প্রয়াত কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সাথে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুসম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ক্লিনটনের ভাষ্যমতে, ট্রাম্প একসময় নিজেই তাকে বলেছিলেন যে এপস্টাইনের সাথে তার বেশ ‘দারুণ সময়’ (great times) কেটেছে। সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) হাউস ওভারসাইট কমিটির একটি ভিডিও জবানবন্দিতে ক্লিনটন এসব কথা বলেন। জেফরি এপস্টাইনের যৌন পাচার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে এই জবানবন্দি নেওয়া হয়। জবানবন্দিতে বিল ক্লিনটন জানান, তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে এপস্টাইনের কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী নন। তবে ট্রাম্পের সাথে কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ট্রাম্প এপস্টাইনকে বেশ পছন্দ করতেন এবং তাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ছিল। একই তদন্তের অংশ হিসেবে সাবেক ফার্স্ট লেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও পৃথকভাবে ভিডিও জবানবন্দি দিয়েছেন। হিলারি জানান, এপস্টাইনের সাথে তার কখনো দেখা হওয়ার কথা মনে পড়ছে না এবং তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে এপস্টাইনের সাথে তার সম্পর্কের কথা অস্বীকার না করলেও, পরবর্তীকালে এপস্টাইনের অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার পর তিনি তার থেকে দূরত্ব বজায় চলেন। তবে ক্লিনটনের এই নতুন দাবি ট্রাম্পের পুরনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জেফরি এপস্টাইন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে বন্দি অবস্থায় আত্মহত্যা করেন। তার বিরুদ্ধে বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌন নির্যাতনের জন্য পাচার করার অভিযোগ ছিল। তার সাথে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম জড়িয়ে থাকায় এই তদন্তটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর মৃত্যুর পর বিশ্বরাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। তেহরানের অন্যতম প্রধান কৌশলগত মিত্র হওয়া সত্ত্বেও বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেন চীন এই সংকটে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে একটি 'পরিমিত' বা সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (SCMP)। চীনা প্রতিক্রিয়ার গতিপ্রকৃতি: হামলার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপে জানিয়েছেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতার ওপর হামলা এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা বেইজিং কখনোই সমর্থন করে না। তবে বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন, চীন নিন্দা জানালেও ইরানের হয়ে সরাসরি সামরিক সহায়তার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বরং বেইজিং বারবার যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে। কেন এই সতর্কতা? বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে কাজ করছে তিনটি প্রধান কারণ: ১. জ্বালানি নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা: মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন তার মোট চাহিদার প্রায় ৪৪ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ইরান চীনের বড় জ্বালানি সরবরাহকারী হলেও বেইজিংয়ের বিনিয়োগ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতেও প্রচুর। ইরানের হয়ে লড়তে গিয়ে এই দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করা চীনের জন্য অর্থনৈতিক আত্মহত্যার শামিল হবে। ২. আমেরিকার সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ ও ট্রাম্প ফ্যাক্টর: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা যে কঠোর সামরিক অবস্থান নিয়েছে, তার মোকাবিলা করার চেয়ে চীন বর্তমানে নিজস্ব অর্থনীতি সামলাতেই বেশি আগ্রহী। ট্রাম্পের 'রেজিম চেঞ্জ' বা শাসন পরিবর্তনের কৌশলে চীন উদ্বিগ্ন হলেও, সরাসরি আমেরিকার মুখোমুখি হওয়া তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় নেই। ৩. কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখা: রেনমিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কুই শৌজুন মনে করেন, ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া চীনের পররাষ্ট্র নীতির পরিপন্থী। বেইজিং বরং জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাশিয়ার সাথে মিলে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পছন্দ করে। ভবিষ্যৎ শঙ্কা: বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এই হামলা যদি একটি প্রথাগত যুদ্ধের রূপ নেয় এবং পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা চীনের টালমাটাল অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। উপসংহার: চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যদি অভ্যন্তরীণভাবে ভেঙে পড়ে বা নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। তাই আপাতত 'ধীরে চলো' নীতি গ্রহণ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বেইজিং।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার দাবি করেছে ইরান। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, এই জলপথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিতে সরাসরি ‘আগুন ধরিয়ে দেওয়া’ হবে। সোমবার আইআরজিসি-র প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাব্বারি এক বিবৃতিতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “হরমুজ প্রণালী এখন থেকে বন্ধ। যদি কেউ এই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে পার হওয়ার চেষ্টা করে, তবে বিপ্লবী গার্ড এবং নৌবাহিনীর যোদ্ধারা সেই জাহাজগুলো পুড়িয়ে দেবে।” উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলে ইরান দাবি করেছে, তারা ইতিমধ্যেই একটি মার্কিন-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ‘এথে নোভা’ (ATHE NOVA) নামক ওই ট্যাঙ্কারটি দুটি ড্রোনের আঘাতে বর্তমানে জ্বলছে বলে আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই দাবি নাকচ করে জানিয়েছে, জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। কেন এই যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি? গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান সরকারের পতনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার খবর পাওয়া যায়। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর খবরের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ অস্থিরতা শুরু হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইতিমধ্যেই ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনি সংকেত: বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সংকটের প্রভাবে সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রুট দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে এবার কড়া বার্তা দিল লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অব্যাহত হামলার মুখে আর চুপ থাকা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সংগঠনটি। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কোনো উস্কানি নয়, বরং এটি একটি ‘বৈধ প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’। ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, গত ১৫ মাস ধরে ইসরায়েল ক্রমাগত লেবাননের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ইসরায়েলকে চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য করার জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "আমরা বারবার সতর্ক করেছি যে, বিচারহীনভাবে এই হত্যাকাণ্ড এবং ধ্বংসযজ্ঞ চলতে পারে না। এখন সময় এসেছে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আগ্রাসনের অবসান ঘটানো।" তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে লেবানন সরকারের অবস্থানে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সম্প্রতি এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, লেবাননে হিজবুল্লাহর সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এখন থেকে তাদের ভূমিকা কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের মধ্যেই হিজবুল্লাহর এই পাল্টা হুঙ্কার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
প্রয়াত কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সাথে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুসম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ক্লিনটনের ভাষ্যমতে, ট্রাম্প একসময় নিজেই তাকে বলেছিলেন যে এপস্টাইনের সাথে তার বেশ ‘দারুণ সময়’ (great times) কেটেছে। সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) হাউস ওভারসাইট কমিটির একটি ভিডিও জবানবন্দিতে ক্লিনটন এসব কথা বলেন। জেফরি এপস্টাইনের যৌন পাচার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে এই জবানবন্দি নেওয়া হয়। জবানবন্দিতে বিল ক্লিনটন জানান, তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে এপস্টাইনের কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী নন। তবে ট্রাম্পের সাথে কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ট্রাম্প এপস্টাইনকে বেশ পছন্দ করতেন এবং তাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ছিল। একই তদন্তের অংশ হিসেবে সাবেক ফার্স্ট লেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও পৃথকভাবে ভিডিও জবানবন্দি দিয়েছেন। হিলারি জানান, এপস্টাইনের সাথে তার কখনো দেখা হওয়ার কথা মনে পড়ছে না এবং তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে এপস্টাইনের সাথে তার সম্পর্কের কথা অস্বীকার না করলেও, পরবর্তীকালে এপস্টাইনের অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার পর তিনি তার থেকে দূরত্ব বজায় চলেন। তবে ক্লিনটনের এই নতুন দাবি ট্রাম্পের পুরনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জেফরি এপস্টাইন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে বন্দি অবস্থায় আত্মহত্যা করেন। তার বিরুদ্ধে বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌন নির্যাতনের জন্য পাচার করার অভিযোগ ছিল। তার সাথে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম জড়িয়ে থাকায় এই তদন্তটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী এখন ঝুঁকির কেন্দ্রে। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। দৈনিক প্রায় ৩১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রুট অচল হলে ২০ দিনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশের তেলক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এতে জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হবে এবং সরবরাহ সংকট দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ আসে এই প্রণালী দিয়ে। সরবরাহ বন্ধ থাকলে দেশটির পেট্রোকেমিক্যাল ও বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংকটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যেও বড় ধাক্কা দেবে। চীনের অর্থনীতিতে বড় আঘাত মানে বিশ্ববাজারে তার প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, কমতে পারে বৈশ্বিক আমদানি-রপ্তানি সূচক। বাজারমূল্য থেকে ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। সরবরাহ সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে দৃশ্যমান। অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, এলএনজির দামও দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সংকটে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে জাপান। দেশটির আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে। জ্বালানি ঘাটতির প্রভাব ইতোমধ্যে টোকিওর অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ার শিল্পনির্ভর অর্থনীতিগুলোও চাপের মুখে পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শুধু জ্বালানি বাজার নয় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে বোনকে কুপিয়ে হত্যার পর বোরকা পরে পালানোর সময় ছোট ভাইকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে এলাকাবাসী। সোমবার (২ মার্চ) রাত ১১টার দিকে হালিশহর থানার ঈদগাহ বড় পুকুর দক্ষিণপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত সেনোয়ারা বেগম স্থানীয় বাসিন্দা সাবের আহমেদের স্ত্রী। হত্যার অভিযোগে আটক ছোট ভাইয়ের নাম জানে আলম। তিনিও একই এলাকার বাসিন্দা। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সময় সেনোয়ারার স্বামী ও ছেলে তারাবির নামাজ পড়তে মসজিদে ছিলেন। বাসায় একা থাকা অবস্থায় জানে আলম স্বর্ণালংকার নিতে গেলে বোন বাধা দেন। এ সময় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে জানে আলম বোরকা পরে পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয়রা সন্দেহজনক আচরণ দেখে ধাওয়া দিয়ে আটক করেন। পুলিশ জানায়, আটক ব্যক্তিকে থানায় নেওয়ার সময় একদল বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গণপিটুনির চেষ্টা করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। নিহতের ছেলে সেকান্দার হোসেন বলেন, তারাবির নামাজ শেষে বাসায় ফিরে তারা ঘটনাটি জানতে পারেন এবং দেখেন লোকজন তার মামাকে আটক করে রেখেছে। হালিশহর থানা–এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী সুলতান মোহাম্মদ আহসান উদ্দিন জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল–এর মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে এবং জানে আলমকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত–এর রাজধানী আবুধাবি-তে একটি জ্বালানি ট্যাংক টার্মিনালে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর সেখানে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হলেও দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আবুধাবির মিডিয়া অফিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মুসাফ্ফা জ্বালানি ট্যাংক টার্মিনাল–এ একটি ড্রোন আঘাত হানে। এ ঘটনায় টার্মিনালে আগুন ধরে গেলেও জরুরি উদ্ধারকারী দল দ্রুত সেখানে পৌঁছে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, এ ঘটনায় কেউ আহত হননি এবং টার্মিনালের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও কোনো প্রভাব পড়েনি। স্থানীয় প্রশাসন জানায়, অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা–এর প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। তবে হামলার পেছনে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঝুঁকি বাড়ছে।
স্ত্রী আফরা ইভনাথ খান ইকরার মৃত্যুর পর দাফনে না আসায় সমালোচনার মুখে পড়া ছোট পর্দার অভিনয়শিল্পী জাহের আলভী ২৮ মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। সোমবার রাত আটটার পর ফেসবুকে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে দেশে না ফেরা, স্ত্রীর শেষযাত্রায় অনুপস্থিত থাকা এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ—এসব বিষয়ে কথা বলেন তিনি। ভিডিওর শুরুতে আলভী বলেন, ঘটনার একপাক্ষিক বিবরণ দেখে তাঁকে বিচার করা হচ্ছে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় সবকিছু গুছিয়ে বলা তাঁর পক্ষে কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দাফনে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে আলভীর দাবি, দেশে ফিরলে ‘মব’ বা গণআক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাঁর ভাষ্য, নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার টিকিট কেটে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করলেও নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য পেয়ে ফিরে যান। ফোনে হুমকি পাওয়ার কথাও জানান তিনি। আলভী বলেন, আইনগতভাবে জবাব দিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু যদি সহিংসতার শিকার হন, তাহলে তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তিনি আরও দাবি করেন, ইকরার পরিবার তাঁকে শেষবার স্ত্রীর মুখ দেখতে দেয়নি। ভিডিওতে তাঁদের ১৬ বছরের দাম্পত্য জীবনের কথাও তুলে ধরেন আলভী। তাঁর বক্তব্য, সম্পর্কের টানাপোড়েন আগে থেকেই ছিল এবং স্ত্রী তালাক চাইতেন। তবে সন্তানের কথা ভেবে তিনি বিচ্ছেদ চাননি। সহশিল্পী ইফফাত আরা তিথির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ প্রসঙ্গে আলভী বলেন, বাইরের মানুষের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর কাছে ‘প্রমাণ’ রয়েছে বলে দাবি করেন, যদিও বিস্তারিত পরে জানাবেন বলে জানান। গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মিরপুর DOHS–এর একটি বাসায় ইকরা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। ঘটনার সময় আলভী নেপালে শুটিংয়ে ছিলেন। ইকরার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, দাম্পত্য কলহ ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। এ ঘটনায় ইকরার বাবা কবির হায়াত খান পল্লবী থানায় আলভী ও তাঁর মা নাসরিন সুলতানা শিউলির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। রোববার