ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা নেতৃত্বের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবে তারা আরও দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি পক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার তেহরানে বিমান হামলায় আবদুল্লাহ জালালি-নাসাব ও আমির শরীয়ত নিহত হয়েছেন। এই দুই কর্মকর্তা ‘খাতাম আল-আনবিয়া ইমার্জেন্সি কমান্ড’-এর গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। ইসরায়েল মনে করছে, তাদের মৃত্যু ইরান সরকারের কমান্ড ও কন্ট্রোল কাঠামোর জন্য একটি ‘বড় ধরনের ধাক্কা’। যদিও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জালালি-নাসাবের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে, আমির শরীয়তের অবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ইসরায়েলের তথ্যানুযায়ী, দুই সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা পশ্চিম ও মধ্য ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে ৪০০টির বেশি বিমান হামলা সম্পন্ন করেছে। শুধুমাত্র গত শনিবারই ২০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অস্ত্র মজুত কেন্দ্র। এছাড়া, ইসরায়েল ইরানের প্রধান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রেও হামলা চালিয়েছে। তারা দাবি করেছে, এই কেন্দ্র সামরিক স্যাটেলাইট পরিচালনা করত, যা নজরদারি ও আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান তাদের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছেন— সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ আবদুর রহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ আজিজ নাসিরজাদে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (IRGC) প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর। এছাড়া গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মারা যান ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
চলমান সংঘাতের মধ্যে রাশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে মানবিক সহায়তা পাঠিয়ে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে প্রায় ১৩ টন ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী একটি বিশেষ বিমান ইতিমধ্যে ইরানে পৌঁছেছে। রাশিয়ার এই পদক্ষেপ মূলত ইরানের হাসপাতালে গড়ে ওঠা সংকট মোকাবিলায় নেয়া হয়েছে। ক্রেমলিনের তরফে বলা হয়েছে, তেহরানের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এই জরুরি সহায়তা পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার জরুরি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আই-৭৬ বিমানের মাধ্যমে প্রথমে আজারবাইজানে অবতরণ করা হয় সামগ্রীগুলো। সেখান থেকে সড়কপথে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংঘাতের কারণে ইরান ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। চলতি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায়ও রাশিয়ার সমর্থন ছিল। যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হলেও আজারবাইজানের মধ্য দিয়ে চলাচলরত স্থলপথটি ইরানের জন্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার এই মানবিক সহায়তা শুধু রোগীদের জন্যই নয়, ইরানের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে একটি গুরুত্বপুর্ন বার্তা হিসেবে কাজ করছে।
ইরান ইউক্রেনকে সরাসরি আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে সংঘাত শুরু করেছে, কিয়েভ এখন সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। তিনি বলেন, “ইসরায়েলকে ড্রোন ও বিমানবিধ্বংসী সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে ইউক্রেন কার্যত এই যুদ্ধে জড়িত। জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে ইরানকে আত্মরক্ষার জন্য ইউক্রেনের যেকোনো অঞ্চলে আঘাত হানার বৈধ অধিকার রয়েছে।” আজিজি ইউক্রেন সরকারকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এর ফলে পুরো দেশ ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পারস্য উপসাগরের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে কিয়েভের ভূমিকায় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জেলেনস্কি দাবি করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ইউক্রেনের সহায়তা চেয়েছে ড্রোন প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে। ইউক্রেন ইতোমধ্যে নিজ দেশে তৈরি ড্রোন ইন্টারসেপ্টর ও অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট টিম ওই অঞ্চলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রস্তাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ড্রোন প্রতিরক্ষা নিয়ে আমেরিকার কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রযুক্তি বিশ্বের সেরা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরানের একটি ছোট দ্বীপ নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত Kharg Island–কে ইরানের অর্থনীতির জীবনরেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও খার্গ দ্বীপ তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। তবে গত শুক্রবার দ্বীপটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি Strait of Hormuz দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে থাকে, তাহলে খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। কেন গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ খার্গ একটি প্রবাল দ্বীপ, যার আয়তন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এটি ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত। ইরানের প্রধান তেলক্ষেত্র—আহভাজ, মারুন ও