতিলের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় বাতিল করে জানিয়েছে, অস্থায়ী নির্বাসন সুরক্ষা বাতিলের এই সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমে স্থগিত করার কোনো অধিকার সিরিয়া ও হাইতির অভিবাসীদের নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে রায় লিখতে গিয়ে বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো জানান, টিপিএস আইনের আওতায় অসাংবিধানিক দাবির বিচারিক পর্যালোচনার কোনো সুযোগ নেই। এই রায়ের ফলে অভিবাসী ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে সরকারের টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং ফেডারেল আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ল। তাছাড়া, হাইতির নাগরিকদের ক্ষেত্রে বর্ণবাদের অভিযোগ এনে সমান সুরক্ষার যে দাবি করা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চ সেটিও নাকচ করে দিয়েছে। বিচারপতি আলিটো উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রশাসন মূলত টিপিএস কর্মসূচির পূর্ববর্তী বাস্তবায়নের বিরোধী, যা সম্পূর্ণ বর্ণ-নিরপেক্ষ একটি যৌক্তিক আইনি অবস্থান। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে টিপিএস সুবিধা পাওয়া ১৭টি দেশের ১০ লক্ষাধিক অভিবাসীর ওপর। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে ১৩টি দেশের অভিবাসীদের আইনি সুরক্ষা বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে, যার ফলে তাদের কাজের বৈধতা হারানোসহ গ্রেফতার ও বিতাড়নের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বিচারপতি সোনিয়া সোটোমায়র এবং কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসনের সমর্থন নিয়ে ভিন্নমত পোষণকারী বিচারপতি এলেনা কাগান তার পর্যবেক্ষণে বলেন, বাদীরা আজকের এই রায়ের চেয়ে আরও ন্যায্য বিচার প্রাপ্য ছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, নিম্ন আদালতে আইনি লড়াই চলাকালীন এই সিদ্ধান্তের কারণে লাখো মানুষের জীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। হোয়াইট হাউস সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, অস্থায়ী সুরক্ষিত মর্যাদা যে কেবলই অস্থায়ী, এটি তারই প্রমাণ। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন জানান, এটি কখনোই স্থায়ী নাগরিকত্ব বা বৈধ বসবাসের পথ হিসেবে তৈরি করা হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণভাবে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারির এখতিয়ারভুক্ত। অন্যদিকে সিরীয় অভিবাসীদের পক্ষে আইনি লড়াই করা ইউসিএলএ-এর আইনের অধ্যাপক আহিলান অরুলানান্থাম এই রায়ের কড়া সমালোচনা করে মার্কিন কংগ্রেসকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, টিপিএস বাতিল হলে আমাদের সমাজের লাখো মানুষ চরম সংকটে থাকা নিজ দেশগুলোতে ফেরত পাঠানোর মতো অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হবেন। ২০১২ সালে বাশার আল-আসাদের দমনপীড়নের পর সিরিয়া এবং ২০১০ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর হাইতি প্রথম টিপিএস সুবিধা পেয়েছিল। তবে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম জানান, এই দেশ দুটি আর টিপিএস-এর মানদণ্ড পূরণ করে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় হাইতিয়ান অভিবাসীদের নিয়ে নানা ভিত্তিহীন ও বিতর্কিত মন্তব্য করলেও, প্রশাসন বর্ণবাদের কোনো উদ্দেশ্য থাকার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। ২০২৫ সালে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ট্রাম্প অভিবাসন ব্যবস্থা কঠোর করতে ব্যাপক পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যার মধ্যে ভেনিজুয়েলার নাগরিকদের বিতাড়ন এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের মতো বিতর্কিত নির্বাহী আদেশও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসীদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের ওপর কড়া নজরদারি চালাতে মার্কিন সরকারের প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের খরচ নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এবং কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)-এর নজরদারি সরঞ্জামের এই বিশাল ও আশঙ্কাজনক বিস্তৃতির তথ্য সামনে এসেছে। অভিবাসী অধিকার বিষয়ক সংগঠন 'মিহেন্তে' (Mijente), আইনি সহায়তাকারী সংস্থা 'জাস্ট ফিউচারস ল' এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সার্ভেইল্যান্স রেজিস্ট্যান্স ল্যাব'-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নজরদারি প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রধান ১১টি কোম্পানির পেছনে মার্কিন সরকারের ব্যয় ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৩১ কোটি ডলারে পৌঁছায়। আর বর্তমান ২০২৬ সালে সেই ব্যয়ের পরিমাণ রেকর্ড ভেঙে এক লাফে প্রায় ৫১ কোটি ৩০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, মার্কিন সরকারের এই বিশাল খরচের বড় অংশই যাচ্ছে ডেটা অ্যানালিটিক্স কোম্পানি 'প্যালান্টির' এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'অ্যান্ডুরিল'-এর পকেটে। অ্যান্ডুরিল মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত নজরদারি ব্যবস্থা, প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ সীমান্ত টাওয়ার, ড্রোন এবং বিশেষ সেন্সর তৈরি করে থাকে। করদাতাদের কোটি কোটি ডলারের এই অর্থ দিয়ে আইসিই এবং সিবিপি ডেটা ব্রোকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্র্যাপার, ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, মোবাইল হ্যাকিং ডিভাইস এবং স্পাইওয়্যারের মতো অত্যন্ত আক্রমণাত্মক প্রযুক্তি কিনছে। এর মাধ্যমে অভিবাসীদের পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও একটি উদ্বেগজনক দিক উন্মোচন করা হয়েছে যে, মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) কেবল এসব প্রযুক্তি কিনছেই না, বরং বিলিয়ন ডলারের তহবিল দিয়ে বিভিন্ন স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে এসব স্বৈরাচারী নজরদারি ডিভাইস তৈরিতে অর্থায়ন করছে। ডিএইচএস-এর 'স্মল বিজনেস ইনোভেশন রিসার্চ' (এসবিআইআর) কর্মসূচির মাধ্যমে ২০০৪ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫০০টি কোম্পানিকে প্রায় ৮৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার অনুদান দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই তহবিলের আওতায় এমন সব প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে যা দিয়ে মার্কিন এজেন্টরা সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন থেকে বায়োমেট্রিক ডেটা সংগ্রহ করতে পারে এবং এআই ব্যবহার করে বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রীদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য তালিকাভুক্ত করতে পারে। এই প্রযুক্তিগত নজরদারির বিস্তৃতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। 'জাস্ট ফিউচারস ল'-এর নির্বাহী পরিচালক পারমিতা শাহ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, কংগ্রেসের জবাবদিহিতার বাইরে গিয়ে আইসিই যেভাবে বিশাল তহবিল ব্যবহার করছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। 'মোবাইল ফোর্টিফাই'-এর মতো ফেসিয়াল রিকগনিশন অ্যাপের মাধ্যমে হাজার হাজার অভিবাসী এবং আন্দোলনকারীদের মুখ স্ক্যান করা হচ্ছে, যা কার্যত ভিন্নমতাবলম্বীদের একটি ডাটাবেজ তৈরির শামিল। এছাড়া 'বার্লা আইভি' (গাড়ির ডিভাইস থেকে তথ্য চুরির প্রযুক্তি), 'ভেরিওয়াচ' (স্মার্টওয়াচের মতো ট্র্যাকিং ডিভাইস) এবং 'ট্যাঙ্গেলস' (সোশ্যাল মিডিয়া ও আর্থিক রেকর্ড ঘেঁটে মানুষের প্রোফাইল তৈরির এআই) এর মতো প্রযুক্তির ব্যবহার আমেরিকাকে একটি ডিস্টোপিয়ান বা অন্ধকার শাসনব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে টেক জায়ান্ট ও ধনকুবেররা নিজেদের স্বার্থে মার্কিন বাজেট কব্জা করছে।
আমেরিকায় বসবাসরত হাইতি এবং সিরিয়ার লাখ লাখ অভিবাসীর জন্য বরাদ্দ থাকা বিশেষ আইনি সুবিধা ‘টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস’ বা টিপিএস (TPS) পুরোপুরি বাতিল করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে সবুজ সংকেত দিয়েছেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। এক ঐতিহাসিক ৬-৩ ব্যবধানের রায়ে সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, মার্কিন ফেডারেল আইন অনুযায়ী টিপিএস সুবিধা দেওয়া বা তা বাতিলের মতো সিদ্ধান্তের ওপর বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার কোনো সুযোগ নেই। একই সাথে বর্ণ বৈষম্যের কারণে হাইতির টিপিএস সুবিধা বাতিল করা হয়েছিল বলে চ্যালেঞ্জকারীদের করা দাবিটি আদালতে টেকেনি। সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের পক্ষে লেখা রায়ে বিচারপতি স্যামুয়েল আলিতো উল্লেখ করেন, সিরিয়া ও হাইতির নাগরিকদের জন্য সাময়িক সুরক্ষিত মর্যাদা বা টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন এই আদেশ স্থগিত রাখার কোনো আইনি অধিকার চ্যালেঞ্জকারীদের নেই। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস, বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাস এবং বিচারপতি ব্রেট কাভানো এই রায়ের পক্ষে একমত পোষণ করেন। এর আগে নিম্ন আদালত এই টিপিএস সুবিধা বাতিলের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছিলেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধবিগ্রহের কারণে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি যদি নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের উপযোগী না থাকে, তবে তাদের সুরক্ষায় মার্কিন কংগ্রেস ১৯৯০ সালে এই টিপিএস প্রথা চালু করে। এর মাধ্যমে অন্য দেশের নাগরিকরা বৈধভাবে আমেরিকায় বসবাসের সুযোগ পান এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো বন্ধ থাকে। ২০১০ সালে হাইতিতে হওয়া এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দেশটির নাগরিকদের এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যার ফলে অসংখ্য হাইতিয়ান নাগরিক দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার সুযোগ পেয়ে আসছিলেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন হাইতির টিপিএস সুবিধা বাতিলের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে জানিয়েছে যে, হাইতিয়ান গ্যাং বা অপরাধী দলগুলো, যাদের মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইতিমধ্যে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ সুবিধাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগও আদালতে যুক্তি দেখিয়েছে যে, তারা সমস্ত সংবিধবদ্ধ বাধ্যবাধকতা মেনেই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই টিপিএস সুবিধা বাতিলে পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে, হাইতি এবং সিরিয়ার নাগরিকদের পক্ষে লড়াই করা মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা দাবি করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ খামখেয়ালি এবং এটি নির্দিষ্ট কোনো আইনি নিয়ম অনুসরণ করে করা হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, সরকার সম্পূর্ণ বৈষম্যমূলক আচরণ করে হাইতি ও সিরিয়ার অভিবাসীদের এই আইনি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের এই চূড়ান্ত রায়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এই দুই দেশের নাগরিকদের টিপিএস সুবিধা বাতিল করার পথ এখন পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে গেল। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে হাইতি ও সিরিয়ার লাখ লাখ অভিবাসী এখন চরম বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়লেন। দীর্ঘ সময় ধরে আইনি লড়াই চলার পর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির এক বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই রায়ের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সূত্রে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইমিগ্রেশন আদালতে হাজিরা দিতে আসা অভিবাসীদের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার এক ফেডারেল বিচারক। ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত নীতির ওপর জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত বলেছেন, আদালতকে অভিবাসী গ্রেপ্তারের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টের ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জাজ পি. কেসি পিটস মঙ্গলবার ৭১ পৃষ্ঠার এক রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওই নীতিকে যুক্তিহীন এবং প্রশাসনিক পদ্ধতি আইন (Administrative Procedure Act) পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এবং ইমিগ্রেশন আদালত পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ আদালতে তাদের পদক্ষেপের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিতর্কিত নীতির আওতায় আইস কর্মকর্তারা ইমিগ্রেশন আদালতে শুনানির জন্য উপস্থিত হওয়া অভিবাসীদের কোর্টরুমের বাইরে থেকেই আটক করতে পারতেন। অভিবাসী অধিকারকর্মীদের মতে, এর ফলে বহু মানুষ আদালতে হাজির হতে ভয় পাচ্ছিলেন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকছিলেন। রায়ে বিচারক পিটস উল্লেখ করেন, যেসব অভিবাসী ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত অভিযোগের কারণে আদালতে হাজির হচ্ছেন, তাদের একই কারণে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই গ্রেপ্তার করা নীতিগতভাবে অসংগত। তিনি বলেন, প্রশাসনের এই নীতি একটি ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শুধু আদালতে গ্রেপ্তারের বিষয় নয়, অভিবাসীদের দীর্ঘ সময় আটক রাখার নীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন বিচারক। তিনি এমন একটি নীতি বাতিল করেছেন, যার মাধ্যমে আটকদের ১২ ঘণ্টার বেশি হেফাজতে রাখার সীমাবদ্ধতা কার্যত তুলে দেওয়া হয়েছিল। আদালতে উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায়, সান ফ্রান্সিসকোর একটি ইমিগ্রেশন কেন্দ্রে অনেক অভিবাসীকে ১২ ঘণ্টার বেশি, কখনও রাতভর বা একাধিক দিন আটক রাখা হয়েছিল। বিচারক বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। রায়ের সমালোচনা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের জেনারেল কাউন্সেল জেমস পার্সিভাল সামাজিক মাধ্যমে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কোনো ইমিগ্রেশন বিচারক বহিষ্কারের নির্দেশ দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তার মতে, এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ বিচারিক সক্রিয়তার উদাহরণ। অন্যদিকে অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্থান, অভিবাসীদের ভয় দেখিয়ে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্র নয়। আদালতে উপস্থিত হওয়া এবং স্বাধীন থাকার মধ্যে কাউকে বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন। এই রায় জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যেই এর প্রভাব পড়বে। এর আগে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতও একই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিল। ম্যানহাটনের ফেডারেল বিচারক কেভিন ক্যাসটেল রায়ে বলেছিলেন, জাতীয় নিরাপত্তা বা জননিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি না থাকলে ইমিগ্রেশন আদালতে গ্রেপ্তারকে ন্যায্যতা দেওয়া কঠিন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বিশেষ করে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় যারা উদ্বিগ্ন ছিলেন, তাদের জন্য রায়টি সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। তবে আইনি লড়াই এখানেই শেষ নয়। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারে। ফলে বিষয়টি নিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর রাজ্যে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এক বিশাল অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশিসহ ২৭০ জন শ্রমিককে আটক করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ। মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম অনলাইন নিউ স্ট্রেইটস টাইমস-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার বিকেলে সেলাঙ্গরের পোর্ট ক্লাংয়ের তেলোক গং শিল্প এলাকার একটি আসবাবপত্র তৈরির কারখানায় এই ‘অপস মেগা’ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইমিগ্রেশন পুলিশ কারখানায় প্রবেশ করতেই শ্রমিকদের মাঝে হুড়োহুড়ি লেগে যায় এবং তারা দিগ্বিদিক দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। গ্রেফতার এড়াতে অভিবাসী শ্রমিকরা কারখানার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও অদ্ভুত জায়গায় আত্মগোপন করেন। এর মধ্যে ২০ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি তরুণ শ্রমিক কারখানার ভেতরে থাকা প্লাস্টিকের ময়লাভর্তি একটি বড় রোল-অন বা রোল-অফ (রোরো) কনটেইনারের ভেতরে ময়লার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। তল্লাশির একপর্যায়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে সেখান থেকে হাতেনাতে আটক করেন। আটকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওই তরুণ কথা না বলে হাতজোড় করে বারবার ইংরেজিতে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরবর্তীতে তাঁর এক সহকর্মী মালয় ভাষায় অনুবাদ করে জানান যে, ইমিগ্রেশন পুলিশ দেখে ভয়েই তিনি ময়লার ড্রামে লুকিয়েছিলেন। একই কারখানায় অন্য দুই বাংলাদেশি শ্রমিককে কাঠ কাটার মেশিনের পেছনে এবং আসবাবপত্রের বড় বড় বাক্সের আড়ালে ধুলোবালির মধ্যে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় আটক করা হয়। আটকের সময় তাঁদের শরীর ও চুল কারখানার কাঠের গুঁড়ো ও ময়লায় ধূসর হয়ে গিয়েছিল। এর আগে সকাল ৮টার দিকে মেরু এলাকার একটি প্লাস্টিক কারখানায় অভিযানের প্রথম ধাপ শুরু হয়, যেখানে প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে গোপন নজরদারি বা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছিল ইমিগ্রেশন বিভাগ। সেলাঙ্গর ইমিগ্রেশন বিভাগের উপ-পরিচালক মোহদ খুসাইরি কামারুদ্দিন জানান, মেরুর প্লাস্টিক কারখানায় ৬৬ জন শ্রমিকের নথিপত্র পরীক্ষা করে ১৮ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ১৭ জন বাংলাদেশি ও ১ জন করে নেপাল ও মিয়ানমারের নাগরিক রয়েছেন। অন্যদিকে, তেলোক গংয়ের আসবাবপত্র কারখানায় ৫২০ জন শ্রমিকের মধ্যে ২৫২ জনকে আটক করা হয়। এই ২৫২ জনের মধ্যে ১৭৫ জন বাংলাদেশি, ৩৯ জন পাকিস্তানি, ৩৩ জন নেপালি, ৪ জন মিয়ানমারের এবং ১ জন শ্রীলঙ্কার নাগরিক রয়েছেন। ইমিগ্রেশন বিভাগ জানিয়েছে, আটককৃত সকল শ্রমিকের বয়স ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে এবং তারা সবাই পুরুষ. প্রাথমিক তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই শেষে দেখা গেছে, আটককৃতদের সিংহভাগই মালয়েশিয়ায় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন এবং অনেকে ওয়ার্ক পারমিট বা পাসের শর্ত লঙ্ঘন করে নির্ধারিত খাতের বাইরে কাজ করছিলেন। কয়েকজন শ্রমিক নিজেদের বৈধ দাবি করলেও অভিযানের সময় মূল কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন। মোট ৫০ জন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ দল এই ঝটিকা অভিযানটি পরিচালনা করে. মোহদ খুসাইরি কামারুদ্দিন স্পষ্ট করে বলেন, এই ক্র্যাকডাউন বা চিরুনি অভিযান শুধু কারখানাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিভিন্ন আবাসিক এলাকা এবং ম্যাসেজ পার্লারের মতো জায়গাগুলোতেও তা চালানো হবে। আটককৃতদের বিরুদ্ধে ১৯৫৯/৬৩ সালের ইমিগ্রেশন আইনের আওতায় মামলা দায়ের করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সূত্র: নিউ স্ট্রেইটস টাইমস
কিউবার কমিউনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম শীর্ষ নায়ক বা ‘হিরো’র কন্যা আলিনা রোসালেস আগুয়েরেতাকে (৩৭) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির অভিবাসন ও সীমান্ত এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টরা। ট্যুরিস্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে দেশটিতে অবস্থান করে একটি ক্লিনিকে প্লাস্টিক সার্জন হিসেবে কাজ করার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত আলিনা কিউবার অত্যন্ত সম্মানিত ও প্রভাবশালী জেনারেল উলিসেস রোসালেস দেল তোরোর কন্যা। আইসিই এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলিনা রোসালেস আগুয়েরেতা পেশায় একজন প্রশিক্ষিত প্লাস্টিক সার্জন। তিনি ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর বি-২ ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে ওরাল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালের মে মাসে তার সেই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি অবৈধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যান। গত ২৬ মে মিয়ামির একটি প্লাস্টিক সার্জারি ক্লিনিকে সহকারী হিসেবে কাজ করার সময় কেন্দ্রীয় অভিবাসন এজেন্টরা তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। আলিনার বাবা ৮৪ বছর বয়সী জেনারেল উলিসেস রোসালেস দেল তোরো কিউবার ইতিহাসের একজন অন্যতম প্রভাবশালী কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্ব। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি কিউবান বিপ্লবের সময় ফিদেল কাস্ত্রো এবং রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ে যুদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দেশটির বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাকে ‘হিরো অব দ্য রিপাবলিক অব কিউবা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এছাড়া তিনি কিউবার কৃষিমন্ত্রী এবং কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবেও শীর্ষ দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সংস্থা আইসিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আলিনা রোসালেস আগুয়েরেতার বিরুদ্ধে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে তিনি আইসিই হেফাজতে রয়েছেন এবং অভিবাসন আদালতের বিচারকের সামনে শুনানির জন্য অপেক্ষা করছেন। এই বিষয়ে আরও তথ্য হাতে এলে তা পরবর্তীতে জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর দেশটিতে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়েছে, যার অংশ হিসেবে কিউবার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আত্মীয়-স্বজনদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আলিনা গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক দিন আগেই আদিস লাস্ট্রেস মোরেরা নামের আরেক কিউবান নারীকে গ্রেপ্তার করে লুইজিয়ানার একটি আইসিই ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়। ওই নারী কিউবার সামরিক বাহিনী পরিচালিত এবং দেশটির অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী গোপন প্রতিষ্ঠান ‘গায়েসা’র (GAESA) প্রেসিডেন্ট তথা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনিয়া গুইলারমিনা লাস্ট্রেসের আপন বোন।
যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে এখন দেশটির জনসংখ্যার একটি বড় অংশে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ কোটি ২ লাখ। এটি দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪.৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি সাতজনের একজন বিদেশে জন্ম নেওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনশুমারি ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউএসএফ্যাক্টস। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ। গত এক দশকে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২৬ সালে ৫ কোটি ২ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে মোট জনসংখ্যার মধ্যে অভিবাসীদের অংশ ১৩.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানে ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসীদের হার সবচেয়ে বেশি, ২৭.৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে নিউ জার্সি ২৫ শতাংশ, নিউইয়র্ক ২৩.৩ শতাংশ, ফ্লোরিডা ২৩.১ শতাংশ, নেভাডা ১৯.৯ শতাংশ, ম্যাসাচুসেটস ১৮.৮ শতাংশ, হাওয়াই ১৮.৬ শতাংশ, টেক্সাস ১৮.৪ শতাংশ, মেরিল্যান্ড ১৭.১ শতাংশ এবং ওয়াশিংটন ১৬.১ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, বড় শহর ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ বেশি থাকায় এসব এলাকাতেই অভিবাসীদের ঘনত্ব বেশি দেখা যায়। মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে মায়ামিতে অভিবাসীদের হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪২.৪ শতাংশ। অন্যদিকে কিছু ছোট শহরে এই হার ১ শতাংশেরও নিচে। অর্থনীতিতে অভিবাসীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা পরিষেবা, নির্মাণ, প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমশক্তি হিসেবে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন শুধু জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শ্রমঘাটতি পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অভিবাসী-আকর্ষণকারী দেশ হিসেবে অবস্থান করছে। প্রতি সাতজনের একজন বিদেশে জন্ম নেওয়া হওয়ায় দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে অভিবাসীদের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী বছরগুলোতে এই হার আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও জননীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে গত এক সপ্তাহে অন্তত ১৫ জন অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। অভিবাসীদের বহনকারী একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার পর এসব মরদেহ সমুদ্রপথে ভেসে উপকূলে এসেছে বলে জানিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী, নৌবাহিনী এবং হাসপাতাল সূত্র। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার নৌবাহিনীর একটি সূত্র জানায়, নৌকাডুবির ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ১০ জনের সাক্ষ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে প্রায় ৬১ জন যাত্রী ছিলেন। ফলে এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো মিশর সীমান্তসংলগ্ন লিবিয়ার তবরুক শহরের উপকূলের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মরদেহগুলোর বেশিরভাগই দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে মারাত্মকভাবে পচে গেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমুদ্রের স্রোতের কারণে আগামী দিনগুলোতেও আরও মরদেহ ভেসে আসতে পারে। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবরুক রেড ক্রিসেন্টের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবীরা সাদা সুরক্ষা পোশাক পরে পাথুরে উপকূল থেকে মরদেহ উদ্ধার করছেন। পরে সেগুলো সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে সংরক্ষণ করে শনাক্তকরণের জন্য পাঠানো হয়। লিবিয়া বহু বছর ধরেই আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের জন্য ইউরোপে যাওয়ার অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারের পতনের পর দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। সেই সুযোগে মানবপাচারকারী চক্রগুলো অভিবাসীদের ইউরোপে পাঠানোর জন্য লিবিয়ার উপকূলকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। দারিদ্র্য, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উন্নত জীবনের আশায় প্রতিবছর হাজারো মানুষ মরুভূমি পেরিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। এরপর ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রায়ই এসব যাত্রা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক অভিবাসন পথ। প্রতি বছর শত শত মানুষ নৌকাডুবি, ঝড় কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে প্রাণ হারান। এদিকে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিভিত্তিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জরুরি চিকিৎসা ও সহায়তা কেন্দ্র জানিয়েছে, খুমস শহরের উপকূলে পৃথক আরেকটি নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ১৩ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই নৌকাটিও সমুদ্রে উল্টে গিয়েছিল। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় বা তারা কোন দেশের নাগরিক, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সাম্প্রতিক এই দুটি ঘটনা আবারও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টায় অভিবাসীদের জীবন কতটা ঝুঁকির মুখে থাকে, তা সামনে এনে দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন পথ তৈরির দাবি জানিয়ে আসছে, যাতে মানুষকে এমন প্রাণঘাতী যাত্রার ঝুঁকি নিতে না হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন শুরু করা অনেক অভিবাসীর মতোই রেহমানের (ছদ্মনাম) যাত্রাও সহজ ছিল না। উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে ২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন তিনি। দেশে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও নতুন দেশে এসে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পাওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। প্রথম দিকে তিনি একটি স্বল্প বেতনের চাকরিতে যোগ দেন। বার্ষিক আয় ছিল ৪০ হাজার ডলারেরও কম। সেই আয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করাই ছিল কঠিন। অন্যদিকে বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের আর্থিক সহায়তা করার সুযোগও ছিল সীমিত। প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের মধ্যেই তিনি উপলব্ধি করেন, দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও পেশাগত উন্নতির জন্য নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন। এরপর তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করেন। বিভিন্ন সম্ভাবনাময় পেশা নিয়ে গবেষণা করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে নিজের ক্যারিয়ারের নতুন গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কয়েক মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে নতুন দক্ষতা অর্জনে মনোযোগ দেন। পরিশ্রমের ফল আসতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ২০১৬ সালে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স (কিউএ) অ্যানালিস্ট-২ পদে চাকরির সুযোগ পান। এটিই ছিল তার পেশাজীবনের বড় মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। নতুন খাতে প্রবেশের পর তিনি ধারাবাহিকভাবে নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন বিষয় শিখেছেন, পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং কর্মক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে তিনি একাধিক স্বনামধন্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পান। কর্মজীবনে ধারাবাহিক উন্নতি এবং কৌশলগতভাবে নতুন সুযোগ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নেতৃত্ব পর্যায়ে পৌঁছে যান। বর্তমানে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তার বার্ষিক আয় এখন প্রায় আড়াই লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রে তার কর্মজীবনের শুরুর সময়কার আয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। তবে রেহমানের সাফল্যের গল্প শুধু আর্থিক উন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি তিনি এখন কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন। বিশেষ করে নতুন বাংলাদেশি অভিবাসীদের দক্ষতা উন্নয়ন, পেশাগত প্রস্তুতি এবং মূলধারার কর্মসংস্থানে প্রবেশের বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করে থাকেন। অভিবাসী জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে তার এই পথচলা অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষতাভিত্তিক পেশাগুলোর চাহিদা বাড়ছে। ফলে পরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং ধারাবাহিক চেষ্টা অব্যাহত রাখলে অভিবাসীদের জন্য মূলধারার পেশায় সফলতা অর্জনের সুযোগ এখনও রয়েছে। রেহমানের গল্প সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে, যেখানে সীমিত আয়ের একটি চাকরি থেকে শুরু করে অধ্যবসায়, দক্ষতা এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে একজন অভিবাসী নিজের জীবন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে সক্ষম হয়েছেন। বি.দ্র.: প্রতিবেদনটি বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুরোধে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। গোপনীয়তা রক্ষার্থে প্রতিবেদনে ‘রেহমান’ নামে একটি ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী এলাকা থেকে গত এক সপ্তাহে নারীসহ অন্তত ১৫ জন ভাগ্য অন্বেষণকারী অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের ধারণা, সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই নৌকা উল্টে গিয়ে সাগরে ডুবে তাদের এই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আজ শনিবার (২০ জুন) লিবিয়ার স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী, নৌবাহিনী এবং দায়িত্বরত চিকিৎসক সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করেছে। লিবীয় নৌবাহিনীর একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, সাগরে বড় ধরণের দুর্ঘটনার পর উপকূলীয় এলাকা থেকে অলৌকিকভাবে অন্তত ১০ জন অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত ওই নৌকাটিতে নারী ও শিশুসহ প্রায় ৬১ জন আরোহী ছিলেন। লিবিয়ার সীমান্ত ও উপকূল রক্ষী বাহিনী জানায়, মিশর সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত তোব্রুক শহরের বিভিন্ন পাথুরে উপকূলীয় এলাকা থেকে গত কয়েক দিন ধরে এই মরদেহগুলো ভেসে আসতে শুরু করে। দুজন স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মরদেহগুলোতে ইতিমধ্যেই পচন ধরতে শুরু করেছে, যা দেখে বোঝা যায় বেশ কয়েক দিন আগেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। ওই সমুদ্র সৈকত এবং আশেপাশের এলাকায় আরও মরদেহ পাওয়ার তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে বলে উদ্ধারকারী দলগুলোর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। তোব্রুক রেড ক্রিসেন্টের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, সাদা প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরা স্বেচ্ছাসেবকরা পাথুরে উপকূল থেকে মরদেহগুলো সংগ্রহ করে সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরছেন। ঐতিহাসিকভাবে ২০১১ সালে লিবিয়ার দীর্ঘকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকেই দেশটির বিস্তীর্ণ উপকূল অঞ্চল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার অন্যতম প্রধান ও বিপজ্জনক রুটে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিদ্ধস্ত মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা নিজস্ব দেশের সংঘাত, চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচতে উন্নত কর্মসংস্থানের আশায় মরুভূমি এবং সাগরের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। এ ছাড়া তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও অনেক দরিদ্র অভিবাসীকে কাজের জন্য আকৃষ্ট করে। এদিকে লিবিয়ার উপকূলে ঘটে যাওয়া আলাদা আরেকটি মানবপাচারের ঘটনায় দেশটির রাজধানী ত্রিপোলির ইমার্জেন্সি মেডিসিন অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার একটি বিশেষ বিবৃতি প্রদান করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ত্রিপোলি উপকূলে আরেকটি অবৈধ অভিবাসীবাহী নৌকাডুবির ঘটনার পর সাগরে ভাসমান অবস্থা থেকে ১৩ জন অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে প্রয়োজনীয় জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত এই আসরে দারুণ সূচনা করেছে মার্কিন পুরুষ ফুটবল দল। উদ্বোধনী ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে তারা। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অন্য একটি কারণেও আলোচনায় রয়েছে দলটি। সেটি হলো খেলোয়াড়দের বহুজাতিক ও অভিবাসী পটভূমি। মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ দলে অন্তত ১২ জন খেলোয়াড়ের পারিবারিক শিকড় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। ছয়জন খেলোয়াড়ের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে, আর অর্ধেকেরও বেশি খেলোয়াড় দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী। আফ্রিকা, ইউরোপ, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকাসহ অন্তত আটটি দেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এই ফুটবলারদের। এই বৈচিত্র্যময় পটভূমি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কঠোর অভিবাসন নীতি অনুসরণ করছে এবং নাগরিকত্ব ও সীমান্ত নীতিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়ের জীবনকাহিনি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। দলের অন্যতম আলোচিত তারকা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন এর অন্যতম উদাহরণ। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। বালোগুনের জন্ম ২০০১ সালে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে। তার মা ছিলেন নাইজেরিয়ার নাগরিক এবং লন্ডনে বসবাস করতেন। গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডনে ফেরার চেষ্টা করলেও বিমান সংস্থার বিধিনিষেধের কারণে তিনি যাত্রা করতে পারেননি। ফলে বালোগুনের জন্ম হয় যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর অধীনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার কারণে তিনি মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পান। পরবর্তীতে সেই নাগরিকত্বই তাকে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ করে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, বালোগুনের গল্প বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত। কারণ ট্রাম্প প্রশাসন জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়ম সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে সেই উদ্যোগ এখনো কার্যকর হয়নি। শুধু বালোগুনই নন, মার্কিন দলের আরও অনেক খেলোয়াড়ের পারিবারিক ইতিহাস অভিবাসনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। উইঙ্গার টিম ওয়েহর বাবা জর্জ ওয়েহ আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার এবং দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট। তার মা জ্যামাইকান বংশোদ্ভূত। টিম ওয়েহ যুক্তরাষ্ট্র, লাইবেরিয়া, ফ্রান্স ও জ্যামাইকা, চার দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নেন। হাজি রাইটের বাবা ঘানার এবং মা লাইবেরিয়ার নাগরিক। বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের ক্লাব ফুটবলে খেলছেন। অন্যদিকে রিকার্ডো পেপির জন্ম টেক্সাসে হলেও তার বাবা-মা মেক্সিকান। একইভাবে ক্রিস্টিয়ান রোলদানও মেক্সিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। মার্কিন দলের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচের পারিবারিক শিকড় ক্রোয়েশিয়ায়। তার দাদা ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেছিলেন। সেই সূত্রে পুলিসিচ ক্রোয়েশিয়ার পাসপোর্টও পেয়েছিলেন, যা অল্প বয়সে জার্মানিতে পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করতে সহায়তা করে। ওয়েস্টন ম্যাককেনির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে হলেও তার শৈশব কেটেছে জার্মানিতে। বিমান বাহিনীতে কর্মরত বাবার দায়িত্ব পালনের কারণে পরিবারের সঙ্গে তিনি ইউরোপে থাকতেন এবং সেখানেই ফুটবল শেখার সুযোগ পান। বর্তমান দলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের সংখ্যাও কম নয়। সেরজিনো ডেস্টের জন্ম নেদারল্যান্ডসে। তার বাবা সুরিনামি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এবং মা ডাচ। অ্যান্টনি রবিনসনের জন্ম ইংল্যান্ডে। মালিক টিলম্যানের জন্ম জার্মানিতে। জিও রেইনা এবং সেবাস্টিয়ান বারহাল্টারের জন্মও ইংল্যান্ডে, কারণ তাদের বাবারা সে সময় সেখানে পেশাদার ফুটবল খেলতেন। অন্যদিকে আলেহান্দ্রো জেন্দেখাসের জন্ম মেক্সিকোর সিউদাদ হুয়ারেজে। মাত্র কয়েক মাস বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন তিনি। পরে দুই দেশের নাগরিকত্বই ধরে রাখেন। বিশ্বকাপে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, অনেক জাতীয় দলই এখন অভিবাসী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করছে। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ২৪৮ জন ফুটবলারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এমন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যেখানে তাদের জন্ম হয়নি। মরক্কোর ২৬ সদস্যের দলে ১৯ জন খেলোয়াড় বিদেশে জন্ম নিয়েছেন। তাদের অনেকেই ফ্রান্স বা স্পেনে বড় হয়েছেন। একইভাবে তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, কুরাসাও, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কঙ্গো এবং কাতারের জাতীয় দলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড় রয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বায়ন, অভিবাসন এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ আধুনিক ফুটবলের চিত্র বদলে দিয়েছে। অনেক খেলোয়াড় এখন জন্মভূমি নয়, বরং পারিবারিক শিকড় বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতীয় দল বেছে নিচ্ছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির প্রভাব এবারের বিশ্বকাপেও দেখা গেছে। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। ইরাক দলের কয়েকজন সদস্যকেও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভিসা জটিলতার কারণে ইরান জাতীয় দলও তাদের বিশ্বকাপ কার্যক্রমের একটি অংশ মেক্সিকোতে পরিচালনা করছে। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের গল্প শুধু ফুটবলের গল্প নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের অভিবাসন, পরিচয় এবং নাগরিকত্বের পরিবর্তিত বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
আমেরিকায় অভিবাসী তরুণ বা 'ড্রিমার'রা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ডেফারড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস বা ড্যাকা (DACA) কর্মসূচির আওতায় থাকা এই তরুণরা তাদের স্ট্যাটাস নবায়নের জন্য আবেদন করে মাসের পর মাস অপেক্ষায় রয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে নবায়ন প্রক্রিয়ায় এই অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেকেই তাদের চাকরি হারাচ্ছেন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। একসময়ে যে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ লাগত, বর্তমানে তা মাসের পর মাস আটকে থাকছে। ২০১২ সালে চালু হওয়া এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল শৈশবে নথিপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের নির্বাসন থেকে রক্ষা করা, যা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। ক্লাউদিয়া নামের এক ড্রিমার গত ডিসেম্বরে তার ড্যাকা নবায়নের আবেদন করেছিলেন। মাত্র চার বছর বয়সে আমেরিকায় আসা এই তরুণী জানান, নির্ধারিত সময়ে আবেদন ও সব নিয়মকানুন মেনে বায়োমেট্রিক্স সম্পন্ন করার পরও দীর্ঘ ছয় মাস ধরে তিনি কোনো উত্তর পাননি। ওয়ার্ক পারমিটের (কাজের অনুমতি) মেয়াদ শেষ হওয়ায় তার শিক্ষা ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়া ক্যারিয়ার এখন ঝুঁকির মুখে। এই পরিস্থিতিকে তিনি একটি 'ব্যক্তিগত আক্রমণ' বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, সিজার নামের আরেক তরুণ দীর্ঘসূত্রিতার কারণে এইচআর (HR) বিভাগের চাকরি হারিয়ে বাধ্য হয়ে রাস্তায় বুরিটো বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। হতাশাগ্রস্ত সিজার বলেন, "মনে হচ্ছে আমি আমার সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি। আমরা এখানেই বড় হয়েছি, আমাদের কমিউনিটি এখানেই, আর এখন মনে হচ্ছে আমাদের আমেরিকান স্বপ্নটা হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেছে।" এই প্রশাসনিক বিলম্ব এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ড্রিমাররা ক্রমবর্ধমান বৈরিতার সম্মুখীন হচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের অভিবাসন দমন নীতির অংশ হিসেবে গত এক বছরে শত শত ড্যাকা গ্রহীতাকে গ্রেপ্তার ও অনেককে বিতাড়িত করা হয়েছে। প্রশাসন যদিও দাবি করছে যে তারা অপরাধের রেকর্ড থাকা অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করছে, তবে দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে নির্বাসনের মুখোমুখি হওয়া ৭৭ শতাংশ মানুষেরই কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০০টি ভিন্ন দেশের পাঁচ লাখেরও বেশি সক্রিয় ড্যাকা গ্রহীতা রয়েছেন, যারা মার্কিন অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রেখে চলেছেন। অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা ইউনাইটেড উই ড্রিমের উপ-পরিচালক জুলিয়ানা ম্যাসেডো দো নাসিমেন্তোর মতে, এই বিলম্ব আসলে ড্রিমারদের কর্মক্ষেত্র থেকে ছিটকে ফেলার একটি সুকৌশল। ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ড্যাকা গ্রহীতাদের জন্য নতুন কিছু কাজের বিধিনিষেধও প্রস্তাব করেছে, যার মধ্যে নিয়োগকর্তাদের 'ই-ভেরিফাই' ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা অন্যতম। ম্যাসেডো দো নাসিমেন্তো একে একটি "ব্যাপক অবৈধকরণ প্রচেষ্টা" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যার মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এদিকে, ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ড্যাকা দেশে কোনো আইনি বৈধতা দেয় না এবং সংস্থাটি মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষায় অভিবাসীদের আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করছে। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে অভিবাসন অধিকারকর্মীরা মার্কিন কংগ্রেসের কাছে একটি দ্বিদলীয় 'ড্রিম অ্যাক্ট' পাসের আহ্বান জানাচ্ছেন, যা এই তরুণদের স্থায়ী আবাসিক মর্যাদা ও নাগরিকত্বের পথ প্রশস্ত করবে। দ্য ড্রিম ডট ইউএস-এর প্রেসিডেন্ট গ্যাবি পাচেকো বলেন, বছরের পর বছর অবদান রাখা এই মানুষগুলো আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব ও রাজনৈতিক আক্রোশের কারণে সবকিছু হারাচ্ছে, যা আমেরিকার ভবিষ্যতের জন্যই অত্যন্ত ক্ষতিকর ও নিষ্ঠুর একটি অধ্যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে বসবাসকারী ভেনেজুয়েলান অভিবাসী ব্রায়ান হোসে রোহাস গালোফ্রে ভেবেছিলেন, স্ত্রীকে নিয়ে ফ্লোরিডার সমুদ্রসৈকত ঘুরবেন এবং সুযোগ পেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক নজর দেখবেন। কিন্তু সেই ভ্রমণই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ে পরিণত হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্ত্রী সকোরো জারাগোসাকে নিয়ে উইসকনসিন থেকে মিয়ামির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন রোহাস। তাদের পরিকল্পনা ছিল Trump National Doral হোটেলে থাকা এবং সেখানে অবস্থানরত প্রেসিডেন্ট Donald Trump-কে একবার দেখার চেষ্টা করা। কিন্তু হোটেলের নিরাপত্তা চৌকিতে তল্লাশির পরই তাদের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। রোহাসের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়ি তল্লাশির সময় নিরাপত্তাকর্মীরা একটি এয়ারসফট পিস্তল এবং একটি ধাতব গাঁজা পেষণযন্ত্র খুঁজে পান। এরপর স্থানীয় পুলিশ তাদের আটক করে। পরে বিষয়টি অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নজরে গেলে রোহাসকে আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) হেফাজতে নেওয়া হয়। ৩৪ বছর বয়সী রোহাস ২০২১ সালে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং আশ্রয়ের আবেদন করেন। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি পান। উইসকনসিনের একটি ব্রেক ডিস্ক কারখানায় ঘণ্টায় ২৯ ডলার মজুরিতে কাজ করতেন এবং পরে সুপারভাইজার পদেও উন্নীত হন। ২০২৪ সালে তিনি মার্কিন নাগরিক সকোরো জারাগোসাকে বিয়ে করেন। তবে মিয়ামির সেই ঘটনার পর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। রোহাস জানান, তার শরীরের উল্কি দেখে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। তার বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার কুখ্যাত অপরাধী চক্র ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’র সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহ করা হয়। যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, তার উল্কিগুলো ব্যক্তিগত পছন্দের অংশ মাত্র। এরপর প্রায় তিন মাস ফ্লোরিডার একটি আটক কেন্দ্রে কাটাতে হয় তাকে। এই সময়ে স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগও সীমিত ছিল। রোহাস বলেন, বন্দি অবস্থায় তিনি আশঙ্কা করছিলেন, তাকে এল সালভাদরে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। কারণ তার সঙ্গে আটক থাকা অনেক ভেনেজুয়েলান নাগরিককে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। রোহাসের স্ত্রী সকোরো জারাগোসা, যিনি নিজেকে ট্রাম্প সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন, বলেন তিনি প্রেসিডেন্টকে এখনো সমর্থন করেন। তবে স্বামীর সঙ্গে যা ঘটেছে, সেটিকে তিনি অন্যায় বলে মনে করেন। তার ভাষায়, “আমি মনে করি ট্রাম্প একজন ভালো প্রেসিডেন্ট। কিন্তু আমার পরিবারের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা ন্যায্য হয়নি।” অবশেষে ২০২৫ সালের এপ্রিলে একজন অভিবাসন বিচারক রোহাসকে ১৫ হাজার ডলারের জামিনে মুক্তির অনুমতি দেন। বিচারকের সিদ্ধান্তে ইঙ্গিত ছিল যে, তিনি রোহাসকে সমাজের জন্য হুমকি বা পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখেননি। তবুও মুক্তি পেতে আরও কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয় তাকে। তবে কারামুক্তির পরও শেষ হয়নি তার দুর্ভোগ। হেফাজতে থাকার সময় তার কর্মসংস্থানের অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। নবায়ন হয়নি ড্রাইভিং লাইসেন্সও। আইনি লড়াই ও জামিনের খরচ মেটাতে পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়েছে। বিক্রি করতে হয়েছে বাড়ি ও গাড়ি। বর্তমানে তাদের ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার ডলারেরও বেশি বলে জানিয়েছেন রোহাস। মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) রোহাসকে ‘অপরাধে অভিযুক্ত অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে তার আইনজীবীরা আদালতের নথি দেখিয়ে দাবি করেছেন, রোহাসের বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার রেকর্ড নেই এবং তাকে মূলত অভিবাসন সংক্রান্ত অবস্থানের কারণেই আটক রাখা হয়েছিল। বর্তমানে রোহাসের পরবর্তী অভিবাসন শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আদালতগুলোতে ৩৩ লাখের বেশি মামলা ঝুলে থাকায় এমন দীর্ঘ অপেক্ষা এখন অস্বাভাবিক নয়। এদিকে পরিবারের নতুন সদস্য হিসেবে একটি কন্যাশিশুর জন্ম হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট এতটাই গভীর যে সন্তানের জন্মের পরদিনই কাজে ফিরতে হয়েছিল জারাগোসাকে। তিনি বলেন, “আমাদের শিশুর জন্য কিছুই ছিল না। এই পুরো অভিজ্ঞতা আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে।” রোহাস এখন বেশিরভাগ সময় পরিবারের সঙ্গেই কাটান। বাইরে গেলেও একা বের হতে চান না। কারণ তার আশঙ্কা, যেকোনো সময় আবারও তাকে আটক করা হতে পারে। একসময় ট্রাম্পকে এক নজর দেখার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া সফর আজ তাদের জীবনে গভীর আর্থিক ও মানসিক সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহাসের কথায়, “আমি শুধু সঠিকভাবে কাজ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে আমার জীবনটাই বদলে গেছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির নবনিযুক্ত মন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে অবৈধ অভিবাসী অপরাধীদের বিতাড়নের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউনটাউনে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কার্যালয়ে অবৈধ অভিবাসীদের হাতে নির্মমভাবে নিহতদের পরিবারের সাথে এক আবেগময় বৈঠকে তিনি এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। ক্রিস্টি নোয়েমের স্থলাভিষিক্ত হওয়া ৪৮ বছর বয়সী এই ডিএইচএস প্রধান লস অ্যাঞ্জেলেসসহ ক্যালিফোর্নিয়া জুড়ে ঘটে চলা অবৈধ কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা জানান। সংবাদমাধ্যম দ্য পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সাথে স্থানীয় ডেমোক্র্যাট নেতাদের অসহযোগিতার কঠোর সমালোচনা করে একে 'লজ্জাজনক' ও 'অপরাধমূলক' বলে আখ্যায়িত করেন। মুলিন অভিযোগ করেন, রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসন যদি ফেডারেল কর্তৃপক্ষের সাথে সহযোগিতা করত, তবে এই বিপজ্জনক অপরাধীদের সহজেই অপসারণ করা সম্ভব হতো। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের দ্বারা ঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য ছিল, কিন্তু বর্তমান প্রশাসন আইন মান্যকারী নাগরিকদের চেয়ে অপরাধীদের সুরক্ষায় বেশি আগ্রহী। বৈঠকে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা, যাদের 'অ্যাঞ্জেল প্যারেন্টস' হিসেবে অভিহিত করা হয়, তারা তাদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ৭১ বছর বয়সী অ্যাগনেস গিবনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার ২৯ বছর বয়সী ছেলে রোনাল্ড ডা সিলভাকে হারানোর কথা স্মরণ করেন, যিনি ২০০২ সালে এক অবৈধ অভিবাসীর গুলিতে নিহত হন। ৭৩ বছর বয়সী ডন রোজেনবার্গ তার ছেলে ড্রিউ রোজেনবার্গের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা জানান, যাকে ২০১০ সালে লাইসেন্সবিহীন এক হন্ডুরান নাগরিক গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করেছিল। এছাড়া ৬৭ বছর বয়সী অ্যাঞ্জি মরফিন তার ১৩ বছরের ছেলে রুবেন মরফিনকে ১৯৯০ সালে এক মেক্সিকান গ্যাং সদস্যের হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়ার স্মৃতিচারণ করেন। এই পরিবারগুলোর মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা শোনার সময় মুলিনের স্ত্রী ক্রিস্টিকেও চোখ মুছতে দেখা যায়। মুলিন পরবর্তীতে অভিভাবকদের এই বক্তব্যগুলোকে 'অত্যন্ত শক্তিশালী' বলে বর্ণনা করেন। সাবেক এই ওকলাহোমা সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে 'পুলিশ-বিরোধী' এবং 'উন্মুক্ত সীমান্ত' নীতির সমর্থক বলে অভিযোগ তোলেন। ফেডারেল এজেন্টদের কাজে বাধা দিলে যে কাউকেই অপরাধীদের সাথে গ্রেপ্তার করা হবে বলে তিনি 'জিরো টলারেন্স' বা শূন্য সহনশীলতা নীতির হুঁশিয়ারি দেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের গৃহহীনতা ও মাদকের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে জননিরাপত্তার উন্নতি সম্ভব। তবে নীতিগত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ ও ২০২৮ সালের অলিম্পিকের মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলোকে সামনে রেখে লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন বাসের সাথে মিলে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন মুলিন।
স্পেন সফরের শেষ দিনে অভিবাসন ও শরণার্থী ইস্যুতে শক্তিশালী বার্তা দিয়েছেন পোপ লিও। তিনি বলেছেন, “আমরা সবাই এক অর্থে অভিবাসী,” এবং মানব পরিবার হিসেবে শরণার্থীদের আরও মানবিকভাবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান। শুক্রবার স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ টেনেরিফে পৌঁছে একটি সাবেক সামরিক ব্যারাকে স্থাপিত অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রে যান পোপ লিও। সেখানে তিনি শত শত অভিবাসীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। পোপ বলেন, আজকের বিদেশি ব্যক্তি আগামী দিনে আমাদেরই প্রতিবেশী ও সহযাত্রী হতে পারেন। তাই অভিবাসীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আরও মানবিক হওয়া জরুরি। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ ইউরোপে অভিবাসনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। আটলান্টিক রুট দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে প্রতি বছর হাজারো মানুষ প্রাণ হারান। পোপ তার বক্তব্যে বলেন, অভিবাসীরা শুধু সীমান্ত পার হন না, বরং অনেক সময় নতুন দেশে এসে “নীরব বিপর্যয়ের” মুখে পড়েন। কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তা না পেয়ে তারা আবারও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতি নিয়েও পরোক্ষ সমালোচনা করেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে এই নীতিকে কঠোর ও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য সীমাবদ্ধতামূলক বলে সমালোচনা করেছে। পোপ লিও বলেন, মানব বিবেক এবং খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ কখনোই সমুদ্রে প্রাণহানির ঘটনায় নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। তার মতে, প্রতিটি প্রাণহানি মানবতার ব্যর্থতা। এ সময় তিনি মানবপাচারকারী ও দালালদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দেন। তিনি বলেন, যারা মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়, তাদের “ঈশ্বরের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।” অভিবাসীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন নাইজেরিয়ার বুসো দিয়ুফ। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার খোঁজে যাত্রা সহজ ছিল না এবং অনেকেই ভয়, ক্ষুধা ও মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি সমাজের কাছে ন্যূনতম সম্মান ও মানবিক আচরণের দাবি জানান, যাতে অভিবাসীদের শুধু সংখ্যা হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পোপ লিওর এই সফর ও বক্তব্য ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নীতি নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জো বাইডেন প্রশাসনের মেয়াদে "নিখোঁজ" হওয়া সাড়ে চার লাখ অভিবাসী শিশুর মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৪৬ হাজার শিশুকে খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছে বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) বিভাগের প্রধান মার্কওয়েন মুলিন এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে বিপুল সংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী শিশু সরকারি নজরদারির বাইরে চলে গিয়েছিল, যাদের মধ্যে এখনো প্রায় তিন লাখ শিশু সম্পূর্ণ অনধিসন্ধিত বা প্রশাসনিকভাবে নিখোঁজ রয়েছে। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বিপুল সংখ্যক শিশুকে 'নিখোঁজ' বা 'হারিয়ে যাওয়া' হিসেবে আখ্যায়িত করার পেছনে মূলত দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও নথিপত্রের ত্রুটি দায়ী। মূলত ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত ডিএইচএস-এর ইন্সপেক্টর জেনারেলের (ওআইজি) একটি অডিট রিপোর্টের সূত্র ধরে এই সংখ্যার হিসাব দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে আসা ৪ লাখ ৪৮ thousand বা প্রায় সাড়ে চার লাখ অনথিবদ্ধ শিশুকে কাস্টমস হেফাজত থেকে পুনর্বাসনের জন্য স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের (এইচএইচএস) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া মেনে তাদের আদালতে হাজির হওয়ার নোটিশ না দেওয়া এবং ঠিকানায় গড়মিল থাকার কারণে বিশাল একটি অংশ সরকারি ফাইলের বাইরে চলে যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই) এবং আইসিই কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থানে সশরীরে অনুসন্ধান ও স্পন্সরদের খোঁজ নিয়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার শিশুকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ের তদন্তে দেখা গেছে, এই শিশুদের একটি বড় অংশ কোনো অপরাধ চক্রের হাতে পাচার বা হারিয়ে যায়নি, বরং তারা তাদের প্রাথমিক স্পন্সরদের দেওয়া নির্দিষ্ট ঠিকানাতেই সাধারণ জীবনযাপন করছিল। কেবল সরকারি আইনি নোটিশ বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে বিগত দিনে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। যদিও এর মধ্যে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ভয়াবহ যৌন নির্যাতন ও শ্রম পাচারের শিকার হওয়ার মতো লোমহর্ষক অভিযোগও পাওয়া গেছে, যা নিয়ে বর্তমানে গভীর তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ডিএইচএস প্রধান। এই উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি স্পন্সরশিপ ব্যবস্থার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। সংবাদ সম্মেলনে দেশটির ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ জালিয়াতির মাধ্যমে শিশুদের স্পন্সর সেজে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ওহাইও থেকে তিন গুয়াতেমালান নাগরিকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়েরের ঘোষণা দেন। একই সাথে ডিএইচএস প্রধান মার্কওয়েন মুলিন নিউ ইয়র্ক, শিকাগো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো ‘স্যাঙ্কচুয়ারি সিটি’ বা অভিবাসীবান্ধব শহরগুলোর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহযোগিতা না করার কারণে এসব অঞ্চল অপরাধী ও মানবপাচারকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হচ্ছে, যা শিশুদের সুরক্ষাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।