ময়মনসিংহের ভালুকায় ইকরার দাফন সম্পন্ন হয়। সেখানে আলভীর অনুপস্থিতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সোমবারের ভিডিও বার্তায় সেই সমালোচনার জবাব দেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। রবিবার (১ মার্চ) রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এই উদ্বেগ জানান। তবে ওই বিবৃতিতে ইসরায়েলের নাম উল্লেখ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা হামলাকে তিনি অকার্যকর ও পরিস্থিতি আরও অবনতির কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং এসব কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ইরানে সাম্প্রতিক সামরিক হামলা এবং এর পরবর্তী সময়ে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ সংঘাতের ভয়ংকর বিস্তারকে নির্দেশ করছে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন, বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী যেকোনো হামলার আমরা দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানাই।” তিনি আরও বলেন, “অঞ্চলে ইসরায়েলের অস্থিতিশীলতামূলক কর্মকাণ্ড আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। এসব পদক্ষেপ উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, সংলাপের পথ সংকুচিত করছে এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় ও আঞ্চলিক ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলাও অকার্যকর এবং পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। সংঘাতের বিস্তার নিরীহ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে এবং মুসলিম বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা গভীরতর করবে।” ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন ও স্বীকৃত আইনি কাঠামো উপেক্ষা করে রাষ্ট্রপ্রধান ও জাতীয় নেতাদের হত্যার প্রবণতা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, যা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে, বৈশ্বিক নীতিমালাকে দুর্বল করে এবং অঞ্চলকে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা ও আইনহীনতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ ও বিশ্ববাসী আরেকটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ চায় না। তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রত্যাশা করে। সংযম ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার না হলে পুরো অঞ্চল আরও বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার গুরুতর ঝুঁকিতে পড়বে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।” বিবৃতির শেষাংশে জামায়াত আমির সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, অবিলম্বে সামরিক তৎপরতা বন্ধ এবং সংলাপ ও কূটনীতির পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ও সফররত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তিনি। পূর্ণাঙ্গ কনস্যুলার সহায়তা, সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করে তাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এই সংকটময় সময়ে রক্তপাত বন্ধ ও আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে ঐক্য, প্রজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপরও তিনি জোর দেন।
মো: আবদুর রহমান মিঞা
ড. মাহরুফ চৌধুরী
ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর মৃত্যুর পর বিশ্বরাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। তেহরানের অন্যতম প্রধান কৌশলগত মিত্র হওয়া সত্ত্বেও বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেন চীন এই সংকটে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে একটি 'পরিমিত' বা সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (SCMP)। চীনা প্রতিক্রিয়ার গতিপ্রকৃতি: হামলার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপে জানিয়েছেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতার ওপর হামলা এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা বেইজিং কখনোই সমর্থন করে না। তবে বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন, চীন নিন্দা জানালেও ইরানের হয়ে সরাসরি সামরিক সহায়তার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বরং বেইজিং বারবার যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে। কেন এই সতর্কতা? বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে কাজ করছে তিনটি প্রধান কারণ: ১. জ্বালানি নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা: মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন তার মোট চাহিদার প্রায় ৪৪ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ইরান চীনের বড় জ্বালানি সরবরাহকারী হলেও বেইজিংয়ের বিনিয়োগ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতেও প্রচুর। ইরানের হয়ে লড়তে গিয়ে এই দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করা চীনের জন্য অর্থনৈতিক আত্মহত্যার শামিল হবে। ২. আমেরিকার সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ ও ট্রাম্প ফ্যাক্টর: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা যে কঠোর সামরিক অবস্থান নিয়েছে, তার মোকাবিলা করার চেয়ে চীন বর্তমানে নিজস্ব অর্থনীতি সামলাতেই বেশি আগ্রহী। ট্রাম্পের 'রেজিম চেঞ্জ' বা শাসন পরিবর্তনের কৌশলে চীন উদ্বিগ্ন হলেও, সরাসরি আমেরিকার মুখোমুখি হওয়া তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় নেই। ৩. কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখা: রেনমিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কুই শৌজুন মনে করেন, ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া চীনের পররাষ্ট্র নীতির পরিপন্থী। বেইজিং বরং জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাশিয়ার সাথে মিলে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পছন্দ করে। ভবিষ্যৎ শঙ্কা: বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এই হামলা যদি একটি প্রথাগত যুদ্ধের রূপ নেয় এবং পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা চীনের টালমাটাল অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। উপসংহার: চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যদি অভ্যন্তরীণভাবে ভেঙে পড়ে বা নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। তাই আপাতত 'ধীরে চলো' নীতি গ্রহণ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বেইজিং।