গাচসারান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে আনা হয়। দ্বীপটির গভীর সমুদ্রবন্দর বিশাল সুপারট্যাঙ্কার ভিড়ানোর সুযোগ দেয়, যা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের জন্য এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কঠোর সামরিক নিরাপত্তার কারণে ইরানিদের কাছে এটি ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামেও পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে গেলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। একটি পুরোনো নথিতে Central Intelligence Agency উল্লেখ করেছিল, খার্গ দ্বীপের স্থাপনাগুলো ইরানের তেল ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হামলায় কী ঘটেছে গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর লক্ষ্য ছিল দ্বীপটির সামরিক অবকাঠামো—যেমন ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কার, নৌ-মাইন সংরক্ষণাগার ও বিমানবন্দর। CNN যাচাই করা একটি ভিডিওতে দ্বীপটির বিমানবন্দর ও রানওয়ে এলাকায় হামলার দৃশ্য দেখা গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা Fars News Agency জানিয়েছে, দ্বীপে অন্তত ১৫টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, তবে তেল স্থাপনাগুলো অক্ষত রয়েছে। তেলের বাজারে প্রভাব বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে ইরান একটি বড় উৎপাদক। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং আরও প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন করে। বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। গ্লোবাল বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান Kpler–এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খার্গ দ্বীপে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। সামনে কী হতে পারে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘাত আরও বাড়লে খার্গ দ্বীপ সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে হামলা চালাতে পারে। ইরানের সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী শাখা Islamic Revolutionary Guard Corps ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে—দেশটির জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
চলমান সংঘাতের মধ্যে রাশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে মানবিক সহায়তা পাঠিয়ে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে প্রায় ১৩ টন ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী একটি বিশেষ বিমান ইতিমধ্যে ইরানে পৌঁছেছে। রাশিয়ার এই পদক্ষেপ মূলত ইরানের হাসপাতালে গড়ে ওঠা সংকট মোকাবিলায় নেয়া হয়েছে। ক্রেমলিনের তরফে বলা হয়েছে, তেহরানের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এই জরুরি সহায়তা পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার জরুরি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আই-৭৬ বিমানের মাধ্যমে প্রথমে আজারবাইজানে অবতরণ করা হয় সামগ্রীগুলো। সেখান থেকে সড়কপথে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংঘাতের কারণে ইরান ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। চলতি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায়ও রাশিয়ার সমর্থন ছিল। যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হলেও আজারবাইজানের মধ্য দিয়ে চলাচলরত স্থলপথটি ইরানের জন্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার এই মানবিক সহায়তা শুধু রোগীদের জন্যই নয়, ইরানের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে একটি গুরুত্বপুর্ন বার্তা হিসেবে কাজ করছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা নেতৃত্বের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবে তারা আরও দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি পক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার তেহরানে বিমান হামলায় আবদুল্লাহ জালালি-নাসাব ও আমির শরীয়ত নিহত হয়েছেন। এই দুই কর্মকর্তা ‘খাতাম আল-আনবিয়া ইমার্জেন্সি কমান্ড’-এর গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। ইসরায়েল মনে করছে, তাদের মৃত্যু ইরান সরকারের কমান্ড ও কন্ট্রোল কাঠামোর জন্য একটি ‘বড় ধরনের ধাক্কা’। যদিও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জালালি-নাসাবের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে, আমির শরীয়তের অবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ইসরায়েলের তথ্যানুযায়ী, দুই সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা পশ্চিম ও মধ্য ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে ৪০০টির বেশি বিমান হামলা সম্পন্ন করেছে। শুধুমাত্র গত শনিবারই ২০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অস্ত্র মজুত কেন্দ্র। এছাড়া, ইসরায়েল ইরানের প্রধান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রেও হামলা চালিয়েছে। তারা দাবি করেছে, এই কেন্দ্র সামরিক স্যাটেলাইট পরিচালনা করত, যা নজরদারি ও আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান তাদের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছেন— সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ আবদুর রহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ আজিজ নাসিরজাদে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (IRGC) প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর। এছাড়া গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মারা যান ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে আফগানিস্তান থেকে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ। শুক্রবার রাতে এ হামলা হয় বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। পাকিস্তানের সামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ইসলামাবাদের কাছে অবস্থিত সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর এলাকাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা করা হয়। তবে তা প্রতিহত করা হয়েছে। এ ছাড়া Quetta অঞ্চলে একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুই শিশু আহত হয়েছে। আর Kohat এলাকায় ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন বেসামরিক নাগরিক আহত হন। হামলার পর রাজধানী Islamabad–এর আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনীর কাছে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি নেই। সাধারণত স্থানীয়ভাবে তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে তারা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হামলা চালাতে পারে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী Kabulসহ তিনটি অঞ্চলে বিমান হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত চারজন নিহত হন। এরপরই প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেয় Taliban। ড্রোন হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট Asif Ali Zardari নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা পাকিস্তান মেনে নেবে না। প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করা যাবে না।” এর আগে গত মাসে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভেতরে কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। ইসলামাবাদের দাবি ছিল, পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার জবাবে ওই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে আফগানিস্তানে এমন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেছে তালেবান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় চলমান সংঘর্ষে গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানে অন্তত ৭৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১৯৩ জন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরানের একটি ছোট দ্বীপ নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত Kharg Island–কে ইরানের অর্থনীতির জীবনরেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও খার্গ দ্বীপ তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। তবে গত শুক্রবার দ্বীপটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি Strait of Hormuz দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে থাকে, তাহলে খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। কেন গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ খার্গ একটি প্রবাল দ্বীপ, যার আয়তন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এটি ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত। ইরানের প্রধান তেলক্ষেত্র—আহভাজ, মারুন ও গাচসারান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে আনা হয়। দ্বীপটির গভীর সমুদ্রবন্দর বিশাল সুপারট্যাঙ্কার ভিড়ানোর সুযোগ দেয়, যা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের জন্য এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কঠোর সামরিক নিরাপত্তার কারণে ইরানিদের কাছে এটি ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামেও পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে গেলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। একটি পুরোনো নথিতে Central Intelligence Agency উল্লেখ করেছিল, খার্গ দ্বীপের স্থাপনাগুলো ইরানের তেল ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হামলায় কী ঘটেছে গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর লক্ষ্য ছিল দ্বীপটির সামরিক অবকাঠামো—যেমন ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কার, নৌ-মাইন সংরক্ষণাগার ও বিমানবন্দর। CNN যাচাই করা একটি ভিডিওতে দ্বীপটির বিমানবন্দর ও রানওয়ে এলাকায় হামলার দৃশ্য দেখা গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা Fars News Agency জানিয়েছে, দ্বীপে অন্তত ১৫টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, তবে তেল স্থাপনাগুলো অক্ষত রয়েছে। তেলের বাজারে প্রভাব বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে ইরান একটি বড় উৎপাদক। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং আরও প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন করে। বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। গ্লোবাল বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান Kpler–এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খার্গ দ্বীপে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। সামনে কী হতে পারে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘাত আরও বাড়লে খার্গ দ্বীপ সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে হামলা চালাতে পারে। ইরানের সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী শাখা Islamic Revolutionary Guard Corps ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে—দেশটির জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোববার (১৫ মার্চ) এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হবে। শনিবার (১৪ মার্চ) বিষয়টি তার ব্যক্তিগত সচিব মিজানুর রহমান সোহেল গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সকাল ১১টায় মির্জা আব্বাসকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর নেওয়া হবে। তার