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার দাবি করেছে ইরান। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, এই জলপথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিতে সরাসরি ‘আগুন ধরিয়ে দেওয়া’ হবে। সোমবার আইআরজিসি-র প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাব্বারি এক বিবৃতিতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “হরমুজ প্রণালী এখন থেকে বন্ধ। যদি কেউ এই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে পার হওয়ার চেষ্টা করে, তবে বিপ্লবী গার্ড এবং নৌবাহিনীর যোদ্ধারা সেই জাহাজগুলো পুড়িয়ে দেবে।” উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলে ইরান দাবি করেছে, তারা ইতিমধ্যেই একটি মার্কিন-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ‘এথে নোভা’ (ATHE NOVA) নামক ওই ট্যাঙ্কারটি দুটি ড্রোনের আঘাতে বর্তমানে জ্বলছে বলে আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই দাবি নাকচ করে জানিয়েছে, জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। কেন এই যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি? গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান সরকারের পতনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার খবর পাওয়া যায়। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর খবরের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ অস্থিরতা শুরু হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইতিমধ্যেই ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনি সংকেত: বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সংকটের প্রভাবে সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রুট দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে এবার কড়া বার্তা দিল লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অব্যাহত হামলার মুখে আর চুপ থাকা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সংগঠনটি। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কোনো উস্কানি নয়, বরং এটি একটি ‘বৈধ প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’। ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, গত ১৫ মাস ধরে ইসরায়েল ক্রমাগত লেবাননের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ইসরায়েলকে চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য করার জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "আমরা বারবার সতর্ক করেছি যে, বিচারহীনভাবে এই হত্যাকাণ্ড এবং ধ্বংসযজ্ঞ চলতে পারে না। এখন সময় এসেছে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আগ্রাসনের অবসান ঘটানো।" তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে লেবানন সরকারের অবস্থানে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সম্প্রতি এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, লেবাননে হিজবুল্লাহর সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এখন থেকে তাদের ভূমিকা কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের মধ্যেই হিজবুল্লাহর এই পাল্টা হুঙ্কার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে চরম উত্তেজনার মধ্যে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান ঘাঁটিতে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ইরানের পক্ষ থেকে এই দাবি করা হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। আইআরজিসির বরাত দিয়ে ক্যাসপিয়ান পোস্ট জানিয়েছে, বাহরাইনের শেখ ঈসা এলাকায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ২০টি ড্রোন এবং তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইরানি সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, এই হামলায় ঘাঁটিটির প্রধান কমান্ড এবং সদর দপ্তর ভবনটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া হামলায় ঘাঁটির জ্বালানি সঞ্চয়কারী ট্যাংকে আগুন ধরে যায় বলেও তারা দাবি করেছেন। টার্গেট করা স্থাপনাটি শেখ ঈসা এয়ার বেসের কাছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা এই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। তবে এই হামলার বিষয়ে বাহরাইন কর্তৃপক্ষ কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা ক্ষয়ক্ষতির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের পর থেকেই তেহরান পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়ে আসছিল। আইআরজিসির এই দাবি সেই হুমকিরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তীব্রতর হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন ধরে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া এবং মার্কিন বি-১ বোম্বারের ইরানে হামলার মতো খবরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।