সঙ্গে থাকবেন সহধর্মিণী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস এবং জ্যেষ্ঠ সন্তান মির্জা ইয়াসির আব্বাস ভাশন। গত বুধবার (১১ মার্চ) ইফতারের সময় অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারান মির্জা আব্বাস। এরপর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। শুক্রবার তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ গঠিত মেডিকেল বোর্ড তাকে দেশে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। শুক্রবার বিকেলে প্রথম দফায় মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। পরে দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার শেষে তিনি নিউরো আইসিইউতে স্থানান্তরিত হন। বর্তমানে মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ৭২ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। মির্জা আব্বাসের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডে আছেন অধ্যাপক আলী উজ্জামান জোয়ার্দার, কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, শাহাবুদ্দিন তালুকদার, রাজিউল হক, সৈয়দ সাঈদ আহমেদ, কাদের শেখ, শফিকুল ইসলামসহ এভারকেয়ার হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসকরা। বিএনপির জ্যেষ্ঠ এই নেতার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েই রয়েছেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা তারেক রহমান।
জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ের ফলাফল ভোট গণনার সময় প্রভাবিত করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় পঞ্চগড় সদর উপজেলার হিমালয় পার্কে আয়োজিত জাতীয় নাগরিক পার্টি পঞ্চগড় জেলা শাখার ইফতার মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন। সারজিস আলম বলেন, আমাদের ভোট কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এই দায় যেমন অন্যদের ওপর দেওয়া যায়, তেমনি এটাও সত্য যে আমরা আমাদের ভোট গণনার সময় যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারিনি। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি নেতাকর্মীদের সতর্ক করে বলেন, কোনো কেন্দ্রে যদি আমাদের ১০ জন ভোটার থাকে, সেই ১০টি ভোটও রক্ষা করতে হবে। আবার কোথাও যদি ১০০ জন ভোটারের মধ্যে ৯০টি আমাদের হয়, তাহলে সেই ৯০টি ভোটও নিশ্চিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা ১১ দলীয় ঐক্যজোটের বিরোধী দল হিসেবে সংসদে আছি। স্থানীয় নির্বাচন একসঙ্গে হবে নাকি আলাদাভাবে হবে—তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে যেভাবেই হোক, জনগণের দেওয়া ভোটের আমানত রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষ অনেক আশা ও পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে আমাদের ভোট দিয়েছে। সেই পরিবর্তনের লড়াই রাজপথ থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। ভয় ও সাহসের প্রসঙ্গ টেনে সারজিস আলম বলেন, ভয় ছোঁয়াচে—ভয় পেলে মানুষ পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু সাহস আরও বেশি ছোঁয়াচে। একজন মানুষ যখন সাহস দেখায়, তখন অন্যরাও সেই সাহস থেকে অনুপ্রাণিত হয়। স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। আপনাদের মধ্য থেকেই কেউ মেম্বার, কেউ চেয়ারম্যান, কেউ উপজেলা চেয়ারম্যান কিংবা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন।
মো: আবদুর রহমান মিঞা
মো: আবদুর রহমান মিঞা
ড. মাহরুফ চৌধুরী
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা নেতৃত্বের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবে তারা আরও দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি পক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার তেহরানে বিমান হামলায় আবদুল্লাহ জালালি-নাসাব ও আমির শরীয়ত নিহত হয়েছেন। এই দুই কর্মকর্তা ‘খাতাম আল-আনবিয়া ইমার্জেন্সি কমান্ড’-এর গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। ইসরায়েল মনে করছে, তাদের মৃত্যু ইরান সরকারের কমান্ড ও কন্ট্রোল কাঠামোর জন্য একটি ‘বড় ধরনের ধাক্কা’। যদিও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জালালি-নাসাবের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে, আমির শরীয়তের অবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ইসরায়েলের তথ্যানুযায়ী, দুই সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা পশ্চিম ও মধ্য ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে ৪০০টির বেশি বিমান হামলা সম্পন্ন করেছে। শুধুমাত্র গত শনিবারই ২০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অস্ত্র মজুত কেন্দ্র। এছাড়া, ইসরায়েল ইরানের প্রধান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রেও হামলা চালিয়েছে। তারা দাবি করেছে, এই কেন্দ্র সামরিক স্যাটেলাইট পরিচালনা করত, যা নজরদারি ও আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান তাদের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছেন— সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ আবদুর রহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ আজিজ নাসিরজাদে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (IRGC) প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর। এছাড়া গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মারা যান ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
চলমান সংঘাতের মধ্যে রাশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে মানবিক সহায়তা পাঠিয়ে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে প্রায় ১৩ টন ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী একটি বিশেষ বিমান ইতিমধ্যে ইরানে পৌঁছেছে। রাশিয়ার এই পদক্ষেপ মূলত ইরানের হাসপাতালে গড়ে ওঠা সংকট মোকাবিলায় নেয়া হয়েছে। ক্রেমলিনের তরফে বলা হয়েছে, তেহরানের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এই জরুরি সহায়তা পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার জরুরি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আই-৭৬ বিমানের মাধ্যমে প্রথমে আজারবাইজানে অবতরণ করা হয় সামগ্রীগুলো। সেখান থেকে সড়কপথে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংঘাতের কারণে ইরান ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। চলতি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায়ও রাশিয়ার সমর্থন ছিল। যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হলেও আজারবাইজানের মধ্য দিয়ে চলাচলরত স্থলপথটি ইরানের জন্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার এই মানবিক সহায়তা শুধু রোগীদের জন্যই নয়, ইরানের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে একটি গুরুত্বপুর্ন বার্তা হিসেবে কাজ করছে।
ইরান ইউক্রেনকে সরাসরি আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে সংঘাত শুরু করেছে, কিয়েভ এখন সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। তিনি বলেন, “ইসরায়েলকে ড্রোন ও বিমানবিধ্বংসী সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে ইউক্রেন কার্যত এই যুদ্ধে জড়িত। জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে ইরানকে আত্মরক্ষার জন্য ইউক্রেনের যেকোনো অঞ্চলে আঘাত হানার বৈধ অধিকার রয়েছে।” আজিজি ইউক্রেন সরকারকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এর ফলে পুরো দেশ ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পারস্য উপসাগরের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে কিয়েভের ভূমিকায় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জেলেনস্কি দাবি করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ইউক্রেনের সহায়তা চেয়েছে ড্রোন প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে। ইউক্রেন ইতোমধ্যে নিজ দেশে তৈরি ড্রোন ইন্টারসেপ্টর ও অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট টিম ওই অঞ্চলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রস্তাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ড্রোন প্রতিরক্ষা নিয়ে আমেরিকার কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রযুক্তি বিশ্বের সেরা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরানের একটি ছোট দ্বীপ নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত Kharg Island–কে ইরানের অর্থনীতির জীবনরেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও খার্গ দ্বীপ তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। তবে গত শুক্রবার দ্বীপটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি Strait of Hormuz দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে থাকে, তাহলে খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। কেন গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ খার্গ একটি প্রবাল দ্বীপ, যার আয়তন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এটি ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত। ইরানের প্রধান তেলক্ষেত্র—আহভাজ, মারুন ও গাচসারান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে আনা হয়। দ্বীপটির গভীর সমুদ্রবন্দর বিশাল সুপারট্যাঙ্কার ভিড়ানোর সুযোগ দেয়, যা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের জন্য এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কঠোর সামরিক নিরাপত্তার কারণে ইরানিদের কাছে এটি ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামেও পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে গেলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। একটি পুরোনো নথিতে Central Intelligence Agency উল্লেখ করেছিল, খার্গ দ্বীপের স্থাপনাগুলো ইরানের তেল ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হামলায় কী ঘটেছে গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর লক্ষ্য ছিল দ্বীপটির সামরিক অবকাঠামো—যেমন ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কার, নৌ-মাইন সংরক্ষণাগার ও বিমানবন্দর। CNN যাচাই করা একটি ভিডিওতে দ্বীপটির বিমানবন্দর ও রানওয়ে এলাকায় হামলার দৃশ্য দেখা গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা Fars News Agency জানিয়েছে, দ্বীপে অন্তত ১৫টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, তবে তেল স্থাপনাগুলো অক্ষত রয়েছে। তেলের বাজারে প্রভাব বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে ইরান একটি বড় উৎপাদক। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং আরও প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন করে। বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। গ্লোবাল বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান Kpler–এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খার্গ দ্বীপে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। সামনে কী হতে পারে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘাত আরও বাড়লে খার্গ দ্বীপ সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে হামলা চালাতে পারে। ইরানের সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী শাখা Islamic Revolutionary Guard Corps ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে—দেশটির জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।